অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
রৌদ্র-তুষার স্নান - খুরশীদ শাম্মী

নকনে শীত। ভারী তুষারপাত। সপ্তাহান্তের সাথে যোগ হয়েছে ফ্যামিলি ডে ছুটি। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী দুইদিন একটানা চলবে এই তুষারপাত। খুব প্রয়োজন ব্যতীত ঘরের বাইরে না যাওয়ার অনুরোধ। শৈবাল বই নিয়ে বসেছে জানালার পাশে ইজি চেয়ারে। একপৃষ্ঠা, দুইপৃষ্ঠা করে সে পড়ে কয়েক পৃষ্ঠা। অজানা কারণে তার দৃষ্টি চলে যায়, বাড়ির আঙিনায়। তাদের বাড়ির পেছনটা খোলা; দীর্ঘ দৃষ্টিতে দেখা যায় শহরের অন্যপ্রান্ত। সাদা তুষার জমে আঙিনা পরিণত হয়েছে তুষার-ভূমিতে। সেই তুষার-ভূমি দেখতে দেখতে সে তলিয়ে যায় স্মৃতির সমুদ্রে। 

পদ্ম, সুন্দরের রানী। শ্যাম বর্ণের মিহি দেহ, দীর্ঘ কালো রেশমি কেশ, কাজল আঁকা টানটান আঁখি, হাতে-কাটা সরু নাক, এককথায় অপরূপা। যার হাসিতে বিজলির মতো চমকে উঠে শৈবালের হৃদয়। আলতা পায়ে চলতে গেলে রুনুঝুনু বাজে তার নূপুর। শাড়ি তার প্রিয় পোশাক। ঘর জুড়ে সে শাড়ীর আঁচল মেলে চলে সর্বক্ষণ। প্রয়োজন নেই তবুও বাঁধা থাকে আঁচলে এক থোকা নকল চাবি। তাকে দেখলে মনে হয় আস্ত একখানা কবিতা। শৈবাল হৃদয় ভরে উপভোগ করে তার সৌন্দর্যের খুঁটিনাটি। সে তার দিকে তাকিয়ে পার করে দিতে পারে যৌবন, বার্ধক্য। এমন কি পর পর কয়েক জনম।  

তার সৌন্দর্যের সমান্তরাল বহে চলে তার মেধা, চলন ও বলন। কখনো সে বেহালার করুণ সুরে স্থির বসে থাকে, কখনো বাঁশির সুরে উতালা হয়ে ছোটে। কখনো আবার পশ্চিমা মিউজিকের সাথে চোখ বন্ধ করে অনুভবে নাচে। তার হেয়ালিপনা খই, মুড়ির মতোই ক্রমান্বয়ে টাপুর-টুপুর ফোটে। রাত দুপুরে জানালা খুলে মাথা বের করে মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নেয়া। ভোর রাতে লেকের পারে চুপ করে প্রত্যুষের আলো-ঝলকের অপেক্ষায় থাকা। হীম বাতাসে আঁচল উড়িয়ে দিয়ে আকাশ দেখা তার খুব পরিচিত প্রহেলিকা।     

তার নতুন হেঁয়ালি, তুষার স্নান। তুষার স্নান বললে ভুল হবে। হবে রৌদ্র-তুষার স্নান। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে তুষারে পা ডুবিয়ে দিন পার করা। সেজন্য, তার সে কি আয়োজন! গ্যারেজ এলোমেলো করে শৈবালের মাছ ধরার ছিপ খুঁজে অস্থির। তুষারপাত শুরু হওয়ার পূর্বেই আঙিনার ঠিক কেন্দ্র বরাবর একখানা চেয়ার, হ্যাঁ, কাঁঠাল কাঠের পলিস করা চেয়ার বসেছে একা। চেয়ারটা মোটা পলিথিন টোপর পরে সেজেছে নতুন জামাই। সূতা-টিকি’র একপ্রান্তে টোপর, অন্য প্রান্ত বাঁধা হয়েছে ছিপের চাকায়। এভাবে টোপর মাথায় বর সেজে থাকবে চেয়ার, পরবে তুষার যতক্ষণ। তুষার শেষে রোদের লুকোচুরি খেলা শুরু হলেই সে টেনে তুলে দেবে আচ্ছাদন। তুষার ভূমিতে বসে থাকবে তার জন্য অপেক্ষারত আসনখানা। পরিকল্পনা তার হয়েছে কার্যকর। 

ফোনের পর ফোন। বর্ণনার পর বর্ণনা; সে কী নৈসর্গিক দৃশ্য! না দেখলেই যাবে হারিয়ে। শৈবাল এলেই পদ্ম তাকে নিয়ে বসবে রৌদ্র-তুষার স্নানে। অপেক্ষা তার চলমান চাকার মতো। গন্তব্য বাড়ির সামনের জানালা থেকে পেছনের জানালাই শুধু। ঘড়ির কাঁটা হরতাল করেছে আজ। হরতাল উপেক্ষা করেও আসবে শৈবাল, যেকোনো মুহুর্তে। 

শৈবাল বাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করতেই ছুটে যায় পদ্ম। দরোজা খুলে সে। অপেক্ষার শেষ পলক। শৈবাল তুষার সাতরিয়ে প্রবেশ করে ঘরে। শৈবালের হাত ধরে নিয়ে চলে পদ্ম। পেছনের দরোজাই তার লক্ষ্য। বাইরের পানে তাকিয়ে পদ্ম বলে, -দেখো, প্রকৃতি কত সুন্দর! একদম ছবির মতো। একটি মাত্র চেয়ার, কিন্তু অপেক্ষা তার দু’জনের জন্য। -সত্যিই তো খুব চমৎকার। তোমার ভাবনার রংতুলীতে আঁকা একটি অদ্ভুত আবিষ্কার। একদম তোমার মতো একটি পূর্ণ শিল্প। ছবি তুলে রাখতে হয়।
      শৈবাল হাতে ক্যামেরা নেয়। ছবি তোলে। বিভিন্ন কোণ থেকে পদ্মকে সহ ছবি তোলে। পদ্মার শাড়ির লম্বা আঁচল মেঝেতে সাতরিয়ে বেড়ায় তখনও। শৈবাল কুড়িয়ে তোলে পদ্ম’র আঁচল। শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
-পদ্ম বুঝি আজ শাড়ি পরেই তুষারে ফুটবে?
-শৈবালের আলিঙ্গনে পদ্ম প্রস্ফূটিত হতে পারে জলে, স্থলে, তুষারে, সর্বস্থানে।
-এই হাড়কাঁপা শীতে শাড়ি পরে তুষার স্নান করলে কাল হাসপাতালে যেতে হবে যে। 
-উহ্, কতবার বলেছি। তুষার স্নান নয়। রৌদ্র-তুষার স্নান। 
-আচ্ছা বাবা, ভুল হয়েছে। রৌদ্র- তুষার স্নান। শাড়ি পড়ে তুমি ওখানে যাবে কী করে? 
-কেন? তুমি কোলে তুলে নিয়ে যাবে।
-এবার তবে বুঝেছি তোমার অপেক্ষার কারণ। 
-এই সামান্য বিষয়টি বুঝতে এতক্ষণ লাগলো বলে কষ্ট পেয়েছি বেশ। 
-আমাকে না বললে, কীভাবে বুঝবো তোমার মনের কথা?  
-আমি কিন্তু অভিমান করলাম। প্রেম করলে, কিন্তু মনের কথা বুঝলে না। তোমাকে ছাড়া আমি রৌদ্র-স্নান করবো, সেটা ভাবলে কী করে? 
 আমিও কিন্তু অভিমান ভাঙ্গালাম। -বলেই শৈবাল নীলিমাকে দু’হাতে আগলিয়ে তুলে নেয় নিজের কোলে। পরক্ষণেই আবার বলে,- সময় কিন্তু মাত্র দু’মিনিট। আমি তোমাকে ওখানে এভাবে দীর্ঘক্ষণ থাকতে দিতে  পারবো না একদম। আমার ভালোবাসারও দায় আছে, তোমাকে সুস্থ রাখা।

শিস বাজিয়ে বাস্প ছড়িয়ে পড়ে রান্না ঘরে। শৈবাল ভুলে গিয়েছিল যে সে কেটলিতে পানি সিদ্ধ দিয়েছিল। শৈবাল বাস্তবে ফিরে আসে।
 হারিয়ে যায় পদ্ম তার নিজের স্থায়ী ঠিকানায়। ঐ দূর আকাশের কোনো এক কিনারায়। দু’বছর আগে এক গাড়ি দূর্ঘটনায় সে পছন্দ করে নিয়েছিল একদিকে ধাবমান একটি পথ। যে পথ তাকে পৌঁছে দিয়েছে ঐ দূর আকাশের ঠিকানায়।    

খুরশীদ শাম্মী
টরোন্ট, কানাডা।

kjshammi@yahoo.com
১৪, ফেব্রুয়ারী ২০১৮