অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত: এক বিস্মৃত মহানায়ক - মিঠুন চৌধুরী

বাংলা ভাষা ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিলেন। দেশত্যাগ করলে ক্ষমতা লাভের হাতছানি থাকার পরও জন্মভূমি ছেড়ে যাননি। প্রতিবাদী ধীরেন্দ্রনাথের প্রথম প্রতিবাদের পথ ধরেই ভাষা আন্দোলন এবং ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। অথচ সেই স্বপ্নদ্রষ্টাই আজ বিস্মৃতির অন্তরালে। 

বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি হিসেবে আমাদের খ্যাতি আছে সত্য। তবে এই বিস্মৃতি আমাদের নিয়ে যেতে পারে তিমিরে। জন্মের ইতিহাস বিষয়ে অজ্ঞানতা জাতিকে করে দিতে পারে উন্মূল। আর অতীতের ভিত্তিভূমিতে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত না করলে লক্ষ্য ও পথ নির্ধারণ দুটোই হতে পারে ভ্রান্ত।  

উপমহাদেশে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিশ্বাসী হয়ে ধর্মকে ভিত্তি ধরে দুটো দেশের জন্ম হয়েছিল। এখনো এই উপমহাদেশে রাজনীতির দুটি স্পষ্ট ধারা- একটি ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং অন্যটি রাজনীতিসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্তির ধারার পরিবর্তে মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ধারায় বিশ্বাসী। মূল লড়াইটা এখানেই। দ্বিজাতিতত্ত্বের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করেই বাংলা ভাষা ভিত্তিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম। 

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মূল দ্বন্ধের প্রশ্ন এখনো এটিই। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় বিরোধীতাকারী অংশ রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের বিরোধীতার নেপথ্যের কারণও এটি। বাংলাদেশকে আবারো পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নিতে চাওয়ার যে রাজনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেষ্টা ছিল এবং আছে তার নেপথ্যের কারণও একই। বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও অগ্রযাত্রার প্রশ্নে তাই ইতিহাসের সত্যকে প্রকৃত রূপে জেনে এবং তা হৃদয়ে ধারণ করেই আমাদের জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে হবে। 

পাকিস্তান সৃষ্টির পর মুসলিম লীগের নেতারা তখন প্রকৃত অর্থে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজে মগ্ন। তখনই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব সেই ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার মূলে এক বিশাল আঘাত। ১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তানের জন্ম। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিরোধীতা করলেও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী স্বপ্নবান ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দেশ ত্যাগ করেননি। বরং রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেই বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে কার্যকর ভূমিকা নেয়া জরুরী ছিল তাই করেছেন দারুণ সাহসের সাথে। 

এবার দেখা যাক ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদের সভায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কী বলেছিলেন। তিনি বলেন- “আমি প্রস্তাব করি রুল ২৯ এর সাব-রুল (১) এর দ্বিতীয় লাইনে ‘ইংরেজি’ শব্দটির পরে ‘অথবা বাংলা’ শব্দ দুটি বসানো হোক।” একই দিন প্রস্তাবের প্রথম অংশে তিনি বছরে গণপরিষদের অন্তত একটি অধিবেশন পূর্ব বাংলায় করার প্রস্তাব দেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি এই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায় ।

পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পরিষদের সভায় তার প্রস্তাবের পক্ষে সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি দেন। ‘বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে মর্যাদা প্রদান করিতে হইবে’ শীর্ষক ওই বক্তব্যে তিনি বলেন, “…আমার মনোভাব এই রূপ যে, যেন সদস্যবর্গ গভীরভাবে বিষয়টি বিবেচনা করেন। এ কথা আমি জানি বাংলা একটি প্রাদেশিক ভাষা। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের কথা যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে দেখিব যে রাষ্ট্রের অধিকাংশ অধিবাসীর ভাষা হইতেছে বাংলা। কাজেই প্রাদেশিক হইলেও যেহেতু রাষ্ট্রের অধিকাংশ অধিবাসীর ভাষা বাংলা, সেকারণে বাংলা ভাষা ভিন্ন মর্যাদার দাবিদার। রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যা ৬ কোটি ৯০  লক্ষ এর মধ্যে চার কোটি ৪০ লক্ষ বাংলা বলে। এই যদি অবস্থা হয় তা হইলে রাষ্ট্রভাষা কোনটি হওয়া উচিত? সেই ভাষারই দেশের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত দেশের সংখ্যাগরিষ্ট লোক যে ভাষায় কথা বলে, আর সেজন্যই আমার বিবেচনায় বাংলা ভাষাই হচ্ছে আমাদের দেশের ‘লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা’। আমি জানি আমার এ মনোভাব দ্বারা আমাদের রাষ্ট্রের বিপুল সংখ্যক মানুষের অনুভূতিকে প্রকাশ করিতেছি।… “ 

তিনি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন কোনো ধরণের প্রাদেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয় বরং বাস্তব কারণেই তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করছেন। তাঁর প্রস্তাব এবং এর প্রেক্ষিতে গণপরিষদের সদস্যদের ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠলে, বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রের বিষয়টি ছাত্রনেতাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

এ বিষয়ে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখছেন- “করাচিতে পাকিস্তান সংবিধান সভার (কন্সটিটিউয়েন্ট এ্যাসেম্বলি) বৈঠক হচ্ছিল। সেখানে রাষ্ট্রভাষা কি হবে সেই বিষয়ও আলোচনা হচ্ছিল। মুসলিম লীগ নেতারা উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষপাতী। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ লীগ সদস্যেরও সেই মত। কুমিল্লার কংগ্রেস সদস্য বাবু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দাবি করলেন বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক। কারণ, পাকিস্তানের সংখ্যাগুরুর ভাষা হল বাংলা। মুসলিম লীগ সদস্যরা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। আমরা দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার।” -পৃষ্ঠা-৯১। 

এই বর্ণনা থেকেই প্রতীয়মান হয় গণপরিষদের মুসলিম লীগের সদস্যের মনোভাব সেদিন কেমন ছিল। একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো গণপরিষদের ৭৯ জন সদস্যের মধ্যে সেদিন ৩৮ জন ছিলেন পূর্ব বাংলা থেকে নির্বাচিত এবং ভাষাগত পরিচয়ে বাঙালি সদস্য। গণপরিষদে পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য শুধু ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন। মুসলিম লীগ করা বাঙালি সদস্যরা সেদিন নিশ্চুপ ছিলেন। তাঁরা নিরব থাকলেও পাকিস্তানের নেতারা ঠিকই এই প্রস্তাবের ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পেরেছিল। 

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধীতা করে বলেন,- এখানে এই প্রশ্নটা তোলাই ভুল হয়েছে। এটা আমাদের জন্য একটা জীবনমরণ সমস্যা। মনে হয় পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা এবং একটি সাধারণ ভাষার দ্বারা ঐক্যসূত্র স্থাপনের প্রচেষ্টা হতে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করাই এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য। 

লিয়াকত আলী খানের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়, মূলত পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী বিভিন্ন ভাষাভাষী মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকেই উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। অর্থাৎ ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্র কাঠামোতে ঐক্যসূত্র হিসেবে ভাষাকেই দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন পাকিস্তানি নেতৃত্ব। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে জাতিগত যে বিভক্তি সে বিষয়ে তাঁরা ওয়াকিবহাল ছিলেন। পাশাপাশি ধর্ম যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হতে পারে না এ সত্য জেনেই পাকিস্তানের পথে তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তাই ভুলভাবে হলেও ধর্মীয় বাতাবরণে উর্দুকে ঐক্যসূত্র হিসেবে ব্যবহারের নেপথ্যে ছিল আসলে জাতির ভাষা ভিত্তিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।  

আর পূর্ব বাংলার সব মানুষের মুখের ভাষাই ছিল বাংলা। আমাদের ভাষা ভিত্তিক ঐক্য তাই হয়েই ছিল অনেক আগে থেকে। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মুখের ভাষা বাংলা হওয়ার পরও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার নেপথ্যে যে দুরভিসন্ধি এবং ভাষিক অাধিপত্যের পথ ধরে বাঙালি জাতিকে অবদমিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল তা সবার আগেই শনাক্ত করতে পেরেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। পাকিস্তানের উর্দুভাষী আরোপিত ঐক্য নির্ভর ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের মূলে কুঠারাঘাত ছিল ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ওই প্রস্তাব। 

গণপরিষদে সেই প্রস্তাব নাকচ হওয়ার পর বাংলার ছাত্ররা গর্জে ওঠেন। এরপর পূর্ব বাংলার ব্যবস্থাপক পরিষদের সভাতেও ভাষা প্রশ্নে সবসময় সরব ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত ভাষার প্রশ্নে সব আন্দোলন সংগ্রামে তিনি সক্রিয় অগ্রসেনানী ছিলেন। 

পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের করা মোক্ষম আঘাতটির কথা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কখনোই ভোলেনি। ১৯৬০ সালে সামরিক শাসন জারি হলে তাঁর ওপর ‘এবডো’ প্রয়োগ করা হয়। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে ছেলে দিলীপ কুমার দত্তসহ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানী সেনারা। নেয়া হয় কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসে। 

তখন এই মহীয়ান রাজনীতিবিদের বয়স ৮৫ বছর। সেনানিবাসে তাঁর ওপর করা নির্যাতনের চিত্র উঠে আসে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারকগ্রন্থে। চোখ-হাত-পা বেঁধে উনাকে ব্রিগেড অফিসে আনা হত। মাথায় ছিল ব্যান্ডেজ। শরীরের ক্ষতে লাগানো থাকতো তুলা। নির্যাতনের কারণে শেষ কয়েকটি দিন হামাগুড়ি দিয়ে তাঁকে চলাফেরা করতে হয়েছে বলে ওই সেনানিবাসে সেসময় কাজ করা ক্ষৌরকার রমণী শীল নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান। 

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদের সেই অধিবেশন শেষে ঢাকায় ফিরলে বিমানবন্দরে ছাত্র যুবকরা ফুলের মালা দিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। সেসময়ের ছাত্র-যুবকদের হৃদয়ে ভাষার প্রশ্নে তাঁর আপোষহীন চেতনা জাগরুক থাকায় আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারায় অবিচল রাখতে হলে ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঠিক ইতিহাস এখনকার ছাত্র-যুবকদেরও জানতে হবে। হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। তাহলেই কেবল সাম্প্রদায়িক শক্তির নিরন্তর চলমান ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করা সম্ভব হবে। শহীদের আত্মদান সফল হবে। রক্তঝরা ফাগুন দিন ২১ ফেব্রুয়ারির প্রাক্কালে ইতিহাসের বিস্মৃত মহানায়ক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে জানাই প্রণতি।

মিঠুন চৌধুরী
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।