অটোয়া, বুধবার ১৯ জুন, ২০২৪
ঝরা পাতা - প্রদীপ কুমার দে

প্রবল বেগে ঝড় বয়ে গেল। গাছপালা মাথা নেতিয়ে পড়েছে যেখানে নদী সমূদ্র একেবারে উত্তাল, আকাশের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে আমি একটি ঝড়া পাতার মত উড়ে গেলাম। একেবারে উড়ে চলেছি থিতু হওয়ার আশা ছেড়েই।

এত ভালো লেগেছিল বর্ণাকে, যে আমি একেবারে উন্মাদের অবস্থা আমার। আরো ভালো লেগে গেল ওর ঐকান্তিকতা দেখে। ও হাত ছুঁয়ে দিল, শিহরণ জাগিয়ে রোমান্টিকতার প্রলেপে। আমি ওর চোখে এক আকর্ষনীয় ঝলকে চমকে উঠেছিলাম। ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমাতে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে আমি একটা ঘোরে থাকতাম।
-ঘুম আসে না আর - চলে গেছে কোথাও!

চোখ মুখ বিষন্নতায় মোড়া বর্ণার।
-আমারও। চলো প্রতিবন্ধকতার মৃত্যু ঘটাই।

আমি স্বাক্ষর করি ওর ইচ্ছার দলিলে।

ঘটনা এই দুই পরিবারের অনেক অমিল। এত জটিলতায় সুস্থিতির কোন অবকাশ নেই। বিবাহ অনস্বীকার্য নয়, বরং যুদ্ধাপরাধ ।

এত ঝড় সামলেও দুজনায় ঝাড়্গ্রামের এক নিরালা অঞ্চলে পৌঁছে গেলাম। খুঁজে পেয়ে গেলাম এক প্রাচীন কালী মন্দির। ইপ্সিত লক্ষ পূরণের জন্য আমার লক্ষ্মীকে বরণ করে নিতে গেলাম।

মন্দিরটি প্রাচীন। জঙ্গলে জঙলী লতাপাতায় আবর্তিত। দুজনায় অতি আনন্দে আগেপিছে না ভেবে ভিতরে ঢুকে গেলাম। তেমন কিছু না পেয়ে খোদাইয়ের কালীমূর্তির হস্তের খড়্গ থেকে শুকিয়ে যাওয়া কিছুটা সিঁদুর নিয়ে আমি আমার সেন বংশের মধ্যম পুত্র কুনাল স্ত্রী মেনে বর্ণার সিঁথি রাঙিয়ে দিলাম। বর্ণা এইভাবে বিয়ে মানতে না পারলেও খুশিতে ভরিয়ে নিল ওর চোখ মুখ।

দুজনায় একটা গাছের নীচে বসে পড়লাম। ওর সিঁথিতে আমার দেওয়া সিঁদুর আর হাতে শাখা -পলা। ও আমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে রইলো।

সব আশা মেটে না -কিছু পরেই উঠে পড়তে হল।
বেরিয়ে আসছি, সিঁড়িতে বর্ণা- উরি বাব্বা! -করে চিৎকার করে উঠলো। আমি সজোরে ওর হাতটা চেপে ধরলাম- কি হয়েছে?

উত্তর পাওয়ার অপেক্ষা করতে হলো না, দেখলাম একটা মোটা কালো লতা ঝরা পাতার উপর দিয়ে খসখসে আওয়াজ তুলে এঁকেবেঁকে পালাচ্ছে। আমি ভয়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম।

এরপর বড় করুণ। অনেক চেঁচামেচি হৈচৈ করে কয়েকজনকে পেলাম। অনেক দূরে সাস্থ্যকেন্দ্রে যখন পৌছোলাম তখনই ডাক্তারবাবু বর্ণার নাড়ি টিপে ঘাড় নেড়ে দিলেন - সব শেষ! 

সত্যি সব শেষ হয়ে গেল চোখের সামনে। সব্বাইকে ছেড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম আমাদের বিয়ের অমতের কারণে।
একটা হঠাৎ আসা ঝড় আমার জীবনটাই লন্ডভন্ড হয় গেল। বড় মুখ নিয়ে শহরে ফেরার পথ বন্ধ হলো ।
আর  সেই থেকেই আমি ঝরা পাতার মতোই ভেসে বেড়াচ্ছি একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে!
-সব শেষ। 

প্রদীপ কুমার দে
কোলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ