অটোয়া, বৃহস্পতিবার ৩ এপ্রিল, ২০২৫
কথা রাখলো না - মৈত্রেয়ী সিংহ রায়

কেউ কথা রাখলো না, এক জীবন থেকে আরেক জীবনে গড়াতে গড়াতে দেখলাম, কেউই কথা রাখেনা।

এক আকাশ জ‍্যোৎস্নাকে সাক্ষী রেখে
বাবা, মাকে বলেছিল
কি নাম রাখবে মেয়ের? সূর্যমুখী না মল্লিকা?
তারপর যখন সত্যিই মায়ের কোল আলো
করে সূর্যমুখী ফুটলো
তখন এক আকাশ জ‍্যোৎস্না মায়ের জীবনের অমাবস্যাকে আলোকিত করতে পারলো না,
চারপাশে অসীম শূন্যতা আর স্তব্ধতাকে সাক্ষী রেখে ফেলে চলে গেল একলা অন্ধকারে।

লুকোচুরি খেলার সাথী সুমন বলেছিল
দেখিস, বৃষ্টি আর রোদের ভালোবাসায়
আমরা সারাজীবন একসঙ্গে থাকবো, 
একসঙ্গে সূর্যাস্ত দেখবো, সমুদ্র কিনারে
ঝিনুক কুড়াবো, জোয়ারের ঢেউয়ে ভেসে যাব।
কতো আষাঢ়-শ্রাবণ গেল, দিনের হাত ধরে দিন গেল,
সুমন, আমি আর কতো অপেক্ষা করবো?
দিন গুনতে গুনতে রাতের সব তারা গোনা
শেষ হয়ে গেলে তুই আমার সঙ্গে সূর্যাস্ত দেখবি?

কলেজ শেষ হতে না হতেই
এক কনে দেখা আলোয় আমার বিয়ে হয়ে গেল।
মালাবদল, সানাইয়ের সুর, দামী কোম্পানি, নামী ইঞ্জিনিয়ার।
ধীরে ধীরে জীবনে অন্ধকার গাঢ় হয়ে এলো,
'এবারে বিশ হাজার টাকা পণ এবং হাতে হাতে আদায়' এর থেকে আমি নিরুপমা মুক্তি পেলাম না।
আমাকে বিসর্জনের লম্বা লাইন।
আমাকে বুকে টেনে নিয়ে মা বলেছিল
দেখিস, নারীমুক্তি একদিন ঘটবেই, বিপ্লব একদিন আসবেই।
মা জানেনা তার মেয়ের অঙ্গে এখন নিষিদ্ধ অসুখ।
নারীমুক্তি আসেনি,
অন্ধকার যেমন ছিল তেমন‌ই থেকে গেল।

ছেলে একদিন বলেছিল,
আমার ধোঁয়াশা ঘেরা শূন্যতা কাটিয়ে,
আমার কলতলা, চৌবাচ্চা, অন্ধকার ঘর, ভাঙা দরজা, তুলসীতলা পেরিয়ে আমাকে
নিয়ে যাবে তার মস্ত বড়ো তিন কামরা ফ্ল‍্যাটে,চোখ ধাঁধানো ঝলমলে শহরে।
বড়ো বড়ো শপিংমল, নামীদামী খাবার।
আমি এখন ফ্ল্যাটেই থাকি, বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়ির মতো। 
ফ্ল্যাটের নাম 'রাজলক্ষ্মী বৃদ্ধাশ্রম'।
আমাকে কেউ আমার সেই কলতলা, সেই  অন্ধকার ঘর, সেই ভাঙ্গাদরজা,সেই তুলসীতলা ফিরিয়ে দেবে না?

কেউ কথা রাখলো না, অনেক গুলো শীত বর্ষা কাটলো, কেউই কথা রাখে না।

মৈত্রেয়ী সিংহ রায় । মেমোরি, বর্ধমান