অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
অন্ধকার থেকে আলোর পথে - আলোর ঠিকানার যাত্রীরা

নয়ন চক্রবর্ত্তী -  ওরা থাকে অন্ধকারের ঠিক কাছাকাছি। পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই, পথচলায় নেই সুন্দর পথের কোন সাথী, চোখ খুললেই চারপাশের পরিবেশ টানতে চায় অন্ধকারের পথে-এমন পরিবেশে থেকেও তারা পেয়েছে ‘আলোর ঠিকানা’। যেখান থেকে একটু একটু করে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে তারা। বলছিলাম ‘আলোর ঠিকানা’য় ঠিকানা করে নেয়া সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কথা। গত তিন বছর ধরে চট্টগ্রাম রেল স্টেশন ও আশেপাশের সুবিধাবঞ্চিত বেশ কিছু শিশুকে বিনা খরচে প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। 

সরেজমিন প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনকালে দেখা যায়, চট্টগ্রামের পুরাতন রেল স্টেশন সংলগ্ন দুই কক্ষের একটি ঘরে চলছে আলোর ঠিকানার শিক্ষা কার্যক্রম। দরজার ঠিক উপরে প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে নামের আগে শোভা পাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের গানের একটি লাইন ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়..’। ভেতরে পা রাখতেই দেখা মিলল এক ঝাঁক কোমলমতি শিশুর। মাদুর পাতা মেঝেতে বসেই চলছে তাদের পড়ালেখা। বই হাতে পাঠ দিচ্ছেন শিক্ষক রনি দাশ। আর মুগ্ধ মনে তা শুনছে আলোর ঠিকানা’র সেই যাত্রীরা। দেয়ালে টাঙানো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোগী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁই, মাষ্টার দা সূর্যসেন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের প্রতীক নূর হোসেন এবং কবিয়াল রমেশ শীলের প্রতিকৃতি।

পথশিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার এ ঠিকানা তৈরির স্বপ্ন যিনি দেখেছিলেন তিনি হলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কবি ও সাংবাদিক ঋত্বিক নয়ন। দীর্ঘ ১৪ বছর দৈনিক আজাদীতে কর্মরত ছিলেন। সদ্য যোগ দিয়েছেন দেশ রূপান্তর, চট্টগ্রাম ব্যুরোতে। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ঋত্বিক জানালেন সেই স্বপ্ন ও আগামী দিনের পরিকল্পনার কথা।

আলোর ঠিকানা’র শুরুর কথা বলতে গিয়ে ঋত্বিক নয়ন বলেন, ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে পুরাতন রেল স্টেশনের পাশে একটি ঘরে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় হঠাৎ চোখে পড়লো ধুলোমাখা শরীর আর মলিন পোশাক পরিহিত চার-পাঁচটি ছেলেমেয়ের দিকে। কাজে  বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি ওদের। স্টেশনের আশেপাশে এমন ছেলে মেয়েদের প্রায়শ:ই দেখা যায়। এদের কেউ কেউ যাত্রীদের লাগেজ টানে, আর কেউ ছিঁচকে চুরি , পকেট কাটা, মাদক বিক্রিসহ নানা অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত। হঠাৎ মাথায় এলো অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকা সুবিধাবঞ্চিত এদের আলো দেখানোর যদি কোন একটি ব্যবস্থা করা যেতো! বিভিন্ন পেশায় জড়িত কয়েকজন বন্ধুর সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপের পর ইতিবাচক সাড়া পেলাম। পরের মাসেই ১৯ জন শিশু নিয়ে শুরু হলো আলোর ঠিকানা’র যাত্রা। তাদের হাতে তুলে দেয়া হলো বই, খাতাসহ অন্যান্য শিক্ষা সামগ্রী। এসব পেয়ে বেজায় খুশি তারাও। এদের দেখা দেখি দিনদিন বাড়ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। কেউ কৌতুহল থেকে নিজেরা আসছে; আবার কাউকে নিয়ে আসছেন বাবা-মা।



আলোর ঠিকানায় এসে এসব বাচ্চারা আলোর সন্ধান পাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এদের কঠোরভাবে মনিটর করা হয়, যাতে কোন ধরণের অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত না হয়। পাশাপাশি পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী করে তুলতে নেয়া হয় নানা কর্মসূচী। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে তাঁদের জন্য বিনোদনমূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করি।

আলোর ঠিকানার শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ঋত্বিক নয়ন বলেন, এখান থেকে যেসব শিক্ষার্থীকে সরকারি স্কুলে পাঠানো হচ্ছে তাঁদের যাবতীয় ব্যয় আমরা বহন করছি। নির্দিষ্ট একটি বয়সের পর তাঁদের যদি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করা যায়- তাহলে তাঁদের জীবিকা নির্বাহের একটি সুন্দর পথ হয় খুলতে পারে। তাই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে।

আলোর ঠিকানার বিভিন্ন আয়োজনে ইতোমধ্যে অতিথি হিসেবে এসেছেন দেশের শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক,বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ , পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা ডিআইজি শহীদুর রহমান, ডিআইজি মাসুদ উল হক, ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন,  জুনিয়র চেম্বার অব প্রেসিডেন্টের সভাপতি জসিম উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ। 

দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, আলোর ঠিকানা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে সমাজের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার প্রমাণ দিয়েছে। আমরাও যার যার অবস্থান থেকে এ কাজটি করতে পারি। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা আর আন্তরিকতার।

কণ্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, আমি অর্থের পেছনে কখনো ছুটিনি। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে যারা দাঁড়ায় তাদের সঙ্গে থেকেছি। যতটা সম্ভব সহযোগিতা করেছি। চট্টগ্রামেও অনুরূপ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জেনে আমি ছুটে এসেছি। আলোর ঠিকানার পাশে আছি, থাকবো। গানের এ রাজকুমার বলেন, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদেরও শিক্ষার অধিকার আছে। আলোর ঠিকানার বিষয়টি আমার হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। সমাজের সবাই যখন ভোগবিলাসী, তখন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্যে এ ধরনের একটিরব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমার ছোট ভাই ঋত্বিককে স্যালূট জানাই।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শহীদুর রহমান বলেন, বিত্তের সাথে চিত্তের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই সুবিধা বঞ্চিত হয়ে কোন মিশুকে বেড়ে উঠতে হয় না। আলোর ঠিকানা এক্ষেত্রে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা সকলেই যদি সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে পারি তবেই এ দেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হবে, সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারের পাশাপাশি আলোর ঠিকানার উদ্যোক্তাদের মতো সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ যতটুকু সম্ভব এ সমাজের জন্য করে যাওয়ার আহবান জানান তিনি।

এডিশনাল ডিআইজি সুজায়েতুল ইসলাম তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, যেখানেই থাকি, আমি সবসময় তোমাদের সাথে আছি। আমার জন্ম বেড়ে উঠা গ্রামে। নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আমার এ পর্যায়ে আসা। আমি বিশ^াস করি, তোমরাও এ দেশের নাগরিক। তোমাদের পূর্ণ অধিকার রয়েছে দেশের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করার। কখনোই হীণমন্যতাকে মনে ঠাঁই দেবে না। দশ তলায় থাকা গাড়ি চড়ে বেড়ানো ঐ শিশুটির সাথে তোমার কোন পার্তক্য নেই। আমরা সবাই মহান আল্লাহতালার সৃষ্টি। তাই মনে জোর রাখবে,অন্যের চেয়ে তুমি কম কীসে?  লেখাপড়া করতে হবে, মানুষের মতো মানুষ হতে হবে।

আলাপকালে স্কুলের শিক্ষক রনি দাশ জানালেন, রেল স্টেশনের আশেপাশে থাকা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ করে দেয়ার প্রয়াসে তিন বছর আগে ঋত্বিক দা’র হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় আলোর ঠিকানা’র । মাত্র ১৯ জন শিশু নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটির এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৬ জন। গত দুই বছরে এ প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ২০জন শিক্ষার্থীকে নগরীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়েছে বলেও জানালেন তিনি।

তিনি জানান, সপ্তাহে ছয়দিন শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হয়। বিকেল তিনটা থেকে প্রথম এক ঘন্টা পড়ানো হয় আরবী। এরপর বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন বই। প্রথম শ্রেণীতে পড়ার মত করে গড়ে তোলার পর স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয় তাদের। এসব শিশুদের পড়ালেখার যাবতীয় ব্যয়ও বহন করে ‘আলোর ঠিকানা’। প্রতি বছর তাদের দেয়া হয় শীতের ও ঈদের পোশাক। শুভাকাঙ্খীদের সৌজন্যে দেয়া হয় শীতের কম্বলসহ নানা সামগ্রী।

শিক্ষা আজ শিক্ষার জায়গায় নেই। শিক্ষা এখন বাণিজ্য হয়ে গেছে। কিন্তু ঋত্বিক নয়নের দাবি, “এতটুকু বলতে পারি, আলোর ঠিকানা, শিক্ষা বিক্রি না করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আলোকিত করে যাচ্ছে। কেননা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভালোবাসলে, তাদের পাশে দাঁড়ালে দেশ এগিয়ে যাবেই যাবে”। আমাদের সকলের প্রত্যাশাও তা-ই। ফিরে আসার সময় মনে মনে কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল। গুণগুণিয়ে অজান্তেই গাইছিলাম, ‘ও আলোর পথযাত্রী , এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না।”

নয়ন চক্রবর্ত্তী, সংবাদকর্মী
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।