অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
আন্তর্জাতিক নারী দিবস একটি মানবিক আন্দোলন এবং নারীর প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের ক্ষেত্র সৃষ্টি: - ফারজানা নাজ শম্পা

রেকটি নারী দিবস আমাদের দ্বারপ্রান্তে এসেছে। নারী দিবসের ইতিহাস নারী আন্দোলনের ইতিহাসের একটি গুরুত্ব পূর্ণ মাইল ফলক। নারীর মানবিক প্রত্যয় আর অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই দিন নারীকে সংঘবদ্ধ হবার এক সোনালী অতীতের কথা বলে। সভ্যতার প্রতিটি পর্যায়েই একজন নারীর ক্রমাগত অধিকার, অবদান প্রায় অনুচ্চারিত থেকেছে বা খাটো করে উপস্থাপিত হয়েছে। ঘরে বাইরে নারী নিরন্তর শিকার হয়েছেন নির্যাতন, বিভাজন ও বঞ্চনার। এই রকমই এক বঞ্চনার প্রেক্ষাপটে ১৮৫৭ সালে যুক্তরাষ্টের নিউয়র্কে সুতা কারখানা নারী শ্রমিকরা তাঁদের প্রতি কর্মঘন্টা ও মজুরি বৈষম্য, কাজের অমানবিক পরিবেশের প্রতিবাদের ঐক্যবদ্ধ হরে এই দিন পথ নেমেছিলেন। তাঁদের এই আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য চলে নির্মম পুলিশি লাঠিচার্জ। এই আন্দোলনের আদর্শের পরম্পরায় ১৯০৮ সালে নিউ ইয়র্ক এ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষ থেকে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্ব প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হলো। নারীর অধিকার প্রশ্নে এর পর ১৯১০ সালে সতেরোটি দেশের ১০০ জন নারী প্রতিনিধির সমন্বয়ে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন এ দ্বিতীয় নারী সম্মলনে অনুষ্ঠিত হয়। এই আয়োজন ক্লারা এই দিবসটি নারী দিবস রূপে ঘোষনা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯১১ সাল থেকে এই দিবসটিকে 'নারীর সম অধিকার' দিবস হিসেবে কয়েকটি দেশ পালিত হয়। ১৯১৪ সাল থেকেই অনেক দেশে এই দিনটি নারী দিবসে হিসেবে পালিত হতে শুরু করে। ১৯৭৫ সালে পূর্ণ ভাবে জাতিসংঘ এই দিবসটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস রূপে স্বীকৃতি দান করে।

নারী ও শিশুর  প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ , নারীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্ম ও মজুরি বৈষম্য ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় মূল প্রতিপাদ্য রেখে জাতিসংঘ এই দিনটিকে পালন বিশেষ আয়োজনের উদযাপন করে আসছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এই দিনটিতে নারী উন্নযন মূলক সংগঠন গুলি নানা কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, যা নারীর প্রতি বিরাজমান বৈষম্যের প্রবাহে সামান্য হলেও যেন আশার বাণী শোনায়। তবে নারী আন্দোলন একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসলেও এখন পর্যন্ত এক শুন্যতার বলয়ে পর্যবাসিত। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পাশাপাশি প্ৰকৃত অর্থে নারী মুক্তির লক্ষ্যে পরিবার ও সমাজের সর্বত্রই নারীর প্রতি সার্বিক ভাবেই একটি ইতিবাচক মনোভাবের ক্ষেত্র সৃষ্টি বিশেষ প্ৰয়োজনীয়। বর্তমানে বাংলাদেশ সহ উন্নয়নশীল ( ক্ষেত্র বিশেষে উন্নত ) দেশে নারীর  কয়েকটি সামাজিক ও দৈনন্দিন বাস্তবতার দিক এক্ষেত্রে আলোকপাত করছি। নারীর স্বাভাবিক শারীরিক বাস্তবতার অজুহাতে অনেক সময় নারী কে দুর্বল, অক্ষম বা খাটো করে উপস্থাপন করার প্রয়াস চলে। মাতৃত্ব, প্রজনন স্বাস্থ্য, মাসিকজনিত হরমোন ভিত্তিক শারীরিক পরিবর্তন ইত্যাদি প্রাকৃতিক বাস্তবতা নারী কে পূর্নতা দেয়। এই দিকটির কোন লজ্জার বা সংস্কারের বিষয় নয়। বরং সেদিকে পূর্ণ সম্মান রেখে একজন নারী কে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। দেশে ও বিদেশে অনেক নারী কর্মীরা লৈঙ্গিক মানদন্ডে বেতন বৈষ্যমের শিকার হন। বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারী কর্মীরা তাঁর কর্ম পরিবেশে প্রজননমূলক, উৎপাদনমূলন স্বাস্থ্যর জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং সয়াহক পরিবেশ পাননা। আবার উন্নয়নশীল অনেক দেশেই নারীরা যারা পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন তাঁদের অনেকেই প্রায়শই পরিবারের সদস্য ও সমাজ থেকে নানা নির্যাতন, প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। পেশাজীবী অনেকেই প্রতিদিনের চলার পথে যৌন সহিংসতার ও হেনস্থার শিকার হন। উন্নয়নশীল ও উন্নত বিশ্বের নারী ও শিশুরা  প্রতিনিয়ত নানা মাত্রার যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন যা অনেক সময় তাঁদের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। অপরদিকে আরেকটি হতাশাব্যঞ্জক দিক হলো আধুনিকতার লেবাসে পুরুষতান্ত্রিক পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত সংষ্কৃতি তে বিভিন্ন গণ ও যোগাযোগ মাধ্যমে কুরুচিকর আনন্দ দানের প্রত্যাশায়  নারীরা ক্ষেত্র বিশেষে সস্তা বিনোদনের উপকরণ রূপে প্রদর্শিত হচ্ছেন। দুঃখজনক ভাবে অনেকে স্বদিচ্ছায় আর অনেক নারী বাধ্যহয়েই অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রয়োজনে এই ভাবে নিজেকে উপস্থাপন করছেন। বাংলাদেশে সহ উপমহাদেশের সর্বত্রই যৌতুকের প্রত্যাশায় নির্যাতনের কারণে প্রতিনিয়ত অকালের প্রান হারাচ্ছেন অনেক নারী ও কিশোরী। নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি মিছিল হলেও  উন্নয়নশীল অনেক দেশই জাতীয় নীতিতে নারীর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সমুন্নত রাখার বিষয়ে তেমন কঠোর আইন প্রয়োগ করা হয়নি।

নারী একজন মানুষ, আর নারী আন্দোলন নারীর মানবিক ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। নারী একদিকে একজন মা, বোন, কর্মী তেমনি অপরদিকে একজন বোধসম্পন্ন মানুষ। তাঁর প্রতি সমাজের, পরিবারের, নারী পুরুষের উভয়ের পক্ষ থেকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তৃতির ঘটানোর প্রয়োজন। নারীর যথাযথ মর্যাদা স্থাপন ও অধিকারের প্রশ্নে সকলকেই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এই জন্য যেমন প্রয়োজন নারী বিষয়ক সচেতনতামূলক শিক্ষার প্রসারের। অপরদিকে দরকার নারী উন্নয়ন প্রশ্নে সকল গোড়ামি, কুসংস্কার, অপব্যাখ্যার, অন্যায় মেনে নেবার সংষ্কৃতির অবসান।

ফারজানা নাজ শম্পা 
হ্যালিফ্যাক্স, কানাডা।