অটোয়া, বৃহস্পতিবার ২৩ মে, ২০১৯
ইউরোপের পথে পথে (এক) - দীপিকা ঘোষ

বার মাসখানিকের ভ্রমণযাত্রা আমেরিকা থেকে ইউরোপে। ৩রা জুন থেকে ৫ই জুলাই। এসব দেশে ঘরবাড়ি ছেড়ে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার হ্যাপা অনেক। ঘরদোর নিখুঁতভাবে পরিচ্ছন্ন করা ছাড়াও হাজার রকমের কাজের চাপ একসঙ্গে ঘাড়ে এসে পড়ে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না। সমুন্নত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় নাগরিক অধিকার ভোগ করতে গেলে সুনাগরিককেও নৈতিক পর্যায়ে কর্তব্যকর্ম পালন করতে হয়। নইলে পরিণতি বড় সুখের হয় না। তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বকেয়া প্রিমিয়ামসহ পরের মাসের সব ধরনের সম্ভাব্য বিল খুঁজে খুঁজে পরিশোধ করা ছাড়াও, রোজকার মেইল যাতে পোষ্ট অফিস সংরক্ষণ করে রাখে, তার জন্য ডাকঅফিসে ছুটতে হলো কিছু অফিসিয়্যাল ফর্ম্যালিটি সারার জন্য। লনের ঘাস জঙ্গলে পরিণত হয়ে যাতে পরিবেশের সৌন্দর্যহানি না ঘটায়, তার জন্য নির্দিষ্ট লন কেয়ার কোম্পানিকে ফোন করতে হলো। প্রতি সপ্তাহে তাদের লোক এসে ঘাস কেটে যাবে। সার প্রয়োগ করে লন সবুজ সতেজ রাখবে। ইনডোর প্ল্যান্টদের সুস্থভাবে বেঁচেবর্তে থাকার সুব্যবস্থাও সম্পন্ন করা হলো। অর্থের বিনিময়ে আজকাল সব ধরনের সার্ভিসই এদেশে মেলে।

এরই মধ্যে একদিন আমাদের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং অনেক বছরের পুরনো প্রতিবেশি রবার্ট মিল, ঘরের তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য ঘন্টাখানিক ধরে তার তথ্যসমৃদ্ধ উপদেশ বাক্য শুনিয়ে গেলো। কারণ এদেশে শীত, গ্রীষ্ম দুই ঋতুতেই ঘর গরম কিংবা ঠাণ্ডা রাখার জন্য সেন্ট্রাল হিটিং ও কুলিং সিস্টেম ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ে। বাড়িঘরের নষ্ট হবার সম্ভাবনা তাতে কম থাকে। যাই হোক সুনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার ইতিবাচক দিকগুলোর বিস্তারিত আলোচনা এর আগেই বেশ কয়েকবার শোনা হয়ে গিয়েছিল রবার্টের মুখ থেকে। তাই অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে এক পলক তাকাতেই সে আশ্বস্ত করতে চেয়ে বললো –
অত ভেবো না। ঘরের চাবি তো রইলোই আমার কাছে। মাঝে মধ্যে সময় করে এসে দেখে যাবো, তাতেই হয়ে যাবে। তবে জানো তো, তোমরা চাইলে সিকিউরিটির জন্য নীল স্পেন্সারকে কিন্তু বলতেই পারি। নীল আমাদের পারিবারিক বন্ধু। এ পাড়ার একমাত্র পুলিশ প্যাট্রল অফিসার। তোমাদের সামনের বাড়ির প্রতিবেশি হ্যারি পেটারসন, প্রতি বছর শীতকালে যখন তার ফ্লোরিডার বাড়িতে থাকতে যায়, নীলই তখন মাঝে মধ্যে প্যাটারসনের বাড়িঘর দেখে যায়।

পুলিশের গাড়ি আমাদেরও নজরে পড়েছে কয়েকবার। ভেবেছিলাম, ভদ্রলোক হয়তো প্যাটারসনের ছেলে কিংবা বন্ধুস্থানীয় কেউ একজন। তবে কিনা বাড়ির বাইরে লম্বা সময় ধরে থাকার ঘটনা এবারই আমাদের জীবনে প্রথম নয়। আর রবার্টের সতর্ক উচ্চারণও নতুন কোনো ঘোষণা নয়। কাজেই বলতে হলো –
আমাদের ঘরেই তো সিকিউরিটি সিস্টেম রয়েছে বব। তাছাড়া তুমি নিজে যখন মাঝে মধ্যে দেখতে আসছো, তাহলে আর চিন্তা কী?
ঠিক কথা। তাহলে আর দরকার নেই। অবশ্য সময়ও নেই। অনেক আগেই এসবের জন্য নিয়ম অনুসারে দরখাস্ত করতে হয়।
সিকিউরিটি সংরক্ষণের ব্যাপারে রবার্টের চিন্তায় বেশ একটু আতিশয্য রয়েছে। একবার তার বাড়ির পেছনে গভীর রাতে কারুর উপস্থিতি তার নজরে পড়েছিল। কদিন পরে সেই সংবাদ আমাদের জানাতে এসে খুব একচোট হেসেছিল রবার্টের বউ মারিয়া –
বিশ্বাস করো আমি নিশ্চিত, সেটা একটা শেয়ালই ছিল। কিন্তু ববকে সে কথা বোঝায় কার সাধ্যি! সকালে উঠেই লোক ডেকে মনিটর করার জন্য সি সি ক্যামেরা বসিয়ে দিলো!
পাশেই মারিয়ার সাত বছরের ছেলে রব, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পিতার কীর্তিকলাপের কথা শুনছিল। উৎসাহ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিলো –
ড্যাডির লাইসেন্স করা গানও রয়েছে, জানো তো! রাতে কেউ এলেই গুলি করা হবে!

৩রা জুন বিকেলে নির্দিষ্ট সময়েই ট্যাক্সি ড্রাইভার এলো। সিনসিনাটি এয়ারপোর্ট থেকে সাত ঘন্টা আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে আজ যাচ্ছি উত্তর আটলান্টিক আর আর্কটিক মহাসাগরের সংযুক্তস্থানের দ্বীপ, আইসল্যাণ্ডে। ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী আইসল্যাণ্ড উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপ, দুই মহাদেশেরই অন্তর্ভুক্ত। তবে তার ইতিহাস ও সংস্কৃতি একে ইউরোপের অংশীভূত করেছে। দরজা খুলে বাক্সপেটরা নিয়ে বেরুতেই কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ ড্রাইভার সহাস্যে এগিয়ে এসে ক্ষিপ্র হাতে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে সব মালামাল তুলে নিলো ট্যাক্সির ট্রাঙ্কে। আমাদের ভেতরে ওঠার জন্য দরজা খুলে ধরে জিজ্ঞেস করলো –
দেশের বাইরে কোথাও যাচ্ছো বুঝি?
ঘোষ সিটবেল্ট পরতে পরতে নিচু গলায় জবাব দিলো –
হ্যাঁ। একমাসের ছুটিতে ইউরোপ ঘুরতে!
ওয়াও! কোথায়, কোথায় যাচ্ছো?
আইসল্যাল্ড, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইটালি।
দারুণ! তবে ইটালিতেই যখন যাচ্ছো, পারলে সিসিলিও ঘুরে এসো! পাহাড়ি দেশ! ভূমধ্যসাগরের সবচাইতে বড় আইল্যাণ্ড! খুব এনজয় করবে!
নাম জিজ্ঞেস করায় এবার আগের চেয়েও উচ্ছলিত হলো সে। হেসে বললো –
ফ্রেডরিক। তবে সবাই আমাকে ফ্রেড বলেই ডাকে। তোমরাও তাই ডেকো।

হাইওয়ে ধরে দ্রুতবেগে চলতে চলতে এরপরে অনর্গল বকে চললো ফ্রেডরিক ওরফে ফ্রেড। বুঝলাম, স্বভাবে বন্ধুভাবাপন্ন ছেলেটি আসলে যে কোনো বিষয় নিয়েই প্রচুর কথা বলতে ভালোবাসে। পনেরো মিনিটের মধ্যেই আমাদের পরিচয় এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলো, যেন আজই প্রথম ফ্রেডের ট্যাক্সি করে আমরা এয়ারপোর্টে যাচ্ছি না। বরং বহুকালের সম্পর্কসূত্রে আমাদের সঙ্গে সে আগেই বাঁধা পড়ে ছিল নিতান্ত আপনজন হয়ে। কথায় কথায় দু’ চারটি ব্যক্তিগত বিষয় জেনে নিয়ে একসময় প্রসঙ্গক্রমে নিজের সম্পর্কে বললো –
নাঃ এখনো বিয়ের পর্বে ঢুকিনি! ঢুকলেই ফ্যামিলি লাইফ! ছেলেপুলে! দায়দায়িত্ব! বাপরে! লাইফের সবরকম চ্যালেঞ্জগুলো জোয়ারের মতো সাঁইসাঁই করে এসে পড়বে! বলেই হঠাৎ উদাত্ত স্বরে হেসে উঠলো ফ্রেডরিক। পরে হাসি থামিয়ে বললো –
আমাদের জেনারেশন তোমাদের জেনারেশনের মতো হুটহাট বিয়ে করতে চায় না। ভয় পায়।আমি তো বহু দেশেই ঘুরেছি, দেখেছি, সর্বত্রই মানুষ গিজগিজ করছে! জীবন বড় কঠিন হয়ে যাচ্ছে! আমাদের জেনারেশন তাই গার্লফ্রেণ্ড নিয়ে থাকলেও বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহী নয়। অবশ্য লাইফ স্টাইলের ধারণা সবার যে একই রকম থাকতে হবে, তাও নয়।
এরপরে পাস ওভার করার জন্য স্পিড বাড়িয়ে কয়েকটি গাড়িকে পেছনে ফেলে ফের লেন পরিবর্তন করতে করতে মুখ খুললো ফ্রেড –
কথাটা কেন বলছি শোনো। কাল তিউনেশিয়ার এক ভদ্রমহিলাকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছোট বড় অনেকগুলো ছেলেপুলে। শুনলাম, ছোটটার বয়স ছ মাস। ভদ্রমহিলা রীতিমতো বয়স্কা। মধ্য চল্লিশ তো বটেই! তারপরেও নাকি ইচ্ছে, আরও ছেলেমেয়ে জন্ম দেবার! বোঝো ঠ্যালা! তার হাজব্যাণ্ড অবশ্য বলেছে, সংখ্যা বাড়াতে পারবো না! ব্যাংক ব্যালান্স শূন্য হয়ে গেছে! 
কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম – 
কতগুলো ছেলেমেয়ে?
আপাতত আট! আশা করি, আর হবে না!বলে নিজের কৌতুকে আবারও হেসে উঠলো ফ্রেড।

সূর্য অস্ত যাচ্ছে বন বনান্তরের অন্তরালে ন্যুয়ে পড়ে। তার হলুদরঙা বিরাট থালার থেকে অবিরাম গড়িয়ে পড়ছে আবিরের স্রোত। ঝিরঝিরি হাওয়া, তরঙ্গের কাঁপুনি হয়ে গাঢ় সবুজ পাতায় আলতোভাবে উড়ছে। আবার মিলিয়ে যাচ্ছে পরক্ষণে। পূব আকাশের শরীর জুড়ে পরতে পরতে কালো সীসার মতো সতেজ নবীন মেঘ। তারা পর্যায়ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে ধীরে ধীরে। সিঁদুররাঙা সায়াহ্নের সূর্য স্পর্শ করেছে তাদের। ফ্রেডরিক আপাতত নীরবতায় সুনসান। এয়ারপোর্টের সাইন এসে গেছে। সম্ভবত টার্ন নিতেই বিশেষভাবে মনোযোগী হয়েছে সে।

সিনসিনাটি এয়ারপোর্ট থেকে একটানা উড়ে যখন আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে আইসল্যাণ্ড এয়ারপোর্টে ‘ওয়াও এয়ারলাইনসের WW 144’ ফ্লাইটি ল্যাণ্ড করলো তখন সূর্যের সোনা আলোয় রীতিমতো ঝলমল করছে বিশ্বের চতুর্থতম বড় দ্বীপ। সমস্ত রাত দুর্দান্ত জলরাশির ওপর দিয়ে অন্ধকারে উড়ে আসতে আসতে ফ্লাইট WW 144 হাওয়ার ঝাপটায় দুলে উঠেছে বারবার। ভয়ের শিহরণে তিরতিরিয়ে কেঁপে উঠেছে বুকের তল। তারপর হঠাৎই জানালায় চোখ রাখতে দেখেছি রাতের অন্ধকারে ক্ষীণতনু সুন্দরী চাঁদ, তার ধ্রুবতারা সাথীর সঙ্গে আমাদের সঙ্গী হয়ে ছুটছে। সাড়ে সাত ঘন্টা সময় ধরে বহুবার কম্পিত হয়েছে ফ্লাইট। বহুবার চোখে পড়েছে অনেক নিচে স্তরে স্তরে পুরু মেঘ, চেনা অচেনা নানা ফুলের পাঁপড়ি হয়ে ফুটেছে।

তারপর মুহূর্তে এক ঝটকায় সরে গেলো কালো রাতের পর্দা। আলোর ঝর্ণায় ভেসে গেলো চারদিক। বোঝা গেলো, আমাদের প্লেন এখন আমেরিকার সীমানা ছেড়ে ইউরোপের সীমানায়। আটলান্টিকের গাঢ় সবুজ জল তার সীমাহীন হৃৎপিণ্ড কাঁপিয়ে অস্তিত্ব ঘোষণা করছে। ককপিট থেকে একটু পরেই উচ্চারিত হলো –
ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই অবতরণ করছি আমরা। চলবে---

দীপিকা ঘোষ
ওহাইয়ো, আমেরিকা।