অটোয়া, মঙ্গলবার ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯
সংবাদ ও সাংবাদিকতা : বাংলাভাষায় সংবাদপত্র - ড.এস এ মুতাকাব্বির মাসুদ

১। সাংবাদিকতা একটি কঠিন এবং জটিল পেশা। জীবন বাস্তবতায় সারস্বত এই পেশায় রয়েছে একধরনের আভিজাত্য! এ পেশায় প্রজ্ঞা,প্রত্যয় ও মেধার সমন্বয়ের পাশাপাশি সততা ও নিষ্ঠার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আজকের অধুনা সাংবাদিকতা মানুষ আর মানবতার দীপ্তিময় নবীভূত চেতনার স্মারক হিসেবে যতটা উদ্ভাসিত ততটাই ইতিবাচক অনুচিন্তনের নিরীক্ষিত ধারায় একটি সমাজ পরিবর্তনে নিঃসন্দেহে দীপ্তোজ্জ্বল। সাংবাদিকতা বস্তুত মানুষ আর সমাজের, রাষ্ট্র আর বিবেকের এক পরীক্ষিত দর্পণ। এখানে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র কিংবা সমাজের বিদ্যমান অসংগতি ওঠে আসে নির্দ্বিধতায়। একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক বিশ্ব বিনির্মাণে সাংবাদিকতার অতুল ইস্পাত ভূমিকা বৈশ্বিক বাস্তবতায় আজ অপরিহার্য হয়ে ওঠেছে।

২। সংবাদ, সাংবাদিকতা,সাংবাদিক এই ত্রয়ী সমন্বয়ে সাংবাদিকতা পেশাটি অন্য আর সকল পেশা থেকে এক অন্য উচ্চতায় নিজেকে মেলে ধরেছে। এভাবেও পেশাটির আঙিক ভিন্নতার মাঝে অনবদ্যতায় একটি কার্যকরী বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। এটিকে আমরা এভাবেও দেখাতে পারি - A daily newspaper, এর সাথে আদর্শিক সংযুক্তি -A journalist's work, এবং An edition of a journal সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা বিষয়ক -'Journalistic of journalism'. সাংবাদিকতার সংজ্ঞায় এরই দৃশ্যমান চিত্রটিও এরূপ-
"Journalism is the production and distribution of reports on recent events. The word journalism applies to the occupation, as well as citizen journalists who gather and publish information. Journalistic media include print, television, radio, internet and in the past newsreels."
বস্তুত সাংবাদিকতা হচ্ছে বিভিন্ন ঘটনাবলীর বস্তু নিষ্ঠ চিত্রোল্লেখ-বিষয়-ধারণা ও সমাজ-রাষ্ট্র ও মানুষ সম্পর্কে নিখুঁত নিরপেক্ষ প্রতিবেদন তৈরি ও পরিবেশন করা।

৩। এ সংবাদ ও সাংবাদিকতার এক বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস পর্যবেক্ষণে ওঠে আসে। ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে স্ট্রাসবুর্গ থেকে ইয়োহান কার্লোস ''রিলেশন অলার ফুর্নেমেন উইন্ড গেডেন কভুর্ডিগেন হিস্টোরিয়েনেকে" শিরোনামে বিশ্বের প্রথম সংবাদপত্র তাঁর মেধাবী হাত থেকেই বেরিয়ে আসে। এটি ইতিহাসের প্রথম সংবাদপত্র।
অন্যদিকে প্রথম সফল ইংরেজি দৈনিক "ডেইলি ক্যরান্ট" যেটি প্রকাশিত হয় ১৭০২ থেকে ১৭৩৫ পর্যন্ত। তবে দিয়ারিও কারিওকা পঞ্চাশের দশকে আধুনিক সংবাদপত্রের নতুনধারার সংস্করণের সংযোজন ব্রাজিলে হয়েছে বলে মত ব্যক্ত করেন।তিনি এটাই বুঝাতে চেয়েছেন আধুনিক সাংবাদিকতার জন্ম ব্রাজিলে। এ ধারায় নিরীক্ষাধর্মী পর্যবেক্ষণে সংশ্লেষিত হয় ১৯২০ এর দশকে বৈশ্বিক প্রেক্ষিত আধুনিক সাংবাদিকতা মননশীল চেতনায় মানবিক বিশ্ব বিনির্মাণে সক্ষমতা অর্জন করে। American Writer Walter Lippmann(1889-1974) এবং American Philosopher John dewey(1859-1952) রাষ্ট্রযন্ত্রের বিদ্যমান সভ্যতা- মানবতা ও আধুনিক গণতন্ত্রকে বেগবান ও গতিশীল করে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার অপরিহার্যতা-দর্শন ও যুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। তাঁদের প্রাজ্ঞ দর্শন ও মেধাবী পর্যবেক্ষণ বৈশ্বিক অঙনে কিংবা সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রাসঙ্গিক সংবাদ ও সাংবাদিকতার প্রতর্ক্যে এর অপরিসীম প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে তাঁদের মূল্যবান দর্শন ও সমকালীন পর্যবেক্ষণ আজও আধুনিক সাংবাদিকতার বিষয়-প্রেক্ষিতে যুক্তি উপস্থাপনে যথাযথ গুরুত্বের সাথে উপস্থাপিত হয়।

৩. সাংবাদিকতার পেশায় পেশাদারীত্ব ও নৈতিক মানদণ্ড যেমন প্রয়োজন তেমনি সংবাদ পরিবেশন ও উপস্থাপনে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যসূত্র একটি অবশ্যই অপরিহার্য বিষয়। তার সাথে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পেশাটিকে অন্যমাত্রায় উদ্ভাসিত করে। বলাযায় -
"A journalist is a person who works in journalism to report the News. They may work one Their own or for a newspaper... A reporter is a type of journalist who research, writes, and reports information. Newspaper reporters write news articles and stories for newspapers."
আর এর অন্তর্গত বিষয় ও উপলব্ধির ভেতর সাংবাদিকতার নীতি ও নৈতিকতা নিজস্বতায় সমুজ্জ্বল।

৪। প্রেক্ষিত বাংলা ভাষায় সংবাদ ও সাংবাদিকতার পর্যালোচনায় আমাদের বাংলা ভাষায় সংবাদপত্রগুলোর সাথে ও আমাদের সম্যক পরিচয়ের প্রয়োজন বোধ করি। এ প্রজন্মের অনেকেই আমাদের বাংলাভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রের সাথে পরিচিত নন। মনে রাখা দরকার এ শিল্প মাধ্যমে আমরা বৈশ্বিক তুলনায় কখনোই পিছিয়ে ছিলাম না!
বাংলা ভাষায় প্রথম প্রকাশিত সংবাদ পত্রটি হচ্ছে 'দিগদর্শন' যা প্রকাশিত হয় গঙ্গাকিশোরের সম্পাদনায় জুন-১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে (প্রথম প্রকাশ ১২২৫ বঙ্গাব্দ)। এটি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা।এরই ধারাবাহিকতায় যেসকল পত্রিকাগুলো আমরা পাই তা নিম্নরূপ -
'বেঙ্গল গেজেটি'(বাঙ্গাল গেজেট) এটি প্রকাশিত হয় শ্রীরামপুর মিশনারি থেকে। এ পত্রিকাটি "সমাচার দর্পণ" এর প্রায় সমসাময়িক। 'বেঙ্গল গেজেট' ও একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে বহুল পরিচিত ছিলো।
"সমাচার দর্পণ" যেটি ছিলো বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র। এ পত্রিকাটি জন ক্লার্ক মার্শম্যান সম্পাদিত এবং তা শ্রীরামপুর মিশনারি থেকেই প্রকাশিত হয় ১১জুন ১৮৩১ এ। যার মূল্য ছিলো মাসিক মাত্র দেড় টাকা। এর ফার্সি সংস্করণ ১৮২৬ এ প্রকাশ পায়। "দিগদর্শন" পত্রিকাটিও প্রথম বাংলা সাময়িক পত্র। এ পত্রিকাটিও শ্রীরামপুর থেকে ১৮১৮ এর এপ্রিলে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের দক্ষ সম্পাদনায় সগৌরবে প্রকাশ পায়। এটিও একটি মাসিক পত্রিকা ছিলো।
"সম্বাদ কৌমুদী"(সংবাদ কৌমুদী) একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। যা রাজা রামমোহন রায় ও ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যৌথ সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত হয় ৪ ডিসেম্বর ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে। "তত্ত্ববোধিনী" এ পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সম্পাদনায় ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত। ১৮৪৩ এ কলকাতা থেকে পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশ পায়। 
"বঙ্গদর্শন" একটি মাসিক পত্রিকা। যার সম্পাদক ছিলেন উপন্যাসের জনক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পত্রিকাটির প্রথম প্রকাশ ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে। এ ছাড়াও বাংলা ভাষায় রচিত আরো বহু পত্রিকার নাম ও পরিচয় এখানে উপস্থাপন করা যেতে পারে।কিন্তু স্বল্প পরিসরে আমি কেবল সেগুলোর চুম্বকাংশ তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছি।

ড.এস এ মুতাকাব্বির মাসুদ । শ্রীমঙ্গল