অটোয়া, বৃহস্পতিবার ৩ এপ্রিল, ২০২৫
একগুচ্ছ কবিতা - মহসীন বখত

গিলগামেশের ভাসান
ন্মত্ত জলের ত্রাস পাড়ি দিয়ে এসেছি ,দানব এনকেদু,তোমাকে জানাই
তোমাকে পরাস্ত করে বসুমাতার ক্রোড়ে বসে পান করব সঞ্জীবনী স্তনের নহর
যৌবন ঈর্ষায় পোড়ে ইহজন্ম আমার। তোমাকে ভাগ দেবনা স্বপ্নমঙ্গলের পাতা
আমি হার মানিনা মল্লযুদ্ধের ঘূর্ণি, রতিদানে ক্লান্তি নাই আমি অগ্নির নিষাদ,
জন্মজন্মান্তর আমাকে প্ররোচিত করে যে সূর্য উদয় শিশিরে
যে চন্দ্র সরোবরে মায়াবশে মণিকাঞ্চন নারীর খিলখিল শরীরী মল্লার
আমি তার সবটুকু বাজাই শোণিতে।মৃৎপত্রে লিখে রাখি আদ্যিকথা
আসুরবানিপালের শীতঘুম গ্রন্থাগারে ঘুমপাড়ানি মাসিপিসির গানে ঘুম যাই
চর্যাগীতির অলিন্দে বাজে কীর্তনীয়া বসন্তবাউরির সহজীয়া গল্পগাথা
কান পাতলে শুনতে পাও,চোখ পাতলে ঘুম যাও অনন্ত মহাকাল?  

আমার জিনকোষ দেহতত্ত্বে লিখেছি বিন্দুবিন্দু স্বপ্ন।গড়েছি বাসর খড়বিচালি
নিনেভ নগর অস্থি আর অগ্নি মাখিয়ে।অনন্ত অরণ্যানী ডেকে বলল-হুশিয়ার,সাবধান
অগ্নির হুঙ্কারে ভষ্ম হবে বাচা,ছাইভষ্মে মিলিয়ে যাবে চন্ডিদাস,লালন
লক্ষকোটি অগ্নীবাণ সাঁই সাঁই বিষ্ণুচক্র ঘাতক তোমার।ফিরে যাও,পান কর মৃত্যু।

তুর-পর্বতে যে লিখেছে অগ্নীমন্ত্র সে আমি।,হিমযুগ  ,আকাশ সমান তুষাররের চাঙড় গলে
জলের প্লাবন সাঁতরে যে আসে সে আমি নূহের কেনান।ইচ্ছে আমার ডাকনাম।
আমাকে চিনে রাখ প্রান্তরে অরণ্যে জলে আর অন্তরীক্ষে । স্বেদবিন্দু যৌবন 
আমার মরমী জন্মের নাম।

অ্যালগরিদম
অ্যালগরিদম মানব হতে চাইনা,অনুভূতিময় হতে চাই-
একথা বলেই চলে গেল পূর্বজন্মের মানুষ।
বলিচ্ছদ উচিয়ে তাদের বলি দিতে উদ্যত ইন্টেলিজেন্ট কসাই
এহেন প্রবঞ্চনার কালে তুমি কেমন সুখে আছ প্রজাপতি জন্ম
আজ বল,তোমাকে বলতেই হবে জেনেটিক চোরাপথ    বাউরি খেয়াল কেমনে বধিল তোমাকে?
আজ কেন নৈঃশব্দ্য সাঁতরে তোমাকে পাঠায়না প্রেম
বিরহের বার্তা দূরের স্মৃতিদগ্ধ কামতৃষ্ণা মায়াজালে
বাজেনা ভায়োলিন কেন অতৃপ্ত রাগে?
তোমাকে কে বধেছিল অ্যালগরিদম,যখন তুমি মানুষ ছিলে ভবে?
নিজেই নিজের ঈশ্বর হতে কে প্ররোচিত করেছিল
কূটচালে নিজেকে নেভাতে, ধূলিময় বসন তোমার খসিয়ে দিয়ে
কোন সে দিওয়ানা চাতক তোমাকে শেখায় জন্মতৃষ্ণার মন্ত্র?

আমি ভর-শূন্যতায় জন্মেছিলাম গোপন টুইটারে
ভুবন চিলের মত উড়ে উড়ে পাড়ি দিয়েছি জন্মতৃষ্ণা
জেনেটিক রেলগাড়িতে চড়ে ধ্যানমগ্ন স্বপ্নের কাল
কাটিয়েছি আমার  ধ্রুপদী অঙ্গের ইচ্ছায়,
আমাকে কেন থামিয়ে দেবে,অ্যালগরিদম?
আমি যে আমার মানবজন্ম চাই -তুমি নও আমার গুনধর ভাই।

ভ্যানগগের তুলি
হাত বাড়িয়ে আকাশ ছুঁয়ে দেয় যেন ঈশ্বরের হাতের মত তোমার তুলি
আঁকে দ্রোহ আঁকে মেঘমালা,আঁকে এই শহরের হেমন্ত,ধূসর বুলবুলি,
একটা ফুলকি, তুচ্ছ কাঁচপোকা কেমন প্রজ্ঞাময় বিরাজ করে মমতায়
আঁকে যতিচিহ্নহীন রৌদ্রভরা ঘাসের দোসর যত কীটকিন্নর মৃন্ময়-
এক তরুনীর রক্তে কতফোঁটা রোদ জোছনার বান ডাকে দুরন্ত আঁচড়ে
বয়েসে নিভন্ত কোনো পৌঢ়া তুষারগলা প্রথম বসন্তের রডোডেনডন
মাখায় মমতা যেন পাঁপড়িতে।দীঘল শীতঘুমে যে ছিল ফসিল তুষারে
ঈশ্বরের কারাগার থেকে কুড়িয়ে এনে রোপন করে তোমার তুলিতে প্রাণ।

বিদগ্ধ ভ্রমরেরা গুঞ্জরে অদৃশ্য ক্যানভাসের মুগ্ধ শ্যামঅঙ্গ কুয়াশায়
কার জন্য তৃণঘাসের ডগায় ধ্যানমগ্ন চকোর বসে বনের আঙ্গিনায়
আকাশ সমুদ্রতীরে চকিত বালকের ঘুড়ি কার জন্য নভোলোক বিরাজে
ভুবনচিলের পাখনায়? নির্জন কোলাহলে জগতের সব সুর এজ্রাসে
বিষন্ন ঘুঘুর বিলাপের,স্তব্ধতার ওপারে জলসাঘরে কার ধ্বনি বাজে
যেন নিভে যাওয়া দিনের আলোয় আমার আনন্দযজ্ঞ মানবিক বৈদেশে।  

দূরের চর্যা
তোমার আমার দ্রাঘিমা্য জয়শ্রী ভাষার ব্যথা,
তপস্বী আলোকবর্ষ অনাবাদী দূরত্বের কথা
গোপনে গোপনে জানে।কত কত ফল্গুদিন আসে,
বৃন্তচ্যুত বাউন্ডুলে অপঠিত যত ঝরাপাতা
যেন ইষ্টমন্ত্র জপতে জপতে মেরুঝড়ে ভাসে।
প্রাকৃতজনের বুলি দূরের বৈদেশে কাঁপে ত্রাসে,
অচিন ব্যধের মন পারানির নৌকা নিয়া যায়
নিঃস্ব ব্যধিনীর বৈঠা সেই তরী অকুলে ভাসায়।

ঝরাপাতা মৃগয়ার বনে এসে গোল্লাছুট খেলে  
কে যেন কানের কাছে শিস দেয় বিহঙ্গের ছলে,
শবর যুবার বুকে সেই শব্দ মথিত বেহাগে
শবরী যুবতির কাকুতি যেন বিরহ সোহাগে।
চৌতাই পর্বতে তুমি শিবিকারোহণে যাও,
ফিরে এসে আমার জবানে মিষ্ট পানদোক্তা দাও।

কবি ও কামিনীর ক্কাসিদা
রবানরের কালে কামিনী  তোমাকে বিরহ যাপন করেছে অর্ধমানবেশ্বর
শৈলপাথরে বসে শীতার্ত সমুদ্রের ঢেউ দিয়ে তোমাকে লিখেছে কবি
প্রেমের কবিতা আত্মাহুতির প্রতিদিন।

সেই সন্ধ্যাবিরাগ নিরালা দুপুরবেলার মন
তোমার জন্য জন্মবিচ্ছেদ একাকী হেঁটে আসে চাঁদেপাওয়া ঘুমন্ত খঞ্জদের পায়ে
গা ভিজিয়ে জোছনার হরিদ্রা জলে
ঘোর নিশির ডাকে ঝরে কবির স্বরবৃত্ত স্বেদবিন্দ
বিষন্ন ব্রম্মান্ডে।তোমার জন্য প্রেম লিখে রাখে কবি পাথরে অন্তরে
মরক্কো-গুহা-জিব্রাল্টায়।

তোমার নিয়ান্ডালতাল পসিনার ঘ্রাণ বড় অচেনা লেগেছিল প্রথমে
তবু কবির স্নায়ুতন্ত্রে দূরসম্পর্কের কাম চিনেছে শরীর
পুষ্পঘুম টুটে গেল আমাদের অবিনাশী অঙ্গে।নিসর্গের উঠোনে চাঁদশশীর
ভাষাগুলো এসে উচ্চারিত হয়েছে রাতের রতিলগ্ন পাখির ডানায়
নদীতে বয়ে গেল জোছনা ভাসানের গল্প।
গ্রেট-রিফট ভ্যালীতে তখন আগ্নেয়লাভার উত্তাপ আমরা সয়ে গেলাম
মহাজাগতিক কম্পন এসে আমাদের কামলগ্ন মন্থন করে চলে গেল,মনে পড়ে?
জারুল ফুলের শরীর তোমার শিমুলতুলোর বীজ নিয়ে নগ্ন বসে রইলে
নদী ইফ্রেতিসের ঢেউয়ের ডিঙ্গিতে।নাইলের দলছুট মীনকন্যারা ঘাই মেরে তোমাকে
অভিবাদন জানিয়ে মাতামুহতীর জলে তলিয়ে গেল অনেক অনেকদিন আগে।

তারপর তুমি তোমাকে নিয়ে চর্যার হরিনীর মত নক্ষত্রের অরণ্যে হারিয়ে যাওয়ার
গল্পে ঘুমিয়ে পড়লে স্বর্গের রূদসীদের আসরে।পাড় মাতাল দেবতারা তোমাদের নিদ্রাগুলো
পান করে চুমুকে   কবি ছাড়া কোনো রাজকুমার
সীতা উদ্ধারে এসে বাণবিদ্ধ হয়নি।কতকাল তুমি পড়ে আছ মুখরা বেনেবউদের গল্পগাথা
বজ্রদগ্ধ কবির শিয়রে।তোমাকে ছাড়া কবি ঘরে ফিরেনা, শোনো আত্মহন্তা
শোনো স্বর্গপ্রত্যাখ্যাত বীজমন্ত্র শোনো
প্রস্তরযুগে এসে শয্যা পেতেছি  নলখাগড়ার তপোবনে
নিভে যাওয়া চাঁদে ভাটবনের মত আঁধারে
আমরা আবিষ্কার করি পরষ্পর ধু-ধু আত্মাকে।জন্মান্ধ সৌররশ্মি লাঞ্চিত হয়ে ফিরে গেছে কবে।
আমরা বিদ্যুচ্চমকের লাস্যে আমনহাতপের মঞ্জুশ্রী মূর্তিতে স্বপ্ন মাখামাখি
আমরা বাউরি কূজন অঙ্গে অঙ্গে লুপ্ত হয়ে থাকি।

মহসীন বখত
অটোয়া, কানাডা।