অটোয়া, মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯
ফেলে আসা দিনগুলি (তের পর্ব) – হুমায়ুন কবির

য়নের অনেক আগেই ঘুম ভেঙ্গেছে। আরো কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। আজকে ছুটি। অফিসের তাড়া নেই। বিকেলে রেবেকা 'ফুড ক্লাবে' দেখা করতে বলেছে। চয়নের সঙ্গে খুব জরুরী কথা আছে। রেবেকা চয়নের জন্য অপেক্ষা করবে।  বাসার কাজের লোক আব্দুর রহিম সব কাজ প্রায় শেষ করেছে। আব্দুর রহিমের দেশের বাড়ি কিশোরগঞ্জ। বাড়িতে ওর স্ত্রী আর এক মেয়ে থাকে। মেয়ে ছবিরন স্থানীয় মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করার পর, নিজের সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে আব্দুর রহিম পার্শ্ববর্তী গ্রামের মরহুম আব্দুল হকের ছেলে আব্দুল কুদ্দুসের সঙ্গে ধুমধাম করে বিয়ে দেয়। বিয়ের পর দিনগুলি ভালোই কাটছিলো নবদম্পত্তির। কিন্তু ছয় মাস যেতে না যেতেই আব্দুল কুদ্দুস বিভিন্ন অযুহাত দেখিয়ে আব্দুর রহিমের কাছ থেকে টাকা আদায় করার চেষ্টা করতে থাকে। যদিও বিয়ের কথাবার্তা যখন হয়েছে, তখন কোন প্রকার যৌতুক দেওয়ার কথা ছিলোনা। পরবর্তীতে আব্দুল কুদ্দুসের চাহিদা মতো টাকা দিতে না পারার কারণে ছবিরনকে আব্দুল কুদ্দুস শারিরীক ও মানসিক অত্যাচার করতে থাকে। স্বামীর এই নির্মম ও অমানবিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ছবিরন স্বামীর বাড়ি থেকে বাবা- মার কাছে চলে আসে। তারপর থেকে আব্দুর রহিমের বাড়িতেই ছবিরন থাকে। স্বামী আবার বিয়ে করে সুখে সংসার করছে। ছবিরন আব্দুল কুদ্দুসকে এখনও ভুলতে পারেনি। হয়তো এক জনমে ভুলতেও পারবেনা। ভুলা সম্ভবওনা। আব্দুল কুদ্দুসকে ছবিরন অনেক অনেক ভালোবাসত। এখনও বাসে। তাইতো ছবিরনের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আর বেদনার সংগে মিতালী করে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের বরাবর আব্দুর রহিম সুবিচার প্রার্থনা করেছে। তাতে কোন লাভ হয়নি। কিছু নিয়ম তান্ত্রিক কথা-বার্তা শুনেই বিদায় নিতে হয়েছে। স্থানীয় থানা ও ওমেন সাপোর্ট সেন্টারে মামলা করেও সুবিচারতো দূরের কথা কোন সহানুভূতিও পায়নি।

 কিন্তু তাতে কি আসে যায়? একজন নারীর মনের অবস্থা, সম্মান, মর্যাদা আর চাওয়া পাওয়ার কি মূল্য আছে আজকের এই সমাজে? এই সমাজতো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। এখানে প্রতিটি পুরুষ মানুষই প্রভু সমতুল্য। রাত হলেই ছবিরন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। চোখের লোনা পানিতে বুক ভিজতে থাকে। ছবিরনের চোখের সামনেসারাক্ষণ ভেসে বেড়ায় আব্দুল কুদ্দুসের সঙ্গে কাটানো স্মৃতি ও সময়গুলি। সেই যে, যেদিন গোলাপী রঙের বিয়ের শাড়ি জড়িয়ে বধু বেসে পালকীতে চড়ে স্বামীর বাড়িতে যাচ্ছিলো, তখন মায়ের কথা ভেবে, বাবার কথা ভেবে  কি কান্না-টাই না কেঁদেছিলো ছবিরন। সব কিছু ফেলে নতুন ঠিকানায় যেতে ছবিরনের খুব কষ্ট হচ্ছিলো। তারপরও  সেদিন থেকেই অচেনা এই লোকটির প্রতি ছবিরনের মায়া পরে গেছে। জীবনের সকল চাওয়া-পাওয়া যেনো এখানেই পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। সমস্ত পথই ছবিরন কান্না করেছিলো। যদিও স্বামী আব্দুল কুদ্দুস মাঝে মাঝে ছবিরনকে শান্তনা দিয়েছে। 
-এই তুমি এতো কাদছো কেন? কেউ এতো কান্না করে? তোমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে। আর লোকজনইবা কি বলবে? কান্না করোনা, প্লিজ!

অনেক বেদনার মধ্যেও অনেক অনন্দ হচ্ছিলো ছবিরনের। এ আনন্দ, হৃদয়কে তোলপার করে দেওয়ার আনন্দ! ছবিরনকে অফুরন্ত সুখের রাজ্যে  সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের দোলায় দুলিয়ে দুলিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে ছবিরন। অজানা আবেশ জড়িয়ে। অচিনপুরের রাজকুমারের সঙ্গে রাজকুমারীর সাজে!  

পালকী বহন করছে ছয়জন বেহারা। তারা প্রত্যেকে অপরূপ সাজে সেজেছে। রঙিন জামা-কাপড় আর জড়ির নকশা আঁকা পাগড়ী পরেছে্। পায়ে ঘুঙুর বেঁধে গান গাইতে গাইতে ছবিরন আর আব্দুল কুদ্দুসকে নিয়ে আমতলী গ্রামে যাচ্ছে। আমতলী আব্দুল কুদ্দুসের বাড়ি। ছবিরনের স্বামীর বাড়ি। ছবিরন স্বামীর বাড়ি যাচ্ছে।

সবাইকে ছেড়ে যেতে যেমন কষ্ট হচ্ছিলো। তেমনি স্বামীর বাড়িতে যাওয়ার এইযে, এতো বিশাল আয়োজন! এতেও ছবিরন ভীষণ পুলক অনুভব করছে। আর যে মানুষটির সঙ্গে হৃদয় জড়িয়ে গেলো। বেঁধে গেলো সমস্ত জীবন। তার কথা ভেবে ভেবেও ছবিরন অজানা সুখের আবেশে রোমাঞ্চিত হচ্ছিলো। একজন মেয়ে, সেই ছোট বেলা থেকেই মনে মনে চায় একজন জীবন সঙ্গী। ছোট্ট একটা ঘর। আর সাজানো একটি সংসার। দু-একটি সন্তান। এই অল্প কিছু নিয়ে সপ্ন সাজিয়ে, স্বপ্ন দেখে দেখে বড় হতে থাকে। আর এই স্বপ্ন দেখতে কোন নিষেধ নেই। ছবিরনের কাছে কেবলি মনে হচ্ছে, সে তার স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করছে। খুব ভালো লাগছে। সবাইকে আর সবকিছুকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য যেমন কষ্ট হচ্ছে। আবার নতুন একটা জীবনের সুখ আর আনন্দের কথাভেবে ভীষণ ভীষণ আনন্দ পাচ্ছে!

পালকী এসে থামলো আব্দুল কুদ্দুসের বাড়ির উঠানে। গাঁয়ের মেয়েরা দল বেঁধে আব্দুল কুদ্দুসের নতুন বউ দেখতে এসেছে। সব বয়সীর মেয়েরাই বাহারী রঙেরশাড়ি পরেছে। একজন মধ্য বয়সী মহিলা। নাম হুরমতী। হুরমতী সবার আগে আগে এসেছে। ছোট কাঁচের প্লেট ভর্তি চিনি। নতুন বর ও কনেকে মুখে চিনি দিয়ে ঘরে বরণ করতে হয়। গ্রামের এমনই নিয়ম। বেহারার দল নেচে-গেয়ে টাকা তুলছে। যে যাপারছে খুশি মনেই দিচ্ছে। বিয়ে বাড়ির চারদিকে আনন্দের বন্যা বইছে। হুরমতী ছবিরনকে প্রায় টেনেই পালকি থেকে বের করে আনলেন। একটা কাঠের তৈরি জরি আর রঙিন কাগজেরে নকশা করা আসনে আব্দুল কুদ্দুছ আর ছবিরনকে পাশা-পাশি দাড় করানো হলো।  আব্দুল কুদ্দুস ডানদিকে আর ছবিরন বাম দিকে দাড়িয়েছে। ছবিরন লম্বা ঘোমটা টেনে আড়ষ্ট হয়ে মাথা নিচু করে আব্দুল কুদ্দুসেরর বাম পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হুরমতীর হাতে রাখা প্লেট থেকে এক এক করে মেয়েরা ছোট চামচে করে চিনি নিয়ে প্রথমে আব্দুল কুদ্দুস ও পরে ছবিরনকে খাইয়ে দিচ্ছে। এই পর্বকে গায়ের লোকেরা চিনি মুখে দেওয়া বলে। এবার ছবিরনকে ঘরে নেওয়ার পালা। আব্দুল কুদ্দুসকে কোলে করে ছবিরনকে ঘরে নিতে হবে। আব্দুল কুদ্দুসের কেমন লজ্জা লজ্জা লাগছে। তবুও নিয়ম রক্ষার জন্য এটা করতেই হবে।

আগে থাকেই বাসর ঘর সাজানো ছিলো। কাগজের ফুল, রঙবেরঙের রঙিন কাগজ আর জরির ঝালর দিয়ে বাসর সাজানো হয়েছে। বিয়ের সমস্ত ব্যাপারটাই মহা আনন্দের। ছবিরনের সংসারে তেমন কেউ নেই। শ্বশুর অনেক আগেই মারা গেছেন। শাশুরী আর এক ননদ। এই  নিয়েই আব্দুল কুদ্দুসের ছোট সুখের সংসার। ননদের বিয়ে হয়েছে বছর খানেক আগে। বিয়ের পর দিনগুলি ভালোই কাটছিলো ছবিরনের। ছয়মাস পরেই আস্তে আব্দুল কুদ্দুস ছবিরনকে বাবার কাছ থেকে টাকা আনতে চাপ দিতে থাকে।  আব্দুল কুদ্দুসের মুদি দোকান আছে। কিছু ফসলের জমিও আছে। সেগুলিতে চাষাবাদ করে । দোকানের আয় আর জমির ফসলে সুখেই কেটে যাচ্ছিলো ছবিরনের ছোট্ট সংসার। বিয়ের সময় আব্দুর রহিম সাধ্যমত আব্দুল কুদ্দুসকে নতুন জামা-কাপড়। লেপ-তোশাক, ঘড়ি, সোনার  আংটি, সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উপহার হিসেবে দিয়েছে। আর ছবিরনকে সোনার কানের দুল, গলার হার আর দু'গাছা চুড়ি দেওয়া হয়েছে। আব্দুল কুদ্দুসের মা ও ননদের জন্যও নতুন শাড়ি এবং ননদের স্বামীর জন্য পাঞ্জাবী আর লুঙ্গিও দিয়েছে।

আব্দুল কুদ্দুস প্রায় দিনই দোকানে লোকশান, জমিতে ফসল ভালো হয়নি এসব কথা বলে আব্দুর রহিমের কাছ থেকে টাকা আনার জন্য ছবিরনকে চাপ দিতে থাকে। ছবিরন অবশ্য নিরবে সব সহ্য করে। বাবাকে বলে কি হবে! বাবা এখন বৃদ্ধ হয়েছেন। অনেক কস্টে সংসার চালান। আব্দুল কুদ্দুসকে দেওয়ার জন্য টাকা কোথায় পাবেন? এতে বাবার কষ্ট আরো বাড়বে। এভাবেই গড়াতে থাকে সময়। এক পর্যায়ে আব্দুল কুদ্দুস মরিয়া হয়ে উঠে টাকার জন্য। তবুও ছবিরন নির্লিপ্ত। আর নির্লিপ্ত না থেকে উপায় নেই। যে বাবা এতো কষ্ট করে সংসার চালান তাকে অতিরিক্ত কষ্ট দেওয়া ছবিরনের পক্ষে সম্ভবনা। একদিন রাতে আব্দুল কুদ্দুস খুবই ভয়াবহ হয়ে উঠলো, উঁচু গলায় ছবিরনকে বলতে থাকে, 
-কিরে তরে বললাম, তোর বাবার কাছ থেকে টাকা আনতে। তুই আনলি না যে? দোকানে পুঁজি কমে গেছে। দোকানে টাকা লাগবে।

ছবিরণ চুপ করে থাকে। কি বলবে। মেয়ে হয়ে জন্মেছে এই টুকু লাঞ্ছনাতো কপালেরই লেখন। মেয়ে মানুষ বলে কথা। সহ্য করতেই হবে।
-কথার উত্তর দিলি না যে? কথা কানে যায় নাই?

ছবিরণ আব্দুল কুদ্দুসের চোখের দিকে তাকালো। নতুন বউ হয়ে যখন এই বাড়িতে এসেছিলো, তখন এই মানুষটা ছবিরনকে কত ভালো বাসতো। হাট থেকে কাঁচের রেশমী চুড়ি, আলতা আরো কতো কি এনে দিতো! একদিন রাতে চুপি চুপি ছবিরনকে বললো,
-পাশের দরবেশ বাড়িতে বাউল গান হবে, তুই যাবি?

ছবিরন খুব অবাক হোল। খুব যেতে ইচ্ছে করছে আবার শাশুড়িকে ভয়ও পাচ্ছে।
- মা'য় জানলে, কি মনে করবেন? বুঝতে পারছিনা যাওয়া ঠিক হবে কিনা।
-আরে, মা'য় কিছুই জানতে পারবেনা। আমরা তালা দিয়ে যাবো ছবিরণ মনে মনে আব্দুল কুদ্দুসকে নিয়ে খুব গর্ব করতো। কতগুলি দিন রাত আনন্দে কেটেছে তার হিসেব নেই। আর এখন আব্দুল কদ্দুসের চোখের দিকে থাকাতেও ছবিরনের ভয় লাগে। ছবিরন মনের কষ্ট অন্তরে চেপে রেখে উত্তর দিতে চেষ্টা করলো,
-বাবায় এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছে। আগের মতো কাজ-কর্ম করতে পারেনা। টাকা কোথ থেকে দিবে। আমি বাবাকে অনেকবার বলেছি। আপনিতো আমাদের অবস্থা জানেনই।

ছবিরন বাবাকে কিছুই বলেনি। কি বলবে? এসব বলে  বৃদ্ধ বাবাকে শুধু শুধু দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়ে কষ্ট বাড়িয়ে কি লাভ। তার চেয়ে এই ভালো। লাঞ্ছনা আর গঞ্জনা ছবিরনের জন্য থাকুক। তবুও বাবাকে কষ্ট দেয়া যাবেনা। কখনো না। কিছুতেই না।

আব্দুর রহিম যখন মেয়েটির কষ্টের কথাগুলি বলছিলো তখন মাঝে মাঝেই সে চোখের পানি মুছে কান্না চেপে রাখতে চেষ্টা করেছে। চয়ন এটা দেখেছে।  চয়নের মাঝে মাঝে এই সমাজ ও সভ্যতার প্রতি প্রচন্ড ঘেন্না আসে। ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে ইচ্ছে করে। শুধুমাত্র টাকার জন্যেই একজন মেয়েকে এতো লাঞ্ছনা আর গঞ্জনা সহ্য করতে হবে?  তার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে?  কেন? মেয়েটিকে সিমাহীন কষ্ট আর অপমান নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে? সমস্ত জীবন দীর্ঘ নিঃশ্বাস আর হাহাকার ভরা কষ্টের মধ্যে বসবাস করতে হবে? কেন? নারীর জন্য করা এতো আইন। এতো আইনী সহায়তা কেন্দ্র তারপরও নারীর জন্য কেন এই নির্ধারিত লাঞ্ছণা আর গঞ্জণার জীবন? কেন? এ-কেমন সমাজ ব্যবস্থা? চয়নের কাছে সমস্ত ব্যাপারটাই বিভীষিকার মতো লাগে। আর কতোদিন এভাবে নারীরা জ্বলে পুরে ছাই হয়ে যাবে? কেন?  

 "এমন দেশটি কোথাও খুজে পাবে নাকো তুমি সকল দেশের রানী সেজে আমার জন্মভুমি। সে-যে আমার জন্মভুমি"।

এতো রক্ত, তাজা প্রাণ আর অসংখ্য নারীর সভ্রমের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা, তার কি মূল্য আছে; যদিনা কোন মানুষের জীবনের এতটুকু নিরাপত্তা না থাকে? আমরাতো এমন দেশ চাইনি। "স্বাধীনতা তুমি পিতার জায়নামাজের উদার জমিন"। একি তাহলে মিথ্যা? কেন মিথ্যা হবে? কেন?

চয়নের প্রানভরে বিশুদ্ধ অক্সিজেন ভরা বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পারেনা। সমাজের কুসংস্কার আর বিভীষিকাময় অসভ্যতা সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। এখানে এখন বিশুদ্ধ বাতাস নেই। নিঃশ্বাস নিবে কেমন করে?
 চয়ন যে বেতন দেয় তা দিয়ে আব্দুর রহিমের ভালোই চলে যায়। চয়ন একা একজন মানুষ। দেখা শোনা করার কেউ নেই। আব্দুর রহিমই আপাতত দেখাশোনা করে।

চয়ন আব্দুর রহিমকে ডাকল। আব্দুর রহিম এলে জানতে চাইলো,
-আপনি কেমন আছেন চাচা?
-জি, ভালো আছি।
-নাস্তা তৈরি করেছেন?
-জি, করেছি। সব্জির খিচুরি। আপনি গোসল করে নেন ততক্ষণে আমি টেবিলে নাস্তা দিচ্ছি।
-জি, আচ্ছা। আপনি নাস্তা করেছেন?
-জি, না । আপনার খাওয়া হলে আমি খাবো।
-আরে না। আপনি খেয়ে নিন। এতো বেলা হয়েছে।
-কিছু হবেনা।
-আমারতো অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইচ্ছে করেই দেরি করে উঠলাম। আপনি খেয়ে নিন।
-আপনার আজকে রেবেকা আপার সংগে দেখা করার কথা না?
-জি, ছিলো। কিন্ত আজকে আর যেতে ইচ্ছে করছেনা। মনটা ভালো লাগছেনা। ভাবছি বাসায় থেকে ঘুমিয়ে নিবো।
-রেবেকা আপা অপেক্ষা করে কষ্ট পাবেন।
-আমি রেবেকাকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছি যে, আজকে শরীরটা ভালো নেই। আগামী সপ্তাহে দেখা হবে। 
-ভালো করেছেন। আমি আপনার জন্য চা করে আনছি।
-জি, খুব ভালো হয়। আনুন। 

আব্দুর রহিম খুবই চমৎকার একজন মানুষ। অনেকদিন ধরে চয়নের বাসাতে আছে। কিন্তু চয়নের অপছন্দ হয় এমন কোন কাজই আজকে পর্যন্ত করেনি। মাঝে মাঝে আব্দুর রহিম তার নিজের ও পরিবারের সুখ-দুঃখের গল্প বলে। চয়নের শুনতে খুব ভালো লাগে। আবার যখন একমাত্র মেয়ে ছবিরনের কষ্টের কথাগুলি বলে, তখন চয়নের মনের ভিতরে ক্ষরণ হতে থাকে। একদিন আব্দুর রহিমের কতো-কি ছিলো। ফসলের জমি। গোলা ভরা ধান। গোয়াল ভরা গরু। এখনও হয়ত কিছু জমি আছে। কিন্তু সব সময় একমাত্র মেয়ের জন্য কষ্ট পায়। কতো ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছিলো মেয়েকে। কিন্তু সুখের মুখ দেখতে পেলোনা। কপালে জুটলো নির্যাতন আর যৌতুকের কলংকের চিহ্ন। 

নারী! তুমি কখনও মা। কখনও বোন আবার কখনও কন্যা। তাহলে তোমার জন্যে নিরাপত্তা কোথায়? কেন তুমি এতো কষ্ট পাবে? কেন?  চলবে...

হুমায়ুন কবির
ঢাকা, বাংলাদেশ।