অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
যাপিত জীবনের ভাঁজ খুলেছে -মীম মিজান

কজন গল্পকার সমাজের মানুষ। তাই তাকে সমাজ নিয়ে ভাবতে হয়। কিংবা সমাজের নানান বিষয় তাকে ভাবতে বাধ্য করে। সমাজের একটি অনুষঙ্গ তিনি। তার সাথে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা, তার চোখের সামনে মর্মকে পীড়াদায়ক ঘটনা তাকে কলম চালাতে তাড়িত করে। আর সেই তাড়না থেকে সমাজের মানুষকে শব্দের সমাহারে গঠিত বাক্যের মিলনের গল্প লিখে জানিয়ে দেন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুক্কায়িত মানবিক হওয়ার আবেদন। সেরকমই কিছু মানবিক আবেদন ও যাপিত জীবনের কানাগলি থেকে তুলে আনা স্বাদ ও রসের গল্প লিখেছেন তরুণ কবি ও গল্পকার এনাম রাজু।

চলতি বছরের অমর একুশে বইমেলায় চমন প্রকাশ থেকে জীবন ঘনিষ্ঠ সাতটি গল্পের সমন্বয়ে 'ভাঁজ খোলার আনন্দ' শিরোনামে একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশ হয়। তরুণ এই শিল্প মানস জীবনকে নানা মাত্রিকতায় দেখেছেন। এঁকেছেন তাই গল্পে। গল্পগ্রন্থটির প্রথম গল্প 'শেষ উপহার'। হারানো প্রেমিকাকে আবার খুঁজে পাওয়া। তার সাথে আবার সখ্যতা গড়ে ওঠা। নানা নাটকীয়তা। পূর্বেকার স্মৃতি রোমন্থন। প্রেমিকা তার সুখের সংসারে অনুভব করছে করুণ অস্বস্তি। গল্পগ্রন্থটির বৃহদায়তনের গল্পটিতে কিছুটা পরাবাস্তববাদিতা পরিদৃষ্ট হয়। হারানো সেই প্রেমিকার জন্য প্রেমিক উপহার বক্সে দেয় তার ডান হাতের সেই আঙুলটি। যেটি একসময় প্রেমিকার খুনসুটির প্রধান মাধ্যম ছিল।

আমরা যদি শরৎচন্দ্রের 'অতিথির স্মৃতি' গল্পটি পড়ি আর হুমায়ূন আহমেদের 'নিয়তি' গল্পটিও পড়ি তাহলে নবীন এই গল্পকারের 'পাখিবিলাস' গল্পটিকে একই কাতারে ফেলতে পারি। প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ এই গল্পত্রয়ের থিম। শরৎ বাবুর মমত্ববোধ ছিল একটি কুকুরের প্রতি। যে কুকুরটিকে মালিনি পান্থশালার ভিতরে আসতে ও নানা খাতির আর্তি গ্রহণে বঞ্চিত করেছিল। হুমায়ূন আহমেদের গল্পেও একটিও খানদানী কুকুর প্রোটোগোনিস্ট। কিন্তু সেই কুকুরটি তিন ভাইবোনের প্রাণ রক্ষা করে আশিবিষের দংশনে বিষাক্রান্ত হয়ে শরীরের পচন ধরে ছটফট করছিল। তখন লেখকের বাবা বন্দুক দিয়ে গুলি করে মেরে কুকুরটিকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়। কিন্তু হুমায়ূনের বেশ মায়া কাজ করছিলো কুকুরটির পরিণতিতে। আর এনাম রাজুর বাসার ছাদে অনেক পাখি বসত। এই পাখিগুলিকে ছাদমুখী করতে গল্পকারের অনেক পরিশ্রম লেগেছিলো। অথচ বাসার কাজের বুয়ার নির্বুদ্ধিতায় পাখিগুলো আর ছাদে ফিরে না। কী মমত্ববোধ পাখির জন্য। এখানে লেখক মননশীল ব্যক্তিদের প্রকৃতি, পশু, পাখির প্রতি অসাধারণ ভালবাসা ফুটিয়ে তুলেছেন।

ইটপাথুরে শহর ঢাকা। সেই শহরের মানুষদের মনও বুঝি কাষ্ঠ। তারই এক নিদারুণ চিত্রের গল্প 'একটি মৃত্যু ও আমি'। ছিনতাই হওয়ার এ শহরে কেউ রাখে না কারো খোঁজ। প্রতারকরা উল্লাসে মাতে রোজ। নিষ্পেষিত ও নিগৃহীত মানুষেরা মরছে ধুকে। মেকি ভিক্ষুক সেজে দাপিয়ে বেড়ায় রাজধানীর বুকে। যার সামান্য চলার মতো সংকুলান নাই, তার মধ্যে নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষদের জন্য এক অগাধ মমত্ববোধ। অথচ যাদের করার ঢের সামর্থ্য তারাই 'রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি'র ন্যায় রক্ত চুষে ফুলে ফেঁপে বিশাল সম্পদের অধিকারী হচ্ছে। পিতামাতার অবর্ণনীয় কষ্টে লালিত সন্তানেরাও আজ জনক জননীকে ভাবে অবাঞ্ছিত। এরকমই এক রিক্সাওয়ালার শ্বাসকষ্ট রোগে ইনহিলার কেনার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঘটনাই এই গল্পটির কাহিনী।

গল্পগ্রন্থটির নামগল্প 'ভাঁজ খোলার আনন্দ' একটি স্বল্পায়তনের গল্প। এখানে গল্পকার ত্রিভুজ প্রেমের গল্প এঁকেছেন। সদ্য মাস্টার্স করা এক বিসিএস ক্যান্ডিডেটের সাথে তারই কোচিং বান্ধবীর একপ্রকার সখ্যতা গড়ে ওঠে। কিন্তু ছেলেটির আরেক মেয়েকে ভালো লেগে যায়। সে তার প্রেমে হাবুডুবু খায়। কিন্তু সে মেয়েটির সাথে ছাড়াছাড়ি হলে বান্ধবীর সাথে রমনা পার্কে দেখা হয়। আর সেখানেই উভয়ের প্রেমের ভাঁজ খুলে যায়। তারা সেই ভাঁজ খোলার আনন্দে কেঁদে ফেলে। আপাতত গল্পের নাম দেখলে মনে হবে যেন রোমান্সে ভরপুর হবে। কিন্তু সেরকম কোন পরিবেশের ঘনঘটাও আসেনি গল্পে। গল্পটি প্রেমের, বিরহের, আন্তরিকতার ও বন্ধুত্বের।

সমাজের কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা প্রতিনিধিকে আজকাল শুদ্ধতার কষ্টিপাথরে ঘষলে শূন্য শতাংশ ভালো ব্যক্তির খোঁজ মেলে।আর সেই সকল ব্যক্তির চরিত্র হচ্ছে, তাদের চরিত্র ফুলের মতই পবিত্র। ফুলে এসে অলি-ভ্রমরা বসে। কিন্তু এনারা অনেক ফুলে ফুলে ঘুরে মধু চুষে হন তৃপ্ত। গ্রামের কাজল নামে এক পিতৃহারা মেয়েকে মেম্বর বিরানির লোভ দেখিয়ে কোকা কোলার ভিতর ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে ধর্ষণ করে। আর তারপর থেকেই মেয়েটি ভ্রষ্টা। গাঁয়ের লোকজন অর্থের বিনিময়ে গতায়াত করতো কাজলের বাড়িতে। কিন্তু একদিন সেই মেম্বরের পুত্রই আসে বিরানি নিয়ে। তখন প্রথম দিনকার সর্বনাশের কথা মনে পড়তেই কাজল ঘর থেকে অস্ত্র নিয়ে বাইরে যেয়ে আঁধারে কুপিয়ে মেরে ফেলে বিরানির সেই প্রজন্মকে। ঘৃণ্য রাজনীতিক ও সমাজপতিদের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন গল্পকার। গল্পটির বুনন অসাধারণ। শব্দচয়ন ও বাক্যগঠন এখানে উল্লেখ করার মতো।

ষষ্ঠগল্প 'হাজেরা বানুর গর্ব' পাঠে মনে পড়ে মঈনুল আহসান সাবেরের অন্যতম উপন্যাস 'আমাদের খনজনপুর' এর নাম। যেখানে ঔপন্যাসিক সাবের গ্রামীণ আবহকে গিলে ফেলা মধ্যম গঞ্জগুলোর বিস্তৃতি ও ভূমিদস্যুদের ব্যাপারে লিখেছেন। এনাম রাজুর এই গল্পটিতেও গ্রামীণ অতীত স্মৃতি রোমন্থন হয়েছে। নিজ গাঁয়ে বেড়ে ওঠার জমিন, ক্ষেত, গাছপালা, পুকুর ইত্যাদি নস্টালজিয়ায় ভাসায়। কিন্তু সেগুলি আজ কালের অতলে চাপা পড়েছে। এরকমই স্মৃতি রোমন্থন আর নস্টালজিক গল্প এটি।

অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যময় এক চরিত্র সম্বলিত গল্পের নাম উপসংহার। এখানে সাজু উদ্ভট পোশাক আশাক পরে। আচরণ করে অদ্ভুত। তার পরিচিত এক ছাত্রনেতার ছায়ায় থেকে সে হয়ে উঠে পাতি নেতা। এরকমটিই 'উপসংহার' নামক সমাপ্তির গল্পটির। রম্যধাচের গল্প এটি।

ধার্মিক বিষয়াদি, নৈতিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার দৃঢ়চেতা আহ্বান, বাক্যের গঠন, শব্দের নান্দনিক ব্যবহার, পীড়িত মানুষদের প্রতি সদয় হওয়ার পরামর্শ, প্রতীকী, ইতিহাসের নানান অনুষঙ্গ, প্রকৃতি ও নারীর অতুলনীয় উপমা ইত্যাদি নবীন এই গল্পকারের গল্পগুলোকে করেছে অন্য গল্পকারের গল্প থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

ভাঁজ খোলার আনন্দ (গল্পগ্রন্থ)
এনাম রাজু
চমন প্রকাশ, ২০১৯ বইমেলা
মূল্যঃ ১৫০ টাকা

মীম মিজান
এম ফিল গবেষক
ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।