অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
ফেলে আসা দিনগুলি (চতুর্থ পর্ব) – হুমায়ুন কবির

মাঝ রাতে পাশের বাড়ির কান্না আর চেঁচামেচিতে বাড়ির সবার ঘুম ভেঙে গেলো। ছবিরন কান্না করছে। সবার সঙ্গে চয়নও গেলো কি হয়েছে দেখতে।
যেয়ে দেখলো, ছবিরন তার ছোট ছেলে শিশুটিকে কোলে নিয়ে অনবরত কাঁদছে। শিশুটিও মায়ের কান্না দেখে কান্না করছে। একজন অসহায় অল্প বয়সী মহিলা আর ছোট একটা ছয় মাসের শিশুর কান্নাভরা অসহায় মুখের দিকে তাকাতেই চয়নের ভিতরটা হুহু করে উঠলো। কিছু বেদনা দেখলে বেদনাটা সম্পর্কে শুধুমাত্র একটা ধারনা-ই হয়না। ঠিক একই রকমের বেদনা নিজের মধ্যেও হতে থাকে। চয়নের ভিতরেও ছবিরনের ও তার শিশুটির কান্না দেখে সেই একই রকমের বেদনা হতে থাকলো। কেউ একজন মহিলা এসে বাচ্চাটিকে ছবিরনের কোল থেকে নিজের কোলে নিয়ে শিশুটির কান্না থামানোর চেস্টা করতে থাকলো। আর একজন ছবিরনকে শান্তনা দেওয়ার চেস্টা করতে থাকলো। ভিতর থেকে একটি কালো স্বাস্থ্যবান পুরুষ বের হয়ে আসলো। একজন বৃদ্ধা মহিলা তাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-কিরে নইমুদ্দিন, তুই ছবিরনরে এইভাবে মারলি যে? তোর কি মায়া দয়া নাই?
নইমুদ্দিন মনে হয় লজ্জা পেলো। নিজেকে সামলে নেওয়ার চেস্টা করলো। বললো,
-ওরে আমি কদম পাগলের মেলায় যাইতে নিষেধ করেছিলাম। ও আমার কথা অমান্য কইরা বেহায়া মেয়ে মানুসগুলানের লগে গেলো। সবসময় এমন করে। আমার কথা শুনতেই চায় না। কি আর করুম, রাগ উঠলো তাই একটা থাপ্পর দিছি। আর ও এই সামান্য কারনে ও এমন করে চিৎকার করে লোক জড়ো করলো।
ছবিরন শাড়ির আঁচলে চোখের পানি মুছতে মুছতে উত্তর দিলো,
-একটা থাপ্পরই না। আমারে লাথ্যি ও ঘুসি দিছে। আমার অনেক লাগছে। আরেকটু হইলে আমার সোনামনির শারিরেও লাগতো। 
মর্জিনার মার কোলে ছবিরনের শিশুটি ছিলো। ছবিরন নিজের কোলে নিয়ে সমস্ত মমতা ঢেলে দিয়ে আদোর করতে থাকলো। শিশুটিও নিরবে মায়ের মমতায় নিজেকে ডুবিয়ে দিলো। মর্জিনার মা নইমুদ্দিনের কাছে এসে বললো,
-দেখ তুই ওর শরীরে আর হাত উঠাবিনা। এতটুকুন একটা মেয়ে,! মা-বাবা, ভাই-বোন ছেড়ে তোর কাছে থাকে। সারাদিন কাজ করে। বাচ্চাকে দেখাশুনা করে। আবার তোর যাতে কষ্ট না হয়। সেই দিকেও খেয়াল রাখে। 

নইমুদ্দিন মর্জিনার মার কথায় খুব লজ্জা পেলো। ছবিরনের জন্যও মায়া হলো। ছবিরনের কাছে এসে বললো, 
-দে, সোনামনিরে আমার কাছে দে। লো ঘরে যাই।
তারপর ছাবিরন শিশুটিকে নইমুদ্দিনের কোলে দিলো। মর্জিনার মায়ের কাছে এসে বললো,
-খালা আমি সোনামনির জন্য মানত করেছিলাম। একদিন কদম পাগলের দরবার নিয়া যামু। সবাই গেলো তাই ভাবলাম যাই, আজকে মানতের কাজটা শেষ কইরা আসি। তাই গেলাম। বেশি দেরি করি নাই। তোমরা অনেক কষ্ট পাইলা খালা?
-আরে না। তুই নইমুদ্দিনরে কইয়া যাইতেতো পারতি।
-হ্যায় মুখে যাই বলুক, আমারে যাইতে দিতো না। তাই না বইল্লাই গেছি।
-আচ্ছা আর এমন করবিনা। নইমুদ্দিন তোর অভিভাবক। তাছাড়া। দুনিয়াটা পাপে পাপে ভইরা গেছে। মাইয়া মানুষের পদে পদে বিপদ। পুরুষ মানুষগুলানতো মাইয়া মানুশগুলানরে মানুষই মনে করে না। চারদিকেই শুধু অন্যায় করতাছে। ওরা মা-বইনের কথা ভুইল্লা গেছে। তোর কান্না শুনলাম। ভাবলাম কি জানি হইছে। এইডাতো আমাদেরই দায়িত্ব। তোর বিপদ মানে আমাদেরও বিপদ। তুই ভালো থাক। আর নইমুদ্দিন, তুই কিন্ত আর এমন করবিনা। 
-না খালা, আর এমন করমু না। রাগ হইলে মাথাটা ঠিক রাখতে পারিনা। তোমরাও আমারে মাফ কইরা দিও। 
-আরে না, মাফ চাওনের কি আছে। তোরা ভালো থাকলে আমাগো কাছে দেখতে ভালো লাগে।

তারপর চয়ন সবার সংগে বাড়িতে ফিরে এলো। অনেকক্ষন জেগে রইলো। সেদিন করিমনের মায়ের সঙ্গে করিমনের বাপের ঝগড়া দেখলো। আবার মিটে যাওয়াও দেখলো। আজকে ছবিরনের আর নইমুদ্দিনের ঝগড়াও দেখলো। তারাও মিটমাট করে ফেললো। কি সুন্দর সরল মানুষগুলি! আহা! শহরের মানুষগুলি এমন হয়না কেনো? সামান্য সামান্য কারনের তারা আলাদা হয়ে যায়। সেখানে ভালোবাসা, আন্তরিকতার কোন মূল্য থাকেনা। সবাই তাদের আত্ন অহংকার নিয়েই থাকতে চায়। একটু খানি ছার দিয়ে চলতে জানলে দুঃখতো টুপ করে গভির মমতার সমুদ্রে ডুবে যাবে। এটা যদি বুঝতে পারতো থাহলে দুনিয়ায় হয়তো কষ্ট কিছুটা কমতো।

রাবেয়া খালা সেই কবে থেকে একা একা থাকে। খালু অন্য একজন বিদেশিনী মেয়েকে বিয়ে করে আটলান্টাতে থাকে। মাঝে মাঝে খালাকে টাকা পাঠায়। তাতে রাবেয়া খালা খুব একটা খুশি হয়না। প্রয়োজন না হলে বাইরে বেড়ই হয়না বলতে গেলে। সবার কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখে। লুকিয়ে রাখে। যেন এর সব দায় রাবেয়া খালার একার। ভুল ও অন্যার করলো খালু। আর তার মাশুল দিছে রাবেয়া খালা। কেন? একদিন বিনা কারনে নানা রাবেয়া খালাকে খুব করে ধমকালো। বললো,
-তুমিতো নিজের মানুষটাকে ধরে রাখতে পারলানা। নিজে যা বুঝো তাই করো। ছেলেরা একটু আধটু এমন হয়ই। এসব মেনে নিতে জানতে হয়।

বাবার কথাগুলি শুনে রাবেয়া খালা নানার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলো। কি উত্তর দিবে বাবাকে ভেবেই পাচ্ছিলোনা। মাথা নিচু করে রাখলো। চোখের পানি দুগাল বেয়ে বুক ভিজিয়ে দিতে থাকলো। রাবেয়া খালার জন্য চয়নের ভিশন মায়া লাগলো। সেদিন চয়ন অবুভব করলো সমাজে মেয়েরা কতোটা অসহায়। একজন বাবার কাছেও নিরপরাধ উচ্চ শিক্ষিতা মেয়েকে চরম ভাবে অপমানিত হতে হয়। এ-যে কি লজ্জার! কি কস্টের! কি বেদনার! তা বলে বুঝাবার নয়। মেয়েরাতো আর নিজেদের দুঃখ কষ্ট বলে বেড়াতে পারেনা। লুকিয়ে রাখতে হয়। রাবেয়া খালাও তা-ই রেখেছে। কিন্ত বুকের ভিতরে রাবেয়া খালার যে প্রতিনিয়ত ক্ষরণ হচ্ছে। রক্ত ঝরছে। তা কেউ জানলোনা। এমন কি নিজের বাবাও না। 

কেন এমন হবে? একজন মেয়ে মানেতো একজন মমতাময়ী মা। একজন স্নেহময়ী বোন। একজন সমস্ত জীবনের সংগিনী। তারপরও কেন মেয়েদের লাঞ্ছিত হতে হবে? অপমানিত হতে হবে? কেন? 
চোখ বন্ধ করলেই চয়ন দেখতে পায় করিমনের মায়ের কান্না আর ছবিরনের চোখের পানি। শুনতে পায় রাবেয়া খালার দীর্ঘশ্বাস।  
বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকারা সুর করে ডাকছে। দূর থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে লক্ষ্মী পেঁচার ডাক শোনা যাচ্ছে। পাখির ডানার ঝাপটানোর আওয়াজ। আর পাহারদার বলছে,
-বখশিওয়ালা জাগোরে। হুঁশিয়ার - হুঁশিয়ার।
-----------
গোয়ালিমান্দ্রা হাটে যাওয়ার দিন ভিশন আনন্দ হচ্ছিলো। কিন্ত পথ যে আর ফুরাতে চায়না। কতদূর গোয়ালিমান্দ্রা হাট কে জানে! বিশাল ফসলের মাঠ। ধূ-ধূ প্রান্তর। দুই পাশে ফসলের জমি। সরু আইল দিয়ে সবাই ধেয়ে চলেছে গোয়ালিমান্দ্রা হাটে। ছেলে, বুড়ো সবাই যাচ্ছে। প্রতি সাতদিন পর পর এই হাট বসে। গাঁয়ের মানুষ সারা সপ্তাহের নিত্য প্রয়োজনীয় সব কিছু হাট থেকেই কিনে আনে। যদিও মাওয়া বাজার ও শিমুলিয়া বাজারও আছে। তবে হাটে সব রকমের জিনিসই সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়।

বিশাল বড় হাট। ঢুকতেই একটা বাঁশের তৈরী পুল। এটার উপর দিয়েই যেতে হবে। এক সংগে অনেক মানুষ পার হচ্ছে। পুল দিয়ে হাটার সময় কেমন ভয় ভয় লাগলো। যদি ভেঙ্গে যায়! মামা বললো, 
-কিরে ভয় লাগছে? ভয় নেই। নে আমার হাত ধর।
চয়ন একটু ভয় পেয়েছে, কিন্ত সেটা সামলে নিয়ে বললো,
-না, ভয় পাচ্ছিনা। 

তারপর মামার হাত ধরে মচ মচ শব্দ করা বাঁশের পুলের উপর দিয় গোয়ালিমান্দ্রা হাটে এসে পৌছালো। এতো মানুষ! সমতল ভূমি থেকে হাটের অবস্থান খানিকটা উপরে। অনেকটা টিলার মতো। যদিও চয়ন কখনো টিলা ভুমি সরাসরি দেখেনি। ছবিতে দেখেছে আর বইতে বিস্তারিত পড়েছে। হাটে ঢুকতেই গোল হয়ে লোক ভির করে আছে। মাঝখানে একজন বেদে সত্যিকারের সাপের খেলা দেখাচ্ছে। গানও গাইছে।
-ও-কি-বিধির কি হইলো! কি সাপে দংশিলো লকাইরে!

কি যে ভালো লাগছে! তা বর্ণনা করার ভাষা চয়নের জানা নেই। ইচ্ছা হলো সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে সাপের খেলা দেখতে। কিন্ত মামা চয়নের হাত ধরে রেখেছে। একটা নিরিবিলি জায়গায় এসে মামা বললো, 
-তুই এখানে বসে থাক। কোথাও যাবিনা। কেউ কিছু দিলেও নিবিনা। খাবিওনা। 
-ঠিক আছে।

মামা বাজারের ব্যাগ নিয়ে চলে গেলো। একা থাকতে চয়নের একটু খারাপ লাগছে। কত রকমের মানুষ! কত কিছুর দোকান বসেছে! চারদিকে মানুষের কোলাহলে মুখরিত। সামনে দিয়ে হাওয়ার মিঠাইওয়ালা যাচ্ছিলো। চয়ন ডেকে তাকে থামালো,
-এই যে, হাওয়ার মিঠাই, এই দিকে আসো।
হাওয়ার মিঠাইওয়ালা আসলে চয়ন দাম জানতে চাইলো।
-দাম কত?
-একটার দাম এক টাকা।
-একটা দাও।

এক টাকার বিনিময়ে চয়ন একটি হাওয়ার মিঠাই কিনলো। হাওয়ার মিঠাই! কি সুন্দর নাম! দেখতেও খুব সুন্দর। গোলাপি রঙের। দূর থেকে দেখলে গোলাপি রঙের ফুলের মতো লাগে। খেতেও বেশ লাগে। চিনি আর রঙ মিশিয়ে তৈরী করা হয়েছে। একটা বাশের চিকন বড় কাঠির মাথায় হাওয়ার মিঠাই লাগানো। পাতলা পলিথিনের কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। 

অনেক সময় ধরে মামা বাজার করতে গেছে। এখনো এলো না। চয়নের এবার ভয় লাগছে। মামা সম্ভবত চয়নের কথা ভুলে গেছে। আর না-হয় এই জায়গাটা চিনতে পারছেনা। চয়নের ভিশন কান্না পাচ্ছে। চোখ দিয়ে পানি বের হচ্ছে। চয়ন কাঁদছে। একজন মাঝবয়সী লোক এসে চয়নকে শান্তনা দিতে থাকলো,
-এই খোকা, তুমি কাঁদছো কেন? 
-না কাঁদছিনাতো।
-তোমার চোখে পানি?

চয়নের একটু লজ্জা লাগলো। তারপর বললো,
-না, ঠিক আছে।
-তুমি কার সঙ্গে হাটে এসেছ?
-আমার মামার সংগে।
- ও আচ্ছা। এসে পরবে। কেনা-কাটা করছেতো। তাই মনে হয় দেরি হচ্ছে।

লোকটি চলে যাওয়ার অনেক পরে মামা এলো। কতো কি কিনে এনেছে! চয়নের হাতে একটা কাগজের প্যাকেট দিলো। চয়ন খুলে দেখলো ভিতরে নিমকি ভাঁজা। চয়ন খুব খুশি হলো। মামা বললেন,
-গরম গরম খেয়ে নে। খুব মজা লাগবে। চয়ন মামাকে কিছু দিলো এবং নিজেও খেতে থাকলো। সত্যিই খেতে খুব মজা। 

ফেরার পথে আবার সেই বেদেকে দেখলো। বেদে একই সুরে গান করে করে সাপ খেলা দেখাচ্ছে। এবার পুল পার হওয়ার সময় জন প্রতি এক টাকা করে দিতে হলো। মামা দুই টাকা দিলেন। এটা আসলে এরা নিজেদের উদ্যোগে তৈরী করেছে। তাই এই ব্যবস্থা। ইচ্ছা করলে সরকারও এখানে একটা পুল তৈরী করে দিতে পারে। তাহলে নিরাপদে লোকজন হাটে যেতে পারতো। আবার এক টাকা করেও এদের দিতে হতো না। এত বড় ও দরকারী একটা হাট! অথচ সরকারের এই দিকে কোন নজর নেই। মানুষের কষ্ট লাঘবের কোন ব্যবস্থাও নেই। চয়নের ভিশন মায়া লাগলো হাটে আসা লোকজনের কথা ভেবে।দল বেধে লোক বিভিন্ন বাজার সওদাই নিয়ে বাড়ি ফিরছে। ভারি ভারি ব্যাগগুলি মাথায় ও কাঁধে করে বয়ে  চলছে। কত দুর-দূরান্ত থেকে লোকজন হাটে এসেছে। আবার মহা আনন্দে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।

চয়নের আর কোনদিন গোয়ালিমান্দ্রা হাটে যাওয়া হয়নি। কিন্ত এখনো সেই সেইদিনের গোয়ালিমান্দ্রা হাটের কথা খুব মনে পরে। চোখের সামনে হাটের সব কিছু দেখতে পায়। আর শুনতে পায়, সেই যে সত্যিকারের সাপ দিয়ে খেলা দেখানো বেদের গাওয়া গান,
"ও-কি-বিধির কি হইলো! কি সাপে দংশিলো লকাইরে"!   চলবে…

হুমায়ুন কবির
ঢাকা, বাংলাদেশ।