অটোয়া, মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯
একুশের ভোরে ফুলেল প্রেম

মাঘ মাস কনকনে শীতে লেপের ভিতর শামুকের মত স্থির হয়ে হাত পা মোড়ে  ইমন শুয়ে আছে চোখ বন্ধ করে – গুনছে প্রতীক্ষার বিনিদ্র প্রহরI মন সে তো পাগলাঘোড়া, কল্পনার আকাশে প্রতি সেকেন্ডে পাল্লা দিয়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছেI এদিকে রাত নিঝুম, আকাশের চাঁদ নিভে যে সুর্য্যের লাল আভা পূর্বাকাশে উঠেনি তা প্রায় নিশ্চিতI প্রকৃতির নিস্তব্দতায় দূর থেকে ভেসে আসছে কুকুরের কান্না আর মাঝে মাঝে হুতুম পেঁচার ডাকওI মা বলত রাতে কুকুরের কান্না আর হুতুম পেঁচার ডাক নাকি বিপদের অশনি সংকেত I গভীর রাতে যদি হুতুম পেঁচা ডাকে তাতে নাকি অশুভ ক্ষণের বার্তা বহন করেI এই জন্য ইমনের মা চাচীরা গভীর রাতে চুলায় আগুন জ্বলিয়ে কাঁচি পোড়া দিতI  যাতে নিজের সন্তানের অথবা আপন জনের কোনো অনিষ্ট না হয়I
এই প্রাচীন ধ্যান ধারণা ইমন বিশ্বাস না করলেও এটা অবশ্য মানত যে, জিনিস  যত সহজ লভ্য, তাকে পাওয়ার পিছনে আনন্দের মাত্রাটাও তত ক্ষীনI পাশে দাঁড়ানো নির্বোধ গরুকে কোনদিন শিকার করার করো সখ হয়েছে কিনা জানে না, তবে অনেক শিকারী হরিণের পিছনে দৌড়িয়ে গহীন বনে পথ হারিয়েছে যাওয়ার ঘটনা অনেক শুনেছেI ইমনের মনেও জাত শিকারী হবার স্বপ্ন আগর ডাগর চোখে উঁকি মারছে বার বার, এই শিকারী যে মায়াবী হরিণের ভালবাসায় আত্মহুতি দিতে চাচ্ছে তার নাম লাবনী,  নানা জল্পনা কল্পনা করতে গিয়ে আজ চোখের ঘুম হয়েছে লাবনীর সতীনI
বিনিদ্র রাতের স্মৃতি গুণ টানা নৌকার মতI গুণ যত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় মাল্লার (মাঝির সাহায্যকারী) মাথা ততই নিচু হয়ে আসে কষ্টে , শক্তির অপ্রতুলতায় - পিঠ বাঁকা ধনুকের আকৃতি ধারণ করেI নৌকায় ফিরে এসে মাল্লাদের  স্মৃতি রোমন্থন মানেই শুধু গায়ে ঘামের দুর্গন্ধ আর হাড় ভাঙ্গা খাটুনির মধ্য দিয়ে খানা খন্দ খালি পায়ে পার হওয়ার অথবা পদ্মা পাড়ের মানুষের প্রকৃতিতে প্রাকৃতিক  কাজের উপর পা মাড়িয়ে যাওয়া মানেই বমি আসা ঘটনাI 
তাই আজকের কাজটিও তেমনি হবে কষ্টের ও দুঃসাহসিক কাজ যা মনে থাকবে সারা জীবনI ইমনের কল্পনা শুধু লাবনীকে নিয়ে, ওরা যেন অন্তহীন পথ যাত্রায় ক্লান্তিহীন প্রেমিক প্রেমিকা মুখোমুখী বসে আছেI মধুচন্দ্রিমার রাত্রি ভোর হয় কিন্তু কথা শেষ হয় নাI আজ ইমনের বেলায় একদম উল্টো, কথাও নেই- ভোরও আসে নাI 
সে একবার চিন্তা করলো বিছানা থেকে উঠে সোজা কালু গাছির খেজুর বাগানে যাবে শিবুকে নিয়েI কিন্তু ভয় হল কালু গাছির চালাকির কথা মনে করেI এবারও যদি খেজুরের রসের হাড়িতে কচুর ডগা দিয়ে রাখে, রস-চোরকে সাজা দেয়ার জন্যI গতবার কচুর ডগার মিশ্রিত খেজুরের রস খেয়ে মরতে গিয়েছিল ইমনরা - সবারি গলা চুলকাতে চুলকাতে যান যায়I 
তাই রস চুরির ইচ্ছা ত্যাগ করে আগের সিদ্ধান্ত মোতাবেক শিবুদের বাড়ি চলে গেলI শিবুর পুরা নাম শিব শংকর পাল এবং বাবার নাম হরি শংকর পালI হরি কাকু খুব পরিশ্রমী, সারাদিন খালিগায়ে তামাটে শরীরে একটি ধুতি পরে হাটুর উপর ভর করে প্রতিমা বানায়I সারা বিক্রমপুরে হরি কাকুকে এক নামে সবাই চিনেI বিভিন্ন রূপের প্রতিমার কারিগর সে – কখনো বীণাহাতে হাঁসের উপর বসা স্বরস্বতী বানায় , কখনো মুন্ডু হাতে লাল জিব্বা বের করা মা-কালী বানায়I আবার বানায় দশ হাতের শারদীয় মা-দূর্গা, মনষা পূজার আগে ঘাটের সামনে রোঁদে শুকায় শত রকমের মাটির সাপ আর মেলায় বিক্রির জন্য হাজারও মাটির খেলনাI ইমনের হিংসা হতো যে শিবুদের মত কারিগর নয়I তবে পুইন (কাঁচা মাটির পাত্র পোড়া ) পোড়ার সময় শিবুদের ধানের নাড়া এগিয়ে দিয়ে অতি উৎসাহ পেতI  
শিবু গতকাল স্কুলের জন্য বানানো স্বরস্বতী প্রতিমাটি দেখিয়েছে ইমনকেI কি সুন্দর! চোখ আর ঠোঁটে উছলে পড়া মোনালিসা হাসিI এই সৌষ্ঠবপূর্ণ সুশ্রী সরস্বতীকেই জ্ঞান, সংগীত, শিল্পকলা, বুদ্ধি ও বিদ্যার দেবী বলা মানায়I 
ইমনরা হিন্দু মুসলিম ছাত্র মিলে লৌহজং দিঘলী বাজার থেকে পূজার চাঁদা তুলেছে অনেকI সেই সময় ওরা জানতো না চাঁদাবাজি কি? জানত না হিন্দু মুসলমানের ধর্মীয় অনুশাসনের গরাদে আটা বন্ধ নগরীর কথা - যেখানে অন্ধত্বের দেয়ালে ঘেরা কুপমন্ডুকতা শুধুই কেঁচোর মত কিল বিল করেI ইমনদের স্কুলের শামসুল হক স্যার বলতো ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের উর্ধ্বে পারাই একজন সত্যিকারের মানুষ হওয়ার লক্ষণI
তখন এত কঠিন কথা না বুঝলেও স্যারের একটি কথা ইমনের কানে আজও বাজে “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”
যাক ও সব কথা, সকল ভয় কে লেপ-চাপা দিয়ে বেরিয়ে পড়লো একুশের প্রভাত ফেরির ফুল চুরি করতেI
শিবুর ঘরের জানালায় টোকা দিতেই হরি কাকুর কাশির আওয়াজI কাকু সারারাত প্রতিমা তৈরির কাজ করেছে, এখনোও জেগে আছেI হঠাৎ কাকু কলে পানি নিতে আসছেI কেউ যেন না দেখে তাই শিবুদের পাটাতন ঘরের নিচে বিড়ালের মত দুই পা আর হাটুতে ভর করে বসে রইলো ইমনI হাতের উপর দিয়ে কি যেন একটা ছুটে গেল, গন্ধে বুঝতে পারলো এটা হয়তো চিকা ইদুর হবেI ভয় পাচ্ছে যদি সাপ আসে এই ইদুর খেতে অথবা কেউ অকস্মাৎ দেখে চোর চোর বলে তাড়া করেI মাঝে মাঝে ডলা পিপড়াও গায়ের উপর দিয়ে যায়- লুঙ্গির ভিতর দিয়া যায় - ভাল যে এই পিপড়ারা কামরায় নাI ভয় হচ্ছে যদি কানে দুই একটা ঢুকে যায়!
কাকুর এখন আর কোনো সারা শব্দ নেইI সে পাটাতনের নিচ থেকে বের হয়ে শিবুর ঘরের জানালায় টোকা দিলI ফিস ফিস করে শিবু বললো আমি আসতেছিI
শিবু এলো একটি পিতলের ফুলের ডালি নিয়ে – দুজনে নেমে পড়লো ফুল চুরিতেI
প্রথমেই শিবুদের ঘাটলার পাশে চিতই পিঠার মত বৃত্তাকারে ফোঁটা হরেক রঙের ফুলI কোনটা লাল, কোনটা হলুদ, কোনটা খয়েরি – শিবু ডালিতে রাখছে আর ইমন ফুল চুরি করছেI এতে ওর কোনো কষ্ট হচ্ছে না – ওর যুক্তি পুকুর সবার, কচুরি পানা সবার, মাছ আমাদের সবাইর, একই পুকুরের পানি দিয়ে হিন্দুরা পূজা করে, মুসলমানেরা অজু করে কিন্তু ঘাট থেকে একটু উপরে উঠে মাটি স্পর্শ করলেই – ভাগ – ভাগ – ভাগ, আমার – আমার –জাত-বেজাত বলে হুরাহুরী, মারা মারি পড়ে যায় স্বার্থ রক্ষার হিসাব নিকাশ নিয়েI পুকুরের কিনারের জিনিসও সবাইর, চুরি করলে কারো কোন দোষ নেইI
শিবুর মায়ের পূজার জন্য ফুল রেখে – আরো অন্য ঘাটে গিয়ে ফুল তুলে ডালি ভরে ওরা দু জনI 
ইমনদের মালা হতে হবে বড়, অনেক বড়- মৃদুলা আর লাবনীর মালার চেয়ে বড়I সবাই যেন ইমনদের মালার দিকে তাকিয়ে থাকে – যেন ইমনদের মালার প্রশংসা থাকে সবার মুখে মুখেI ওরা ফুলের মালা বানিয়ে সুন্দর করে ঢেকে রাখলো ইমনদের  রান্না ঘরের চালার উপর, যেন সারা রাত শিশিরে ভিজে থাকেI সকালে ঘুম ভাঙ্গলো শিবুর মায়ের চিৎকারে “যে আমাগো ফুল চুরি করছে ওগো যেন কলেরা হয়, যেন উলা বসন্ত উঠে, অতিসাইরারা যেই হাত দিয়া আমাগো ফুল ধরছে, সেই হাতে যেন কুষ্ঠ হয়”I 
সকালে দুই বন্ধু দরজা বন্ধ করে, ফুলের মালা তৈরী করে দুই পাশে ধরে স্কুলের শহীদ মিনারে রাখলো – দারোয়ান ও দপ্তরী এই মাত্র ধোয়া মোছার কাজ শেষ করেছেI ইমনদের এত বড় মালা দেখে ওরা দুজন কি যেন ফিস ফিসI হয়ত ওরাও জানে ফুল চুরির কথাI 
সূর্য উঠার সাথে সাথে ছাত্র ছাত্রীদের আসা আরম্ভ হয়েছে – ছাত্রীরা হরিণ শাবকের মত হেঁটে আসছে স্যারদের পিছনে পিছনে লাইন ধরেI কারো হাতে গোলাপ ফুল, কারো হাতে পলাশ ফুল, কারো হাতে ফুলের মালা, কারো হাতে গেন্দা ফুলের মালাI কিন্তু যাদের সাথে প্রতিযোগিতার জন্য ইমনরা চোর হলো, ফুল চুরি করলো তাদের তো দেখছে নাI
জিরাফের মত গলা উঁচু করে দেখে দুই সহচরী আসছে মৃদু পায়ে, হেলে দুলে স্নিগ্ধ সকালে শান্ত নদীর ঢেউয়ের মতI মনে ভয় হচ্ছিল ইমনের তটিনীর বালু রেখায় এসে যেন ওরা না হারিয়ে যায়I লাবনিরা যতই কাছে আসছে স্পস্ট হচ্ছে ওদের রূপI ততই ইমনের বুক ধুক ধুক করছেI মৃদুলা আর লাবনী দুজনেই সাদা কাপড়ের কেডস খুলে খালি পায়ে হাটছে– লাবনীর পায়ের নেইল পালিশের রং সূর্যের আলোতে শিশির ছোঁয়ায় ঝলমল করছেI যেন এক এক পায়ে পাঁচটি করে গোলাপের পাপড়ি বসানোI মাথার বেণীতে লাল পলাশ ফুলের কুড়ি, গলায় শিমুলের মালা আর ঠোঁটে লাল লিপিষ্টিক সব মিলে লাবনী যেন আজ বসন্তের আগমনী সংবাদের একটি লাল টকটকে পোষ্টারI ইমন শুধু দেখছিল পাথর খচিত দু-চোখে মূর্তির মতI 
ওরা দুজন শহীদ বেদিতে ফুল দিল একবারও ওদের দিকেও তাকালো নাI মনটা হটাৎ ফুটে যাওয়া বেলুনের মত চুপসে গেলI মনে হলো ঘূর্ণি ঝড়ে আক্রান্ত বাসা ভাঙ্গা আহত শিশু পাখি ওরা দুজনI শিবু ইমনের অনুভুতি বুঝতে পেরেছে তাই বললো- ওরা হয়তো আমাদের দেখে নাই – “আয় আর একবার মালাটা ধরে সোজা করি, যেন বুঝতে পারে বড় মালাটা আমরাই এনেছি “ইমনরা দুজনে মালাটি দুদিক থেকে ধরে সোজা করতেই, - পিছন থেকে হই চৈ ..ওই জুতা খোল্ .. জুতা খোল, এইটা কি পোস্টার হইলো ..খোল্.. খোল্”। ইশ্ - এইবারও সব রসাতলে গেল!
পিছনে তাকিয়ে দেখে যাকে জুতা খুলতে বলছে সে ওদেরই বন্ধু ক্লাস নাইনের নবাব আলীI হাতে পোস্টার লিখা “বিশ্ব ভাষা বাংলা চাই”, “বিশ্ব ভাষা বাংলা চাই”, হই চৈ শুনে নবাব আলীর পাশে সবাই জড়ো হয়I সেই সাথে ইমনদের বিজ্ঞান শিক্ষক আশুতোষ স্যারও চলে আসেনI স্যার বললেন “আমরা যদি “বিশ্ব ভাষা বাংলা” করে ফেলি তাহলে যারা তাদের মাতৃভাষা হারাবে তারাও আমাদের ঘৃনা করবে যেমনটি তোমারা ঘৃনা কর পাকিস্তানের জিন্নাহর প্রতি”। 
সরল মনের ইমনের মাঝে সেই কঠিন সত্য কথাটি তেমন কোন আলোড়ন জাগালো নাI 
শুধু পিছন থেকে সুরেলা আওয়াজ ভেসে এলো “ফুল চোর, ফুল চোর”I দুটি শব্দে গাঁথা “ফুল চোর” কথাটা সুবর্ণ রঙের মালা হয়ে ইমনের গলায় জড়িয়ে ধরলোI এই প্রথম লাবনী ইমনের উদ্দেশ্যে কিছু বললোI লাবনীর দিকে তাকাতেই সৃষ্টির অপরূপে সাজানো প্রকৃতির ছোঁয়ায় মায়াময় অংকনে চিত্রকর্ম মুখখানি ভেসে উঠলোI লাবনী হৃদয় নিংড়ানো হাসির ঝলক দিয়ে মুহুর্তের মাঝে হারিয়ে গেল ভিড়ের মধ্যেI যেমনটি হারায় পথের বাকেঁ সবুজ ধান খেতে মুনিয়া পাখিI
লাবনীর ফুলচোর শব্দটি শো শো করে লু হওয়ায় ভেসে উঠা ঘূর্ণি ঝড়ের মত প্রতিদিনই বুকের মাঝে বান ডাকে ইমনেরI যদি আর একটিবার সেই সুরেলা কন্ঠটি শুনতে পারতো লাবনীর মুখে “ফুল চোর”I লাবনীরা চিরকালই একটি শব্দ উচ্চারণ করে ইমনদের কাঁদায়I যা হাজার মধুময় শব্দ শোনার পরেও, সেই আকাঙ্খিত শব্দটি শোনার আকুতিতে মন হু হু করে কাঁদেI জীবন তখন পীড়নে দহনে হারিয়ে ফেলে সামনে চলার ছন্দI ধূসরিত হয় উঠে সাবলীল মুগ্ধতাI

আবুল হোসেন 
হেমিল্টন, কানাডা।   
abulsab@yahoo.com