অটোয়া, মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯
ইউরোপের পথে পথে (আট) -দীপিকা ঘোষ

ভোরের আলোয় ছজন আরোহী নিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটছে ওয়েলসের দিকে। পাহাড়ি পথে চড়াই উৎরাইয়ের বাঁকে বাঁকে অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্যাবলী। গাড়িতে শুচির বদলে তার বাবা ‘মিস্টার কে ঘোষ’। সঙ্গে বাবার বন্ধু এডগার ডাইফ্যান এবং তার স্ত্রী লোলো ডাইফ্যান। মিসেস ডাইফ্যান সেন্ট্রাল লণ্ডনের এক গার্লস স্কুলের ইতিহাস শিক্ষিকা। একই সঙ্গে কনজারভেটিভ পার্টির সক্রিয় কর্মী। ওরা দুজনেই শুচির বাবাকে শুরু থেকে ‘মিস্টার কে ঘোষ’ বলে সম্বোধন করে কথা বলছে। বিশেষত বন্ধুত্বের সুবাদে তার সঙ্গে বিরামহীন কথা বলে চলেছে লোলো। মাঝে মাঝে এডগারও যোগ দিচ্ছে তাতে। অনেক সময় ঘরোয়া কথা আলোচনার পরে  পরবির্তিত সমাজ পরিস্থিতির প্রসঙ্গ স্বাভাবিকভাবে এসে পড়লো ওদের আলাপনে।
লোলো অবশ্য আগেই বলে রেখেছিল-
শোনো, তোমরা বলেই এসব আলোচনা খোলামেলাভাবে করতে পারছি। মিস্টার কে ঘোষকে আমরা পনেরো বছর ধরে জানি আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে। তোমরা তার নিজের লোক, সবকিছু তাই...।
আন্তরিকতার পরশ দিতে হেসে বলেছিলাম-
কোনো অসুবিধে নেই লোলো! আমরাও তোমাদের বন্ধু বলেই মনে করছি।
ঘোষ শুরু থেকে নীরব ছিল আজ। বহু সময় ধরে শুনতে শুনতে এতক্ষণ পরে জানতে চাইলো–
তাহলে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলোকে তোমরা ভবিষ্যতের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছো?
লোলো একটুও না ভেবে সরাসরি জবাব দিলো–
এক কথায় প্রায় সব ক্ষেত্রেই! কারণ, আমাদের নতুন প্রজন্মই বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এখন! প্রত্যেক জেনারেশনেরই কিছু বিশেষত্ব থাকবে, এটা ঠিক কথাই। যেমন আমরা আমাদের আগের জেনারেশন থেকে কিছুটা আলাদা ছিলাম। কিন্তু এদের ব্যাপারটা অনেকটাই অন্যরকম! সামাজিক জীবনের ব্যাপারে এরা এত বেশি সেন্সিটিভ, এতটাই হতাশাগ্রস্ত, অসুখী আর উদ্বিগ্ন যে...!
ঘোষ মাঝখানে বলে উঠলো–
এর কারণ সম্ভবত, আমরা বেড়ে উঠেছিলাম আর্থসামাজিক আর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে। এরা বড় হচ্ছে টেকনোলজি আর সোশ্যাল মিডিয়ার সংস্কৃতিতে।
ঘোষের মন্তব্য হয়তো যথার্থ বলে মনে হলো ইতিহাস শিক্ষিকার। সে নিজের গভীরে ডুব দেবার মতো করে বিশেষ উৎসাহ নিয়ে বললো–
যথার্থ বলেছো! আমার এক সাইকোলজিস্ট বান্ধবীও বলছিল, তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য দারুণভাবে বদলে যাচ্ছে। ল্যাপটপ, স্মার্টফোনের অতি ব্যবহার প্রভাব ফেলছে বিভিন্ন অর্গানের ওপরে! সামাজিকভাবে এরা তাই অতিমাত্রায় সচেতন!যা প্যানিকও সৃষ্টি করে! নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এরা অস্থির! কোথাও কোথাও আত্মবিশ্বাসও নড়বড়ে!
মিস্টার কে ঘোষ এখনো প্রাচ্যের ঐতিহ্য রক্ষায় আগ্রহী। সে তার মন্তব্যে শোনালো সঙ্গে সঙ্গে–
হাঁ, তরুণ সমাজ অতি সচেতন! তাই ফ্যামিলি লাইফে প্রবেশ করতে ভয় পা্য়! সংসারের দায়দায়িত্ব কাঁধে নিতে চায় না অথচ লিভ টুগেদার করায় আপত্তি নেই! এতে যে সমাজে অস্থিরতা বাড়বে, নৈতিকভাবে বিপর্য্য় নেমে আসবে সমাজ ব্যবস্থায়, সে কথা কে বোঝাবে!
প্রাচ্যের বিভিন্ন নৈতিক আদর্শ সম্পর্কে এদের ধারণা পরিষ্কার নয়। কথার মর্মে না গিয়ে অতি উৎসাহ নিয়ে এডগার তাই মুখ খুললো এবার–
কিন্তু এর একটা ভালো দিকও রয়েছে মিস্টার কে! দীর্ঘদিন লিভ টুগেদার করার ফলে দুই পার্টনারই বুঝতে পারবে পছন্দমতো সঙ্গী তারা পাচ্ছে কিনা। জানাশোনার লম্বা সুযোগ থাকায় সঙ্গী নির্বাচনেও ভুল কম হবে! ডিভোর্সের অনুপাত তাতে কমে আসবে! ফলে ব্রোকেন ফ্যামিলির সংখ্যাও কমবে!
তাছাড়াও আরও ইতিবাচক দিক রয়েছে - লোলো বলতে আরম্ভ করলো–
পড়াশুনো শেষ করে, ক্যারিয়ার তৈরী করে, স্টুডেন্ট লোন পরিশোধ করে বিয়ে করলে, আমি বলতে চাইছি সবদিক গুছিয়ে ফ্যামিলি লাইফে গেলে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তারা পাবে! অবশ্য এটাও বাস্তবতা, সবকিছু গুছিয়েও অনেকে সংসার করতে ভয় পাচ্ছে!
আজকের সকালটি ভারি স্নিগ্ধ। চমৎকার ঝকঝকে নীল আকাশ। চরাচর জুড়ে নরম সূর্যের তরল ছোঁয়া। কোথাও উত্তাপের প্রবলতা নেই। ভোর থেকে তন্বী তরুণীর দোলায়িত দেহভঙ্গিমার মতো ছোট ছোট হালকা হাওয়া তরঙ্গায়িত হচ্ছে। তার স্পর্শে প্রকৃতির অঙ্গ জুড়ে প্রফুল্লতার ঢেউ। ওয়েলসের সবখানেই বড় সুন্দর। কোথাও বলিষ্ঠ পাহাড়ের দৃঢ় আলিঙ্গনে রোমাঞ্চিত হচ্ছে নীল আকাশ। কোথাও অনুচ্চ উপত্যকা থেকে হঠাৎই জলধারা নেমে এসে অজানা নদীরূপে বনের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। কোথাও পাহাড়ের পাদদেশ জুড়ে চরে বেড়াচ্ছে সংখ্যাতীত মেষের পাল। যেন শত সহস্র ধূসর রঙের চলন্ত ফুলের গুচ্ছ। আবার কোথাও তার রূপের রাশি এমনই অবারিত, এতটাই শুধু অনুভবের যে, ভাষা তার নাগাল পায় না। উপমা উৎপ্রেক্ষার শব্দগুচ্ছে রূপায়িত করা সম্ভব হয় না তার মহিমাকে। মুগ্ধ চোখ কৃতজ্ঞতায় শুধু বলতে পারে–
আহা ধন্য হলো চোখের দেখা! ধন্য এই বিমুগ্ধতা! 
আমাদের গাড়ি এখন সেভার্ন নদীর দ্বিতীয় ব্রিজ অতিক্রম করছে। ওয়েলস এবং ইংল্যাণ্ডকে সংযুক্ত করেছে  লেক সমান নদীর ব্রিজ। দৈর্ঘ্য ১৬৮২৪ ফুট। ১৯৬৬ সালে এটি নির্মিত। বিশ্বের বৃহত্তম নদীগুলোর মধ্যে সেভার্ন তার দুরন্ত উন্মাদ তরঙ্গের জন্য গল্পকাহিনীতে ভরপুর। প্রতিদিন এই নদীর বুকে কয়েকবার করে জোয়ার ভাঁটার খেলা চলে। জোয়ারের ঢেউ উচ্চতায় আটচল্লিশ ফুট অবধি পৌঁছে যায়। অসাধারণ সৌন্দর্যে ভরপুর এখানকার চারপাশের পরিবেশ। সবুজ ঘাস আর অরণ্যের আস্তরণে ঢাকা অজস্র পাহাড়ের ছোট বড় মিনার। তারই মাঝ দিয়ে লীলায়ত তারল্য নিয়ে নীলাভ আকাশের মতোই প্রসারিত হয়েছে পৌরাণিক কালের সেভার্ন। পাহাড়ের পাদদেশে, তার মাথায় মাথায় নানা আকারের লোকালয় অলংকারের মতো সাজানো। যেন সবকিছু গুছিয়ে রেখেছে কেউ।
লোলো ফের বিরামহীন কথা বলতে শুরু করেছে –
এই ব্রিজের নাম ছিল ‘দ্বিতীয় সেভার্ন ক্রসিং’। মানে ওয়েলশ ভাষায় যাকে বলা হতো -‘আইল গ্রোয়েসফ্যান হারফেন’।
ছিল কেন বলছো? ঘোষের প্রশ্ন শোনা গেলো।
এ বছর ৫ই এপ্রিল সেতুর নতুন নামকরণ হয়েছে-‘দ্য প্রিন্স অফ ওয়েলস ব্রিজ’। আসলে অফিসিয়্যাল ভাষা হিসেবে ওয়েলশ স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই সব কিছুর বদল হচ্ছে। জানো তো, ১৯৯৯তে ওয়েলশকে স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাধ্যতামূলক করার আইনও পাস হয়ে গেছে?
ওঃ এতদিন এখানে ওয়েলশ পড়ানো হতো না বুঝি?
আমার জিজ্ঞাসায় অজ্ঞতার আভাস পেয়েও লোলো স্বাভাবিকভাবেই বললো–
নাঃ!  সে তো ১৫৩৬ খ্রীষ্টাব্দেই রাজা দ্বিতীয় হেনরির অ্যাক্ট অফ ইউনিয়নের চুক্তি অনুসারেই নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখনও ৬৪ পার্সেন্ট মানুষ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ওয়েলশ শিক্ষা প্রচলনের বিরোধী। কারণ নগর জীবনে ওয়েলশ বলিয়ে মানুষ তো নেই!
পৃথিবীতে প্রতি বছরই কয়েকটি করে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে ভাষার তালিকা থেকে। সাধারণ মানুষের ধারণা, বহু ভাষার চেয়ে বিশ্বের মানুষ মাত্র গুটিকয়েক ভাষায় কথা বললেই বোঝাপড়ার দিকটি সহজ হয়ে আসবে। তাতে জীবনের জটিল বিষয় দূরীভূত হবে। কিন্তু মানুষের জীবন তো আর যন্ত্র নয় যে তা যন্ত্রের মতো শুধু নিত্য নতুন ধরাবাধা কিছু নিয়মপদ্ধতির ভেতর বন্দী থেকে পরিচালিত হবে। একটি ভাষার মৃত্যু মানে একটি সুনির্দিষ্ট জাতি, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির চিরতরে হারিয়ে যাওয়া। হাজার বছরের ইতিহাস, প্রচলিত লোকবিশ্বাস, ধ্যানধারণার মৃত্যু হওয়া। তাই সম্প্রতি ভাষাবিজ্ঞানীরা গুরুত্ব বুঝে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সচেতন হয়েছেন ভাষা রক্ষণের কাজে। ওয়েলশ ভাষা সংরক্ষণের তাগিদও সেই কারণেই কিনা কে জানে।
মধ্যাহ্ন ভোজনের সময় উপস্থিত পাশ্চাত্যের নিয়ম মেনে। অতএব গ্যাস, রেস্ট এরিয়া, ফাস্টফুড দোকানের সাইন দেখে এক্জিট নিলো কণিষ্ক। পাক্কা চার ঘন্টার ওপরে ড্রাইভ করেছে সে। অতি ভোরে ওঠায় খানিকটা উস্কোখুস্কো দেখাচ্ছে তাকে। হাইওয়ে থেকে বাঁক নিয়ে উঁচুতে উঠে আসতে চোখে পড়লো, ডানপাশে পাহাড়ের মাথার ওপর এক ভগ্নদশা রাজপ্রাসাদ। অনেকগুলো ছোট বড় গম্বুজ মিলে এখনো আভিজাত্যের গর্বিত মহিমা ধরে রেখেছে তার কারুকার্য।
হঠাৎই উত্তেজিতভাবে কথা বলে ভাবনার স্রোত ঘুরিয়ে দিলো এডগার–
লোলো, ওই যে দেখো পেমব্রোক ক্যাসল! এর থেকে আরেকটু ওয়েস্টের দিকে গেলেই কেয়ারফিলি ক্যাসল! গতবার বার্টন এখানেই ঘুরতে এসেছিল!
ওখানেও কি ট্যুরিজমের ব্যবস্থা আছে নাকি? গভীর মনোযোগে দেখতে দেখতে প্রশ্ন করলো মিস্টার কে। এখানে নেই। তবে অন্য অনেক ক্যাসলেই রয়েছে। বিশেষত রাজধানী কারডিফের ক্যাসলে তো আছেই! লোলো তার স্কুলের ছাত্র ভেবে পরক্ষণেই জিজ্ঞেস করলো-
ওয়েলসে মোট কতগুলো ক্যাসল আছে জানো তো?
এডগার সোৎসাহে জবাব দিলো–
ইয়েস ম্যাম! সিক্স হাণ্ড্রেড! ওই জন্যই ওয়েলসের আরেক নাম ‘ল্যাণ্ড অফ ক্যাসলস’!
মিস্টার কে বিস্ময় নিয়ে বললো-
প্রাচীন এবং মধ্যযুগে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ক্যাসল তৈরী করা হয়েছিল জানি। কিন্তু ওয়েলসে অতগুলো তৈরী করার কারণ কী?
জবাব দিতে কয়েক সেকেণ্ড সময় নিলো এডগার। একবার পাশে বসা ইতিহাস শিক্ষিকার মুখে তাকালো। তারপর বললো–
কে জানে। আমার ঠিক জানা নেই।
কারণটার কিছুটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা করলো লোলো–
শত শত ক্যাসল নির্মাণের সব কারণ এখনও অজানা। তবে একটা ব্যাপারে প্রায় সব ইতিহাসবিদই একমত, প্রাচীনকাল থেকে ওয়েলস বার বার বিদেশিদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। রোমানরা করেছে। এ্যাংলোস্যাকশনদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। কিন্তু ব্রিটেন থেকে এখানকার মানুষ বেশি স্বাধীনচেতা ছিল। স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘাত  তাই লেগেই থাকতো। তাই নিরাপদ ব্যবস্থার জন্যই..।
ম্যাকডোনাল্ডে ঢুকে খাবার মেন্যুর অর্ডার দিয়ে একখানা বড় টেবিলে বসলাম সবাই। সঙ্গে সঙ্গে নজরে এলো জানালার পাশের টেবিলে বসে, চার কিশোরী খাচ্ছে। বয়স তেরো থেকে চোদ্দ পনেরোর মধ্যে। দুজন স্থূলত্বের কারণে টোপাটোপা। অন্য দুজন লাউয়ের ডগার মতোই সতেজ। ধারালোভাবে ছিপছিপে। কিচিরমিচির ভাষায় পাখির মতো অবিরাম কথা বলছিল ওরা। লোলোর দৃষ্টি নাগরদোলার মতো একবার ঘুরে এলো চারপাশে। কোনো কিছুই তার নজর এড়াতে পারে না কয়েক ঘন্টার অভিজ্ঞতায় সে ধারণা বেশ পাকাপোক্ত হয়েছিল। বাস্তবেও তার প্রতিফলন দেখতে পেলাম। স্মিত হেসে আমার মুখে পলকহীন তাকালো সে–
কিছু বুঝতে পারছো না তো?
উহু।
ওয়েলশ বলছে। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ঘরোয়াভাবে অনেকে ওয়েলশ বলে। কিন্তু উত্তর-পশিচমের দিকে এমন পাবে না। যদিও স্কুলে শিখছে এবং সান্ধ্য স্কুলে বড়দেরও শেখার ব্যবস্থা হচ্ছে।
এদিকটায় সেভাবে বড় বড় গাছপালা একেবারেই চোখে পড়ছে না। মরু অঞ্চলের গৈরিক ধূসরতা চারদিকে ছড়ানো। প্রকৃতির মনমেজাজ অন্যরকম। একটু অচেনাও। লাঞ্চ শেষ করে ছেলের বদলে বাবার গাড়ি ড্রাইভ করার কথা থাকলেও কণিষ্ক দরজা খুলে প্রথমেই ড্রাইভিং সিটে বসে স্টিয়ারিং-এ হাত রাখলো। আজ ছেলে একেবারেই কথা বলেনি। শুধুমাত্র দুপুরে খেতে বসে মামণির সঙ্গে দু’ চারটি কথা ছাড়া। পিতা স্নেহবশে প্রশ্ন করলো–
তুই এত ঘন্টা ধরে গাড়ি চালালি, টায়ার্ড হোসনি? এবার আমি চালাই?
ছেলে গম্ভীর মুখে জবাব দিলো-
দেরি করো না! গাড়িতে ওঠো!
মিস্টার কে ঘোষ, মেসোর কানের কাছে ফিসফিস করলো আহত হয়ে–
ছেলেমেয়েদের মাঝে মাঝে যে কী হয়, কে জানে! মুড বোঝা দায়!

এবার গাড়ি ছুটছে উত্তর-পশ্চিমের দিকে। হোটেলের ঠিকানা সেদিকে। হোটেলের নাম ক্যাসল। ঐতিহ্যবাহিতা ধরে রাখার জন্যই নাকি এমন নাম। এডগারের বিস্তর কথা বলিয়ে বউ ইতিহাস ছেড়ে কিছু সময় আগেই প্রবেশ করেছে রাজনীতির অঙ্গনে। সেই আলোচনার ভিত্তি ধরে ঘোষ এবার জানতে চাইলো–
তাহলে তোমার ধারণা, ব্রেক্জিটের ভবিষ্যৎ ঝুলেই থাকবে?
বাস্তবতা সেটাই বলছে! ২০১৬য় ইউনিয়ন ছেড়ে বেরিয়ে আসার পক্ষে ৫১.৯% গণভোট পড়লেও শুরু থেকে এর বিরুদ্ধে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে! শুধু যে ইউরোপের রাজনীতিতেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্তহীন বিতর্ক চলছে, তা তো নয়! ইউনাইটেড কিংডমের তরুণ সমাজও এর বিরুদ্ধে মুখর রীতিমতো! তাদের ৭০% ভোটই তো ব্রেকজিটের বিপক্ষে পড়েছিল!
ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রের কথা বুঝতে পারি! কিন্তু এর ফলে ইউ কে-এর অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হওয়ার কথা! চাকরির বাজারও ভালো হবে! তাহলে ইয়্যাং জেনারেশনের আপত্তি কিসের?
ওই বললাম না, তরুণ প্রজন্ম সংশয়গ্রস্ত? উদ্বিগ্ন? অসুখী? এরা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সন্তুষ্ট নয়!
তাদের মতে সমাজ ব্যবস্থার অগ্রগতি ঠিকমতো হচ্ছে না! রাজনীতিকরা সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে! পলিসিমেকারদের প্রতিও আস্থার অভাব মারাত্মক! তবে এই পরিস্থিতি তৈরী হওয়ার মূলে রয়েছে, বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউণ্ড থেকে আসা মানুষদের উপস্থিতি!
শেষের দিকে লোলোর কণ্ঠস্বরে বিশেষ রকম ক্ষুব্ধতা ছড়ালো। তার এই প্রচ্ছন্ন অভিযোগের মর্ম বুঝতে দেরি হলো না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদার নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস, কৃষিবিভাগসহ বিভিন্ন জনসংযোগমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে পঁচিশ লাখ বাইরের মানুষ কর্মরত যুক্তরাজ্যে। এছাড়াও এখানকার জনসমষ্টিতে রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির বিশাল সংখ্যক ইমিগ্র্যান্ট। তরুণ প্রজন্মের অনেকের মধ্যে ব্রিটিশ জাতীয়তাবোধের আবেগ থাকলেও জাতীয়সত্তার সীমারেখা মানতে রাজি নয়। সাংস্কৃতিকভাবেও দ্রুত বদলে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। এরা আন্তর্জাতিকতা পছন্দ করছে ব্যক্তিগত লক্ষ্য থেকে। নতুন প্রজন্মের ধারণা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন ছাড়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্ত মেনে চলা ছাড়া, ইউনাইটেড কিংডমের সামনে ভবিষ্যতের পথ খোলা নেই। এরা তাই ব্রেক্জিটের বিরোধী।

যুক্তরাজ্য সরকার শুধুমাত্র মাল আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবাধ ব্যবস্থা ধরে রেখে মানুষ চলাচল, ব্যবসাবানিজ্য এবং চাকরির ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে চলবে, এই নীতির ঘোর বিরোধী কেবল তরুণ সমাজ নয়। ‘হাউজ অফ কমন্স’ অর্থাৎ ইউনাইটেড কিংডমের পার্লামেন্টের মেম্বারদের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন অভিমত এবং শর্ত পূরণের দাবী রয়েছে এ সম্পর্কে। ইতিহাস পাঠক মাত্রই জানেন ‘ইউনাইটেড কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেন এণ্ড নর্দ্যার্ন আয়ারল্যাণ্ড’(বর্তমান অফিসিয়্যাল নাম) চার দেশের সমন্বয়ে গঠিত। এরা হলো ইংল্যাণ্ড, স্কটল্যাণ্ড, ওয়েলস আর উত্তর আয়ারল্যাণ্ড। ‘এ্যাক্টস অফ ইউনিয়ন’ অনুযায়ী রাজনৈতিকভাবে ১৫৩৬ খ্রীষ্টাব্দে ইংল্যাণ্ডের সঙ্গে ওয়েলস, ১৭০৭ খ্রীষ্টাব্দে স্কটল্যাণ্ড আর ১৮০১ সালে আয়ারল্যাণ্ড সংযুক্ত হয়। 
আয়ারল্যাণ্ডের ইতিহাস অবশ্য অন্যরকম। ১৮০১ খ্রীষ্টাব্দে তৎকালীন ‘রিপাবলিক অফ আয়ারল্যাণ্ড’ (উত্তর ও দক্ষিণ আয়ারল্যাণ্ড) যখন ‘এ্যাক্টস অফ ইউনিয়ন’ এর শর্ত অনুযায়ী ইউনাইটেড কিংডমের সঙ্গে যুক্ত হয় তখন একত্রিত পার্লামেন্টের নাম ছিল ‘ইউনাইটেড কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেন এণ্ড আয়ারল্যাণ্ড’। সেই সময় বিরাট রাজ্যপাট একমাত্র ব্রিটিশ সরকারের অধীনেই শাসিত হতো। কিন্তু ১৯২২ সালে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনায় ব্রিটিশ সরকার আয়ারল্যাণ্ডের বিভক্তি ঘটাতে বাধ্য হন। কারণ, আইরিশ জনতার একটি অংশ এ সময় স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে বসে। শুরু হয় প্রধান দুই রাজনৈতিক দল, ন্যাশনালিস্ট আর ইউনিয়োনিস্টদের মধ্যে প্রবলতর শত্রুতা। দক্ষিণ আয়ারল্যাণ্ডের অধিকাংশ নাগরিক ক্যাথলিক মতের অনুসারি এবং রাজনৈতিক মতবাদে ন্যাশনালিস্ট। উত্তরের মানুষ ধর্মমতে প্রোটেসট্যান্ট। রাজনৈতিক বিশ্বাসে ইউনিয়োনিস্ট। ইউনিয়োনিস্টরা ব্রিটিশ সরকারের অধীনে থেকে যাওয়াকেই সঠিক সিদ্ধান্ত মনে করে। সেই থেকে উত্তর থেকে দক্ষিণ আলাদা হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ‘রিপাবলিক অফ আয়ারল্যাণ্ড’ হয়ে পরিচিতি পায়। আর উত্তর আয়ারল্যাণ্ড স্বায়ত্তশাসিত থেকেও ইউনাইটেড কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেনের অঙ্গ থেকে যায়।
গাড়ির ভেতরে আগের চেয়ে অনেক বেশি নীরবতা বিরাজ করছে এখন। তাকিয়ে দেখি, মিস্টার কে ঘোষ যথারীতি মধ্যাহ্নের অলস তন্দ্রায় নিমগ্ন। এডগার ব্যস্ত হয়েছে বই পড়ায়। ঘোষ ম্যাকডোনাল্ড থেকে কেনা একটি ডেইলি নিউজপেপারে চোখ রেখেছে। আর লোলো জানালার পাশে থাকায় বাইরে দৃষ্টি ছুঁয়ে নীরবতায় সুনসান। কণিষ্কর জিপিএস ট্রাকার জানিয়ে দিচ্ছে, ‘হোটেল ক্যাসল’ আর মাত্র সাত মাইল দূরত্বের সীমায়। লোলো হঠাৎ তার সার্চ লাইটের চোখ ফেললো আমার মুখে। মনে হলো তার কথা এখনো ফুরোয়নি। সম্ভবত কোনোদিন ফুরোবারই নয়। সত্যিই তাই।
তাকিয়েই গলা নামিয়ে বললো–
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একটা সময়ের জন্য ইউনিয়নের মোক্ষম প্রয়োজন ছিল! কিন্তু বর্তমানে সেটা কেবল জটিলতাই বাড়িয়ে তুলছে!
মনে মনে বললাম–
শুধু কি তাই? তোমার দেশের জনসমাজ আর সাংসদরাই বা কম যাচ্ছেন কিসে? আসলে রাজনৈতিক একত্রীকরণের ফরমূলা রাজনীতিতে সাময়িকভাবেই সার্থক হয়! বহু বছরের জন্য টেনে নিতে গেলে উল্টো ফল ফলে! জাতীয়তাবাদের ধারণা একই কারণে বিশ্বায়নের ধারণায় স্থিতিশীল হতে পারে না! কারণ মানুষ আজও সেই স্তরের সভ্য হতে পারেনি! চলবে…

দীপিকা ঘোষ 
ওহাইয়ো, আমেরিকা।