অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
হার মানা হার - যুথিকা বড়ুয়া

( এক
কাল থেকেই মেঘলা আকাশ। একটু হাওয়া নেই, বাতাস নেই, পশু-পাখীর কলোরব নেই। গাছের একটা পাতা পর্যন্তও নড়ছে না। যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে গোটা পৃথিবীটা। সময়ের গতিবিধি মালুমই হচ্ছে না। সকালবেলাই নেমে এসেছে অন্ধকার। তন্মধ্যে সাংঘাতিক গরম। হষ্টেলের চার-দেওয়ালের বদ্ধ ঘরে দম বন্ধ হবার যোগার। -‘ধুৎত্তোরি, এরকম ওয়েদার ভালো লাগে কারো! বিচ্ছিরি!’   
মনে মনে বিড়বিড় করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে আসে জয়ন্তি। গিয়ে দাঁড়ায় ব্যালক্নিতে। তবু স্বস্তি পায় না। মনটা কেমন আনচান করছে। এক ধরণের শূন্যতাবোধে বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠছে। মনে হচ্ছে, কি যেন একটা ওর হারিয়ে যাচ্ছে।    
হষ্টেলের পিছন দিকটা বিশাল জায়গা। বিস্তর প্রান্তর জুড়ে রোজ-গার্ডেন। বেশ শান্তিপূর্ণ, নিরিবিলি জায়গা। ছুটির দিনে হষ্টেলের ছাত্র-ছাত্রীরা উন্মুক্ত নীল সামীয়ানার নীচে অবকাশ যাপনে দলবদ্ধভাবে পরিবেষ্টিত হয়ে গল্প-গুজব করে, আড্ডা দেয়। কিন্তু আজ প্রকৃতির আবহাওয়া উপেক্ষা করেই পালা করে চলছে ব্যাটমিন্টন খেলা। দেখতে বেশ ভালো লাগছে জয়ন্তির। গার্ডেনের চারিধারে সারি সারি দেবদারু আর কৃষ্ণচূড়া গাছ। হষ্টেলের চারতলার উপর থেকে দেখে মনে হচ্ছে, গাছগুলি লাল আর হলুদ রঙে আবৃত হয়ে আছে। গাছের পাতাগুলি ঝুরু ঝুরু মিহিন বাতাসে এলোপাথারি দুলছে। গার্ডেনের এক কোণায় নায়গ্রার জলপ্রপাতের মতো শন্ শন্ শব্দে অনবরত বইছে ঝর্ণার জল। হঠাৎ সেই শন্ শন্ শব্দের ধ্বনি প্রতিঃধ্বনিতে এক শূন্য নিবিড় নিস্তব্ধতায় জয়ন্তি গভীর তন্ময় হয়ে ডুবে যায় এক সৌন্দর্য্যময় জগতে। যেদিকে দুচোখ যায় সর্বত্রই যেন এক অভিনব বৈচিত্র্যের সমাহার। যা দ্যাখে সবই নতুন লাগে, সুন্দর লাগে। সে এক অনবদ্য আনন্দ উপভোগ করার মতো একটি অবিস্মরণীয় দৃশ্য। যার চারিধারে বর্ণনাতীত ভালোলাগার উপাদানে আচ্ছাদিত এবং সমৃদ্ধ।  
বিস্ময়ে অভিভূত জয়ন্তি উন্মুক্ত অন্তর মেলে আস্বাদন করতে থাকে, দিগন্তের প্রান্তরে পড়ন্ত বিকেলের ক্লান্ত সূর্য্যরে কুসুম আলোয় ভেসে ওঠা প্রকৃতির চমকপ্রদ রূপ, সৌন্দর্য্য। কল্পনায় বিচরণ করে, এক শূন্য নিবিড় নির্জন ভুবনে। যেন স্বর্গোদ্যান! আহা, কি নিদারুণ সেই অনুভূতি। ছুঁয়ে যায় ওর হৃদয়পটভূমি। শীতল হয়ে আসে হৃদয়-মন-প্রাণ, সারাশরীর। আত্মমুগ্ধতায় ওকে একেবারে চুম্বকের মতো আবিষ্ট করে রাখে। চোখের পলক পড়ে না। আর সেই একটানা তীব্র ভালোলাগা আর মুগ্ধতার আমেজ মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে ওর দেহে, মনে। জমে ওঠে হাজার প্রশ্নের ভীঁড়। সে এক ব্যাখ্যাতীত ভাবনার উৎপত্তি হয় ওর মস্তিস্কের মধ্যে। জয়ন্তি কিছুতেই ভেবে কূল পায় না, ওতো প্রায়ঃশই ব্যালক্নিতে দাঁড়িয়ে রোজ-গার্ডেন অবলোকন করে। নজর বুলিয়ে চারিদিকে পর্যবেক্ষণ করে। কোন কোনদিন ঘন্টার পর ঘন্টা গার্ডেনে বসে থাকে। কই, কখনো তো এমন অনুভূতি অনুভব করেনি! এমন ভাবান্তরও আগে কখনো জাগ্রত হয়নি! প্রতিদিনই তো সকাল হয়, দুপুর আসে। তারপর গোধূলী এবং সন্ধ্যার মধ্য দিয়ে রাত আবার ফিরে চলে যায় ভোরে। ঊষার প্রথম সূর্য্যরে স্নিগ্ধ কোমল নির্মল আলোয় দিগন্ত জুড়ে বিকশিত করা একটি নতুন সকালে। আবার সব সকাল, দূপুর, সন্ধ্যে এবং রাত কখনো এক হয়না। তরুণ তাপসের মতো কখনো উজ্জ্বল রৌদ্রখরদ্বীপ্ত সোনালী আকাশ, কখনো মেঘাচ্ছন্ন। এতে মানব মনেও প্রভাব পড়ে, প্রতিক্রিয়া ঘটে। মানুষের জীবনকেও করে নিয়ন্ত্রিত। প্রকৃতির সাথে মানব মনের এ এক নিবিড় সর্ম্পক। কিন্তু তাতে কখনো কিছুই এসে যায়নি জয়ন্তির। মনেও রেখাপাত করেনি। জয়ন্তি বরাবর নিরবিচ্ছিন্ন একাকী সন্ধ্যায় নির্জন নিস্তব্ধতায় একলা থাকার ভালোলাগাটুকুই শুধু একান্তে নিবিড় করে পেতে চেয়েছিল। তাতেই ছিল ওর সুখ, আনন্দ। এতকাল তা-ই হয়ে এসেছে। অথচ আজ দিনটা সকাল থেকে কেমন নীরব, নিরুচ্ছাস, বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে আছে। সূর্য্য দশর্ণের কোনো সম্ভবনাই নেই। আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। মনে হচ্ছে, এক্ষুণি ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি নামবে। অথচ কি আশ্চর্য্য, আজ সেই একাকী সন্ধ্যার নিঃসঙ্গ বিষন্নময় জগৎ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জয়ন্তি উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে। বিচলিত হয়ে ওঠে। খাঁচার পাখীর মতো মনটা ছটপট করতে থাকে।
ভাবনার জাল বুনতে বুনতে হঠাৎ এক সীমাহীন ইচ্ছানুভূতির অতল গহ্বরে তলিয়ে যায় জয়ন্তি। খুঁজে পায়, জীবনের প্রকৃত অর্থ। আবিস্কার করে বেঁচে থাকার সাধ। আজ যেন ও’ প্রকৃতিতে সম্পূর্ণ বিসর্জিত। নিয়তির কাছে আত্ম সমর্পিত। স্বপ্নের কাছে ধরাশায়ী। মন-বাসনার প্রকোষ্টে কারাবন্দি। যেন নিবেদিত প্রাণ। মন-মানসিকতার কি অদ্ভুদ বৈপরীত্য জয়ন্তির। ইচ্ছে করছে, মুক্ত-বিহঙ্গের মতো দূর নীলিমায় হারিয়ে যেতে। পুর্ণোদ্যামে খুশীর পাল তুলে জীবন জোয়ারে ভেসে বেড়াতে। আরো কত কি! ভিতরে ভিতরে সেই ভালোলাগার মধুর আবেশ হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। টের পায়, মনের মধ্যে রস সঞ্চার হবার একটা তীব্র অনুভূতির জাগরণ। কি নিদারুণ একটা শিহরণ। যা রক্তের স্রোতের মতো ক্রমশ ওর শরীরের সমস্ত শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ছে। শুনতে পায় প্রাণস্পন্দন। যা কল্পনা শক্তিকে উদ্দীপ্ত করে, বিকশিত করে। আর সেটা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে গিয়ে জয়ন্তি বেমালুম হারিয়ে যায়, এক অভাবনীয় কল্পনার সাগরে, এক স্বপ্নময় জগতে। যেদিন শরীরের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে জীবনে প্রথম অনুভব করে, এক অভিনব কোমল অনুভূতি। মধুর শিহরণ। আর তৎক্ষণাৎই শারীরিক, মানসিক অবসাদ ঝোরে গিয়ে সদ্য প্রষ্ফূটিত ফুলের মতো জয়ন্তি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। নদীর উত্তাল তরঙ্গের মতো পুলক জাগা শিহরণে দোলা দেয় ওর হৃদয়-মন-প্রাণ-সারাশরীর। চোখমুখ থেকেও ঝোরে পড়ে একরাশ উচ্ছাস, আবেগ। হঠাৎ স্বগতোক্তি করে ওঠে,-‘এর নামই কি ভালোবাসা! ভালোবাসায় এতো সুখ, এতো আনন্দ! তবে কি সত্যিই প্রফেসার শুভেন্দুর প্রেমে পড়ে গেল জয়ন্তি!’
হঠাৎ মনে পড়ে, মাতা সুধাময়ীর সাথে একবার তুমুল বাকযুদ্ধ হয়েছিল। বৈবাহিক জীবন নিয়ে নানাভাবে আপত্তি, বিরোধীতা করেছিল। যেদিন শ্রুতিকটূ বাক্যের তীর ছুঁড়ে মনুষ্যজাতির চিরাচরিত রীতি-রেওয়াজ, দু’টি মানব-মানবীর পবিত্র বিবাহ বন্ধন শুধুমাত্র অবাঞ্ছিতই নয়, অন্তত্য দৃঢ়তার সাথে তীব্র মন্তব্য করেছিল,-‘কর্তব্যের দোহাই দিয়ে সামাজিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া মানেই ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে বির্সজন দেওয়া, অন্যের বশ্যতার স্বীকার হওয়া, করুণার পাত্রী সেজে অন্যের পদতলে আত্মসমর্পন করা, দুঃখকে স্বেচ্ছায় বরণ করা, নিরন্তর বোঝা পোড়া। এসব নিজেকে অবমাননা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। যার ফলসরূপ দুঃখের দহনে করুণ রোদনে নিজেকে তিলে তিলে ক্ষয় করা, নিঃশ্ব হয়ে যাওয়া। এছাড়াও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, বিশ্বস্থতা, আস্থা এবং সামঞ্জস্যতার একটা ব্যাপার আছে। যা নিতান্তই প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে যার ভিত্তিতে দৃঢ়ভাবে নির্ভরশীল হয়ে আমরণ অটুট থাকে বৈবাহিক জীবনের সুখ-শান্তি-আনন্দ আর ভালোবাসা। তা না হলে ভিত্তিহীন, আবেগ-অনুভূতিহীন দাম্পত্য জীবনের চাওয়া পাওয়ার হিসেব কষতে কষতেই অবলীলায় একদিন অনাদরে অবহেলায় নীরবে ঝড়ে যাবে একটি মাসুম জীবন। সেটাই কি তুমি চাও মামনি? না, না এ হতে পারেনা, কিছুতেই না। রক্তে-মাংসে গড়া মানবীয় হয়ে, আপন সত্ত্বা হারিয়ে, সূঁতোয় বাঁধা অবলা কাঠপুতুলের মতো নির্বিবাদে এই ছলনাময় সংসারে বেঁচে থাকতে কখনো পারবো না, কিছুতেই না। তোমার দুটি পায়ে পড়ি মামনি, একজন অচেনা অজানা অপরিচিত পুরুষমানুষের গলায় আমায় মালা দিতে বোলো না, প্লীজ!’
গর্জে উঠলেন সুধাময়ী,-‘এসব কি বলছো জয়া! সব মিথ্যে কথা, তোমার ভুল ধারণা। পৃথিবীর সব মানুষ, মানুষের রুচী, মনোবৃত্তি সমান নয়। যদি তাই-ই হোত, তবে বহুকাল আগেই সংসার নদীর প্রবাহ থেমে যেতো। বংশ বিন্তার লোপ পেতো। পৃথিবীর জনমানব শূন্য হয়ে যেতো। জীবনে কোনদিন মানুষ বড় হতে পারতো না। মানুষের জীবন এতো উন্নত মানের হোত না। পৃথিবীর সৌন্দর্য্য কখনো এতোখানি বৃদ্ধি পেতো না। জীব সৃষ্টির সাথে সাথে জীবন ধারণের নানা উপকরণ এবং ভোগের কৌশল সৃষ্টিকর্তা যেমন সৃষ্টি করেছেন, তেমনি প্রাত্যহিক জীবনে চলার পথে অনাগত দুঃখ-যন্ত্রণা, নানান সমস্যা দূরীভূত করার বহু পন্থাও সৃষ্টি করে রেখেছেন। তুমি এতোখানি পড়াশোনা করে এসব শিখলে?’
অসন্তোষ গলায় বললেন,-‘রসায়ন বিজ্ঞান পড়তে পড়তে মাথাটা তোমার একেবারে গেছে জয়া। সারাদিন রিসার্চ করো। বাস করো ভিন্ন জগতে। সেখানে নিজস্বতার প্রাধান্যে নিজের কর্মসূচীকে এতবেশী গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছ, পৃথিবীর অন্য কিছু আর তোমার নজরে পড়ে না। তাই বুঝতে পারো না। প্রত্যেক জিনিসের একটা বৈপরীত্য আছে, প্রতিঃদ্বন্দিতা আছে এবং থাকবেও। বিশেষ করে মনুষ্য জীবনে। মানুষের জীবন কখনো একই ধারায় প্রবাহিত হয় না। নদীর জোয়ার ভাটার মতো সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা নিয়েই মানুষের জীবন। কিন্তু কোনটাই চিরস্থায়ী নয়। তুমি ভেবো না, সংসার জীবনের পারিপার্শ্বিকতাকে উপেক্ষা করে সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করবে, জীবনকে নিজের ইচ্ছা মতো পরিচালনা করবে, সেটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। পৃথিবীর সমগ্র মানবজাতী, তথা নারী-পুরুষ প্রত্যেকেই একে অপরের পরিপূরক, প্রেরণা শক্তি, শক্তির উৎস। বিশেষতঃ দাম্পত্য জীবনে। সেই সঙ্গে বিধাতার দান স্বরূপ বাচ্চা-বুড়ো-জোয়ান, নারী-পুরুষ প্রত্যেকের অন্তরে ভক্তি-শ্রদ্ধা, আদর-স্নেহ-মমতা -ভালোবাসা সমানভাবে বিরাজমান। এই ভবের সংসারে মানুষ ভালোবাসা ছাড়া কখনো বাঁচতে পারে না। যা অন্ন-বস্ত্রের মতো আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে নিতান্তই প্রয়োজন। আর মানুষকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা-ভক্তি করা, এ তো মনুষ্যজাতির পরম ধর্ম। আর সেই মনুষ্য কূলের তুমিও একজন সদস্য। এর ঊর্ধ্বে তুমি নও জয়া!’  
মায়ের সেই কথিত চরম সত্যের বাণী কানে বেজে উঠতেই ঠোঁটদুটো চিপে অস্ফূট হেসে ফেলল জয়ন্তি। শ্বাশত লজ্জা আর আবেগের সংমিশ্রণে চোখমুখ রাঙা হয়ে ওঠে। একেলা নিরবিচ্ছিন্ন নির্জন সন্ধ্যায় ব্যাল্কনিতে দাঁড়িয়ে গভীর তন্ময় হয়ে ডুবে যায় স্মৃতি রোমন্থনে।

 ( দুই)  

ছোটবেলা থেকে জয়ন্তি যেমন একরোখা, ধীর-স্থীর-গম্ভীর, তেমনি বিদ্রোহী গোছের মন-মানসিকতা। প্রতিটি ব্যাপারে ওর আপত্তি, অভিযোগ, বিরোধীতা। সামান্য খুঁটিনাটি বিষয়েই সাংঘাতিক চটে যাওয়া ওর চরিত্রের একটি প্রধান বৈশিষ্ঠ। একেবারে মিলিটারীদের মতো মেজাজ। নাকের ডগা দিয়ে একটা মাছি পর্যন্ত কখনো উড়ে যেতে পারে না। বিরল সেন্টিমেন্টাল। অনমণীয় জেদ। বিবাহ সে কখনোই করবে না। সর্বদা নিজের চাহিদা হাসিল করে নেওয়াই ওর জীবনের প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে সৃষ্টিশীলতার তাগিদে মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে, অন্যের করুণায় নির্ভরশীল হয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা কখনো সমর্থন করেনা। কিন্তু অধ্যাপক পিতা-মাতার শাসন শিক্ষায় বেড়ে ওঠা উচ্চাভিলাষী জয়ন্তির মূল উদ্দেশ্য জীবনে বড় হওয়া, সৎ হওয়া, মহৎ হওয়া। ওর একান্ত ইচ্ছা, মাতা-পিতার ¯েœহ-ভালোবাসার ছত্রছায়া থেকে সড়ে এসে নিজস্ব মাটিতে শক্ত পায়ে দাঁড়াবে। নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখে উচ্চপদ মর্যাদাসম্পন্ন সুপ্রতিষ্ঠায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে, স্বাবলম্বী হবে। জীবনের সমগ্র জটিলতা উপেক্ষা করে বন্ধনহীন, চিন্তাহীন, মুক্ত-বিহঙ্গের মতো স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকবে। পুরুষ শাসিত সমাজে পূর্ণ মর্যাদায় সমান অধিকারের তালিকাভূক্ত হয়ে পুরুষমানুষের সাথে তালে তাল মিলিয়ে একই পদক্ষেপে এগিয়ে চলবে। জীবনে কোনদিন হার মানেনি জয়ন্তি, হার মানতে শেখেনি। ওর একমাত্র আশা-আকাঙ্ক্ষা জীবনে সফলতা অর্জন করা। আর সেই উচ্ছাকাংখিত স্বপ্নকে বাস্তবায়ীত করতে দৃঢ় মনের অধিকারী জয়ন্তি উচ্চশিক্ষা গ্রহণে পদার্পণ করে দিল্লীর জহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটিতে। যেদিন উজ্জ্বল গৌরবর্ণের সুঠাম সুদর্শণ বুদ্ধিদ্বীপ্ত তরুণ লেক্চারার শুভেন্দুকে ও’ প্রথম দেখেছিল। সেখানেই লেডিস হষ্টেলে থেকে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নিরলস ডুবে থাকতো বিদ্যার অথৈ সাগরে। বন্ধু মহলে হাসি-মশকরা, আনন্দ-কোলাহল, উৎসাহ-উদ্দীপণা কোনদিকে ওর উৎসাহ, আগ্রহ কোনটাই ছিলনা। অথচ তখন সুকোমল যৌবনের প্রথম প্রহর ওর। যেন বাঁধ ভাঙ্গা উত্তাল যৌবন। কি চমকপ্রদ রূপ, রং, লাবণ্যতা, শরীরের গড়ন। যেন সৌন্দর্য্যরে পারিজাত। চির অম্লান, চির সজীব, শান্ত-স্নিগ্ধ-কোমনীয় নব যৌবন সম্পন্না এক উদ্বিগ্ন অনন্যা। বিধাতা যেন অকৃপণ নিপুণতা ঢেলে ওকে পড়েছিলেন। 
কথায় বলে,-‘যার বিয়ে তার হুঁশ নেই, পাড়াপর্শীর ঘুম নেই!’
ভেবে অস্থির হয়ে ওঠে ওর সহপাঠীরা। কেউ কেউ উপহাস করে বলে,-‘বালিকা  ব্রহ্মচারী!’ 
আবার কেউ কেউ ওর রূপের বর্ণনা দিয়ে মন্তব্য করে,-‘পরিণত যৌবনে জীবনকে উপভোগ করবার উপযুক্ত সময়ে তারুণ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে গৃহত্যাগী সাধু-সন্তদের মতো এতখানি আত্মসংযমী হয় কি করে! আবেগ অনুভূতিও  কি নেই ওর অন্তরে! জীবনে কোনো স্পৃহাই নেই! আশ্চর্য!’
কিন্তু আবেগ-অনুভূতিহীন নিরস নিরুচ্ছাস, নিপ্রেম জয়ন্তির ধূসর মরুভূমির মতো হৃদয় আকাশেও যে একদিন ভালোবাসার গ্রহণ লাগবে, তা কে জানতো!   
সেদিন ছিল ২৫শে বৈশাখ, বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের জন্ম দিবস। প্রত্যেক বছরের মতো ইউনিভার্সিটির অডিটোরিয়ামে পূর্ণদ্যোমে প্রস্তুতি চলছিল, একটি মনোজ্ঞ সঙ্গীত সন্ধ্যার বিশাল আয়োজন। সেই সঙ্গে কেউ কেউ চুড়ইভাতির অন্যতম আনন্দে মেতে ওঠে। সুরের মূর্ছণায় গমগম করছে রোজ-গার্ডেন। রেকর্ডে বাজজে রবীন্দ্র সঙ্গীত, প্রাচীন লোকসঙ্গীত। একমাত্র জয়ন্তিই সবার চেয়ে ব্যতিক্রম। একটু ভিন্ন ধরণের। সহজে ধরা দেয় না। এমনিই কথা কম বলে। কোয়াইট থাকতে ভালোবাসে। তন্মধ্যে মহিলাঙ্গনের কোনো ভূমিকা পালন করা বা দায়িত্ব গ্রহণ করা, সৌজন্যমূলক কুশল বিনিময় করা, ওসব ওর ধাতে নেই। এক কথায় নিজেকে সর্বত্র গুটিয়ে রাখাই ওর চরিত্রের আরো একটি প্রধান বৈশিষ্ঠ্য। পার্শ্বস্থ একটি উঁচু ঢিবির উপর হাঁটুতে মুখ গুঁজে সবার কান্ড কারখানা দেখছিল বসে বসে। ইতিপূর্বে কখন যে প্রফেসার শুভেন্দু এসে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কেউ টের পায়নি। তিনি হঠাৎ সবাইকে কাঁপিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন,-‘কি, রান্না-বান্না হ’ল তোমাদের! খাওয়া দাওয়া হবে কখন!’ 
বলতে বলতে হঠাৎ উঁচু ঢিবির দিকে পলকমাত্র দৃষ্টিপাতে থমকে দাঁড়ান। নিজের চোখদু’টোকে কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। হাঁ করে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। সেই সঙ্গে জয়ন্তির অভাবনীয় রূপ দর্শণে পড়ে গেলেন বিস্ময়ের ঘোরে। -এ কি, জয়ন্তি না! আজ ওর বেশভূষার একেবারে আমূল পরিবর্তন যে! জিন্সের প্যান্ট-শার্ট বর্জন করে পরিধানে বাঙালি রমণীর চিরাচরিত ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র তাঁতের শাড়ি! বাহ্,অপূর্ব! সোনালী চওড়া পাড়ের মেরুন রংএর শাড়িতে অবিকল দূর্গা প্রতিমার মতো দেখাচ্ছে। যেমন দুধসাদা গায়ের রং, তেমনি হরিণাক্ষী দু’টির মায়াবী চাহনি। তন্মধ্যে পৃষ্ঠদেশ জুড়ে লম্বা কালো কোঁকড়ানো রেশমী চুল। চোখ ফেরাবার সাধ্য কার! প্রতিটি মানুষকে চুম্বকের মতো আকৃষ্ঠ করবে। যেন সাক্ষাৎ দেবী, ভক্তদের আরাধনায় স্বয়ং নেমে এসেছে মর্তে।
স্বাভাবিক কারণেই একটা খুশীর ঝিলিক দিয়ে ওঠে প্রফেসার শুভেন্দুর। হাসিটা বজায় রেখেই প্রসন্ন হয়ে বললেন, -‘ওখানে কেন জয়ন্তি! এসো এসো, নেমে এসো! আমি তো না এসে পারলামই না! রান্নার কি চমৎকার গন্ধ বের হচ্ছে! হুঁম স্ম্যাল্ গুড্! কেমন টেনে নিয়ে এলো আমায় দ্যাখো তো!’
বলে জয়ন্তির সন্নিকটে এগিয়ে আসেন। ডানহাতটা প্রসারিত করে বললেন,-‘দেখো সাবধান, বিকেয়ার ফুল! জায়গাটা খুব পিচ্ছল, স্লীপ্ করতে পারে!’
অপ্রস্তুত জয়ন্তি হঠাৎ বিপাকে পড়ে যায়। মনে মনে ইতস্ততবোধ করে, সংকোচবোধ করে। অগত্যা সলজ্জে হাতটা বাড়িয়ে দিতেই বিদ্যুতের শখের মতো শরীরে একটা ঝটকা লাগল। কেঁপে ওঠে ওর হৃদয়স্পন্দন। অনাকাক্সিক্ষত প্রফেসার শুভেন্দুর উষ্ণ পরশে নিদারুণ একটা শিহরণ খেলে গেল ওর দেহে, মনে। কি অদ্ভুত একটা শিহরণ! যা ক্ষণপূর্বেও কল্পনা করেনি।যা রক্তের স্রোতের মতো সারাশরীরে সঞ্চালণ হতে থাকে এক অনবদ্য ভালোলাগার তীব্র অনুভূতি। স্পর্শ করে ওর হৃদয়কে। যার বিশ্লেষণমূলক কোনো ব্যাখ্যা ওর জানা ছিল না। জানা ছিল না, আচমকা বিপরীত লিঙ্গের উষ্ণ পরশে হৃদয়পটভূমিতে তুমুল ঝড় বয়ে যাবে। তোলপাড় করে দেবে, আলোড়ণ সৃষ্টি করবে। কিন্তু তখন ওর শোচনীয় অবস্থা। কি করবে মনস্থির করতে পারেনা। মুহূর্তের জন্য বুদ্ধিভ্রষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল ওর কণ্ঠস্বর। অপ্রত্যাশিত প্রফেসার শুভেন্দুর আগমন, উপস্থিতি এবং তাঁর অমায়িক আন্তরিকতার অভিব্যক্তিটুকু ওকে বুঁদ করে রাখে। অনুভব করে এক অভিনব কোমল অনুভুতি। কি নিদারুণ সেই অনুভুতি! কিন্তু তার অন্তর্নিহীত কোনো তাৎপর্য প্রকাশ্যে ধরা না পড়লেও আবেগের প্রবণতায় জয়ন্তি পারেনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। পারেনি, অভাবনীয়ভাবে সাময়িক সঞ্চিত কোমল আনন্দানুভূতিটুকু ধারণ করতে। শুধুমাত্র মুগ্ধ আকর্ষণে দৃঢ়ভাবে অনুভব করেছিল, এক অবিচ্ছেদ্য টান, এক অদৃশ্য বন্ধন। যা ক্রমশ ওর আত্মার সাথে আষ্টে-পিষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে। চোখ তুলে তাকাতেই পারে না। সলজ্জে শাঁড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে ছুটে চলে যায় হষ্টেলের দিকে। হষ্টেলে ঢুকে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়। না জানি কত কিইনা ভাবছিল শুয়ে শুয়ে, কখন যে সন্ধ্যে ঢলে পড়েছে খেয়ালই ছিল না। হঠাৎ বাদ্যযন্ত্রের অপূর্ব মূর্ছণায় লাফ দিয়ে ওঠে। শরীরের সমস্তু ইন্দ্রিয়গুলিও চাঙ্গা হয়ে ওঠে। দ্রুত ফ্রেস হয়ে স্বতঃম্ফূর্ত মনে গিয়ে ঢুকে পড়ে অডিটোরিয়ামে। ততক্ষণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পুরোদমে শুরু হয়ে যায়। একে একে মঞ্চস্থ হতে থাকে, নৃত্যনাট্য, গীতিনাট্য, কাব্য-জলসা এবং কবিতার আসর। সব মিলিয়ে অত্যন্ত চমকৃতভাবে সমগ্র কলা-কূশলীদের দুর্দান্ত পরিবেশনায় সকল দর্শক-শ্রোতাদের যখন চুম্বকের মতো আবিষ্ট করে রাখে, ঠিক তখনই অনাকাক্সিক্ষতভাবে ঘটে যায় একটা অঘটন। যার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলনা। হঠাৎ বিজলীবাতী নিভে গিয়ে সৃষ্টি হয়, এক অভাবনীয় বিরূপ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। অন্ধকারে ছেয়ে যায় চারদিক। চোখে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। শুরু হয় ছাত্র-ছাত্রীদের  হুড়োহুড়ি, ছোটাছুটি। 
এমতবস্থায় জয়ন্তি অন্ধের মতো পথ অনুসরণ করে ব্যাক্-ডোর দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে বেরিয়ে আসছিল। আর ঠিক তখনই সিঁড়ির গোড়ায় প্রফেসার শুভেন্দুর সাথে লেগে যায় ধাক্কা। বেশ জোরেই লেগেছিল ধাক্কাটা। ছিটকে দুজনে পড়ল গিয়ে তিনহাত দূরে। কিন্তু অঙ্গ-পতঙ্গের স্পর্শের অনুভূতিতে সেদিন উভয়েরই বোধগম্য হয়েছিল তাদের বিপরীত লিঙ্গের ব্যক্তিটিকে। কিন্তু সেদিন কেউ কাউকে ধরা দেয়নি।
প্রফেসার শুভেন্দু তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,-‘সরি ম্যাডাম, আই এ্যাম সো সরি! আর ইউ ওকে?’
জয়ন্তি  নীরব, নিরুত্তর। অপ্রত্যাশিত প্রফেসার শুভেন্দুর কন্ঠস্বরে ওর সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে। যেদিন ও’ প্রথম অনুভব করেছিল, পুরুষালী দেহের স্পর্শের এক অভিনব অনুভূতি। সে এক নতুন বিস্ময়, নতুন চেতনা, নতুন অভিজ্ঞতা। যা ভাষায় বিশ্লেষণ করা যায় না। কিন্তু তখন ওর শোচনীয় অবস্থা। আচমকা প্রফেসার শুভেন্দুর সংর্স্পশের কোমল অনুভূতিতে তাঁর পুরুষালী দেহের গন্ধ্যে এক ধরণের নেশায় ওকে মাতাল করে তোলে। ইচ্ছে হচ্ছিল, প্রফেসার শুভেন্দুর ঘন পশমাবৃত প্রশ্বস্ত বক্ষপৃষ্ঠে নিজেকে সঁপে দিতে। ওঁর বলিষ্ঠ বাহুদ্বয়ের বেষ্ঠনে একেবারে পিষ্ট হয়ে যেতে। ওঁর উষ্ণ আলিঙ্গনে লীন হয়ে যেতে। কিন্তু একটি শব্দও আর উচ্চারিত হয়না কিংকর্তব্যবিমূঢ় জয়ন্তির। নীবরতায় বয়ে যায় কয়েকটি মুহূর্ত। হঠাৎ প্রফেসার শুভেন্দুর কষ্ঠস্বরে লজ্জা আর আবেগের সংমিশ্রণে দিক নির্ণয় করতে পারেনা। অন্ধের মতো হাতরাতে হাতরাতে বের হবার পথ খুঁজতে থাকে। কিন্তু প্রফেসার শুভেন্দু? ওঁর মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়াই কি ঘটে নি? অবশ্যই ঘটেছিল। আকস্মিক অনাকাক্সিক্ষত বিভ্রান্তিতে ক্ষণপূর্বে যে কান্ডটি ঘটে গিয়েছিল, তাতে এ্যাম্বেরেসিং ফিল করলেও অজানা এক আকর্ষণে তাঁর মনকে যে দুর্বল করে দিচ্ছিল, তা কে জানতো! কে জানতো, বাই-এ্যক্সিডেন্টে যুবতী রমণীর কোমল অঙ্গ স্পর্শে প্রফেসার শুভেন্দুর হৃদয়কেও ভিজিয়ে দিয়েছিল। তাঁর মধ্যেও যে এক ধরণের তীব্র অনুভূতির জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল তা কে জানতো! অথচ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান! সেদিনের বিপদকালিন সময়ে থমকে যাওয়া কয়েকটি মুহূর্তে উষ্ণ নিঃশ্বাস প্রঃশ্বাসের আনা গোনার মধ্যেই ঝট্ করে জ্বলে উঠেছিল বিজলীবাতী। দুজনেই চমকে ওঠে। পলকমাত্র দৃষ্টিপাতে প্রফেসার শুভেন্দু লক্ষ্য করলেন, স্পর্শকাতরতায় লজ্জাবতী পাতার মতো মাথাটা নূয়ে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল জয়ন্তি। যেদিন পুলক জাগা অদ্ভুদ এক শিহরণে হৃদয়পটভূমি ওর সিক্ত হয়ে ওঠেছিল। ক্ষণপূর্বের স্মৃতি ওকে বিচলিত করে তুলেছিল। যেদিন প্রথম দোলা দিয়ে ওঠেছিল ওর মন-প্রাণ সারাশরীর। যেদিন শরীরের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে প্রথম আবিস্কার করে, জীবনের প্রকৃত অর্থ এবং ভালোবাসার সারমর্ম। মিরাকলের মতো যেদিন জেগে উঠেছিল ওর বেঁচে থাকার সাধ, ভালোবাসার ইচ্ছা, আবেগ-অনুভূতি। যা স্বপ্নেও কখনো কল্পনা করতে পারেনি। আর সেদিন থেকেই প্রফেসার শুভেন্দুকে একান্ত আপন করে কাছে পাবার নেশায় ওকে উৎসুক্য করে তোলে।
কিন্তু সূর্য্য কি এতকাল পশ্চিমদিকে উঠেছিল? না বসন্তে ফুলই ফোটেনি। স্রষ্টার পরিচালনায় সারা বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডে সব কিছু একইভাবে চলছে। প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্য, অমাবস্যা-পূর্ণিমা, কিছুই বদলায় নি। তবে আজ হৃদয় আঙ্গিনার কেন এমন বিবর্তন জয়ন্তির? কেনইবা এমন অস্থিতিশীল? কখনো উচ্ছলতা, কখনো ঔদাসীন্যতা, কখনো মলিনতা, কখনো চঞ্চলতা। আগে কখনো তো এমন ঘটেনি! আর এখন. নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার চরম দায়িত্ব পালনের দৃঢ় অঙ্গীকার বদ্ধ জয়ন্তি, মাতা-পিতার সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অদূরে পড়ে থাকার বুকভাঙ্গা কষ্ট আর বেদনাগুলিকে বেমালুম ভুলে গিয়ে একান্তে নির্জনে গভীরভাবে নিমজ্জিত হয়ে থাকে প্রফেসার শুভেন্দুকে নীরব ভালোলাগার আবেশ ও ভালোবাসার ইচ্ছানুভূতির অবগাহনে।
হষ্টেলের ছোট ছোট কামরা। আজকাল একেলা নিঃসঙ্গতায় দম বন্ধ হয়ে আসে জয়ন্তির। অস্বস্তিবোধ করে। হষ্টেলের রুটিনমাফিক জীবন এখন ওর বোরিং লাগে। একঘেঁয়ে লাগে। যেদিন থেকে প্রফেসার শুভেন্দুর অমায়িক আন্তরিকতার অভিব্যক্তি এবং তাঁর কোমল সান্নিধ্য ওকে পাগল করে দিয়েছে, রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, হষ্টেলের চার দেওয়ালের ভিতরে ওর মনই টিকতে চায়না। অপেক্ষা করে থাকে, কখন সকাল হবে, প্রফেসার শুভেন্দুকে দেখতে পাবে।
 

( তিন) 

প্রতিদিনকার মতো যথারীতি সকালে ঘুম থেকে উঠে শাওয়ার নিতে বাথরুমে ঢুকে পড়ে জয়ন্তি। ইতিমধ্যে ঝন্ ঝন্ করে টেলিফোনটা বেজে ওঠে। দ্রুত বেরিয়ে এসে মনে মনে বলল,-সাত সকালে টেলিফোন! খুব জরুরী তলব মনে হচ্ছে! কিন্তু করল কে! মামনি নয়তো! এইভেবে রিসিভারটা তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে পুরুষ কণ্ঠস্বর। 
-‘হ্যালো!’
-‘হ্যালো, কে বলছেন!’
-‘কংগ্রেজুলেশন্স্ জয়ন্তি! আমি শুভেন্দু স্যার বলছি, কেমন আছো!’
নাম শুনেই চমকে ওঠে জয়ন্তি। -কে শুভেন্দু স্যার! ওকি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে! আশ্চর্য্য, গতকাল সারারাত শুভেন্দু স্যারকেই তো স্বপ্নে দেখেছিল! যেন কতদিনের চেনা, কত ঘনিষ্ঠ, কত আপনজন। যুগলবন্দী প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতো বসন্তের স্নিগ্ধ বাতাসে দোলায়িত কৃষ্ণচূড়ার গাছেরপাতার আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া একফালি সূর্য্য কিরণের ছায়ায় নির্জন নিরিবিলিতে পুস্প বাগিচার সবুজ মখ্মলে ঘাসের প’রে পাশাপাশি দুজনে বসে সেই কত কথা, কথার আলাপন, কত হাসি-কলোতান স্যারের সাথে। শেষ হয়েও হয় না শেষ। চারদিক নীরব, নিস্তদ্ধ। দিগন্তবিস্তৃত রেশমী জোছনায় অতন্দ্র মায়াবী রাতের মোহময় ভালোলাগা আর ভালোবাসার বিশাল উপত্যকার মাঝে তন্ময় হয়ে দুজনেই ডুবে গিয়েছিল, হৃদয়-মন-প্রাণ শীতল করা সেই নির্জন নিস্তদ্ধতার গভীরে। কখনো বা হিন্দি ছবির রোমান্টিক নায়কের মতো উচ্ছাসে উতল হয়ে, মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি মেলে আস্বাদন করতে থাকে, সৌন্দর্য্যরে পারিজাত, মমতাময়ী বিদূষী রমণী জয়ন্তির বাঁধ ভাঙ্গা উত্তাল যৌবনের চমকপ্রদ রূপ। যেন তাঁর স্বপ্নের রাজকুমারী। চোখের পলক পড়েনা। বেমালুম পোহায়ে যায়, আত্ম মুগ্ধতায় আবিষ্ট করে রাখা বিনিদ্র রজনীর কত অগণিত প্রহর। তার রেশ যেন এখনো কাটেনি। সুস্পষ্ট জীবন্ত হয়ে দু’চোখের পাতায় ভাসতে থাকে।
একেই বলে সংযোগ। এক অদৃশ্য আকর্ষণ। তবু নিজের কানদুটোকে কিছুতেই বিশ্বাস হয়না জয়ন্তির। বিস্ময় আর খুশীর সংমিশ্রণে মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ থেমে একটা ঢোক গিলে ফ্যাস্ ফ্যাস্ শব্দে বলল,-‘কি- কি ব্যাপার স্যার! ভালো আছেন?’
পাল্টা প্রশ্ন প্রফেসার শুভেন্দুর,-‘শরীর খারাপ না কি জয়ন্তি? আর ইউ ও.কে?’ 
শুনে থ্ হয়ে যায় জয়ন্তি। আশ্চর্য্য, ওঁর কণ্ঠে কি আবেগ, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা! যেন কতদিনের সম্পর্ক! কত আপনজন! বিশ্বাসই করা যায় না! পরক্ষণেই উচ্ছাসিত কণ্ঠে জয়ন্তি বলে ওঠে,-‘নো স্যার, আই এ্যাম ও.কে! হোয়াট’স্ দ্যা নিউজ?’
-‘ভাবলাম, শুভ সংবাদটি তোমায় এবার দিয়েই দিই!’
কিন্তু শুভ সংবাদটি যে কি, তা আর বোঝার অপেক্ষা রাখে না। সীমাহীন আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে জয়ন্তি। তবু স্যারের মুখ থেকে শুভ সংবাদটি শোনবার ইচ্ছাটুকু কিছুতেই সম্বরণ করতে পারে না। বিস্মিত হয়ে বলে,-‘কি সংবাদ স্যার?’
সহাস্যে প্রফেসার শুভেন্দু বললেন,-‘আই এ্যাম ভেরী গ্যাল্ড্ টু সে, ছাত্রীদের মধ্যে একমাত্র তুমিই ইন্টেলিজেন্ট্, ব্রিলিয়ান্ট এ্যান্ড সিন্সিয়ার। উই নো এ্যান্ড হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিওর দ্যাট, ইউ উড্ উইন এ্যান্ড সাক্স্সে ইন ইওর লাইফ্। প্রিন্সিপাল সাক্সেনার রিকমেন্ডেই তোমার স্কলারশীপ্ গ্রান্ড্ হয়ে গিয়েছে। তুমি খুব শীঘ্রই রসায়ন বিজ্ঞানে পি.এইচ্.ডি করতে বিলেত যাচ্ছো। উই আর সো প্রাউড অফ্ ইউ। এভ্রিথিং হ্যাজ বিন্ কন্ফার্মড্। বি রেডি নাও। সি ইউ, বাই।’
মুহূর্তে সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল জয়ন্তির। অব্যক্ত আনন্দে স্পীচ্লেস হয়ে পড়ে। তখনও ওর কানে বাজে, ক্ষণপূর্বের টেলিফোনে অন্তরঙ্গ আলাপনের প্রফেসার শুভেন্দুর আবেগপ্রবণ কণ্ঠস্বর। ছড়িয়ে পড়ে মস্তিস্কের কোষে কোষে। প্রতিবিম্বের মতো ধীরে ধীরে ওর মনঃশ্চক্ষে ভেসে ওঠে, চড়–ইভাতির অন্যতম আনন্দের সেই দৃশ্যপটের একখন্ড স্মৃতি আর স্যারের সাথে নির্জন অন্ধকারে যুগলবন্দী হয়ে থাকার কয়েকটি মুহূর্ত। যা কখনো ভোলার নয়। একদিকে বিদেশ যাত্রার অসীম আনন্দ, উল্লাস, অন্যদিকে ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের ছেড়ে যাবার বিচ্ছেদ-বেদনা। স্পেশালী প্রফেসার শুভেন্দুকে। যাকে মনে প্রাণে শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। যে সবার চেয়ে আপনজন। 
কথাটা মনে হতেই বুকের ভিতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে জয়ন্তির। অনুভব করে এক ধরণের কোমল বেদনাময় অনুভূতির তীব্র জাগরণ। যা রক্তের স্রোতের মতো ক্রমশ শরীরের সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলিতে সঞ্চালণ হতে থাকে। শিথিল হয়ে আসে সারাশরীর। হাত-পা অসার হয়ে আসছে। কোনো শক্তিই নেই ওর শরীরে। রিসিভারটা রেখে বিমূঢ়-ম্লান হয়ে ধপাস করে বসে পড়ে সোফায়। আনন্দ-বেদনার সংমিশ্রণে মন-প্রাণ বিষন্নতায় ছেয়ে যায়। পলকহীন নেত্রে শূন্যের মাঝে চেয়ে থাকে। হঠাৎ সুরের মূর্ছণায় একটি পাখী কাতর কণ্ঠে ডেকে উঠতেই চমকে ওঠে। চেয়ে দ্যাখে, বিরামহীন স্নিগ্ধ বাতাসে দোলায়িত একটি বিশাল পাইনগাছের ডালে বসে সাথী হারা অবলা পাখীটি নিঃসঙ্গতায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। চকিতে মনের আঙ্গিনায় এক অদ্ভুদ নীরব নিস্তদ্ধতায় ছেয়ে যায় জয়ন্তির। যা ওর মনে প্রচন্ড রেখাপাত করে। ওকে করে দেয় গভীর নিমগ্ন, উদাসীন। অথচ তা কত বেদনাদায়ক, কত হৃদয়বিদারক। তবু বর্নণাহীন এক অনবদ্য ভালোলাগার অনন্ত গভীরে নিমজ্জিত হয়ে থাকে। যা দৃষ্টিগোচর না হলে জয়ন্তির কখনো মালুম হতো না, মনুষ্য জীবনে একাকীত্বের নিঃসঙ্গতা কত দুর্বিসহ, কত মর্মান্তিক, কত কষ্টকর। যখন বিরহকাতর মানুষ একান্ত আপনজনকে হারিয়ে একেলা নির্জনে নির্বাসিত জীবন যাপন করে। 
অস্থীর হয়ে ওঠে জয়ন্তি। হঠাৎ কক্ষচ্যুত উল্কার মতো হষ্টেল ছেড়ে ছুটে বেরিয়ে আসে রোজ-গার্ডেনে। উন্মুক্ত নীলাকাশের নীচে মন-প্রাণ শীতল করা প্রকৃতির বিশুদ্ধ বাতাসে দাঁড়িয়েও সারাশরীর ঘর্মসিক্ত হয়ে ওঠে। ঘেমে একেবারে চুপসে গেছে গায়ের জামা-কাপড়। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে একটি বেঞ্চিতে গিয়ে চুপটি করে বসে থাকে। ভিতরে ভিতরে টের পায়, ওর মন-মানসিকতার আমূল পরিবর্তন। অথচ কয়েকমাস আগেও যিনি ছিলেন জয়ন্তির সম্পূর্ণ অজানা, অচেনা, অপরিচিত একজন অজ্ঞাত কূলশীল ব্যক্তি। যিনি রসায়ন বিজ্ঞানের গবেষক। সারাদিনে বেশীরভাগ সময় ল্যাব্রোটারীতে পড়ে থাকেন। তখন তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের মানুষ। একাগ্রহে নিমগ্ন হয়ে রির্সাচ করেন। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও তাঁর কর্ণগোচর হবেনা। ওঁর নাগাল পাওয়া বড়ই দুস্কর। পাবার সম্ভাবনাও নেই। আর পেলেই বা, প্রফেসার শুভেন্দু ওর হয় কে? ওঁর সাথে সম্পর্কই বা কিসের? একজন শিক্ষক আর ছাত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক যেটুকু থাকা প্রয়োজন, সেটুকুই। এর বাইরে তেমনভাবে আলাপচারিতা তো দূর, মনের মধ্যে এরূপ চেতনাও আগে কখনো উদয় হয়নি। কিন্তু আজ, এ কি হয়ে গেল জয়ন্তির! ইট্ ইস্ ইম্পসিবল! আনথিংকেবল! 
আসলে, মানুষের মন বড়ই বিচিত্র। শতচেষ্টা করেও পোষ মানানো যায়না। কখন যে হৃদয় নামক ভ্রমরা কোন বাগিচায় গিয়ে উড়ে বসবে, বোঝা মুশকিল। তদ্রুপ প্রফেসার শুভেন্দুর সংস্পর্শে যাবার পর থেকে একটা মুহূর্তও আর স্বন্তিতে পারে না জয়ন্তি। রাতেও ঘুমোতে পারে না। দু’চোখ বুজে এলেই অদ্ভুদ এক শিহরণে শিহরিত হয় সারাশরীর। জাগ্রত হয়, অত্যাশ্চর্য্যময় এক অভিনব অনুভূতি। যার নাম ভালোবাসা। যা হিসেবের দাড়িপাল্লায় কখনো  মাপা যায় না। যার কোনো ওজন নেই। সীমা নেই। আয়তন নেই। আছে শুধুমাত্র অসীম গভীরতা। 

( চার)

হঠাৎ কেমন বদলে গেল জয়ন্তি। ওর হৃদয় প্রাঙ্গন ভর করে বসে প্রেমের ভূত। কারণে অকারণে প্রফেসার শুভেন্দুর সন্নিকটে যাবার চেষ্টা করে। যতক্ষণ আশে-পাশে থাকতো, কোনো না কোনো বাহানায় গা ঘেষতে চাইতো। কিন্তু পারেনি। শতচেষ্টা করেও পারেনি নিলর্জ্জ বেহায়ার মতো ইউনিভার্সিটির নির্জন নিরিবিলিতে ধর্ণা দিয়ে স্যারের মনের ঠিকানা খুঁজে বের করতে, তাঁকে বিভ্রান্ত করতে। তাঁর পথ অবরোধ করতে। পারেনি ছলনাময়ী মেয়েদের মতো বিচিত্র ইশারায়, মুখাবয়বে, অঙ্গ-পতঙ্গের নানার ভঙ্গিমায় মনের ভাব প্রকাশ করতে, ভালোবাসার সংকেত প্রেরণ করতে। 
অগত্যা, নিজের আবেগ-ইচ্ছা-অনুভূতিকে অন্তরের অন্তঃপুরে পুষে রেখে গহীন অনুভূতি দিয়ে দৃঢ়ভাবে শুধু এটুকুই উপলব্ধি করে, অতীতে মায়ের উদৃত ভবিষ্যৎবাণী নিতান্তই বাস্তব সত্য। মানুষ সত্যিই ভালোবাসার পূজারী। সৃষ্টির অমোঘ নিয়মে বসন্ত ঋতুতে বাগিচায় যেমন ফুল ফোটে, তেমনি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের হৃদয়পটেও জন্ম নেয় ভক্তি-শ্রদ্ধা-আদর-স্নেহ-মমতা এবং ভালোবাসা। পৃথিবীর সমগ্র পুরুষ জাতির প্রতি যে ধারণা মনের মধ্যে পুষে রেখেছিল, তা সম্পূর্ণ ভুল, সব মিথ্যে। আর সেই মিথ্যে আবরণ হৃদয় থেকে সড়ে যেতেই জয়ন্তির সুকোমল হৃদয়পটভূমিতে জন্ম নেয় ভক্তি-শ্রদ্ধা, প্রেম-ভালোবাসা। সী ইস্ ইন লাভ। 
অবলীলায় প্রফেসার শুভেন্দুকে সত্যিই হৃদয় দিয়ে ভালোবেসে ফেলেছে জয়ন্তি। হ্যাঁ, প্রফেসার শুভেন্দুকে সত্যিই সে ভালোবেসে ফেলেছে। প্রেম যমুনার অতল তলে আজ ও’ হাবুডুবু খাচ্ছে। কিন্তু এর কিইবা মূল্য আছে। এ তো সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন, ভিত্তিহীন, অর্থহীন। অহেতুক বিড়ম্বণা। চাওয়া-পাওয়ার মিথ্যা আকাক্সক্ষা। স্বেচ্ছায় নিজেকে কষ্ট দেওয়া। 
অবশেষে নিজের ইগোর কাছে পরাস্ত হয়ে সংকল্পচ্যুত এবং আবেগ-অনুভূতিহীন জয়ন্তির নিরস নি¯েপ্রম হৃদয়ে যে  ভালোবাসার জন্ম নিয়েছিল, তা অঙ্কুর হয়ে গজিয়ে ওঠার উঠতেই দুঃস্বপ্ন ভেবে বিনষ্ট করে দেয়। পারেনি তা হৃদয়পটে ধারণ করতে। আর সেই অপারগতার ব্যর্থতার কারণে একরাশ মনবেদনা নিয়ে বিদেশ যাত্রার প্রস্কুতি শুরু করে দেয়। স্কলারশীপ্ নিয়ে রসায়ন বিজ্ঞানে পি.এইচ.ডি করতে যথারীতি পৌঁছে যায়, ওর পরম আকাক্সিক্ষত স্বপ্নের দেশ লন্ডন, ইংল্যান্ড। অথচ বিদায়বেলায় একগোছা রজনীগন্ধা হাতে নিয়ে প্রফেসার শুভেন্দুই বিমান বন্দরে ওকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন। অপ্রত্যাশিত যার দর্শণে নিবিড়তম আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেও জয়ন্তি পারে নি উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় একটি শব্দও উচ্চারণ করতে। পারেনি নিজেকে স্বেচ্ছায় ধরা দিতে। পারেনি ভালোবাসা নামক চিরসত্য ও পবিত্র শব্দটি মুখ ফুটে উচ্চারণ করতে। এক ধরণের শূন্যতাবোধে মনের অব্যক্ত কষ্ট বেদনাগুলি তরল হয়ে দু’চোখর কোণায় চিক্চিক্ করে ওঠে। মনে মনে বলে, কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের নিমেষে আকাশ পাড়ের দূর নীলিমায় অদৃশ্য হয়ে যাবে। হয়তো জীবনে আর কোনদিনও দেখা হবে না। হবার সম্ভাবনাও নেই। জীবনে চলার পথে ক্ষণিকের সীমাহীন সঞ্চিত ভালোলাগা আর ভালোবাসাটুকুই শুধু রয়ে যাবে ওর স্মৃতির গ্রন্থিতে, অদৃশ্য এক অনুভূতিতে। অথচ মাত্র কয়েক ফুট দূরত্বের ব্যবধানে প্রফেসার শুভেন্দু দাঁড়িয়ে ছিলেন। সপ্রশংস দৃষ্টি মেলে অস্ফূট স্বরে শুধু বলে ছিলেন, -‘আমরা আশাবাদী জয়ন্তি। উর্ত্তীণ তুমি হবেই! ভালো থেকো।’
ইতিপূর্বে জয়ন্তির গভীর সংবেদনশীল দৃষ্টির দিকে চোখ পড়তেই ছাপা অক্ষরের মতো না বলা কথাগুলি ওর সুস্পষ্ট ফুটে ওঠে। মুহূর্তের জন্য মনকে দুর্বল করে দিলেও নিজেকে সামলে নিয়েছিলন প্রফেসার শুভেন্দু। বিষন্ন একটা হাসি ফুটিয়ে-‘ও.কে জয়ন্তি, বেষ্ট অফ্ লাখ। টেক্ কেয়ার।’ বলে অবিলম্বে বিমান বন্দর থেকে প্রস্থান করেন। 
জয়ন্তি নীরব, নির্বিকার। লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে প্রফেসার শুভেন্দুকে যতক্ষণ দেখা গিয়েছিল, বিষন্ন দৃষ্টি মেলে সেদিকেই তাকিয়েছিল। হঠাৎ চোখের আড়াল হতেই নিজেকে শান্তনা দিয়ে মনে মনে বলে, একান্তে নিঃভৃতে নিবিড় করে নাই বা পেলাম, তবু আভিজাত্যসম্পন্ন এবং মার্জিত পুরুষ শুভেন্দু স্যারের অকৃত্রিম হাসির অম্লান স্মৃতিটুকুই নয় চিরদিন জড়িয়ে থাকবে ওর কোমণ অনুভূতিতে। এও কি কম! ভাবাই যায় না! কল্পনারও অতীত! কিন্তু কতদিন! লন্ডনে পৌঁছেই নানান ব্যস্ততায় ধীরে ধীরে একদিন ভুলে যাবে প্রফেসার শুভেন্দুকে। বেমালুম ভুলে যাবে অতীতের একখন্ড সঞ্চিত আনন্দময় স্মৃতির মুহুর্তগুলিকে। হয়তো একদিন ওর স্মৃতির পাতা থেকে সর্ম্পূণ নিশ্চিহ্ন হয়ে সব মুছে যাবে।
কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। ইংল্যান্ড পৌঁছে জয়ন্তি পারেনি প্রফেসার শুভেন্দুকে ওর হৃদয় থেকে অপসারিত করতে, তাঁকে ভুলে যেতে। পড়াশোনায় বিজি থাকলেও দিনের শেষে একখন্ড অবসরে গভীর তন্ময় হয়ে বিচরণ করে, ওর মনগড়া এক স্বপ্নলোকে, এক নতুন পৃথিবীতে। কখনো জাগরণে, কখনো স্বপনে। তখন নিশুতি রাত। গভীর নিদ্রায় ঢলে পড়ে আকাশ বাতাস গোটা পৃথিবী। ঘুমন্ত শহর। চারদিক নিঝুম। দূরে রাস্তায় গাড়ির শব্দ শোনা যাচ্ছে। জানলা দিয়ে দ্যাখে, পশ্চিম দিগন্ত জুড়ে নীলাভ জ্যোৎ¯œার ঢল নেমেছে। আর সেই পূর্ণিমার চাঁদের উজ্জ্বল রেশমী জোছনার আলোয় স্নিগ্ধ বাতাসের সুগন্ধ্যে নিমজ্জিত জয়ন্তি অনুভব করে, ওর সুকোমল অঙ্গে মৃদুস্পর্শে কার যেন হস্ত সঞ্চালণ হচ্ছে। কি নিদারুণ একটা কোমল অনুভূতি! যা শরীরের সাথে লীন হয়ে জয়ন্তি আস্বাদন করতে থাকে, ভালোলাগার মধুর আবেশ। ছুঁয়ে যায় ওর হৃদয়পটভূমি। শিহরিত হয় মন-প্রাণ, সারাশরীর। শুনতে পায় ফিস্ ফিস্ শব্দ। চোখ তুলে তাকাতেই প্রফেসার শুভেন্দু দুহাত প্রসারিত করে ওকে প্রেমালিঙ্গনে টেনে নেয়। ধীরে ধীরে জয়ন্তি নিঃসংকোচে নূয়ে পড়ে প্রফেসর শুভেন্দুর প্রশ্বস্ত উষ্ণ বক্ষপৃষ্ঠে। এমনি করেই নীরব নিস্তব্ধে পোহায়ে যায় কত অগণিত প্রহর। না জানি কতক্ষণ! একসময় ঘুম ভেঙ্গে যায় জয়ন্তির। চোখ খুলে দ্যাখে, ও’ একাকী শুয়ে আছে বিছানায়। আশে-পাশে কেউ নেই। সকাল হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ। বেলা দশটা বাজে। রুটিনমাফিক শুরু হয়ে গিয়েছে ব্যস্ততাময় প্রাত্যহিক জন জীবন। তবে কি এতক্ষণ সব স্বপ্ন দেখছিল জয়ন্তি! 
মায়ের মুখে শুনেছে, ভোরের স্বপ্ন কখনো বিফলে যায়না। বাস্তবে তা রূপান্তরিত হয় বৈকি। কিন্তু তাই বা সম্ভব হবে কেমন করে! নেভার, ইম্পসিবল্। প্রফেসার শুভেন্দু কখনো ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা তো দূর কখনো ওর মুখের দিকেও চোখ তুলে তেমনভাবে চেয়ে দ্যাখেন নি। ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কখনো হাসি-ঠাট্টাও করেন না। তা’হলে কেন এমন স্বপ্ন দেখা? কেনইবা ওঁর প্রতি চুম্বকের মতো আসক্তি হয়ে নিজেকে কষ্ট দেওয়া? জীবনকে দুর্বিসহ করে তোলা? কিসের মোহে এ মায়া মরীচিকা ছল্? কেন? কিসের জন্যে? সবই কি শুধু মনের ভ্রম?
স্বাভাবিক কারণে মনটা হঠাৎ বিষন্নতায় ছেয়ে যায় জয়ন্তির। বিছানা ছেড়ে উঠতেই ইচ্ছে করছে না। আর উঠেইবা করবে কি! অল্ এ্যাক্সজামিনস্ হ্যাজ বিন ডান। শুধু রেজাল্ট আউটের অপেক্ষা মাত্র। কিন্তু হঠাৎ প্ল্যান প্রোগ্রাম সব বদলে যায় জয়ন্তির। মনস্থির করে দেশে ফিরে যাবে। কিন্তু সেখানে যে একটি বড় সারপ্রাইজ্ নিউজ ওর জন্যে অপেক্ষা করে আছে, তা স্বপ্নেও কখনো এস্পেক্ট করতে পারেনি।  
পরিকল্পনা অনুযায়ী যথারীতি উড়ো জাহাজ থেকে বিমান বন্দরে অবতরণ করে জয়ন্তি। চেকিং সেড়ে করিডোর দিয়ে বের হতেই ভুত দেখার মতো চমকে ওঠে। বুক ধুক্ ধুক্ করে ওঠে। হৃদস্পন্দন আরো দ্রুতগতীতে চলতে শুরু করে।-এ কি, শুভেন্দু স্যার যে! উনি এইখানে? কোলকাতায় কি করছেন? আসলেন কবে? ওঃ মাই গড্! এ তো ভাবাই যায় না! স্বপ্নেরও অতীত!’
কিছু বুঝে ওঠার আগেই সকৌতূক হাস্যে দ্রুত এগিয়ে আসে ছোটবোন সায়ন্তী। চোখের ইশারায় হবু জামাইবাবু শুভেন্দুকে পয়েন্ট করে বলে,-‘শুভষ্য শীঘ্রম দিদি। কে এসেছে দ্যাখ্। চিনতে পারছিস? তোর মনের মানুষটাকেই নিয়ে এসেছি সঙ্গে। সারপ্রাইজটা কেমন দিলাম বল্ তো!’
জয়ন্তি আকাশ থেকে পড়ে। -বলে কি সোনু! এসব ও’ জানলো কিকরে! ফোনেও তো কখনো আলাপ হয়নি। তবে কি প্রফেসর শুভেন্দু এতদিন ধরে ওকে ওয়াচ করছিলেন? ও’কি অন্তর্যামী! নিশ্চয়ই সোনুকে সব বলে দিয়েছে। 
চোখেমুখে অপার বিস্ময় জয়ন্তির। বিস্ময়ে এতটাই অভিভূত হয়ে পড়ে, বড় বড় চোখ মেলে জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে হাঁ করে থাকে। আশ্চর্য্য, একজন রসায়ন বিজ্ঞানের প্রফেসর, তাঁর হৃদয়েও যে ইমোশন, ফিলিংস থাকতে পারে তা ওর ধারণাই ছিলনা। আচমকা অপ্রত্যাশিত আনন্দে দিশা হারিয়ে ফ্যালে। মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায। কিছুক্ষণ থেমে ক্ষীণ কণ্ঠে বলে,-‘মানে! হোয়াট ডু ইউ মিন সোনু? আর ইউ যোকিং? হাউ ইস দিস পসিবল? আমি তো কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না!’ 
হাতের কনুই দিয়ে একটা গুঁতো মেরে সায়ন্তী বলে,-‘হুঁমঃ ন্যাকা! কিছুই বুঝতে পারছে না! ইট ইস কোয়েন্সিডেন্স? আই নেভার বিলিভ।’ মুচকি হেসে বলে,-‘মাই ডিয়ার সিষ্টার, ডোন্ট বী আপসেট! আই এ্যাম যাষ্ট যোকিং!’  
ঠোঁটের কোণে হাসির ঝিলিক দিয়ে উঠতেই মুহূর্তে মিলিয়ে গেল জয়ন্তির। এ্যাম্বেসিং ফিল করে। অপদস্থ হয় মনে মনে। লজ্জায় মাথা হেট্ হয়ে যায়। চোখ তুলে তাকাতেই পারেনা। সবার অলক্ষ্যে সায়ন্তীকে একটা চিমটি কেটে বলে,-‘সোনু ষ্টপ ইট। বিহেইভ ইওর সেল্ফ।’
এতক্ষণ বিবর্ণ মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাতা সুধাময়ী। টেনশনে কত কিইনা ভাবছিলেন মনে মনে। কিন্তু জয়ন্তির পজিটেভ বিহেইভ লক্ষ্য করে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। চোখেমুখেও উচ্ছাসিত আনন্দে খুশীর ঝিলিক দিয়ে ওঠে। স্বহাস্যে জয়ন্তিকে বললেন,-‘ভগবান আমার প্রার্থনা শুনেছে। শুভেন্দু নিজে কোলকাতায় এসে প্রোপোস করেছে। পাত্র আমাদের খুব পছন্দ। আভিজাত্য এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিলং করে। পিতা স্বনামধন্য শ্রী শশাঙ্ক মুখুজ্জ্যে। যিনি দিল্লীর মেডিক্যাল কলেজের একজন ডিন ছিলেন। মাতা শ্রীমতি মৃন্ময়ী দেবী। ওদের একমাত্র সুযোগ্য পুত্র শুভেন্দু, বংশের প্রতীক, উত্তরাধিকারী। দিল্লীতে বিশাল বাড়ি। ছোট্ট পরিবার। কোনো ঝামেলা নেই। গতকাল ফোনও করেছিল শুভেন্দু। তুমি খাওয়া দাওয়া ঠিকমত করছো কি না, শরীরের প্রতি ঠিকমত যত্ন নিচ্ছো কি না, এ্যাক্সাম কেমন হোলো! তুমি আসছো জেনে সায়ন্তী ওকে জবরদস্তী সঙ্গে নিয়ে এসেছে। অমত কারো না।’
ফিস্ ফিস্ করে জয়ন্তি বলে,-‘হোয়াট এ সারপ্রাইজ সোনু? ইট ইস রিয়েলি রিয়েলি আনথিংকেবল, আনবিলিভএ্যবল্!’
একগাল হেসে সায়ন্তী বলল,-‘হী ইস্ ইমেইজিং! ভেরী নাইস পার্সন দিদি! দারুণ ম্যাচিং হবে। ইউ আর সো লাকি!’
ততক্ষণে জয়ন্তির সন্নিকটে এগিয়ে আসেন প্রফেসর শুভেন্দু। মৃদু হেসে বললেন,-‘কেমন আছো জয়ন্তি? কোনো অসুবিধে হয়নি তো!’
তখনও বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি জয়ন্তির। হঠাৎ প্রফেসার শুভেন্দুর কণ্ঠস্বরে চমকে ওঠে। একটা শব্দও উচ্চারিত হয় না। স্বপ্নের মতো মনে হয়। কিছুতে যেন বিশ্বাস হয়না। মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল, আকাশের চাঁদটাই বুঝি পেয়ে গিয়েছে হাতে। স্বলজ্জে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো চোখের তারাদুটিতে অব্যক্ত খুশীর ঝিলিক দিয়ে ওঠে। বিমান বন্দরে অবতরণ করেই আচমকা মিরাকলের মতো জীবনটা ওর এতখানি বদলে যাবে, তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। কখনো ভাবতেই পারেনি, ওর একান্ত কাক্সিক্ষত ভালোবাসার মানুষটিকেই এতো শীঘ্রই এতো অনায়াসে স্বামীরূপে জীবন দেবতার আসনে স্থাপন করবে। তাঁকে নির্জন নিঃভৃতে একান্ত আপন করে কাছে পাবে। ওর হৃদয় নামক বিশাল সাম্রাজ্যের আধিপত্য তাকেই সঁপে দেবে। 
আকাশকুসুম ভাবতে ভাবতে একরাশ আনন্দ আর লজ্জার সংমিশ্রণে চোখমুখ উজ্জ্বল দ্বীপ্তিময় হয়ে ওঠে। ভিতরে ভিতরে অসীম আনন্দে শিশির বিন্দুর মতো অশ্রুকণায় চোখের তারাদু’টো চিক্চিক্ করছে। হঠাৎ প্রফেসার শুভেন্দুর সাথে দৃষ্টি বিনিময় হতেই রাঙা মুখখানা ওর নূয়ে পড়ে। অস্ফূট হেসে জড়িয়ে ধরে মাতা সুধাময়ীকে। মায়ের গালে একটা চুম্বন করে বলে,-‘আই কান্ট বিলিভ ইট্ মাম! আই কান্ট বিলিভ! ইউ আর সো গ্রেট্! আই লাভ ইউ মাম্! আই লাভ ইউ!’ 
সমাপ্ত

টরোন্টো, কানাডা। 
যুথিকা বড়ুয়াঃ টরোন্টো প্রবাসী গল্পকার, গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পী।

jbaruajcanada@gmail.com