অটোয়া, রবিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
আমরা কোন সময়ে বাস করছি – ফরিদ তালুকদার

মরা কোন সময়ে বাস করছি? একটি ছোট প্রশ্ন। কিন্ত এর উত্তর খুঁজতে গেলে একটি বিশাল পরিসরের মধ্যে হারিয়ে যেতে হবে। এর পূর্বে দু'একটা লেখায় চেষ্টা করেছিলাম। তবে আজকে আর নয়। আজকে সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া দু’টা ঘটনার উপরে একটুখানি আলোকপাত করাই মূলতঃ উদ্দেশ্য। এবং এ আলোকপাত অবশ্যই আমাদের ধর্মীয় তথা ঈশ্বর বোধের নিরিখে। শুরুতেই ছাত্র জীবনে পড়া একটি কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে শুরু করতে চাই। 

“ঈশ্বর নেই আমি আছি
আমি আছি জলে স্হলে অন্তরীক্ষে 
আছি সুখ দুঃখের গ্রহে রাগে ও রোদনে
ঈশ্বর নেই 
চৌধুরী বাড়ীর পিছনে কুয়োতলায় 
ঈশ্বর মারা গেছেন আমার জন্মের রাতে
নাগাসাকির সেই শেষ শিষুটিও 
অন্ধ হয়ে যাবার পূর্বে দেখেছিলো ঈশ্বরের মরণ
…………“-কবি তাহের অমৃত 

এখন, এই তোমরাই হিরোশিমা, নাগাসাকিতে গিয়ে পারমানবিক বোমা নিক্ষেপ করে পৃথিবীতে মানুষ সহ সব প্রাণী ধ্বংস যজ্ঞে মেতে উঠো। আবার তোমরাই চার্চে গিয়ে ঈশ্বরকে স্মরণ করো। হয়তো তোমাদের ঈশ্বর এর বৈধতাও দিয়ে দেন। তা না হলে তোমরা কিভাবে একটার পর একটা এমন হত্যা যজ্ঞে মেতে থাকতে পারো? এই তোমরাই এতিম, অসহায় শিশু নির্বিশেষে সবার হক মেরে খাও। অবৈধ ঘুষের টাকা পকেটে পুরো। যেভাবে তোমরা তোমদের ঈশ্বরকেও পকেটে পুরে ফেলো! আবার মসজিদ মন্দিরে গিয়ে ঠিকই সেই আল্লাহ এবং ঈশ্বরের সামনে সেজদা দাও পূজা করো। হয়তো তোমাদের ঈশ্বরও তা মেনে নেন। কারন তোমরা এটা করে আসছো দিনের পর দিন। শুধু তাই নয় তোমাদের মতের সাথে না মিললে বা একটুখানি বিরোধিতা করলে তোমরা নির্বিচারে মারো-ধরো খুন করো, জ্বালাও পোড়াও। এমনকি তোমাদের ঈশ্বরের ঘরে গিয়েও এটা করো। এবং এগুলোও তোমাদের ঈশ্বর মেনে নেন। কারন তোমরা মনে করো তোমরাই ঈশ্বর তথা ধর্মের সঠিক এবং একমাত্র প্রতিনিধি। এতে তোমাদের কিছুই যায় আসে না কারন পৃথিবীর ঈশ্বরেরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে তোমাদেরই পক্ষে থাকেন। 

আমি আবারও বলছি প্রথাগত ধর্ম তথা ঈশ্বর বিশ্বাসের ভিত্তি শুধুমাত্র ধারণা, কল্পনা, ব্যক্তিগত বোধ ও অনুধাবনের উপরে স্হাপিত। দুই ভাগ হাইড্রোজেন আর এক ভাগ অক্সিজেনের বিক্রিয়ার ফলে  যে পানির সৃষ্টি হয় ধর্মীয় বিশ্বাসের এমন কোন বৈজ্ঞানিক বা চাক্ষুষ প্রমান নেই। কিন্তু  বর্তমান পৃথিবীতে অধিকাংশ সময়েই এটি যেভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তাতে এটাকে স্বার্থান্ধ বিশ্বাস বললেও কোন অত্যুক্তি হবে না। এবং আরও একটা কথা আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, এই স্বার্থান্ধ বিশ্বাস দিয়ে হাজার বছরেও এই পৃথিবীতে সত্যিকারের মানবতার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় নি! কিন্তু  এই স্বার্থান্ধ বিশ্বাস এতোই পরাক্রমশালী যে যুক্তি-তর্ক এবং ব্যাক্তিগত বোধের ভিত্তিতে যদি কেউ এর বিপরীত স্রোতে দু'একটি কথা বলে তাহলে তৎক্ষনাৎ তোমরা তাকে শূলে চড়িয়ে দাও! না, কারোর বিশ্বাসেই আঘাত দিয়ে কথা বলাকে আমি সমর্থন করছি না। কিন্তু সেই একই সহনশীলতা তো তোমাদের মাঝেও থাকতে হবে। যে এই ধর্মীয়  বিশ্বাসের বিপক্ষে কথা বলছে, প্রয়োজন হলে যুক্তি দিয়ে তার প্রতিবাদ করো। কিন্তু ক্ষমতা এবং শক্তি দিয়ে তার কন্ঠকে রুদ্ধ করে দেয়াটা তোমাদের কোন ঈশ্বরের নির্দেশ? কোন ধর্মের নির্দেশ? যদি তাই ই হয় তাহলে ভাই তোমাদের ঐ ঈশ্বরকে আমিও মানতে পারছি না। তাতে তোমরা আমাকে নাস্তিক, আস্তিক, মানুষ, অমানুষ যাই ই বল না কেন। যদি ঐ লোকের যুক্তি বা মতামতে ভুল থাকে তাহলে তো এমনিতেই পরিত্যাজ্য হবে। গলাটিপে মারতে হবে কেন? 

কোন কারনে কোথাও যদি একসাথে ১০০ মানুষ কোন যন্ত্রণায় ভোগে তাতে হয়তো যন্ত্রণার সমষ্টিটাই বাড়ে। কিন্তু আলাদা ভাবে প্রতিটি মানুষের যন্ত্রণার মাত্রায় কোন হেরফের হয়না। এটা আমাদের বুঝতে হবে। কোন একা একজন মানুষ তার বোধের ভিত্তিতে হোক বা অন্যকোন কারনেই হোক ভিন্ন মাত্রায় ভিন্ন উপলব্ধিতে ভাবতেই পারে। এটা তার ভাবনার স্বাধীনতা।  সে তো কারোর হক মেরে খাচ্ছে না বা কারোর ক্ষতি করছে না, কোন রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ করছে না? এই ভাবনার জন্যে তাকে কেন শূলে চড়তে হবে বা জেলে যেতে হবে? সে একা বলে এমন শাস্তিতে তার যন্ত্রণার মাত্রা  তো কমছে না?

এখন আসা যাক সাম্প্রতিক ঘটনায়। তিনটা নাম, আরজ আলী মাতুব্বর এবং অতি সাম্প্রতিক শরীয়ত বয়াতি ও রীতা দেওয়ান। প্রথম জনের সাথে অন্য দুজনকে এক সারিতে বসানো ঠিক হচ্ছে না। তারপরও ঘটনার কিঞ্চিত সামঞ্জস্যতার কারনেই এদেরকে এক সাথে টেনে আনা। আরজ আলী মাতুব্বর সম্পর্কে আমরা একটু আধটু আগেই জানি। চমৎকার যুক্তির মাধ্যমে ধর্মীয় কুসংস্কার তথা ধর্মীয় দর্শনকে কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করে লেখা তার বই বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল। হয়তো তা এখনো আছে। মাইকের সামনে শরীয়ত বয়াতি হুজুর বা তথাকথিত ধর্মীয় মওলানাদের বিরুদ্ধে অমার্জিত ভাষায় যে ভাবে বিষোদগারণ করছিলেন তা কোন ভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু এটা এমনই একটা দেশ যেখানে কোন হুজুর নারীদেরকে তেঁতুলের সাথে তুলনা করলেও তার বিরুদ্ধে তেমন কিছুই হয় না বরং বাহবা পান। সুতরাং সেক্ষেত্রে শরীয়ত বয়াতি কে জেলে যেতে হবে কেন? আর কোরআনে সংগীত হারাম হবে কেন? কোরআন নিজেই তো কাব্যময়তায় পূর্ণ একখানি সংগীতের ভান্ডার।  এই যে এক নক্তা, দুই নক্তা এগুলোতো সংগীতের ই কোয়ার্টার নোট, হাফ নোটের সমতুল্য। এটাই তো কোরআনের একটি বিশেষ  বিশেষত্ব। এতটুকুও যারা না বুঝেন তারা কিসের আলেম? দর্শক শ্রোতাদের সামনে রীতা দেওয়ানের কথোপকথন যতটুকু শুনলাম তাতে মনে হয়েছে তার যুক্তিগুলো অনেকাংশেই আরজ আলী মাতুব্বরের অমার্জিত সংস্করণ। তার যুক্তির ধারণা গুলো সম্ভবত ওখান থেকেই নেয়া। এটা নিয়েই বা এতো হৈচৈ কেন? যারা এগুলো নিয়ে এতো বাড়াবাড়ি করেন তাদের কাছে প্রশ্ন আপনাদের বিশ্বাস এবং মূল্যবোধের ভিত এতো ঠুনকো কেন যে রীতা দেওয়ানের মতো একজন মহিলার কথায়ই তা নড়ে উঠবে? এগুলো গ্রহণ যোগ্য না হলে তা শ্রোতারাই পরিত্যাগ করবে। এমনিতেই বাতাসে হারিয়ে যাবে। তার কন্ঠকে জোড় করে থামিয়ে দিতে হবে কেন? ওয়াজ মাহফিলের সময় ও তো মওলানারা অনেক অবান্তর অবাস্তব কথা বলে,  ফতোয়া দেন। কই তা নিয়ে তো কোন হৈচৈ হয় না? শাফিনা খতমের সময় রাতভর আরবীতে কোরআন পড়া হয়। যে পড়ে সে শুধু তোতা পাখির মতো মুখস্থ পড়ে যায়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই জানেনা কি পড়ছে। আর যারা শুনছে তাদের তো বোঝার প্রশ্নই উঠে না কি শুনছে। মাঝখান থেকে রাতের ঘুম হারাম। পড়তে যদি হয় তবে বাংলায়ই পড়ুন যাতে করে সবাই বুঝতে পারে। কিন্তু আপনাদের এই বেহুদা ( যেহেতু কেউই বুঝতে পারে না কি বলা হচ্ছে)  চিল্লাচিল্লি নিয়ে তো কেউ কথা বলে না? জোর করে থামিয়ে দেয় না? 

এবারে দু'একটা উদাহরণ টেনে দেখা যাক ধর্মান্ধতা আমাদের বিবেককে কতটা খোঁয়াড়ে আবদ্ধ করে রাখছে। দু'দিন আগেই একটা ভিডিও ক্লিপে দেখলাম একজন মহিলাকে হিজাবে মুরে, গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে ফেলে মহা উল্লাসে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। নাহ্ পুরোটা দেখা মানবিক বোধ সম্পন্ন কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কয়েক সেকেন্ড দেখে একটি মন্তব্য লিখে ওটা থেকে বেড়িয়ে এসেছি। দৃশ্যটা আমার ক্ষুদ্র বোধকে এতোটাই আঘাত করেছে যে সেকারণেই আজকের এই নিবন্ধ।  কী কী কারনে ধর্মীয় মতে একজন মহিলা বা পুরুষকে এমন শাস্তি দেয়ার বিধান আছে তার পুরো তালিকা আমার জানা নেই। তবে তার একটি অবশ্যই অবৈধ যৌন সম্পর্কে লিপ্ততা। এবং এই লিপ্ততার বিষয় যদি কোন মহিলা বা পুরুষ নিজে স্বীকার করেন বা কমপক্ষে দুই বা অধিক ( সুরা আন নিসায় কমপক্ষে ৪ জন স্বাক্ষীর কথা বলা হয়েছে ) স্বাক্ষীর দ্বারা প্রমানিত হয়। এখন কথা হলো প্রাপ্ত বয়স্ক দুজন নর-নারীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে কোন যৌন সম্পর্ক ই অবৈধ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়। তবে এই সম্পর্ক যদি বিবাহ পূর্ব হয় বা বিবাহ পরবর্তী পরকীয়া প্রেম ঘটিত হয় তাহলে বেশীর ভাগ সমাজেই তা একটি অনাচার বলে গন্য হয় বা হওয়া উচিত। অপরাধ হিসেবে গন্য হলে এমন ঘটনাগুলোর অপরাধের মাত্রা হয়তো প্রতিটি ঘটনার সময়, প্রেক্ষিত, এবং আরও অনেক আনুষঙ্গিক বিষয় বিবেচনার পরে নির্ধারিত হওয়া উচিত। তবে প্রশ্ন হলো অবৈধ যৌন সম্পর্ক তো একা একা হয় না। দু'জন মানুষের মধ্যে ঘটিত বিষয়। সেক্ষেত্রে শাস্তি পাথর ছোঁড়া বা বেত্রাঘাত যা ই হোক, ঐতিহাসিক ভাবে আমরা এই শাস্তির প্রয়োগ টা কেবল নারীদের উপর ই আরোপিত হতে দেখি কেন? এজন্যে কখনো কোথাও কোন পুরুষের সমান মাত্রায় শাস্তি হয়েছে বলে তো শুনিনি? তাহলে প্রশ্ন জাগে এই একপেশে একতরফা শাস্তির বিধান ও কি আপনাদের ধর্ম বা ঈশ্বরের নির্দেশ? না এই পুরুষ শাসিত সমাজের ই সৃষ্টি। তা সে সৃষ্টি যেখান থেকেই হোক না কেন, কোন মানবিক বিবেক তো তাকে মেনে নিতে পারে না? কই এর পরিবর্তনের জন্যে তো আপনারা কোন কথা বলেন না? কোন লাফালাফি করেন না? কেবল শরীয়ত বয়াতি আর রিতা দেওয়ান কি বললো সেটাই আপনাদের সামনে একটি পাহাড় সমান সমস্যা হয়ে গেলো। কারন বৈষম্য আর মানবতাতে তো আর আপনাদের কিছু যায় আসে না? এ যে আপনাদের ধর্মের প্রতি ঠুনকো বিশ্বাসে আঘাত হেনে তাকে জলে ফেলে দিতে চায়!

প্রসংগত উল্লেখ করতে হয় যে, কোরআনে “সুরা আন নূর এর আায়াত ২” জেনা করার শাস্তি হিসেবে প্রকাশ্যে জনসমক্ষে একশত বেত্রাঘাতের উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এর পরবর্তী ব্যাখ্যায় গেলে দেখা যায়, মুসলিম পন্ডিতেরা মনে করেন, এই শাস্তি শুধুমাত্র যারা বিবাহ পূর্বে জেনা করার অপরাধে অভিযুক্ত হন তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বিবাহিত যারা এমন অপরাধে অভিযুক্ত হবেন,  হজরত মুহম্মদ ( সঃ ) এর সুন্নাহ মতে তাদেরকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলার নির্দেশ রয়েছে।  “সুরা আন নিসার আায়াত ১৫” তেও শাস্তির এই বিধানের উল্লেখ রয়েছে। যেখানে নারী যারা অতিরিক্ত মাত্রায় যৌনকাতর ( বা বহুগামী ),  আল্লাহর কাছ থেকে নির্দিষ্ট কোন পন্থায় মৃত্যুর নির্দেশ না আসা পর্যন্ত তাদেরকে আমৃত্যু গৃহবন্দী করে রাখতে বলা হয়েছে । এবং পরবর্তী ব্যাখ্যায় গেলে দেখা যায় এখানেও পাথর ছুঁড়ে মৃত্যু দন্ডের বিধান নির্দিষ্ট করা হয়েছে। পুরুষ যারা একই ধরনের অপরাধে অপরাধী এখানে তাদের ক্ষেত্রেও মৃত্যু দন্ডের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোন পন্থার কথা উল্লেখ করা হয়নি।

ইতিহাস মতে ১৪০০ বছর আগে আরবের মাটিতে যে সমাজ ব্যবস্হা ছিলো সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নারীদের অধিকার এবং মর্যাদা রক্ষার জন্যে হজরত মুহম্মদ ( সঃ )  যে সব উপদেশ দিয়েছেন,  বিধানের উল্লেখ করেছেন তা এক কথায় বৈপ্লবিক।  কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর সব বিবেকের কাছে কি তার সবই যথেষ্ট বলে মনে হয়? উদাহরণ হিসেবে “সুরা আন নাবা” এর আয়াত নম্বর ৩২-৩৪ এ যা বলা হয়েছে তা আমরা আর একবার পড়ে দেখি। এখানে বলা হয়েছে পুণ্য আত্মা যারা স্বর্গবাসী হবেন তাদের জন্যে “দেয়াল সুরক্ষিত উদ্যান এবং আঙ্গুর সমূহ ( আায়াত ৩২ ) , সমবয়স্কা পূর্ণ যৌবনা সতী সুন্দরী তরুণী ( আয়াত ৩৩ ), এবং পরিপূর্ণ পানপাত্র ( আয়াত ৩৪ ) থাকবে”। এখান থেকে এটা পরিস্কার যে স্বর্গে এমন একটি ব্যবস্হার কথা বিশেষ করে পুরুষদের জন্যে  ই বলা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যে নারীরা স্বর্গে যাবেন তাহলে তাদের জন্যে কি ব্যবস্হা থাকবে? নাহ্, যতটুকু জানি ( কেউ যদি জেনে থাকেন জানালে অগ্রিম কৃতজ্ঞতা ) এমন সুনির্দিষ্ট ভাবে  কোরআন শরীফের কোথাও তাদের জন্যে কিছু বলা হয় নি। তবে অন্য আর একটি সুরায় বলা হয়েছে স্বর্গবাসীনী নারীদের জন্যে ও সুব্যবস্হা থাকবে। অবশ্যই সুসংবাদ।  ১৪০০ বছর আগে তাদের অধিকার রক্ষায় এর চেয়ে আর বেশী কি আশা করতে পারি?   

স্বর্গে রাখা এমন ব্যবস্হার প্রতি কে কতটুকু বিশ্বাস করবেন কি করবেন না তা প্রতিটা মানুষের সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যাপার। এখানে জবরদস্তির কোন কিছু নেই এবং থাকাও উচিত নয়। তবে সকলের প্রতি আমার ছোট্ট আহ্বানটা হলো, আসুন মুহূর্তের জন্যে পূর্বাপর সব ভুলে নিজেদের বিবেকটাকে একটু খুলে দিয়ে তার কাছে একটা প্রশ্ন করি। প্রশ্নটা হলো এই একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে এখানেও কি নারী-পুরুষের মাঝে একটা বৈষম্য রেখা রয়ে গেছে না? জানিনা আপনাদের বিবেক কি উত্তর দিবে তবে আমার বিবেক বলে হ্যাঁ রয়েছে। এবং শুধু তাই নয় আমি মনে করি এটা থাকা উচিত নয়। তবে এই উচিত-অনুচিত নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু এখানেও কোন জবরদস্তি থাকা উচিত নয়। এই বৈষম্য মেনে নেয়া না নেয়া প্রতিটা মানুষের ব্যাক্তিগত ব্যাপার। ১৪০০ বছর আগে জন্মালে আমিও হয়তোবা মেনে নিতাম। কিন্তু এটা যেখানেই লেখা থাকুক এই মুহূর্তে আমার বোধ এটাকে মেনে নিচ্ছে না। আরও পরিস্কার করে বুঝাতে হলে বলি, আমি যদি কেল্টস্ ( খৃষ্টপূর্ব ৮০০-১ ) বা আযটেক ( ৫০০ থেকে ১৫০০ খৃষ্টাব্দ ) সভ্যতায় জন্মাতাম তবে হয়তো নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করতাম যে দেবতাকে খুশী করতে হলে নরবলি দিতে হবে। কিন্তু আজকের দিনে দু'একটা খুবই পশ্চাদপদ গোত্রের অধিবাসী ছাড়া কেউ ই এটা বিশ্বাস করে না। এটাই হলো সময় এবং সময়ের সাথে আমাদের বিবেক এবং মূল্যবোধকে মুক্ত করা, উন্নত করা। আর এখানেই রয়েছে অন্য প্রাণীদের থেকে আমাদের একটি বড় পার্থক্য।  

জানি এতো কিছু বলার পরেও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে কোরআন বা অন্য ধর্ম গ্রন্হে বর্ণিত এমন কিছু অসামঞ্জস্যকে আপনারা স্বীকার করে নিতে পারবেন না। এমনকি যে নারীদের অধিকার সম্পর্কিত উদাহরণটি দিয়ে নিবন্ধটির শেষের রেখায় আসছি সে নারীরাও এ যুক্তি মেনে নিবেন না জানি। শুধু তাই নয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে হালে যারা নারী অধিকার নিয়ে মাঠে সোচ্চার তাদেরও বেশীর ভাগই হয়তো এ মতামতের বিরোধিতা করবেন। এটাও বেশ ধারণা করতে পারি। কারণ?  প্রথমেই হয়তো বলতে হয় ঐ যে স্বর্গের লোভ আর নরকের ভয়? দৃশ্য-অদৃশ্য, ইহজাগতিক-পরজাগতিক সম্ভব-অসম্ভের সীমানার মাঝে যা কিছু ফায়দা লাভ করার সুযোগ আছে তার একটুও যে আপনারা ( আমি নিজেও হয়তো ) হারাতে চান না। এই দৃশ্য-অদৃশ্য লোভ আর ভয়ই যে আপনাদের বিবেককে খোঁয়াড়ে আড়ষ্ট করে রাখে। আপনারা বুঝেও বুঝেন না বা বুঝতেই চান না। আর এর পিছনেও কাজ করছে আর এক ফায়দাবাজ চক্র। আর স্বর্গের এই লোভ এবং নরকের ভয়ের কারনে প্রকারন্তরে অনেক সময়ই যে আপনারা আমাদের বর্তমান এই পৃথিবী এই জীবনকে নরক বানিয়ে ফেলছেন তা আপনারা বুঝতে পারেন কিনা সেও এক বিশাল প্রশ্ন?

সুতরাং নিজের বোধ এবং বিবেককে মুক্ত করার চেষ্টা না করে অন্যের বিবেকের প্রশ্নকে নিয়ে টানা হেঁচড়া করাটা কতোটা সমীচীন সেটা সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরেকবার ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।। 

ফরিদ তালুকদার । টরন্টো, কানাডা