অটোয়া, বুধবার ১৯ জুন, ২০২৪
ভিন্ন জীবন (পর্ব- পাঁচ) - সুফিয়া ফারজানা

ভিন্ন জীবন (পর্ব- চার) পড়তে ক্লিক করুন

পাঁচ. 
ফিস থেকে ফিরে ইদানীং আর কোন কাজে আগ্রহ বা এনার্জি পায় না ফারিন। আগে তো এমন হতো না, ইদানীং এত ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মনে হয় কেন নিজেকে?? তবুও আজ সারাকে নিয়ে একটু ডাক্তারের কাছে যেতেই হল। মেয়েটা গলা ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছে বেশ কিছু দিন হল। ডাক্তার সব চেক করে বললেন, সারার টনসিলটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, অপারেশন করিয়ে ফেলতে। আপাতত কিছু ঔষধ আর সব সময় কুসুম গরম পানি খেতে হবে।

বাসায় ফিরে দেখে, হিমেল ফিরেছে আরও আগেই।  যথারীতি ফোনটা চোখের সামনে নিয়ে শুয়ে আছে বিছানায়। বাসায় ইদানীং কারো সাথে কথাও তেমন বলে না হিমেল। হঠাৎ খুব বেশি চুপচাপ হয়ে গেছে। এমনকি তার মায়ের শরীরের খোঁজ খবরও নেয় না আগের মত।

ফারিন ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়েই চায়ের পানি বসিয়ে দিলো। সারাদিন পর এই চা টুকুই শক্তি দেয় বাকী কাজ সম্পন্ন করার। এক কাপ চা শাশুড়িকে দিয়ে তার আর হিমেলের চা নিয়ে ফারিন ঢুকলো বেডরুমে। চুপচাপ চা শেষ করলো হিমেল। ফাঁকে ফাঁকে চালাচ্ছে ইন্টারনেট। একবার জানতেও চাইলো না, কোথায় গিয়েছিল ফারিন অথবা সারার কি হয়েছে। কী আজব হয়ে যাচ্ছে মানুষ টা দিন দিন! আচ্ছা, হিমেল নিজেও কি জানে, কতটা বদলে গেছে সে??

চুপচাপ রান্না, খাওয়াদাওয়া শেষ করে, সাবিত-সারাকে শাশুড়ির ঘরে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও শুতে গেল ফারিন। হিমেল তখনও কি যেন পড়ছিল অনলাইনে। ফারিন বললো, 'আলোটা কমাও, চোখে লাগছে।' হিমেল অফ করে রেখে দিলো ফোন। বললো, 'এই জবটাও বোধ হয় করতে পারবো না, ফারিন।'

'কেন?'

'এসব দুই নাম্বারি কাজ আমাকে দিয়ে হবে না।'

'দুই নাম্বারি কাজ মানে?'

'এই যে লোক ঠকানো, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে প্রতারণা, মানুষকে মিথ্যা আশ্বাস দেয়া, এসব হবে না আমাকে দিয়ে।'

'মার্কেটিং জবে কাজের ধরনই তো এই। তুমি তো একা না, অনেকেই করছে।'

'অনেককে দিয়ে হয়ত হয়, আমাকে দিয়ে হবে না।'

ফারিন আর কথা বাড়ালো না। মাস্টার্স শেষ করার পর এই নিয়ে ছয় নাম্বার জবে জয়েন করেছে হিমেল। বলছে, এটাও করবে না। অথচ সে ভালো ছাত্র ছিল, তার রেজাল্ট অনেক ভালো। কিন্তু আত্মসন্মানবোধ খুব বেশি প্রখর। অনেক জায়গাতেই তার অভিযোগ, তার কাজের মূল্যায়ন নাকি হয়নি সেসব প্রতিষ্ঠানে। ভুল বোঝাবুঝি থেকে জবই ছেড়ে দিয়েছে কয়েক জায়গায়। কিন্তু এভাবে আর কত?? সিস্টেমটাই যে ভুল অনেক জায়গায়, সেটা বুঝতেই চায় না হিমেল।

আর ফারিন অনার্স শেষ করেই ঢুকেছিল একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। আজ বারো বছর পর মোটামুটি ভালো পজিশনে পৌঁছে গেছে সে। জবের ফাঁকে ফাঁকেই এমবিএ টাও করে নিয়েছে। সংসার খরচ, বাসা ভাড়া, বাচ্চাদের স্কুল, পড়াশোনার যাবতীয় খরচ সমস্ত দায়িত্ব মূলত ফারিনেরই। হিমেলের দায়িত্ববোধ বরাবরই খুব কম।

সারাদিন অফিস করে, সমস্ত দায়িত্ব পালন করে, ফারিনও আর পারে না হিমেলের সাথে রোমান্টিক বা সুন্দর সুন্দর কথা বলতে আগের মত। হিমেল নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে মারাত্মক হতাশায় ভুগতে শুরু করেছে ইদানীং। ফারিন পারে না তাকে আর কোন সাহস বা সান্ত্বনা যোগাতে। সারাদিনের পরিশ্রমের ক্লান্তিতে চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে ফারিনের। ভোর ছয়টায় উঠতেই হবে তাকে। আটটায় বের হতে না পারলে কালও লেট হয়ে যাবে অফিস।।
(চলবে)

সুফিয়া ফারজানা
ঢাকা ,বাংলাদেশ