অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
“মাতব্রিং”, এক মহা কালের বাঁশি – শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস

পস্থিত ছিলাম সেদিন বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার বঙ্গবন্ধুআন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উৎসব ২০১৯ আয়োজিত নাট্যউৎসবে।     
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উৎসব উদযাপন পরিষদ আয়োজিত ১৫ মার্চের 'মাতব্রিং' নাটকটির মঞ্চস্থ  হওয়া দেখলাম শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান জেলা পরিষদ মিলনায়তনে। রচনা-সাধনা আহমেদ, নির্দেশনা- ইউসুফ হাসান অক।

সর্বমোট ২২ জন কলাকুশলীকে নিয়ে একটি মনগত কৃতকৌশলী অভিনয়ের দক্ষতায় মাতব্রিং যেন এক পার্থিব জগতের উৎপত্তির গোড়ার কথা,যেখানে পাহাড় আছে, আছে ভূমি ও ভূমিজাতকদের খিদের এক বিরাট প্রশ্ন! সামাজিক বিশৃঙ্খলা, শোষন, দূর্নীতি, কালোবাজারি ও অপসংস্কৃতির আগ্রাসন যখন কোনো একটি দেশের সীমানা অতিক্রম করতে থাকে,তখন এই নাটকের সুত্রধরের মুখ থেকে নিসৃত হয়- "কেন পৃথিবীর মাঝের দেওয়াল গড়ে ওঠে? "

নাটকের কথায় উঠে এসেছে প্রান্তজনেদের চিরকালের হাহাকার! যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে রক্তেভেজা রূপকথার মতো সে কোন্ কালের মায়ের গর্ভনাড়ি থেকে উৎপাদিত মান্দি- গোত্রনারীর আদিম মানুষের বিবর্তনের পেছনে থাকা এক কান্নার ঝোড়ার কথা। 

শুরুতেই অন্ধকারচেরা সেই পাথরমানুষের ধ্যানভূমি থেকে জেগে ওঠা জীবনের জয়গান রূপকথার মতো রক্তেভেজা সেই কবেকার! সেই কোনকালের ফসল তোলার উৎসব ওয়ানগালর যেন মান্দি যুবক কানু সাংমাকে প্রেমিক করে তোলে। সেই অনন্ত প্রেম মান্দিযুবতী মিত্তি মারাকের প্রতি। এখানে কানু যেন ভয়ঙ্কর এক কৃষ্ণকালো বীজ, যা ঝরে পরবে মিত্তি, অর্থাৎ জমির বুকে। মান্দি উপজাতির জন্য ফসল উঠবে ঘরে। এত বেদনা, তবু বনমহিষ মেরে আগুনের পাশে বসে সমস্ত মান্দিবস্তি যখন ভোজনের সাথে নৃত্যগীতে মেতে ওঠে,তখন প্রাচীন সভ্যতার উৎপত্তিস্থল থেকে যৌথখামারের জয়গদ্য যেন শ্রোতা-দর্শকের কর্ণকুহরে বসন্তের প্রথম খবর হয়ে ওঠে। বিবর্তনের হাত ধরে উঠে আসে সভ্যতার পদধ্বনি। পাহাড় দখল হয়ে যায়। মান্দিদের আবাসভূমিতে হানা দেয় " দেশ হাউজিং এন্ড ডেভেলপিং কোম্পানি"। আধুনিক পর্যটন নগরী গড়ে ওঠার ছলে কালোবাজারি প্রোমোটরদের ভয়াল থাবা যখন এগিয়ে এসে কুটিল স্বপ্ন দেখায় মান্দিদের,তখন আদ্যানারী কলাবতী সাংমা মনে করিয়ে দেয় তাদের ওপরে নেমে আসা যুগযুগান্তরের অত্যাচারের ইতিহাসের কথা। এদিকে ফাটকাবাজদের হাতে কানু সাংমার প্রেমিকা মিত্তি,অর্থাৎ ভূমি ধর্ষিতা হয়। তবুও কোম্পানির সাথে ফরেস্ট রেঞ্জার সাহেবের গোপন বোঝাপড়ায় মান্দি- জনগোষ্ঠী মৈত্রীতে বসে। আর এভাবেই যুগান্তরের কাহিনী এগোতে থাকে বসুন্ধরার বুকে।

যশোরের 'বিবর্তন' নাট্যগোষ্ঠীর ৭৬ টি প্রযোজনার ১০০০টি মঞ্চায়ন দেশে ও দেশের বাইরে ইতিমধ্যেই নজর কেরেছে দর্শকের কাছে। আলো শব্দ- প্রেক্ষণ এবং সম্পূর্ণ মঞ্চানুষ্ঠিত মান্দি-সংগীতের মূর্ছনায় এবং কলাকুশলীদের অভিনয় দক্ষতায় "মাতব্রিং" যেন মহা এক কালের রাখালের বাঁশি।   

শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস
ওয়েস্ট বেঙ্গল, ইন্ডিয়া।