অটোয়া, বৃহস্পতিবার ৩ এপ্রিল, ২০২৫
মীরার বয়স - ফরিদ তালুকদার

মীরার বয়স সতেরো 
নাহ্..
মীরার বয়স  আর-ও কম, কিংবা আর-ও কিছু বেশী
সাত কিংবা সাঁইত্রিশ? কি আসে যায়? 
এ তো নিছক একটি সংখ্যা 
ওর জন্মের মতনই ভুল একটি নম্বর 
মা-বাবার বুক ছাড়া আর কোথাও তো সে  নিবন্ধিত হয়নি?  
দেয়াল গাত্র, প্যাপিরাস কিংবা সভ্যতার কোন পাতায় 
কখনো তো লেখা হয়নি তার জন্ম তারিখ?? 

তার নিরুৎসব জন্মের ক্ষণ
আলোহীন এই পৃথিবীতে এক সলতে রশ্মির মতো
হয়তো মা-বাবার বুকেই শুধু 
এক রেখা সুখের ঝিলিক ছড়িয়েছিলো  একদিন
আর কিছু নয়..!

মীরার বয়স তাই শুধুই  একটি ভুল সংখ্যা। 

সে তো নিপাট বেনীর স্নিগ্ধতা ছড়ানো ভোরে
গোছানো বইয়ের  ব্যাকপ্যাক পিঠে 
কোনদিন স্কুলের পথে তৈরী হয় নি?
বাড়ী ফেরার সময় 
ঝাঁঝালো রোদ কিংবা মুশল বৃষ্টিতে রঙীন ছাতার নীচে 
তার স্বপ্ন তো কখনো প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায় নি..?
সে তো তার মাকে কোনদিন জিজ্ঞেস করে নি
মা.. এবারের জন্মদিনে নীলাকেও আসতে বলি..?

এ মীরার দৃষ্টি যে হামেশাই আকাশের শূন্যতাকে ভেদ করে
আলোকবর্ষ দূরের কোন অজানা ঠিকানায় হারিয়ে যায়
যেখানে সে হন্যে হয়ে খুঁজে আজন্ম অচেনা একফোঁটা মানবিক ভালোবাসা
চাঁদ তারার শাসন সে দৃষ্টির পথে কোন বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না
মীরাদের জীবনে এ সবই তো প্রকৃতির এক অর্থহীন আয়োজন
আপন কান্নার কাছেই সমর্পিতা যে জীবন
কি প্রয়োজন তার জানতে চাওয়ার
কেন নীলাকাশ কখনো এমন গোমরো মুখো হয়ে কাঁদে?

হয়তো কখনো ছিলো আহ্লাদী কিছু দিন
বেশী দূরের কথা নয় 
কিন্তু কিছুই মনে পড়ে না তার
শুধু মনে পড়ে  শরীরের চেয়েও বড় হয়ে
তাকে জড়িয়ে থাকতো নিত্য সংগী ক্ষুধা। 

এ মীরা যে তাই আপনার আমার বাসায় 
তার চেয়ে মাত্র দু’বছরের ছোট
আর একটি শিশুর দেখাশুনার দায়িত্ব কাঁধে নেয়
এ মীরা যে একদিন মায়ের বুক ভাঙা কষ্টের বকায় 
আবছায়া অন্ধকারের মতো
এক টুকরা অভিমানকে সংগী করে পৃথিবীর পথে বেড়িয়ে যায়
স্টেশন, ইটের ভাটা,  উদোম আকাশের নীচে
ফুটপাতের ধুলোর মমতায় বিছিয়ে দেয় ক্লান্ত শরীর
গতর খেটে খেটে, পুড়ে পুড়ে ছাই ভস্ম হয়ে 
প্রতিদিনের নবজন্মে 
এ মীরা যে শুধু বেঁচে থাকার স্বপ্নে ই বেঁচে থাকে 
এ মীরাদের বয়স তাই  দিনে দিনেই যে বছর হয়ে যায়..!

শরীরের কুঁকড়ানো ব্যাথায় 
কোন এক কালো কুন্ঠাহীন রাতে
সে যে সহসাই বেড়ে উঠে আর এক সীমানায়
যখন সে জানে 
নারী জন্মের  শেষ সম্ভ্রম টুকু বিকিয়েও বেঁচে থাকার সওদা হয়
যখন সে জানে 
কালো দাগের নীচে মোড়ানো কাঁথায়
সর্বস্ব বিকানো  এই শেষ দোকানেও 
মুখোশ ধারী সন্তর্পণ শেয়ালেরা হানা দেয়

কৃশ ক্লান্ত অস্হিসার রাতের যে প্রহর
তাকে টেনে নিয়ে যায় চোরাবালি সভ্যতার 
আরেকটি নপুংসক দিনের গোড়ায় 
তার কাছে তো এ মীরার কোন চাওয়া নেই,  
কোন স্বপ্ন নেই, কোন স্বীকারোক্তি নেই 
জীবনের চৌহদ্দি খানায় তাই 
কখনো সে তাকায় দুর্বিনীত ঘৃণায়
প্রত্যাশার কফিনে মাথা পেতে 
কখনো বা পড়ে থাকে মৃতসার অসহায়

বঞ্চনা আর বাস্তবতার এমন ইতিহাসে মার খেতে খেতে
এই মীরারা যে সতেরোতেই পৃথিবীর মতো বুড়ো হয়ে যায়
বিনয়ের অকিঞ্চিৎকর মিথ্যা প্রলোভনে ও তাই
আবার তারা শিশুর মতো প্রতারিত হয়
মীরার বয়স তাই সাত ও নয়,  সাঁইত্রিশ ও নয় 
একটি ভুল সংখ্যা মাত্র। 

ছিকে ছেঁড়া জীবনের জীর্ণ ডালে
মীরাদের বয়স তবে কখনোই আর
সাতাত্তর এ পৌঁছায় না…!!

ফরিদ তালুকদার । টরন্টো