অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
মুক্তিযুদ্ধের গল্প অন্বেষী রাফিয়ার যুদ্ধ দেখা - আরিফা আশরাফ তামান্না

 প্রতিবার ঢাকা থেকে সিলেট গমনের পূর্বে রাফিয়াকে পরিকল্পনা করে তালিকা প্রস্তুত করতে হয়। রওয়ানা দেয়ার পাঁচদিন পূর্ব থেকে ওর খাতা-কলমের মধ্যে অন্যরকম বোঝাপড়া শুরু হয়ে যায়। ১-২০ পর্যন্ত , এভাবে উপর থেকে নিচের দিক দিয়ে বিশটি কাজের তালিকা তৈরি করে । এক মাসের ছুটিতে তালিকাভুক্ত দশটির বেশি কাজ করা যায় না, সে তা জেনেও বেশি পরিকল্পনা করে রাখে কারণ তার ভাবনা লক্ষ্য বেশি থাকলে কিছুটা হলেও এগোনো সম্ভব।
এবারের একটি পরিকল্পিত কাজ হলো গ্রামের বয়স্ক পুরূষ-মহিলাদের থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে জানবে এবং এক একটি বাস্তব কাহিনীকে গল্পাকারে লিখবে। আর কোনো কাজ হোক আর না ই হোক সে এই কাজটি করবে, ইনশা-আল্লাহ।
বুধবার রওয়ানা দিতে হবে। শুক্রবার মা কে নিয়ে গ্রামে হাঁটতে বের হবে । ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস। কিন্তু এমনিতেই কোনোদিকে বের হতে হলে কাজ শেষ হয় না, তার মধ্যে সকালবেলা উঠে নাশতা তৈরি করা, ছেলে দু'টোকে প্রস্তুত করা, স্বামী শামীমকে ঘুম থেকে জাগানো, তাকে প্রস্তুত হতে সাহায্য করা, নিজে প্রস্তুত হওয়া, ব্যাগ গুছানো সবই এই এক জোড়া হাত দিয়ে করতে গেলে নিজের উপর চাপটা বেশিই পড়ে যাবে। তাই তারা জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসে বুধবার দুপুর ২ টায় রওয়ানা হবে ।
বাবার বাড়ি এলে আলসেমির ভূতটা রাফিয়ার মাথা চেপে বসে। কর্মব্যস্ত জীবনের চাকরি, সংসারকর্ম সব ছেড়ে এসে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকতে মন চায় কেবল। মা সায়মা বেগমও যে তেমন! মেয়ে, নাতি দু'টোসহ জামাইকে বছরের শেষে পেয়ে যেন তাঁর শরীরের সব রোগ চলে যায়, হারিয়ে যাওয়া শক্তি দ্বিগুণ হারে জীবন্ত হয়ে ওঠে! তাদের কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে সব কাজ ই মা করে দেন। রাফিয়া মা কে বাধা দিতে গিয়েও যখন মানেন না তখন ভাবে সে নিজেই কেবল নয়, যে কোনো মেয়ে এলেই মায়ের অবস্থা এমন হয়! নিজেকে প্রশ্ন করে,' জগতের সব মা কি এমন? নাকি আমার মা অন্যরকম! অন্যরকম হওয়ার কারণেই বুঝি আলসেমিটা মাত্রাতিরিক্ত হয়! '
শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর। কম্বলের সাথে যুদ্ধ করে রাফিয়া ঘুম থেকে উঠলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার লোভ সামলাতে না পেরে । বাপ-বেটাদের ঘুমে রেখে মা কে সাথে নিয়ে গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। ফসলের মাঠে কুয়াশা একপ্রস্থ চাদর, রাস্তার দু'পাশে সারি সারি গাছের মাঝে সূর্য উকি দিচ্ছে। শীতকালে গ্রামের এসব রূপ রাফিয়ার খুব পছন্দের। শহরে এ সৌন্দর্য দেখা যায় না, তাও আবার ঢাকার মতো রাজধানী শহরের জন্য তা কল্পনা করাই যায় না। রাফিয়া মা কে বললো,'তুমি না বলেছিলে কোন মুক্তযোদ্ধার বাড়িতে নিয়ে যাবে?'
- হ্যাঁ যাবো, অনেক মুক্তির বাড়িই এখানে আছে। আজ তোমাকে মুক্তিযোদ্ধা হাসান সাহেবের বাড়িতে নিয়ে যাবো।'
মা কে অনুরোধ করে গ্রামের বড় রাস্তা দিয়ে না গিয়ে খেতের আলের মধ্য দিয়ে হাসান সাহেবের বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো তারা। কচুক্ষেত, শাকক্ষেত, ধানক্ষেত প্রভৃতির একটির চেয়ে অন্যটি ভিন্ন, যাই চোখে পড়ছে তা দেখে রাজধানীর ইটকাঠে আবদ্ধ মন আনন্দে হচ্ছে উদ্বেলিত!
মিষ্টি রোদ, সকালের সদ্য ওঠা সূর্য হাসান সাহেবের বাড়িকে বেশ আকর্ষণীয় করে তুললো রাফিয়ার চোখে। বাড়িটি অনেকটা ছোট বাংলোর মতো দেখতে। বেশ বড় উঠোন, একপাশে ফুলের বাগান, অন্যপাশে একটি গাড়ি রাখার মতো জায়গা নিয়ে গ্যারেজ। রাফিয়াদের বেশ ঝামেলা পোহাতে হলোনা। তাদেরকে দেখে বেরিয়ে এলেন মুক্তিযোদ্ধা হাসানের ছোট ভাই জাহান সাহেবের স্ত্রী জামিলা খাতুন।
জামিলা খাতুন সসম্মানে তাদেরকে ঘরে নিলেন। ঘরে ঢুকেও রাফিয়া বেশ অবাক হলো। গ্রামাঞ্চলের ঘর-বাড়িতে এমন আভিজাত্যের ছোঁয়া তার ভীষণ ভালো লাগে। নিজেরও এমন একটি বাড়ি করার শখ বহুদিনের। ড্রয়িংরুমের আভিজাত্য, শিল্পনন্দন ভাবটা দেখে বুঝাই যাচ্ছে পরিবারের মানুষগুলোর রুচিবোধ আছে। শৈল্পিক ডিজাইনের আভিজাত্যময় একটি সোফাসেট, ওই ঘরের প্রবেশ পথের কোণায় দেয়ালের রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বড় আকৃতির স্ট্যাডি পিতলের প্রদীপদানি। প্রদীপদানির ওপরে দু'দিকের দেয়ালের সঙ্গে বসিয়ে দেয়া কাঠের কারুকাজ করা আয়তাকৃতির আয়না। মেঝেতে রাখা পিতলের হুঁকোর শো-পিস। সিলিংয়ে বসিয়ে রাখা স্পটলাইট। রাফিয়া দেখলো স্পটলাইটের আলোটাও আকর্ষণীয়, হলুদাভ রঙের। সমস্ত ঘরের সাদা রঙের সাথে সামঞ্জস্য রেখে লাইটিং, লেটেস্ট থ্রিডি টিভি, শো-পিস, বেড সিট, পর্দা, কার্পেট, অ্যাকুরিয়াম ইত্যাদি ; সব দেখে মনে হলো বড়লোক এরা। সমস্ত বাড়িটিতে আভিজাত্যের ছোঁয়া।
জামিলা খাতুন চা নিয়ে এসে হাজির। চা খেতে খেতে রাফিয়া দেয়ালে লাগানো ফ্রেমে একজন গোঁফওয়ালা তরুণ যুবক এবং তার কোলে ৫-৬ বছরের একটি মেয়ের ছবি নির্দেশ করে জামিলা খাতুনকে জিজ্ঞেস করলো,'উনি কে?'
- মুক্তিযোদ্ধা হাসান আহমেদ। আর কোলে যে মেয়েটা দেখছেন সে উনার অনেক আদরের ছোট বোন। রাফিয়া মনে মনে তাই ধারণা করেছিলো।
-উনার সম্পর্কে কিছু বলতেন যদি। অর্থাৎ জানতে চাচ্ছিলাম যে উনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন কীভাবে বা অনুপ্রেরণার উৎস কী?
জামিলা খাতুন 'আসছি' বলে অন্য ঘরে গেলেন। রাফিয়া খেয়াল করলো, একটি ১৮-১৯ বছরের মেয়ে স্মার্টফোন হাতে আর কানে হেডফোন লাগিয়ে অন্য ঘর থেকে বের হলো। তাদেরকে দেখে পরিচিত হতে এগিয়ে আসলো। পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে ছোট নাকি সে। ২ ছেলে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী আর ২ মেয়ের ভালো ঘর দেখে বিয়ে দেয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে জামিলা খাতুন দু'টি ডায়েরি হাতে উপস্থিত হলেন। একটিতে মুক্তিযোদ্ধা হাসানের নিজের হাতের লেখা ছেঁড়া কয়েকটি পৃষ্টা সযত্নে রাখা। যুদ্ধে থাকাকালীন নিজের সম্পর্কে লিখেছিলেন। লেখা দেখেই বুঝা যাচ্ছে অবিন্যস্ত করে লেখা, যখন যেভাবে পেরেছেন লিখেছেন।অন্যটিতে জাহান সাহেবের হাতে হাসানের ঐ লেখাগুলো গুছিয়ে লেখা।
রাফিয়া যখন ডায়েরিটা খুললো তখন থেকে ওই মেয়েটিও ঝুঁকে পড়তে শুরু করলো। বুঝা গেলো অত্যাধুনিক যুগের মোহে অন্ধ হয়ে ওসব লেখা পড়ার উৎসাহ বোধ করেনি এতোদিন।আজ রাফিয়ার উৎসাহ দেখে একটু ইচ্ছে হয়েছে হয়তো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ইচ্ছেটাও দেখা গেলো ঊধাও হলো। মেয়েটি চলে গেলো সেখান থেকে।
রাফিয়া পড়তে গিয়ে ভাবলো মনোযোগ সহকারে বসে পড়া যাবেনা এখানে। তাই তাদের কাছ থেকে ডায়েরিগুলো চেয়ে নিয়ে এলো দু'দিনের মধ্যে ফেরত দিয়ে দেবে বলে।
রাফিয়ার তর সইলোনা। বাড়িতে এসেই ডায়েরিগুলো পড়া শুরু করলো। সন্ধ্যার পর নিজে গুছিয়ে লিখলো হাসানের কথাগুলো।
" আমি হাসান। সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার ইতি ঘটলো। মা-বাবা,দুই ভাই এবং, এক বোন মিলে সুখের রাজ্য আমাদের। বাবা আলাল মিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আর জমিজিরাত দেখাশোনা করেন। মা রাইসা বিবি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ নিয়ে সংসারের হাল ধরেন। ভাই জাহান আহমেদ এবার মেট্টিক দেবে। রামিসা, বোনটা আমার কলিজার টুকরা, পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। বাড়িতে যতক্ষণ থাকতাম ততক্ষণ পিছন পিছন ঘুরতো আমার। আমিও বড় আদরে আগলে রাখতাম। হঠাৎ জীবনে এমন ধস নেমে আসবে ভাবিনি কখনো। ভাগ্যকে বিশ্বাস করতাম না, ভাবতাম নিজের মধ্যে ই তো সমস্ত পৃথিবী বসবাস করে। কিন্তু ভাগ্য আর কর্ম যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এখন ঠিক ই অনুভব করছি।
পাকসেনারা জেলা শহরটাকে দখল করে গ্রামের দিকে এগোচ্ছে। গ্রামগুলোতে ওদের তান্ডব চলছে। তাদের কর্মকান্ড শুনলে সকলে শিউরে উঠি। নিরীহ,নিরস্ত্র মানুষগুলোকে এলোপাথাড়ি মারছে। নিষ্পাপ, ফুলের মতো শিশুগুলোও রেহাই পাচ্ছেনা। প্রতি ঘরের কিশোরী থেকে যুবতী সবাইকে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, নিজেদের পশুত্বের তান্ডব চালিয়ে পরে হত্যা করছে। সব খবরই কানে আসছে, কিন্তু পরিবারের মায়া, মায়ের বাধা সবকিছু আমাকে কাপুরুষ করে রেখেছিলো।
আদরের বোনটাকে বুকে আগলে ঘুমিয়ে আছি শঙ্কিত মন নিয়ে। রাত একটা নাগাদ দরজায় শব্দ হলো 'ঠক ঠক ঠক....।'
ভীষণ ভয় পেলাম। এবার মরা ছাড়া উপায় নেই বুঝি। খুলতে গিয়েও বোনটির দিকে তাকিয়ে বারবার থেমে যাই। বসে পড়লাম। দোয়া-দরুদ পড়তে লাগলাম। দরজায় ডাকার শব্দটা আরও তীব্র হলো, 'হাসান, হাসান '। কণ্ঠটা অতি পরিচিত লাগলো কিন্তু এ মানসিকতায় মানুষটাকে চিনতে পারছিলাম না। এরপরও আল্লাহর নাম জপতে জপতে দরজা খুলতেই লায়েক এসে ধপাস করে আমার বুকের সাথে তার বুক লাগিয়ে জড়িয়ে ধরলো। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়! সাথে সাথেই খেয়াল করে লায়েক দরজাটা লাগিয়ে আসলো। হাঁপাতে হাঁপাতে কিছুই বলতে পারছিলোনা। আমি এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলাম।
লায়েক আমাদের গ্রামেরই ছেলে। আমার সমবয়সী, খবরের কাগজ বিক্রেতা। তার আধো আধো অস্পষ্ট কথাগুলো থেকে বুঝলাম, হায়েনারা তার মা-বাবাকে হত্যা করে দু'বোনকে নিয়ে গেছে। সে পারেনি কাউকে রক্ষা করতে। ভাগ্যক্রমে তার ওপর ছোড়া গুলি মিস হয়ে যায় এবং সে পালিয়ে আসে। চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। বোনটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কী মায়ামাখা মুখ! এমন কত আদরের বোন ই না হারাচ্ছে কত ভাই! বোবার মতো বসে ছিলাম কতক্ষণ। আকাশ ভারি করে খান খান শব্দে গুলি, মেশিনগানের আওয়াজ আসছে। লায়েকের দিকে তাকালাম। বললো,'কী করবি?'
-ভেবে পাচ্ছিনা।
-আয় না, আমার তর সইছেনা। প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে অন্তরে।
চোখ মুছলো লায়েক। পাশের ঘরগুলোতে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম। মা-বাবা ঘুমে। জাহান এপিঠ-ওপিঠ করছে। মাথায় একটু নাড়া দিলাম। বললাম,'আমি বাইরে যাচ্ছি, তুই এদিকটা দেখিস।' ওর বুঝার বাকি রইলোনা। আমাকে বাধা দিলো প্রথমে, বাধা না মানায় সাথে আসতে চাইলো। কিন্তু পরিবারের দিকে খেয়াল রাখার কথা বলে ঘুমন্ত বোনটাকে আবার আদর করে, মা-বাবাকে এক পলক দেখে বেরিয়ে পড়বো এমন সময় লায়েককে বললাম,'কোনো অস্ত্রতো নেই। সঙ্গে কী নেব?' লায়েক বললো,'এইতো মাইল দেড়েক পরেই মুক্তিবাহিনীর একটি শিবির আছে। ওখানে গেলেই সব ব্যবস্থা হবে। চল, কপালে যা রাখে আল্লাহ।'
মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিলাম। অস্ত্র চালনা শিখলাম, কয়েকদিন প্যারেড চললো, রাইফেল ট্রেনিং হলো। আমি খুব সহজেই বেশ ভালোভাবে রপ্ত করতে পারায় সার্বিক দিক বিবেচনায় সকলে আমাকে কমান্ডারে রাখলো। কিন্তু সমস্যা একটাই, আমাদের অস্ত্রের সংকট। সব স্থানেই মুক্তিদের এই এক সমস্যা! তবুও এগিয়ে যাওয়ার পণ করলাম।
শুনলাম পরদিন ঘুম থেকে জেগে বোনটি আমার অনেক কেঁদেছে। পুরোপরি না বুঝলেও সে মা'র কান্নায় এটাই বুঝেছে যে তার ভাইকে নিষ্ঠুর হায়েনারা বাঁচতে দেবে না। মায়ের আহাজারি দেখে বাবা নাকি শক্ত থাকার অনেক চেষ্টা করেও লুকিয়ে কেঁদেছেন। আর জাহান, ভাইটি আমার ওর নিজের কথাতো বলেনি। সেও হয়তো দুশ্চিন্তায় কাঁদছে। রামিসা খাতায় আঁকিবুঁকি করে ভাইকে চিঠি লেখার চেষ্টা করেছে! জাহানের মাধ্যমে অনেকটা পাঠিয়েছেও। অনেক যত্ন করে রেখেছি কাগজগুলো পকেটে।
অনেক নতুন নতুন রাইফেল, আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। সোমবার। আমাদের যাত্রা দক্ষিণের দিকে। পাক-বাহিনীর সাথে আজ লড়াইয়ে অবশ্য আরাম লাগবে। অস্ত্রগুলো দেখেই ইচ্ছে হচ্ছে ওদের কয়েকটাকে ফেলে দেই।
সেদিনের লড়াই শেষে এসে দেখি জাহান খাবার নিয়ে এসে টিফিন বক্সের ভিতর ভাতের উপরে একটি চিঠিও রেখেছে।চিঠিতে দেখলাম, গতকাল নাকি জাহান বাইরে থেকে ফিরে পিছনের দরজা দিয়ে পাশের রুমে ঢুকে দেখে পা ছড়িয়ে মা কাতরাচ্ছেন আর বলছেন, ‘তোর বাবাকে দেখ না বাবা, রামিসা কোথায় গেল? ওকে দেখ না, দ্রুত দেখ।' জাহান বুঝে উঠতে পারছিলো না কী করবে। পাশের ঘরে রামিসার গোঙানি শুনা যাচ্ছে। সে এগিয়ে যা দেখলো তাতে মাথায় রক্ত উঠার উপক্রম হলো। সে বিছানার নিচে রাখা বন্দুকের বাট দিয়ে নীরবে মানুষরূপী পশুটার মাথায় একের পর এক আঘাত করলো। পশুটা কাম-লালসায় তার পশুত্বে এমন বিভোর ছিলো যে, জাহানের উপস্থিতি টের পায়নি। আঘাতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলো। জাহান নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলো না। গুলি ছুড়লো হায়েনাটার মাথায়। মারা গেলো ওখানেই। জাহান সাথে সাথেই ফার্স্ট এইড বক্স খুলে সবার সেবা করতে লাগলো। মায়ের ডান পায়ে গুলি লেগেছে। পারলোনা বাবাকে বাঁচাতে। অজ্ঞান রামিসা এবং কাতর মা’কে নিয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়ে ব্যবস্থা নিয়ে এসেছে। রামিসা কোনো কথা বলতে পারেনা। পশুর আক্রমণের ভর, বাবার মৃত্যু, মায়ের শারীরিক অবস্থা, প্রিয় ভাইয়ের অনুপস্থিতি এসব চিরকালের জন্য তার মুখের কথা কেড়ে নিলো, ব্রেন ড্যামেজড হলো, হারিয়ে গেলো স্মৃতিশক্তি। মা কোনোরকমে কেবল বেঁচে আছেন। বাবার দাফন কাজও দ্রুত সম্পন্ন করে নিয়েছে প্রতিবেশীদের সাহায্যে৷ মা আর রামিসার অসহায় দৃষ্টি বোধ হয় আমাকে খুঁজছে কেবল। আমি চোখের সামনে অগ্নিকুন্ড দেখছ! মাথায় কে যেন হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে! চিৎকার দিয়ে উঠলাম, 'আর হবে না। আর হতে দেবো না।'
মন চাইলো তাদেরকে এক পলক দেখে আসি। তাই জাহানের মাধ্যমে বাবা যে টাকা পাঠিয়েছিলেন তা থেকে কিছু খাবার নিলাম ওদের জন্য। ফিরে আসতে মন চাচ্ছিলো না ওদের রেখে। রামিসাকে অনেক ডাকলাম, কথা বলে না, শুধু চেয়ে থাকে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে চোখের পানিতে বুক ভাসছে আমার। মা, উনিতো আরও অসহায়! হঠাৎ স্বামী হারানো, আমার অভাব, নিষ্পাপ মেয়ের অকাল দুর্দশা এসব মাকে অসহায় করে রেখেছে। অসহায় চোখ দু'টির দিকে তাকিয়ে বড় মায়া হলো। আর জাহান, সে তো আরও অসহায়! শয্যাশায়ী দু’জন মানুষকে নিয়ে তার কষ্টের সীমা নেই। তবে তাকে একটু আধটু সাহায্য করেন পাশের বাড়ির জামিলার মা।
মা আমাকে উৎসাহ দিলেন, ‘যা বাবা, তোর মা-বোনের দিকে তাকিয়ে হাজার মা-বোনকে বাঁচাতে পারবিনা। বরং আমাদের এই অবস্থা যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তোর বাবার আত্মা, তোর মা-বোন শান্তি পাবে।'
মায়ের চোখের পানি টপ টপ.. করে পড়ছে।
গভীর রাতের অন্ধকারে একসময় বাইরে বের হতে ভীষণ ভয় পেতাম। কিন্তু আজ সেই অন্ধকার আমাকে ভয় পায়। শেল-মর্টার-ব্রাশফায়ারের আওয়াজ চতুর্দিকে যতই ঘনতর হচ্ছে, ততই আমার প্রতিশোধের আগুন শক্তিশালী হচ্ছে। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি, গ্রামটার যে অবস্থা। চেনা যাচ্ছেনা সহজে। সারাদেশেরই এমন অবস্থা!
শিবিরে এসে গাড়ি নিয়ে বের হলাম আমরা। কমান্ডে ছিলাম আমি। লড়াইয়ে লড়ছি আমরা। সাথে সেই সমবয়সী কাগজ বিক্রেতা লায়েকও।হঠাৎ কী ঘটে গেল আমরা বুঝতে পারলাম না, যদিও এর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। একটা গুলি এসে লায়েকের বুকে লেগেছে। এক হাতে বুকে চেপে ধরেছে, অন্য হাত দিয়ে আমাদেরকে লড়তে ইশারা দিচ্ছে। অন্যদেরকে সক্রিয় থাকতে বললাম। ওদিকে সাথীরা দুজন পাকিস্তানীকে ফেলে দিয়েছে। মৃত্যুর সঙ্গে ওরা পাঞ্জা লড়ছে দেখে লায়েক আমাকে বলল, 'আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করিসনা হাসান। ওই দুই কুকুরকে মরতে দেখে আমি শান্তিতে মরতে পারবো। তুই ওদেরক সাহায্য কর গিয়ে।'
আমি মুক্তিদের সাথে যোগ দিলাম। বাকী ছিল একটি কুকুর। ও আমাদের সাথে পেরে উঠছে না দেখে পালাতে লাগলো। এরপরও ছাড়া পায়নি। কাঁধে একটি গুলি লেগেছে ওর। লড়াই শেষ করে লায়েকের কাছে এসে দেখলাম সে চলে গেছে ওপারে। কষ্ট হয়েছিল, কিন্তু সহ্য করার মতোই। কারণ আরও অনেক আপনজনকে এর আগে হারিয়ে সহ্য করতে হয়েছে। মনে মনে ভাবছিলাম, হয়তো রাতে ওরা আমাদের উপর হামলা করবে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য, এমনটিই করে ওরা। তাই বাড়িতে গিয়ে আবার পরিবারের অসহায় মানুষগুলোর সাথে সাক্ষাৎ করে আসলাম। এই যে লিখছি, মনের ভাবনা থেকে ডায়েরীর পৃষ্ঠাগুলো ছিড়ে বুকপকেটে রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছি। যদি শহীদ হই তাহলে আমার আপনজনেরা এটা পাবে। সেদিন রাতও লিখতে বসেছি প্রতিরাতের মতো। প্রহরায় ছিলাম আমি আর অন্য একজন। দু'জন দু’দিকে। বাকী সবাই ঘুমে। লিখছি আমি। হঠাৎ মুখোশধারী দুই লোক এসে আমার নাক-মুখ বেঁধে নিল। আমি তাড়াহুড়ো করে কাগজটা পকেটে ঢুকিয়ে দিলাম। ভাগ্যিস, খাতার পাতাগুলো ছিড়ে রেখেছিলাম, না হয় খাতাটা সাথে আনতে দিতো না। কলমটিও লুকিয়ে সাথে এনেছি।
আমাকে নিয়ে এলো এক ছোট্ট অন্ধকার ঘরে। আরও অনেক নিরস্ত্র অসহায় মানুষগুলো এখানে বন্দী। মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি আর লিখছি। ভাবছি, কেউ না কেউ লেখাগুলো পাবে। দু’দিন হলো এখানে। এক এক করে অনেককে নিচ্ছে, আর ফিরিয়ে আনছেনা। জানি না কবে আমার পালা এসে যাবে।”
ডায়েরিতে আর কিছু লেখা নেই। রাফিয়া বুঝতে পারলো ওইদিনই হাসানের পালা ছিল। হাসতে হাসতে শহীদ হয়েছে হাসান, দেশকে স্বাধীনতা এনে দেয়ার লক্ষ্যে। হয়তো জানেনি দেশ স্বাধীন হওয়ার কথা।রাফিয়া লিখছে আর নিজের কাছে মনে হচ্ছে নিজের কাহিনী যেন লিখছে। পঁয়ত্রিশ বছরের নিজেকে ষাট বছরের বৃদ্ধা মনে হচ্ছে। ডায়েরিগুলো ফেরত দিতে গিয়ে রাফিয়া জানতে পারে, দু’দিন হাসান সাহেবের কোনো খবর না পেয়ে জাহান সাহেব বেওয়ারিশ লাশগুলোর মাঝে খুঁজে পেলেন উনাকে। উনার শার্টের ভিতরের পকেটে সযত্নে রাখা ছিল এই লেখা।
তিন বছর একা একা মা-বোনের সেবা করে দিন কাটায় জাহান, সাথে পড়াশোনাও। তিন বছরের মাথায় মা মারা গেলে জীবনযুদ্ধে লড়ার একজন সঙ্গীর প্রয়োজনীয়তা বোধ করে; যদিও আপনজনের সংখ্যা বাড়ানোর ইচ্ছা ছিলোনা হারানোর ভয়ে। বিয়ে করে নেয় কম বয়সেই। উনিশ বছর বয়সে গ্রহণ করে পনেরো বছর বয়সী জামিলা খাতুনকে। বোনটি তার অনেক কষ্টে দশ বছর বিছানায় থেকেছে। কষ্ট হয়েছে অনেক মেয়েটার। পরিবারের সকলেই ওরা যোদ্ধা। কেউ মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ, কেউবা পরোক্ষ আবার কেউবা জীবন যুদ্ধে সক্রিয়। পুরো দশটি বছর বিছানায় থেকে কষ্ট করে পনেরো বছর বয়সে পাড়ি দেয় ওপারে, সুখের খোঁজে।
জামিলা খাতুন সেই ছোট থেকেই হাসানদের পরিবারের ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষদর্শী। তাই গড়গড় করে সব বলে গেলেন রাফিয়াকে। এও বললেন যে, জাহানকে সরকারিভাবে অনুদান দেয়া হয়েছে। এছাড়া সে শিক্ষিত হয়েছে, টাকা রোজগারের হাতও তার প্রবল। রাফিয়া অবাকদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জামিলা খাতুনের মুখের দিকে, সাথে অবাকদৃষ্টি জামিলার মেয়েটারও। রাফিয়া নোট করে নিল সব। আরও অনেক গল্প লিখতে হবে তাকে। এভাবে আরও অনেক সংগ্রহ করবে। রাফিয়া উঠে আসার মুহুর্তে জাহান সাহেব এসে ঘরে ঢুকলেন। দেখে মনে হলো বয়স ষাট-পঁয়ষট্টি হবে। জামিলা খাতুন রাফিয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে জাহান সাহেব গর্ববোধ করে বলে উঠলেন, 'আমাদের মুক্তি পরিবার। আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ভাই। হারিয়েছি আপনজনদের, পেয়েছি স্বাধীনতা।' 

আরিফা আশরাফ তামান্না
সিলেট, বাংলাদেশ।