অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
অসমীকরণ (শেষ পর্ব) - শুভেন্দু_খান

অসমীকরণ (প্রথম পর্ব) পড়তে ক্লিক করুন
চেয়ারে বসে বসে প্রিয়ার কথাই ভাবছিলাম। একটা সময়ে প্রিয়াকে ভীষণ ভাবে ভালোবাসতাম। প্রিয়াকে ছাড়া কোনোকিছু ভাবতে পারতাম না। এত অল্প সময়ে প্রিয়া যে কি করে আমার সমস্ত মন জুড়ে বসলো জানিনা।
আমি তখন মেদিনীপুর কলেজে পড়ি। মেদিনীপুরে আমাদের চারপুরুষের বাস। বাবা সরকারি চাকরি করেন। যথেষ্ট উচ্চশিক্ষিত। মা'ও উচ্চশিক্ষিত। এমনিতে সেই সময় আমাদের অবস্থা খুব একটা সচ্ছল না হলেও টানাপোড়েন ছিলো না। প্রাচুর্য না থাকলেও অভাব ছিলো না। বনেদী শিক্ষিত পরিবার হিসাবে স্থানীয় বাসিন্দার কাছে একটা সুনাম ছিলো। বাবার ও সৎ মানুষ হিসাবে বেশ নাম ছিলো পাড়ায়। ছোটবেলা থেকেই দেখতাম অনেকেই বিভিন্ন ব্যাপারে বাবার সুপরামর্শ চাইতে আসতেন। সেই নিয়ে একটা প্রচ্ছন্ন গর্ববোধ ছিলো। আমরা দুই ভাই। আমি বড়। ভাই আমার চেয়ে চার বছরের ছোট। 
বাবা ছিলেন আদর্শবান পুরুষ। তেমনি রাশভারী। অন্যায় কে মেনে নিতে শেখেন নি। মাথা নত করতে শেখেন নি কারোকাছে। ছোটবেলায় বাবার সাথে কথা বলতে খুব ভয় লাগতো। যা কিছু আবদার, সব ছিলো মায়ের কাছে। মা বলতেনঃ
-মানুষ টা ওই রকম। নারকেলের মত। বাইরে টা শক্ত হলেও ভেতর টা খুব কোমল। 
পরে একটু বড় হয়ে বুঝতে শিখেছিলাম বাবা কে। মা, ঠিকই বলতেন। মানুষ টা ছিলো বড় কোমল। নীতি শিক্ষার প্রথম পাঠ বাবার কাছেই। প্রায়শই বলতেনঃ
-সৎ পথে থেকো সবসময়। কারো কাছে মাথা নীচু করতে হবে না। দুনিয়া আপনা হতেই তোমার কাছে নত হবে। নিজের উপর বিশ্বাস রেখো সবসময়। 
বাবা খুব পড়তে ভালোবাসতেন। বাড়িতে কত রকমারি বই আসতো। বইয়ের সাথে সম্পর্ক টা তাই সেই ছেলেবেলা থেকে। গল্প, কবিতা যা পেতাম গোগ্রাসে গিলতাম। আর এই থেকেই বোধহয় লেখালিখির সাথে একটা ভালোবাসা তৈরী হয়ে গিয়েছিল।
প্রিয়ার সাথে পরিচয় টা আমার মেদিনীপুর কলেজে। আমাদের সাথেই পড়তো। মৌখিক একটা আলাপ ছিলো, যেমন সব বন্ধু বান্ধবদের সাথে থাকে। একই ক্লাসে পড়ি, নোট আদানপ্রদান হয়। ব্যস, ওই টুকুই। বন্ধু মারফত শুধু এটুকু জেনেছিলাম যে প্রিয়ার বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। শহরে অনেকগুলি ব্যবসা আছে। অনেক উঁচু জায়গায় জানাশোনা। বেশ হোমড়াচোমড়া লোক। আসলে সেই সময় আমি নিজের মধ্যেই থাকতে বেশি ভালোবাসতাম। খাচ্ছি দাচ্ছি খেলছি ঘুরছি আর একটু আধটু সুযোগ পেলে দু একটা প্রবন্ধ লিখে যে সমাজে বাস করি, তার ই বুকে বসে দাড়ি ওপড়াচ্ছি। বেশ চলছিল। 
সেদিন ক্লাসের ফাঁকে বন্ধুদের সাথে পিছনের বেঞ্চে বসে গল্প করছি, কলেজ ম্যাগাজিনে কার লেখা কেমন হয়েছে, সেই নিয়ে গুলতানি চলছে। সুজয় কে বললামঃ
-কলেজ ম্যাগাজিনে লেখার মান কিন্তু নেমে যাচ্ছে। গতবারের লেখাগুলো বেশ ভালো ছিল। এবারে  একমাত্র দীপেশদা'র লেখাটাই ভালো লেগেছে। 
-কেন? আমাদের প্রিয়ার গল্প দুটো তো বেশ ভালোই লাগলো। 
-আমার কিন্তু তেমন লাগেনি। প্রথম গল্পের শেষ টা কেমন যেন খটমট লাগলো। 
ততক্ষণে বুঝিনি প্রিয়া কখন আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। 
-আমার গল্প যদি ভালো না লাগে, তাহলে না পড়লেই হলো। কেউ তো আর পড়ার দিব্বি দেয়নি। 
-না, তা দেয়নি। কিন্তু না পড়লে বুঝবো কেমন করে যে ভালো না মন্দ।
-এবার থেকে আর পড়তে হবে না। তুমিও তো দেখলাম একটা প্রবন্ধ লিখেছো। এটাকে কি প্রবন্ধ বলে? দেশের মুন্ডুপাত করে কি দেশ উদ্ধার করবে?
আমি প্রমাদ গুনলাম। ব্যাপারটা ঝগড়ার দিকে চলে যাচ্ছে। কথার রাশ টেনে বললামঃ
-তোমার দ্বিতীয় গল্পটা কিন্তু খারাপ নয়।
-থাক! হয়েছে! পারলে একটা গল্প লিখে দেখাও। তাহলে বুঝবো!
-আমি তো গল্প লিখি না। প্রবন্ধ লিখি। কয়েকদিন আগে একটা লিখেছি। তোমাকে দেবো। পড়ে দেখো। তবে এটাতে কারো মুন্ডুপাত করা নেই। 
প্রিয়া হেসে ফেলেঃ
-আচ্ছা দিও। পড়ে দেখবো। 
শুরুটা ছিলো এমনি ভাবেই। এরপর থেকেই লেখার আদানপ্রদানে সখ্যতা বাড়ে। প্রিয়া কিছু লিখলেই আমাকে আগে এনে দেখাতো। ভালো হয়নি বললে প্রিয়ার মুখ ভার হয়ে যেতঃ
-তোমার তো আমার কোনো কিছুই ভালো লাগে না।
-তা কেন? যে গুলো ভালো হয়, সেগুলো তো ভালোই বলি। 
-থাক! হয়েছে! আর বলতে হবে না! 
পরেরদিন আবার লেখাটাকে একটু বদল করে এনে দেখাতো।
এভাবেই কখন আমরা খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। ক্লাসের ফাঁকে নানান গল্প চলতো। ক্যান্টিনে আড্ডা, একসাথে বাড়ি ফেরা। দিন এগিয়ে চলে সময়ের স্রোতে।  
জয়েন্ট দিয়ে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ টা পেয়েই গেলাম। উত্তরবঙ্গে চলে যেতে হয়। প্রিয়া তখন বাংলা নিয়ে অনার্সকোর্সে পড়াশুনা করছে। আগেরমত আর দেখাসাক্ষাৎ না হলেও ছুটি তে যখন ই বাড়ি আসতাম, প্রিয়ার সাথে কথা হত। বিকালের কিছুটা সময় বরাদ্দ ছিলো প্রিয়ার জন্য। ওর নতুন লেখাগুলো আমাকে দেখাতো। আর আমি ছিলাম প্রিয়ার গুণমুগ্ধ পাঠক। 
ঠিক এমনি একটা দিন ছুটিতে বাড়ি এসেছি। বিকালে প্রিয়ার মুখ ভার। একেবারে চুপচাপ। 
-কি ব্যাপার! এত চুপচাপ। তোমার নতুন লেখা কোথায়? আজ যে একেবারে খালি হাত?
প্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেঃ
-আমার বিয়ের দেখাশোনা চলছে।
কথাটা ধক্ করে বুকে গিয়ে লাগে। আচম্বিতে কেউ যেন একটা তীক্ষ্ণ শলা বসিয়ে দেয় বুকে। এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।  এই প্রথম বুকে একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করি। কেমন যেন একটা যন্ত্রণা দলা পাকিয়ে ওঠে। প্রিয়ার কথাগুলো গোলগোল হয়ে মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে- "আমার বিয়ের দেখাশোনা চলছে"। 
-কি হলো, চুপ করে গেলে যে? কিছু বলছো না? 
-বেশ তো! ভালোই। 
-শুধু ভালো? আর কিছু বলার নেই?
প্রিয়ার হাত টা চেপে ধরে বলেছিলামঃ
-তুমি রাজি থাকলে আমি কিন্তু সারাজীবন তোমার পাশে থাকতে পারি। 
সেদিন অনেকক্ষণ আমরা একসাথে কাটিয়েছিলাম। সে ছিলো এক অন্য অনুভূতি। এক অন্য রকম ভালোলাগা। এমন অনুভূতি আগে কখনো হয়নি। আগে কখনো মনে হয়নি সমস্ত দুনিয়া টাকে এমন ভাবে হাতের তালুর মধ্যে পুরে ফেলা যায়। জীবনটাকে এমন ভাবে জয় করা যায়।
আমার হাতের আঙ্গুল গুলো নিয়ে খেলা করতে করতে প্রিয়া বলেছিলোঃ
-বাবা যদি রাজি না হয়।
-আমি নিজে গিয়ে তোমার বাবার সাথে কথা বলবো। 
-বাবা কে তুমি চেন না। অর্থ ছাড়া কিছু বোঝে না।
আমি হাসতে হাসতে বলেছিলামঃ
-তোমার বাবা তো বিজনেসম্যান। এমন হীরের টুকরো জামাই কে কি ফেলে দিতে পারবে? খুব লোকসান হবে কিন্তু!
আমার কথার ভঙ্গিতে প্রিয়াও হেসে ফেলে গালে একটা আলতো চিমটি কেটে বলেছিলঃ 
-হীরে না ছাই! একেবারে কাঠকয়লা!
কয়েকদিন পরেই আমাকে ফিরে যেতে হবে উত্তরবঙ্গে। তাই ঠিক হয়েছিলো দুদিন পরে রবিবার আমি প্রিয়ার বাড়ি গিয়ে ওর বাবার সাথে কথা বলবো। প্রিয়াও থাকবে সেদিন। 

*******

রবিবার সকালেই গিয়েছিলাম প্রিয়াদের বাড়ি। কলিংবেল বাজাতে প্রিয়াই দরজা খুলে দেয়। শুষ্ক মুখে বলেঃ
-ভেতরে এসো।
প্রিয়ার পেছন পেছন উপরে উঠে আসি। ড্রয়িংরুমে সোফায় বসার পর প্রিয়া বলেঃ 
-তুমি বসো। আমি একটু আসছি। 
খটকা লাগে মনে। একেবারে শুষ্ক অভ্যর্থনা। কথার মধ্যে সেই মিষ্টতা নেই, আপ্যায়নে সেই আন্তরিকতা নেই, প্রিয়ার মধ্যে সেই উচ্ছাস নেই, মুখে হাসি নেই। 
সোফায় বসে সুন্দর সাজানো গোছানো ঘরটা দেখছিলাম। দেয়াল জুড়ে বড় বড় অয়েল পেন্টিং। নানান মনীষীদের ছবি। একটা কাঁচের আলনায় খুব সুন্দর করে সাজানো সারিসারি বই। দেখে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম। 
একটু পরেই প্রিয়ার বাবা আসেন। উল্টো দিকের সোফায় বসতে বসতে বলেনঃ 
-প্রিয়া তোমার সব কথা আমাকে বলেছে। তুমিই অরিন্দম?
-হ্যাঁ।
-পদবি কি?
-মাইতি।
-কি করো? 
-ডাক্তারি পড়ি।
-কোন ইয়ার? 
-থার্ড ইয়ার
-ডাক্তারি পড়ে কি করবে?
এরম একটা প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। মুখে এসে গিয়েছিল -"ডাক্তারি পড়ে কি কেউ ওকালতি করে"? নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলিঃ
-পাশ করে নিজের একটা চেম্বার খোলার ইচ্ছে আছে। 
-মেদিনীপুরের অলিগলিতে এরম হাজার ভুঁইফোড় চেম্বার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটা মাছিও বসে না। 
ঠিক কি বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আর সে সুযোগ ও উনি দিলেন না। 
-শোনো, পরিষ্কার করে বলি। আমার এ বিয়েতে মত নেই। মেয়েকে বিয়ে দেবো, তা বলে জলে ফেলে দেবো না। তুমি কোনো অর্থেই আমার মেয়ের সমকক্ষ নও, না বংশগৌরবে না পদ মর্যাদায়। আমি নিশ্চয়ই চাইবো না আমার মেয়ে তোমাদের বাড়ি গিয়ে ঘর ঝাঁট দেবে।  প্রিয়ার বিয়ে আমি ঠিক করে ফেলেছি। এর পর আশাকরি তুমি প্রিয়া কে আর বিরক্ত করবে না। নইলে পুলিশে খবর দিতে বাধ্য হব। তোমার যদি আর কিছু বলার না থাকে তো আসতে পারো। 
কেউ যেন একটা শেল বিঁধিয়ে দিয়েছিল বুকে। লজ্জায় অপমানে মুখচোখ লাল হয়ে গিয়েছিল। বেশ বুঝতে পারছিলাম কপালের শিরা দুটো ফুলে উঠেছিল। অজান্তেই হাতের আঙ্গুল মুষ্টিবদ্ধ হয়েছিল। উঠে দাঁড়িয়ে চলে আসছিলাম। পেছন থেকে প্রিয়ার বাবার গলা শুনতে পাইঃ
-মিষ্টি টা খেয়ে যাও।
-মিষ্টিতে আমার এলার্জি আছে।
কথাটা বলে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে এসেছিলাম। 
সেই দিনটাই ছিলো প্রিয়ার সাথে শেষ দেখা। দুদিন পরে  প্রিয়া একটা ছোট চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলো যে এই বিয়ে তে বাড়ির কারো মত নেই। তার হাত পা বাঁধা। পারলে আমি যেন প্রিয়াকে ভুলে যাই। তারপর আজ এতদিন পর প্রিয়াকে দেখলাম বইমেলায়। 
হঠাৎ একপশলা দমকা হাওয়ায় চমক ভাঙ্গে। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। বারান্দায় আর বসে থাকা যাচ্ছে না। গাছের পাতায় আলতো আটকে ঝুলে থাকা হালকা কুয়াশা যেন একটু ঘনীভূত হয়েছে। সোডিয়ামের ফিকে হলুদ আলো যেন ধূসর হয়ে উঠেছে। বারান্দার দরজা ভেজিয়ে নিজের ঘরে আসি। টেবিল টা বড় অগোছালো হয়ে আছে। নানান ওষুধপত্র, কিছু সিরাপের শিশি, প্রেসক্রিপশন প্যাড, স্টেথোস্কোপ বিভিন্ন জ্যামিতিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে জায়গা দখল করে আছে। আজ আর ইচ্ছে করছে না টেবিল টা গুছিয়ে রাখতে। সেদিন দরজার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয়ার করুণ মুখটা বারবার ভেসে উঠতে থাকে এক অস্পষ্ট ছবির মত। বড় ক্লান্ত লাগছে আজ। বিছানায় এলিয়ে দিই শরীর। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে।

*******

আজ পাঁচ তারিখ। প্রিয়ার ছেলের অন্নপ্রাশন। মাঝে একটু দ্বিধান্বিত ছিলাম। যাবো কি যাবো না। যাওয়া টা ঠিক হবে কি হবে না। সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। হঠাৎ একদিন প্রিয়ার ফোন পাই। আমি তখন হসপিটালে রুগীদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। বিশেষ কথা হয়নি। প্রিয়া শুধু বারবার আসার কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছিল।
নেমন্তন্ন ছিলো দুপুরে। তাই আজ দুপুরের পর কোনো কাজ রাখিনি। ইচ্ছে ছিল দুপুরে অন্নপ্রাশনে উপস্থিতি দিয়ে বিকালের দিকে মেদিনীপুর ফিরে যাবো। মা-বাবা কে একটু দেখে আবার কাল সকালে কোলকাতায় ফিরে আসবো। 
সকালে কিছু রুগী দেখে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি। কমপ্লেক্সে পৌঁছে খুব অস্বস্তিতে পড়ি। এলাহী ব্যাপার। আমিও বিশেষ কাউকে চিনি না। রবাহূতের মত এদিক ওদিক কিছুটা ঘোরার পর প্রিয়াকে দেখতে পাই। প্রিয়া হাত ধরে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে আসে। ওর বরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। অল্পকিছু কথা হয়। তারপর ব্যস্ত হয়ে পড়ে অন্যান্য অতিথি আপ্যায়নে। 
খাওয়া দাওয়া সেরে প্রিয়ার সাথে একবার দেখা করে বেরিয়ে যাবো ভাবছিলাম, হঠাৎ প্রিয়ার বাবার সাথে দেখা। 
-অরিন্দম না! তোমার তো আজকাল খুব নামডাক। একনামে সবাই চেনে। 
মুখে কথাটা প্রায় এসে গিয়েছিল- "মাছি ভালোই বসে"। কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করালামঃ
-আপনি ভালো আছেন?
-তা আছি। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস দেখো! যে ছেলের অন্নপ্রাশনে তুমি লোক খাওয়াবে ভেবেছিলে, আজ তারই অন্নপ্রাশনে তুমি নিমন্ত্রিত অতিথি!  
শ্লেষ টা বুঝতে অসুবিধা হয় না। মুহূর্তে কথাটা খুঁচিয়ে ক্ষতটাকে রক্তাক্ত করে তোলে। বুঝতে পারি কপালের শিরা দুটো আবার ফুলতে শুরু করেছে। শান্ত ধীর অথচ কঠিন গলায় বলিঃ
- আপনি চিন্তা করবেন না। যার অন্নপ্রাশনে আজ খেতে এলাম, সেই ছেলেটি একদিন বড় হয়ে যখন জানবে তার অন্নপ্রাশনে কারা কারা নিমন্ত্রিত ছিলেন, তাতে আমার নাম শুনে গর্ব বোধ করবে। 
উত্তরের অপেক্ষায় না দাঁড়িয়ে বেরিয়ে আসি। হাইওয়ে তে উঠতেই ড্রাইভার গাড়ির স্পীড তোলে। প্রচন্ড গতিতে সারিসারি গাছপালা বাড়িঘর দ্রুত পিছে সরে যেতে থাকে। গাড়ির কাঁচে সামনের রাস্তাটা বড় ধূসর বলে মনে হয়, ঝাপসা দেখায়।  (সমাপ্ত)

শুভেন্দু_খান
কোলকাতা, ভারত।