অটোয়া, বৃহস্পতিবার ৩ এপ্রিল, ২০২৫
দূরত্বরেখার সংসার -জিললুর রহমান

মুহুর্মুহু পাল্টে যায় মুহূর্ত সকল
সকালবেলায় খুব কাছে
এসেছিলে যদি
বিকেলটা গড়াতে গড়াতে
দূরত্বের হাত প্রসারিত দূরে
কর্ণফুলীর ওপারে
তবুতো আসার — বসার নিমিত্তে কাছে —
কাছে কাছে থাকার সেইসব
আমাদের নিত্য চেষ্টাগুলো
যেমন প্রতিটি সন্ধ্যাকালে
পশ্চিমে গেলেও অস্ত সূর্য লাল
প্রতিভাত প্রভাতে পূর্বেই

সুতাহীন সুদৃঢ় বন্ধন
কতোটা অটুট সে তো এই
কাছে কাছে থাকবার
নিরন্তর তাগাদার সাথেই সমান্তরাল
আমাদের সমস্ত অর্জন থমকে থাকে
ভালবাসবার দ্বারপ্রান্তে এসে

আমার ব্যর্থতা প্রিয় পদে পদে
প্রেমের হাত তো সখী
সেরকম করে ধরতে জানি না
যতবার সচেষ্ট হয়েছি
ততবার সামনে এসে
দাঁড়িয়েছে সমস্যার সর্পিল নদীরা
নদীর বন্যার সাথে কতো না কচুরীপানা
ভর করে সম্পর্কের জটিল সেতুতে

মনে পড়ে? একটি পুতুল তুমি ছিলে
বছর বিশের মেয়ে — সারাক্ষণ উচ্ছলতা
চন্চলতা খেলে যেত দুচোখে তোমার
প্রতিটি কথায় প্রতি কাজে
অবাক বিস্ময়টুকু
ধরা দিতো মুগ্ধ দুই চোখে
এমন সুতপ্ত দিনে প্রার্থনা করেছি পাণি
তুমিও বেসেছ ভাল—ধরেছ দু’হাত
কলকল ছলছল কেটেছে বিনিদ্র রাত্রি যতো
রিকশা যাত্রার চাকা হাওয়ায় উড়তে উড়তে
চাঁটগা শহর থেকে পতেঙ্গায় সমুদ্রের ধারে
আমাদের চারপাশে কেবল আলোকরশ্মি
শুধু উজ্জ্বলতা —
তোমাকে পরীর বেশে দেখেছে সকলে

সংসারের খুঁটিনাটি — ব্যন্জনা শাশুড়ি ননদের
হাওয়ায় উড়িয়ে সেসব
এগিয়ে গিয়েছি কত প্রগল্ভ সঙ্গমে
মিশেছি প্রাণের সেই অনন্ত উল্লাসে
তখন ক্লান্তির ছায়া আমাদের মাড়াতে পারেনি
তোমার ক্রমশ বেজে ওঠা
ক্রমশ ঝলসে ওঠা আনন্দ উল্লাসে
ভাসিয়ে রাখত মন অনন্ত যৌবনে

সংসারে প্রথম থেকে লেগেছিল নানা খটমট
হয়ত এমনই থাকে সব ঘরে ঘরে
কখনো শশুর বলে কখনো শাশুড়ি
পড়শী-আত্মীয়া — তারাও থাকেনি থেমে
কটুভাষ—কূটভাষ —
আমাদের রঙীন কর্ণিয়া
দু’পয়সার পাত্তা দেয়নি —
আগলে আগলে রেখে পার করে যাই প্রতিদিন
সংসার গড়ার চেয়ে সংসার ঘুরার দিকে
দিনে দিনে নজর দিয়েছি
দিনে দিনে উড়নচণ্ডীর খাতা মোটা হতে হতে
শীতের পাখির মত দূর থেকে দূরে
উড়ে উড়ে কত না নক্ষত্র ছুঁয়ে চলি
পৃথিবীর কত না প্রান্তরে

আমাদের থামতে হলো
নক্ষত্রের সুউজ্জ্বল আবির্ভাবে
সন্তানের সে কলকল্লোলে
হঠাৎ থমকে গেল চাকা
হঠাৎ দুনিয়াদারি কঠিন থেকে কঠিনতর
আমার ব্যর্থতাগুলো বাড়তে থাকে
টিলা থেকে হিমালয়
নদী থেকে সাগর মহাসমুদ্র
নীরবে সয়েছো স্থানু বছর বছর
সন্তান পালন—শ্বশুর শাশুড়ি ঘর
সংসারের খুঁটিনাটি
সকল সামলে নিয়ে
সংগ্রাম সংগ্রাম চলে — নারীর সংগ্রাম

নিজেকে শীলিত করে বহুবার
তোমার সাথেই পথ চলতে সচেষ্ট হয়েছি
আজন্ম পুরুষতন্ত্রে বেড়ে ওঠা
সংস্কারের ঘুণ আঁকড়ে ধরে প্রতিপদে
ব্যর্থতা আমাকে গ্রাস করে —
ব্যর্থতা মানুষ হতে
ব্যর্থ বন্ধু হতে
ব্যর্থ তো সংস্কারের খোলস ছাড়তেও
তুমি সব বুঝেও হজম করে
কতবার সুযোগ দিয়েছ
কতো রাত অশ্রু গোপন করেই
সহাস্য আলাপে তুমি মেতেছিলে
বুঝিনি পুরুষ আমি
বুঝার জন্যে তো চাই জিনের সংস্কৃতি
কিংবা সংস্কৃতির জিন
পুরুষতন্ত্রের ছায়া
প্রতিটি চলনে — বলার ধরনে

তবু ঝিম মেরে থেকে
সন্তানের পরে জ্ন্ম দিয়ে গেছ
আরো আরো সন্তানের সারি —
একটি সন্তান মানে একটি ক্রুসেড
আরেক সন্তান মানে নতুন যন্ত্রণা
একটু গুছিয়ে নিলে ফের এসে
সন্তানের বোঝা চেপে বসে —
ভালবেসে বেসে সব সয়ে গেছ
সকল মমতা দিয়ে করেছ লালন
বুক বেঁধে ছিলে একদিন সুদিনের দেখা পাবে
সুদিনের কোনো রূপরেখা
কোনো স্বপ্নাদ্য আদল
আঁকতে পারোনি তুমি
প্রতিদিন চুরমার করেছে তোমার স্বপ্ন
আমার অযোগ্য আচরণ
আমার নিয়ত ব্যর্থতায়
তুমি ক্ষুব্ধ — অতৃপ্ত হৃদয়
কতো প্রতিবাদী হতে চায়
সন্তানের মুখ চেয়ে থেমে গেছ
হে আমার দুর্গতিনাশিনী — দুর্গেশনন্দিনী

তারপরও চলেছে সংগ্রাম
চলে প্রেম ভালবাসা
যেমন সূর্যের গতি দিবসে রাত্রিতে
অথবা চাঁদের ক্ষয়বৃদ্ধি
অমাবস্যা পূর্ণিমার রাতে
মাসে মাসে কৃষ্ণপক্ষ আসে
কখনোবা শুক্লপক্ষে
হৃদয়ের দুকুল ছাপিয়ে যায়
অন্ধকারে যতো আলো আসে
সকলই নারীর দান
নারী মানে সম্ভাবনা — উজ্জ্বলতা অনির্বাণ
পুরুষতন্ত্রের সব ফাঁপা বুলি
ধীরে ধীরে মেকি হতে হতে ফাঁকিতে মিলায়

এদিকে আজন্ম রোগী — লতাকাশি খুক খুক
প্রথম রজনী থেকে দেখে দেখে
তোমার ভাগ্যের রেখা
কুঁচকে কুঁচকে গেছে পৃথিবীর প্রথম প্রদোষে
কখনো পেটের ব্যামো
ঘন ঘন ছুটাছুটি বাথরুমপ্রীতি
তোমাকে বিব্রত করে
হতাশ স্থবির করে বছর বছর
থামে না রোগের যত অক্লান্ত মিছিল
কখনো ভেঙেছে হাঁটু
কখনো বাহুতে কিংবা
আঙুলে টিউমার
কখনো ঘাড়ের ব্যথা ফের একসময় হাঁপানির টান
এমন জীবন শুধু অর্থহীন নয়
এ জীবন বোঝার মতোন
চেপে বসে তোমার ঘাড়েই
তুমি কি মানুষ তবে
এতো চাপ এতো উদ্বেগের ঝুলি
মাথায় চাপিয়ে নিয়ে
আকাঙ্ক্ষার তরী কি করে বাইবে, বলো?
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে
ছেড়ে যাই সমাজ সংসার
মুহূর্তের ব্যাপার এসব, তবু
শেষ মেষ তোমার অদম্য প্রেম
পিছুটান — শিশুদের মুখ
আমাকে তাড়িয়ে ফেরে কর্তব্যের ঘোরে।

তোমাকে ভেবেছি দেবী, তাই যত উটকো আবদারে
ভরিয়েছি যন্ত্রণার ডালা
তোমারও মেজাজ কোনো কোনো দিন
বিগড়ে যেতেই পারে, যাক
তবে তোমাকে আনবে টেনে এ সংসারে
সময়ের মহা-মহাকাল
আমাদের সব সূর্যোদয় প্রতিটি প্রভাতে
পরম প্রণয় শুধু ফিরে আসে, তাই
কখনো সন্ধ্যায় একা একান্ত নিভৃতে
সকল দূরত্বরেখা দূরে ঠেলে দিয়ে
মুহূর্তরা মুহুর্মুহু রোমান্চে গড়ায়
তোমারই সে প্রাণশক্তি অনন্ত অযুত
এরই নাম বুঝি ভালবাসা তবে
আমি যারে দেখেও চিনিনি ইগো’র মরীচিকায়...

জিললুর রহমান
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।