অটোয়া, শুক্রবার ১২ জুলাই, ২০২৪
আশ্রম: একটি চেতনার নাম – ষষ্ঠ পর্ব

বির চৌধুরী, অটোয়াঃ সম্প্রতি অটোয়ার সবচেয়ে পুরাতন বাংলাদেশি সংগঠন ‘বাকাওভ’ তার সকল সদস্যদের কাছে তাদের সদস্যপদ নবায়ন করার জন্যে ইমেইল দিয়েছে। এমনকি বর্তমান যুগে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অনেক ঘটনা এবং দরকারী কিছু শেয়ারের অন্যতম কার্যকরী মাধ্যম ফেইসবুকেও এই আহবান জানানো হচ্ছে। বিশেষ করে ‘বাকাওভে’র বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সদস্য রিয়াজ জামান যখনই সুযোগ পাচ্ছেন, তখনই উনার টাইমলাইন, বন্ধুদের মেসেঞ্জার, বিভিন্ন গ্রুপ, এমনকি পরিচিত ফ্রেন্ডের ফেইসবুক লাইভেও ‘বাকাওভে’র সদস্য হওয়ার অনুরোধ করছেন। ফেইসবুক লাইভের কমেন্ট বক্সে লিংকটি কমেন্ট হিসেবে সংযুক্ত করে দিচ্ছেন। এই তো সেদিন অটোয়ার জনপ্রিয় ইউটিউবার গুলজাহান রুমি তার ইউটিউব চ্যানেল Rumi’s Vlog Ottawa Canada তে উত্তর আমেরিকার পাঠকনন্দিত লেখক প্রয়াত ড. মীজান রহমানের ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একটি লাইভ আলোচনার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেখানেও দেখলাম রিয়াজ জামান ‘বাকাওভে’র সদস্য হওয়ার জন্য গুগল ফরম দিয়ে সবাইকে অনুরোধ করছেন। গুলজাহান রুমির লাইভের ইনবক্সে গুগল ফরম সংযুক্ত করার পাশাপাশি রিয়াজ জামান লিখেছেন, “সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা আর মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা হৃদয়ে ধারণ করে প্রবাসে, কানাডার রাজধানী অটোয়ার সর্ব প্রথম বাংলাদেশি-কানাডীয়ান সংগঠন, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন আজকের ‘বাকাওভ’ তার নতুন কার্যকরী ও উপদেষ্টা পরিষদ নির্বাচন ২০২৪ (সম্ভবত ২১ শে এপ্রিল) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই উপলক্ষে এসোসিয়েশন তার বর্তমান সদস্যদের সদস্যপদ নবায়ন ও নতুন সদস্য সংগ্রহের জন্য আগামী ২৬শে মার্চ পর্যন্ত বিশেষ ব্যবস্থা করেছে। অনুগ্রহ করে এই গুগল লিংকের মাধ্যমে অথবা QR কোড, আপনাদের ফোনের ক্যামেরায় স্ক্যান করে সদস্য ফরম পূরণ করার মাধ্যমে ‘বাকাওভে’র সদস্য হওয়ার অনুরোধ করা যাচ্ছে। আপনাদের সকলের আন্তরিক সহযোগিতায় সংগঠন আরো বেশী উজ্জীবিত হয়ে উঠবে, প্রবাসে নতুন প্রজন্মের সংগঠক সৃষ্টি হবে, নবীন প্রাণে জাগাবে নব প্রেরণা!” স্যালুট রিয়াজ জামান। রিয়াজ জামানের মতো আমরা কি ‘বাকাওভ’কে এভাবে ভালোবাসতে পারি না?   

আমাদের আরশীনগর অটোয়াতে এখন অসংখ্য বাংলাদেশি সংগঠন। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক। অভাব নেই। এই অসংখ্য সংগঠনের ঘেরাটোপে পড়ে আমরা ভুলে গেছি যে, বাকাওভ ধর্ম-বর্ণ-আঞ্চলিকগোষ্ঠী বিহীন একটি সংগঠন। এই সংগঠন আলাদা আলাদা কোন গোষ্ঠী বা ধর্মের নয়। এখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবারই সমান অধিকার। সবাই-ই এই সংগঠনের সদস্য হতে পারেন। তাইতো ফেইসবুকে রিয়াজ জামানের উৎসাহমূলক এইসব পোস্ট আমাকেও এসপ্তাহের শনিবারের নিবন্ধে ‘বাকাওভ’ নিয়ে কিছু লিখতে উৎসাহিত করলো। যদিও আশ্রম প্রকাশের পর থেকেই সময়ে-অসময়ে, দরকারে-বেদরকারে সুযোগ পেলেই আমি আমার ‘গাল-গল্প’ কলামে, অটোয়ার বাঙালিদের প্রথম সংগঠন ‘বাকাওভ’ নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করেছি, অন্যকে দিয়েও কিছু লেখাবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আজ কী লিখবো? রিয়াজ জামানের ছোট কিন্তু কার্যকরী এই পোস্টের পরে আর কি-ই বা লেখা যায়? এছাড়া রিয়াজ জামানের মতো আমিও ‘বাকাওভে’র বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সদস্য। একদিকে ‘বাকাওভে’র মেম্বার, অন্যদিকে আশ্রমের প্রকাশক, সর্বোপরি অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির একজন সদস্য হিসেবে কি লেখা উচিত তা নিয়ে চিন্তিত অথবা বলতে পারেন, কোনোভাবেই যখন মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকা কথাগুলো গুছাতে পারছিলাম না তখন হঠাৎ করেই মনে পড়ে আশ্রম ২য় বর্ষ ১ম সংখ্যায় প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক লেখক মুস্তফা চৌধুরীর “মুক্তিসংগ্রামে অটোয়াবাসী বাঙালি” নিবন্ধের কথা। কারণ লেখক মুস্তফা চৌধুরীর লেখা উল্লেখিত নিবন্ধে বর্তমানের ‘বাকাওভ’ তৈরীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। লেখকের দেওয়া তথ্যগুলো অটোয়ার নতুন অভিবাসী বাঙালিদেরকে ‘বাকাওভে’র সদস্য হতে উৎসাহিত করবে নিশ্চিত।  

"বাংলাদেশ কানাডা এসোসিয়েশন অব অটোয়া ভ্যালী (বাকাওভ)", কানাডার প্রথম বাংলাদেশি সংগঠন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষদের সাহায্য করার জন্য হাজার হাজার মাইল দূরের একটি দেশ কানাডায় অবস্থানরত বাঙালিরা অটোয়ার একটি এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের কোন এক রুমে বসে এ্যাকশন কমিটি গঠন করেন। সেই সময়ের এ্যাকশন কমিটিই এখনকার ‘বাকাওভ’। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক লেখক মুস্তফা চৌধুরীর দেওয়া তথ্যমতে, “১৯৭১ এর প্রথম থেকেই অটোয়াবাসী বাঙালিরা খেয়াল করেন বিক্ষোভ, হরতাল আর অসহযোগ আন্দোলন, কেমন করে দেখতে দেখতে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছয় দফা আন্দোলন ও স্বায়ত্বশাসনের দাবী স্বাধীকার, স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয়। ১লা মার্চ ’৭১ যে-দিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় অধিবেশন স্থগিত করেন, সে-দিন অটোয়ার বাঙালিরাও আশঙ্কিত হয়ে ওঠেন। সে রাতের সি.বি.সি’র খবরে তাঁরা শুনতে পান প্রশাসনিক রদবদলের কথা। আর সাথে সাথে এ ও শুনতে পান কেমন করে ঢাকা বলতে গেলে মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। সবার মুখে তখন একই প্রশ্ন, জাতীয় পরিষদের বৈঠক কেন স্থগিত করা হল? ছয় দফা ও স্বায়ত্বশাসনের কি হবে? মার্চের শেষ সপ্তাহে যখন বাঙালিরা ইয়াহিয়া-ভূট্টো-মুজিব বৈটকের ফলাফল জানার জন্য অধীর আগ্রহ ও উদ্বেগচিত্তে অপেক্ষায়, তখন অটোয়াবাসী বাঙালিরাও আকস্বিকভাবে বাকী খবরগুলো পান—পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে পিলখানা, ই.পি.আর. ঘাটি এবং রাজারবাগ পুলিশ ষ্টেশন আক্রমন করে শহরের বিভিন্ন লোকদের হত্যার কথা। এইসব খবর পেয়েই অটোয়াবাসী বাঙালিরা রাতে আজমত আলী’র এপার্টমেন্টে মিলিত হন। সেখানেই তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে সর্বসম্মতিক্রমে ‘এ্যাকশন কমিটি’ গঠন করেন” (মাসিক আশ্রম, জানুয়ারি সংখ্যা ২০১০)। এভাবেই রচিত হয় তৎকালীন অটোয়াবাসী বাঙালিদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার কথা। আজকের ‘বাকাওভে’র জন্মের কথা।  

বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রামে, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ওপর চাপ দেয়ার দাবী করে ক্যানাডীয় সরকারের প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করা, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশপগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাসহ ভারতে আশ্রয় নেয়া বাঙালিদেরকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করার জন্যে মার্চের শেষ থেকে মোটামোটিভাবে অটোয়াবাসী বাঙালিরা নিয়মিত সভা করতেন, দেশের সার্বিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করতেন। গবেষক মুস্তফা চৌধুরীর তথ্যমতে, “১৯৭১ সালে অটোয়াতে বাঙালি পরিবারের সংখ্যা ছিল ১৫, ক্যানাডীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের তালিকা অনুযায়ী, ড. ও মিসেস নাসির উদ্দীন আহমেদ, জনাব ও মিসেস আজমত আলী, ড. ও মিসেস মুহম্মদ আহসান উল্লাহ, জনাব ও মিসেস ফারুখ সরকার, ড. ও মিসেস লুৎফুল কবির, জনাব আব্দুল আওয়াল, জনাব ও মিসেস আব্দুস সত্তার, ড. ও মিসেস মীজান রহমান, জনাব ও মিসেস আব্দুর রহিম, সর্বজনাব মুহম্মদ হানিফ, গনি মিয়া, টিপু সুলতান, আব্দুল আওয়াল, হরিপদ ধর, ড. ও মিসেস এহসানুস সালেহ এবং জনাব ও মিসেস মুহম্মদ জালাল উদ্দীন। এখানে উল্লেখ্য যে, মুহম্মদ জালাল উদ্দীন ও তাঁর স্ত্রী শাকিলা জালাল উদ্দীন ভারতীয় নাগরিক হওয়ার কারণে সরাসরি বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হতে পারেননি। বিভিন্ন সময়ে যে দাবীর ওপর আন্দোলনকারী বাঙালিরা জোর দেন সেটা ছিল বাংলাদেশের মাটি থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের মুক্তি” (মাসিক আশ্রম, জানুয়ারি সংখ্যা ২০১০)। সাহসী আর দেশপ্রেমিক এসব বাঙালির কথা ইতিহাসের পাতায় কিভাবে লিপিবদ্ধ হচ্ছে আমরা কী জানি? ‘বাকাওভে’র আগামী কমিটি কি অটোয়ার বাঙালিদের মহান এই অবদান সংরক্ষণের উদ্যোগ নেবে? 

১৫ পরিবার থেকে ১৫শ’ পরিবার! ‘এ্যাকশন কমিটি’ থেকে ‘বাকাওভ’! এক থেকে একাধিক! বর্ধিষ্ণু শহর অটোয়াতে এখন কয়েকহাজার বাঙালির বসবাস। এখানের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন থেকে শুরু করে নানাধরণের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠনের ছড়াছড়ি। অথচ বাঙালিদের আদি সংগঠন ‘বাকাওভে’র ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থা। প্রায় সময় দেখা যায় অটোয়ার বাঙালিরা সংগঠনের সদস্য হতে চান না। পর্যাপ্ত সদস্য আর সংগঠকের অভাবে অনেক সময় সময়মতো বাকাওভের কার্যকরী কমিটি করা যায় নি। সেজন্যে গত বিশ বছরে ‘বাকাওভ’কে কার্যকরী সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার জন্যে তিনটি অন্তবর্তীকালীন কমিটি করতে হয়েছে। এসব অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি করার উদ্দেশ্য সংগঠনের সদস্য সংগ্রহ করে সুন্দর একটি কার্যকরী পরিষদ তৈরি করা। আমার জানামতে এসব উদ্যোগের ফলে দু’তিনবার এসোসিয়েশনের জন্যে সুন্দর এবং দায়িত্বশীল কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় গত বিশ বছরে গঠিত এসব কমিটির কোনো কমিটিই সব কার্যকরী সদস্যদের নিয়ে তাঁদের দায়িত্ব শেষ করতে পারেনি। কমিটি গঠনের কিছুদিন পরই আস্তে আস্তে পদগুলো খালি হতে শুরু করে! দায়িত্ব নেওয়া অনেকেই সময় এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ছেড়ে দেন অথবা সংগঠনের কাজ-কর্ম থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে নেন! এভাবেই জোড়াতালি দিয়ে চলছে অটোয়ার প্রথম বাংলাদেশি সংগঠন ‘বাকাওভ’। আমার প্রশ্ন হাজার হাজার বাংলাদেশি অধ্যুষিত শহর অটোয়ায় ‘বাকাওভে’র মত পুরাতন একটি সংগঠনের এরকম অবস্থা কেন হয়? (চলবে…)
 
কবির চৌধুরী
১৩/১/২০২৪
প্রকাশক, আশ্রম
অটোয়া, কানাডা