অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
ফড়িং-ধরা বিকেল (তৃতীয় অংশ) – নূরুন্‌ নাহার

 

 

ফড়িং-ধরা বিকেল প্রথম অংশ পড়তে ক্লিক করুন

ফড়িং-ধরা বিকেল দ্বিতীয় অংশ পড়তে ক্লিক করুন

তৃতীয় অংশ

নিরাপত্তার ছাউনি
[ উৎসর্গঃ লেখক ও সাংস্কৃতিক-ব্যক্তিত্ব শওকত ওসমান, শাহরিয়ার কবির ও মমতাজউদদীন আহমদ-কে ]

এখনো বেনাপোলের সেই স্মৃতির মালাই গাঁথছি।
মনে পড়ে আমরা দু’বোন, বাবা-মা, আমাদের একটা ছোটো ভাই সবেমাত্র হয়েছে, আর বাড়তি একজন মানুষ ছিলেন আমাদের পরিবারে, তিনি হলেন আমার বাবার ছোটো বোন। তিনি ছিলেন আমাদের সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে-কুড়িয়ে।
বাবা ছিলেন সবার বড়ো, তাই বড়োত্বের দায়ভার ও ব্যয়ভারও ছিল তাঁরই কাঁধে। সংসারের সবরকম অস্থিরতার মাঝে তাঁকে ধৈর্যের মতো স্থির থাকতে দেখেছি। বাবার সেই মা-মরা অনাদরে বেড়ে ওঠা ছোটো বোনের দায়ভারও তাই তাঁর কাঁধে কর্তব্যের মতো করে তুলে নিয়েছিলেন। মা-হারা বোনটাকে বাবার ছায়া দিয়ে মায়ের মতো করে বড়ো করেছিলেন।
বাবার সেই বোনের আঁচলের ছায়ায় ছায়ায় আমরা দু’বোন সারাক্ষণ ঘুরঘুর করতাম। সংসারের সবকিছুই তাকে গুরুদায়িত্বের মতো করে ভাবতে দেখেছি। কখনো ক্লান্তির মতো কালো রং দেখিনি তার চোখে-মুখে। সব কাজের ফাঁকে আমাদের নাওয়ানো-খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, চুল বেঁধে দেয়া এসবও তার দায়িত্বের ছকে বাঁধা ছিল। আমরা তাকে মনের মতো করে পছন্দ করতাম। আদর্শ ঘেঁষা জীবন ছিল তার।
মা ছিলেন অনেকখানি স্বাধীনচেতা ও একটু বদরাগী। তাই মায়ের চোখ এড়িয়ে, পালিয়ে-পালিয়ে বাবার সেই ছোটো বোনের কাছে মায়ের মতো করে যত তাল-বাহানা আছে করতাম। বাবার সেই ছোটো বোন আমাদেরকে নিরাপত্তার মতো করে আশ্রয় দিতেন। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে খুব সহজেই তাই সেই নিরাপত্তার আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যেতাম। বাবার সেই ছোটো বোন যেন ছিলেন আমাদের সবরকম নিরাপত্তার ছাউনি। ঝড়ের পূর্বাভাস পেলেই তাই নিরাপত্তা খুঁজতে ঢুকে যেতাম বাবার সেই ছোটো বোনের একেবারে বুকের ভেতর।

প্রথম শূন্যতা
[ উৎসর্গঃ স্বপ্ন-সঞ্চারী শাহ্‌জাহান মিয়া, হাসিনা জাহান ও মন্নুজান নেছা-কে ]

একদিন বাবার সেই ছোটো বোনের বিয়ের সানাই বাজল। বিয়ের সানাই বাজিয়ে বরের হাত ধরে তিনি আমাদেরকে খুব কাঁদিয়ে, সেই নিরাপত্তার জায়গাটা একেবারে শূন্য করে, আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলেন। বেড়ে-ওঠা জীবনে সেই প্রথম শূন্যতার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমাদের। সেদিনই প্রথম বুঝেছিলাম শূন্যতা কাকে বলে। সেদিনের সেই সত্যের মতো স্বচ্ছ-শূন্যতাকে মেনে নিতে খুব কষ্ট হয়েছিল। এমন কঠিন শূন্যতার সঙ্গে কিছুতেই যেন সন্ধি করতে পারছিলাম না। কারো জন্য যে কারো মন অমন করে কাঁদে সেই প্রথম বুঝেছিলাম। খুব কেঁদেছিলাম সেদিন, অনেকদিন। জানিনে বাবার সেই ছোটো বোনের আমাদের ছেড়ে যেতে মন অমন করেছিল কি না। হয়তো করেছিল, হয়তো বা করেনি। কিন্তু আমার মন আজও সেই শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
মনে পড়ছে গড়াই নদীর বুকের ওপর দিয়ে নৌকোয় পাল তুলে বাবার সেই ছোটো বোন বরের সঙ্গে বসে হাত নেড়ে নেড়ে বিদায় জানিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। আমি সেদিন গড়াইয়ের পাড়ে বসে সন্ধ্যে অবধি কেঁদেছিলাম। সন্ধ্যেয় যখন বাড়ি ফিরেছি, তখন আমার মনের বিপদ-সংকেত ছিল শত ডিগ্রি।
খুব রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলাম বাবার সেই ছোটো বোনের বরের ওপর। তাই অবুঝ মনের সমস্ত আকুতি দিয়ে সেদিনেই বলে প্রার্থনা করেছিলাম যে, আমাদের কাঁদিয়ে বাবার ছোটো বোন যে-বরের হাত ধরে চলে গেলেন, সেই বর যেনো মরে যায়।
তাহলে হয়তো বাবার সেই ছোটো বোন, উপায়ান্ত না পেয়ে, ফিরে আসবেন আবার আমাদের নিরাপত্তার আশ্রয়-কেন্দ্র হয়ে। সেদিনের সেই প্রার্থনার মাঝে কোনো খাদ ছিল না। খুব অবুঝের মতো ছিল সেদিনের সেই প্রার্থনা। শূন্যতার ভার এত বেশি ছিল যে, অমন প্রার্থনা করতে বাধ্য হয়েছিলাম। সেদিনের সেই প্রার্থনাও ছিল বুঝি জীবনের প্রথম প্রার্থনা। এতখানি জীবনে অমন প্রার্থনা আর কোনোদিনও করা হয়নি।
আজ অবশ্য মনে হলে হাসি পায়।
আড়ালে একটু মুচকি হাসি, আর
মনে-মনেই বলি, কোথায় হারিয়ে গেল সেই অবুঝ-বেলার দিনগুলি হায়!

বেনাপোলের একটা নিদারুণ মন-ছোঁয়া ঘটনা
[ উৎসর্গঃ কথা ও সুরের জাদুকর দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, শচীনদেব বর্মণ ও রবিশঙ্কর-কে ]

তখন স্মরণশক্তি, স্মৃতিশক্তি কেবল কানাকানি করছে। 
বয়সটা ছিল শিশু। সেই শিশু বয়সেই মন ছুঁয়েছিল সেই ঘটনা। কাস্টম-কলোনিতে একজন ডি.এস. সাহেব ছিলেন। সেই ডি.এস. সাহেব পরকীয়া করেছিলেন একজন চল্লিশ বছর বয়সী মহিলা ইন্সপেক্টরের সাথে। তখন পরকীয়া কী বুঝিনি। এই পরকীয়া কাহিনি কলোনির সবার মুখে-মুখে ছিল।
পরকীয়া কাহিনির নায়িকারনাম ছিল জহুরা। আমরা তাকে জহুরা খালাম্মা বলে ডাকতাম।
একদিন ডি.এস. সাহেব তার আগের বউকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে জহুরা খালাম্মাকে বিয়ে করে ফেলেন। 
সেদিন এমন শ্রাবণ দিন ছিল। সন্ধে হয়ে গেছে। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। আগের বউটি ফিরে এলো। কিন্তু দরজা বন্ধ। কিছুতেই ডি.এস. সাহেব ঢুকতে দিচ্ছেন না ভিতরে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন সেই আগের বউ। কলোনির আমরা অবুঝ শিশুরা, তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার কান্না দেখে আমরাও অবুঝের মতো কেঁদেছিলাম সেদিন। সেদিন জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন পাখা মেলেনি মনে।
আজ বুঝতে পারছি, ডি.এস. সাহেবের আগের বউয়ের কান্নায় কী কষ্টটাই না ছিল। মনে পড়ছে আজও। কিন্তু অন্যভাবে।
সেদিন আগের বউ বার বার প্রশ্ন করছিল এই বলে যে, ‘ডি.এস. সাহেব আমি চলে যাবো, কিন্তু কী দোষে আমাকে এমন শাস্তি দিলেন, আমি জানতে চাই!’ ডি.এস. সাহেব নিরুত্তর ছিলেন। যারা জ্ঞানপাপী তাদের নিরুত্তর থাকাটা বুঝি একটা ফ্যাশন। একথা সেদিন বুঝিনি, আজ খুব করে বুঝতে পারছি! অবশেষে বৃষ্টির মতো করে, অঝোরে কেঁদে-কেঁদে কাক-ডাকা ভোরে, ডি.এস. সাহেবের সঙ্গে এতদিনের বোঝা-পড়ার সম্পর্ককে বলি দিয়ে, আগের বউটি তার উত্তরহীন প্রশ্ন নিয়ে ফিরে গেলেন একেবারে অনিশ্চিতের পথে।
কেউ কিছুই করতে পারলো না, তার বড়ো বড়ো ছেলেমেয়েরাও না। সেদিনের সেই বিচ্ছেদের কষ্ট আজও বুকে বাজে! পুরো কলোনির মানুষ সেদিন ডি.এস. সাহেবকে বোঝাতে পারেনি। বিচ্ছেদের কষ্টে সেদিন কলোনির বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল। বেনাপোল কাস্টম কলোনির সবকিছুই সেদিন ডি.এস. সাহেবের অমন ব্যবহারে হতবাক হয়েছিল। কলোনির আকাশ-বাতাস, গাছের পাতারা, পথের ধুলোরা, পথচারীরা সবাই দুঃখে দু’ফোঁটা চোখের জল মুছেছিল।
জানিনে আজ কে কোথায়?
কিন্তু সেই স্বনামধন্য ডি.এস. সাহেব আজও আছেন আমার অভিযোগের খাতায়!

তালগাছ
[ উৎসর্গঃ সাহিত্য জগতের তিন ধ্রুবতারা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও সুকান্ত ভট্টাচার্য-কে ]
বেনাপোল কলোনির সেই ডি.এস. সাহেবের বাসার কাছে একটা তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। সেই গাছের নীচে বসে আমরা দু’বোন পড়াশুনো করতাম। 
পড়াশুনোর থেকে মনোযোগ থাকতো তালগাছের দিকেই বেশি। কখন যেন একটা তাল পড়ে। তাল কুড়োনোর লোভে আমরা প্রতিদিন ঐ তালগাছটার নীচে গিয়ে বই নিয়ে বসতাম।
তাক করে তাকিয়ে থাকতাম তালগাছের দিকে। তাল কুড়োনোর সেই লোভ কী যে আকর্ষণীয় ছিল।
আজও সেই তাল-কুড়োনোর লোভে আক্রান্ত হই তালগাছ দেখলেই। মন ছুটে যায় আবার অনেক বছর আগে।
স্মৃতিরা সারি বেঁধে আবার বুকের ভেতর জেগে ওঠে। … … …. চলবে

ঢাকা, বাংলাদেশ 

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন

ছড়া ও কবিতাঃ বর্ষা যখন – নূরুন্‌ নাহার