অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
'ফেলে আসা দিনগুলি (অষ্টম পর্ব) -হুমায়ুন কবির

জকে সৌদি আরবে ঈদ-উল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই আগামী কাল বাংলাদেশে দেশে ঈদ হওয়ার কথা। কিন্ত সাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার উপর সবকিছু নির্ভর করছে। 

মিনি, রানু, লালু শুভ্র আরও অনেকেই চাঁদ দেখার জন্য ভিড় করেছে। ইফতারের পর আরও অনেকেই এসে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ঈদের চাঁদের জন্য। 

পিছন থেকে আনন্দে চিৎকার করে মিনি বলছে,
-এই বগার বৌ, দেখ চাঁদ উঠেছে!  
রানু মিনির দিকে এগিয়ে যেয়ে বললো, 
-কই চাঁদ? আমিতো দেখতে পারছি না!
-আরে, ভালো করে দেখে। ঐ যে, দেখেছিস! কি সুন্দর চাঁদ!  
রানু খুব তীক্ষ্ণ ভাবে তাকালো পশ্চিম আকাশের দিকে। একফালি বাকা চাঁদ!  কি অপূর্ব দেখতে। চয়ন সহ সবাই এখন দেখতে পাচ্ছে ঈদের চাঁদ। এক মাস সিয়াম সাধনার পর সৃষ্টিকর্তা যেন দুনিয়ার সমস্ত মানুষের জন্য চাঁদের মাধ্যমে জানান দিচ্ছে। চাঁদ যেনো ঈদের খুশির বারতা বাড়িয়ে দিচ্ছে সমস্ত ভুবনে। 

একটা দরিদ্র কিশোরী মেয়ে, ডানহাতে একটি নারিকেল জড়িয়ে ধরে আছে। খানিকটা লাফিয়ে লাফিয়ে বলছে,
-চাঁদ উঠেছে! কাল ঈদ হবে! কাল ঈদ হবে!

মুহূর্তের মধ্যেই ছেলে বুড়ো সবাই জড়ো হয়ে চাঁদ দেখতে শুরু করলো। কেউ দেখতে না পেলে অন্য একজন আংগুল দিয়ে দেখিয়ে বলছে,
-ঐ যে, ঐ দিকে। কি দেখতে পাচ্ছো?
-জি, পাচ্ছি।

একফালি বাকা চাঁদ যেন সমস্ত ভূবন খুশির জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চারপাশ থেকে ভেসে আসছে বিখ্যাত গানের সেই চিরচেনা সুর, 
"রমজানেরও রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ!" 

আশে পাশে আতসবাজির ঝলকানো আলো আর বাজি ফোটানোর আওয়াজে ঈদের আনন্দ  আরো বেশি উপভোগ্য হয়ে উঠলো।   

গায়ের ঈদের খুশি আর আনন্দ দেখে চয়নের মনে পরে গেলো সেই, সেদিনের বাবার সংগে নিউমার্কেটে ঈদের কেনকাটা করার কথা। রাস্তার পাশে রংবেরঙের জামাকাপড় আর ঈদের হরেক রকমের সামগ্রী নিয়ে বসেছে খুদে ব্যবসায়ীরা। প্রতিটি দোকানেই প্রচুর ভিড়। এতো ভীড়! একবছর পরে ঈদ এসেছে। ঈদে সবকিছুই নতুন লাগবে। জামা জুতা, সবকিছু। কেউ মেহেদি আর বাসনা সাবান কিনছে।  সবার হাতেই হরেক রকমের প্যাকেট। ভারী ভালো লাগছে দেখতে! 

রিক্সায় ছোট ছোট প্যাকেটে একবোতল আতর আর সুরমা একসংগে বিক্রি করছে। রিক্সার পিছনে মাইক বেধে স্পিকার হাতে নিয়ে বিক্রেতা অনবরত বলছে, 
"আতর সুরমা এক টাকা।  আতর সুরমা এক টাকা। কস্তরী আতর। হরিণের মৃগনাভি থেকে তৈরী করা হয়েছে আতর। আর 'তুড় পাহাড়ের সুরমা '! আতর সুরমা ব্যবহার করা সুন্নাত "। 

চয়নের কিজে ভালো লাগছে!  ইচ্ছে করছে সমস্ত ঈদের বাজার ঘুরে ঘুরে বেড়াতে। হঠাৎ চিৎকার আর চেচামেচিতে সব আনন্দ স্থবির হয়ে গেলো।  একজন অল্পবয়সী শিশুকে একজন দোকানী ভয়ানক ভাবে মারছে। শিশুটির মা ছেলেকে বাচানোর চেস্টা করছে।  অন্যরা দাড়িয়ে দাড়িয়ে এ-ই ভয়াবহ কস্টের ও অমানবিক দৃশ্য দেখছে। দুই একজন সাহায্য করছে। চয়ন সাহস করে এগিয়ে গেলো। দোকানীকে বললো, 
-মারবেননা। ছেলেটি খুব কষ্ট পাচ্ছে। 

কে শুনবে চয়নের কথা! শিশুটির মায়ের শরীরেও হাত তুললো নিষ্টুর দোকানী লোকটা।  

শিশুটির অপরাধ, সে নাকি একটি জামা চুড়ি করেছে। জামাটি দোকানীর হাতেই রয়েছে। নিল রঙের কালো কালো ফুলের ছাপানো নতুন জামাটি শিশুটির খুব পছন্দ হয়েছিলো। হাতেই ছিলো জামাটা। মায়ের ডাকে সারা দিতে যেয়ে ভুলে গেছে জামাটা রাখতে। দোকানী ভাবছে শিশুটি চুরি করেছে। আসলে ব্যপারটা তা নয়। 

অথচ ছোট্ট একটা শিশুকে কি অমানবিক নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হলো!  কেন? কেন এমন করবে দোকানী? এই রকম একটি ছোট শিশু তারও হয়তো আছে! এতোটুকুও মমতা আর মানবিকতা নেই লোকটার মধ্যে। কেন নেই? কেন থাকবেনা?  মানুষ এতো হিংস্র হবে কেন?

মানছি শিশুটি চুরি করেছে।  কিন্তু কেন করেছে? অনেকেই প্রয়োজনের চাইতে অনেক বেশি কেনাকাটা করেছে। আর এই অসম্ভব সুন্দর শিশুটি একটা নিল রঙের ফুটপাথে বিক্রি করা জামার জন্য কি অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করলো। 

চয়ন ভীষণ ব্যথিত হলো। বেদনায় বুক টন টন করতে লাগলো। যেনো শিশুটির মতো একইরকম বেদনা চয়নেরও হতে থাকলো।  

 নিউমার্কেটের বিশাল এক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দোকানে বাবার হাত ধরে চয়ন ঢুকলো। বাবা  বললেন,
-পছন্দ করো। কি মন খারাপ লাগছে?
-না। ঠিক আছে। 
-তাহলে পছন্দ করো।
- জি। দেখছি। 

চয়ন হালকা ঘিয়ে রঙের গরদের কাপরে মেরুন রঙের সুতার কাজ করা পাঞ্জাবি নিলো। সংগে ধুপিয়ান পায়জামা। মেরুন রঙের মখমলের জিন্না টুপি। শার্ট, টিশার্ট, প্যান্ট আর আতর পছন্দ করলো।  কিন্ত চয়নের বার বার মনে হলো, 
-"আহা! সেই শিশুটকে যদি একটা জামা কিনে দিতে পারতাম! আমার তো অনেক আছে, ওরতো কিছুই নেই। মনে হলো বাবাকে ইচ্ছার কথাগুলো বলে। কিন্তু কিছুই বলতে পারলো না।

মন খারাপ নিয়েই সেদিন বাসায় ফিরতে হলো। ফেরার পথে দেখলো একজন দরিদ্র মা একটি ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে একটি লাল রঙের ফুলতোলা নতুন জামা তার মতোই আরও কিছু মহিলাকে দেখিয়ে বলছে, 
-দেখ এক আফায় আমার সোনামণিরে কিন্না দিছে। কি সুন্দর না?

সম্ভবত মেয়েটির মা হবে, তিনি বললেন, 
-দেখি। বাহ! অনেক সুন্দর হইছে। আফারে আল্লায় অনেক বালা করুক।

চয়নের কাছে ভালো লাগলেও ভিতরটা হু হু করে উঠলো। এতো অসম ব্যবস্থা কেন? রাস্ট্রের এ কেমন নিয়ম? এতো বৈশম্য থাকবে কেন? কারো এতো আছে। আবার কারো কিছুই-ই নেই। কেউ প্রাসাদে বাস করছে। আবার কেউ পথেই ঘর বেধেছ। ফুটপাতে পেতেছে সংসার। 

সেদিন চয়ন সারারাত ঘুমাতে পারলো না। বার বার কালো ফুলতোলা নিল রঙের জামাটি পছন্দ করা শিশুটির অসম্ভব সুন্দর মা-র খেয়ে লাল হয়ে যাওয়া গালদুটো চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকলো।  আর শুনতে পেলো, ছেলেটির মায়ের আকুল করা আকুতি, 
"আমার যাদুমনিরে মারবেননা। ও চুরি করে নাই। ভুলে ওর কাছে জামাটা ছিলো। "

আহারে! মানুষ কি অমানবিক, নিষ্ঠুর! বেদনায় চয়নের কচি কোমল প্রাণের ভিতরে প্রচন্ড ক্ষরণ হতে থাকলো। 

সকালে দাদার কেনা বক্স ওয়াগন গাড়িতে করে চানমারি ঈদগাহে নামাজ পড়তে গেলো।  গাড়ি পারকিং-এ রেখে বাবার পিছনে পিছনে নামাজ পড়তে এগিয়ে চললো।  ঈদগাহের চারপশে সারি সারি কৃস্নচূরা গাছ। উপরে বৃস্টি ও রোদ প্রতিরোধের জন্য রঙিন ঝালর দেওয়া চান্দিনা টানানো হয়েছে। নিচে সবুজ আর লাল রঙের মিশেল মখমলের কারপেট বিছানো হয়েছে। বাসা থেকে আনা জায়নামাজ বিছিয়ে বাবার পাশাপাশি চয়ন বসলো। ইমাম সাহেব রোজা রাখার ও ঈদের নামাজ পড়ার ফজিলত বয়ান করছেন। 

সবাই নতুন পাঞ্জাবি আর পায়জামা পরে ঈদগাহে এসেছে। বাতাসে আতরের সৌরভ ছড়িয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষের আনন্দ আছে। বেদনাও আছে। সবকিছু মিলেই ঈদের খুশি আর আনন্দধারায় ভেসে ভেসে যাচ্ছে ঈদগাহে নামাজ পড়তে আসা সবাই। 

গ্রামে ঈদ করতে এসেছে। যদিও শহরের অনেক কিছুই নেই গ্রামে। কিন্ত এখানে সম্ববত একে অপরের জন্য সহমর্মিতা আর ভালোবাসার কমতি নেই। মানুষতো মানুষেরই জন্য। 

সকালে ঈদগাহে প্রায় সবার সংগেই দেখা হলো। হরেকরকমের রঙিন পোশাক পরে মিনি, রানু, লালু, শুভ্র আরও নামনাজানা অনেকেই এসেছে। এখানে সবার মধ্যেই হয়তো এখনও ভালোবাসা আছে। আছে পারস্পরিক সহমর্মিতা। এতো ভালো লাগছে! ভীষণ  ভালো লাগছে! 

চয়ন ঈদ এলেই গ্রমের সেই সেদিনের ঈদের আনন্দ আর সেই ছেলেবেলায় দেখা সাথিদের খুজে ফিরে। চোখের সামনে ভেসে উঠে, অসম্ভব সুন্দর একটি কিশোরীর মুখ। একহাতে একটি নারিকেল জড়িয়ে নেচে নেচে বলছে,
"চাঁদ উঠেছে!  কাল ঈদ হবে! কাল ঈদ হবে!" চলবে…

হুমায়ুন কবির
ঢাকা, বাংলাদেশ।