অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
ধুচনি – তাপস দাস

বাঁকুড়ার ছাতনা থেকে শুশুনিয়ার দূরত্ব ১০ কিলোমিটার৷ বর্ষামঙ্গলের গানে দিন শুরু হয় এখানে, শেষ হয় জ্যোৎস্না রাতের অপার্থিব সৌন্দর্যে৷ বসন্তে পলাশের আগুনে আরও মোহময়ী হয়ে ওঠে শুশুনিয়া৷ একদিকে ইতিহাসের ঐতিহ্য, অন্যদিকে প্রকৃতির অপার ঐশ্বর্য, রয়েছে শাল-পিয়াল-আমলকির দিগন্ত বিস্তৃত শোভা। ১৫০০ ফুট উচ্চতার শুশুনিয়া পাহাড়ের নিচ দিয়ে বয়ে গিয়েছে গন্ধেশ্বরী নদী৷ সঙ্গে বাড়তি পাওনা ছোট ছোট প্রাকৃতিক ঝর্ণা। পাহাড়ের গায়েই রয়েছে প্রাচীন মূর্তি৷ যাকে নরসিংহ দেবতা বলে পুজো করে থাকেন স্থানীয়রা৷ কাছেই শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাসের বাসভূমি৷ পাশাপাশি কয়েকটা গ্রাম, হাদাল, নারায়ণপুর, নেতকমলা,বিন্ধ্যজাম। শাল-পিয়ালের ঘন জঙ্গল ভেদ করে সূর্যের আলোও ভাল ভাবে ঢুকতে পারে না। বন্য জীবজন্তুরা ঘুরে বেড়ায় এলাকায়। শুশুনিয়ার পাহাড় কোলে এমনই জঙ্গলের বুকে আদিবাসীদের গ্রাম শিউলিবনা। 

চামরুরা বেশ কয়েক পুরুষধরেই এখানকার আদি বাসিন্দা। চামরু জোয়ান মরদ। টানটান পেটানো চেহারা। পাহাড়ের জঙ্গল থেকে শুকনো শালপাতা আর কাঠ সংগ্ৰহ করে। বাপ দাদার শেখানো পেট চালানোর জীবিকা মনের আনন্দে করে। ভীষণ ভালো লাগে চামরুর পাহাড়ের জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে। খুব খিদে পেলে ঝর্না থেকে পেট ভরে জল খেয়ে, কোমরে গোঁজা বাঁশের বাঁশিটা নিয়ে বাজাতে থাকে। কোন এক বসন্তে চামরুর বাঁশির প্রেমে পড়ে ধুচনি। সেদিন চোখ বন্ধ করে বাঁশিতে সুর তুলছিল চামরু। কয়েকদিন পরেই 'খেরওয়াল তুখৌ’। সেই মেলায় আদিবাসী নাচের সাথে বাজাতে হবে চামরুকে। চোখখুলে সামনে অমন সুন্দরী দেখে পুলকিত হয়েছিল চামরু। অদ্ভুত তার রূপ, একেবারে বনবিবি। ডাগর ডাগর চোখ। বুকগুলো মত্ত যৌবনে ভরা। কানের পাশে লাল শিমুলটা জ্বলে উঠেছে যেন। এরপর রোজই দেখা হতো ওদের, পাহাড়ের ওপরে একান্তে। না, বনবিবির সামনে আদিমতায় মেতে ওঠেনি ওরা,কিন্তু প্রেম করেছে অদ্ভুত নিস্তব্ধতায়। ওদের পবিত্র প্রেমের সাক্ষী থেকেছে পাহাড়,জঙ্গল আর পাখিরা। মেলা শেষের দুইমাস পরেই ভরা পূর্ণিমায় ওদের 'বিহা' হয়ে যায়। আর গোটা শিউলিবনা মেতে ওঠে মহুয়ার নেশায়, মাদলের তালে। 

******

থেকে থেকেই পেটটা কামড়ে ধরছে। সকাল থেকে অনেকটাই হাঁটা হয়েছে। মেয়েটা কেঁদে কেঁদে পিঠেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমলকি গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে হাঁফাতে থাকে ধুচনি। শুকনো বুকটা হাড় পাঁজর বের করে হাপরের মতো ওঠা নামা করছে। মাথাটাও ঝিম ঝিম করছে। শক্তিহীন পা দুটো ছিঁড়ে পড়তে চাইছে। গাছের নিচেই বসে পড়ে ধুচনি। কোঠরে ঢুকে যাওয়া চোখ দুটো ক্লান্তিতে, খিদের জ্বালায় বুজে আসে।
'-- তুরা মরদটাকি ছাড়ি দে, বিবির দুহাই তুদের...
-- ইইই লকসা, শালী ....পোয়াত হইছে...বাঁন্ধ জোয়ানটারে শিমুল সনে...
-- দানা,মুর জুরুটোকে ছাড়ান দে ...উর পা টো ভারী হইছে..ছাড়ান দে উয়ারে....'
একটা কুকুরের ডাকে চমকে ওঠে ধুচনি, কতক্ষণ ঘুমিয়ে আছে বুঝতে পারেনা। মাথাটা ঝনঝন করছে। স্বপ্নটা মনে মনে ভাবতে থাকে। দানা,ঘনা,লদু এসেছিল সেদিন রাতে। ঘনার হাতে বন্দুক ছিল। ওরা চামরুকে ডাকতে এসেছিল। ওদের সর্দার আগেও ডেকেছে চামরুকে। চামরু যায়নি, বলেছিল ওইসব কাজ করতে পারবেনা। বনে বনে ঘুরে সরকারের লোক মারতে পারবেনা। ওরা বলে বিপ্লব। চামরু জানে শালপাতা কুড়িয়ে, কাঠ কুড়িয়ে হাটে বেচতে পারলে অল্পকিছু চাল কিনতে পারবে। পোয়াতি বউটাকে খাওয়াতে পারবে। কিন্তু ওরা শোনেনি,বারবার মারধোর করেছে চামরুকে দলে টানার জন্য। সেদিন হাত ছাড়িয়ে রাতের আঁধারে পালাতে সক্ষম হয়েছিল ধুচনি। বেশ কিছু পরে বাজ পড়ার আওয়াজ শুনেছিল যেন পরপর দুবার। পাথরের খাঁজটাতে আড়াল করেছিল নিজেকে, আর ওর পেটে বাড়তে থাকা চামরুর সন্তানকে। রাতের শেষে সূর্য ওঠার অনেক আগে শিউলিবনা গ্রামের আকাশটা লাল হয়ে উঠেছিল সেদিন। ধুচনি পাহাড়ের ওপরে গাছের আড়ালে থেকে ঝাপসা চোখে দেখেছিল শুধু। বুকফাটা কান্নাটাকে গলা টিপে আটকে রেখেছিল,পাছে ওরা শুনতে পায়। ওর পৃথিবী জ্বলছে,ওর মরদ বোধহয় রক্তে ভেসে গেছে। সঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ধুচনি আর ওদের আগত সন্তানের ভবিষ্যৎ।

প্রায় একবছর হয়ে গেছে,ধুচনি মেয়েকে নিয়ে বনে জঙ্গলে কাটাচ্ছে। মাঝে মাঝে নীচে নেমে যায়। শহর থেকে ছোট ছেলে মেয়েদের পাহাড়ে ওঠা শিখতে নিয়ে আসা দলগুলো যখন আসে। তখন কিছু ভাত জোটে। কিন্তু তা কয়েকদিনের জন্য। বাকি সময় প্রায় না খেয়েই কেটেছে। অপুষ্টিতে বুকের দুধও শুকিয়েছে। কোলের মেয়েটা হঠাৎ হঠাৎ কেঁদে ওঠে খিদের জ্বালায়। প্রাণপণে ওর মুখটা চেপে ধরে ধুচনি। বনবিবির কাছে বাঁচার আকুতি করে। দুচোখের জলও শুকিয়েছে। বহুবার চেষ্টা করেছে সবার অলক্ষে গঞ্জে পালিয়ে যেতে। কিন্তু প্রতিবারই ভয়ে শিউরে উঠেছে,নীচে শোনা বিক্ষিপ্ত ঘটনাগুলো যখন কানে এসেছে। এরপর পুলিশের টহলদারী, আধাসেনার সার্চ। পালাতে পালাতে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রায় অর্ধমৃত হয়ে গিয়েছিল ধুচনি। ঝড়ু ওকে আশ্রয় দেয়। ধুচনিকে চায়ের দোকানের পিছনে কয়েকদিন লুকিয়ে রাখে। পাহাড়ের নীচে, মেন রাস্তার ওপরেই ঝড়ুর চায়ের দোকান। এখানেও বোধহয় ধুচনি হেরে যায় ভাগ্যের কাছে। দীর্ঘদিন ক্যানসারে ভুগতে থাকা ঝড়ু কয়েকমাস পরই মারা যায়।অবশ্য ততদিনে সেনার টহল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ঝড়ুর মুখেই টুকরো টুকরো করে জেনেছিল, বিপ্লবীদের সর্দার সেনার গুলিতে মরেছে, অনেকে পালিয়েছে। কয়েকজন লুকিয়েছে। বেশকিছু ধরা দিয়েছে সরকারের কাছে। তবুও ধুচনির ভয়। কারণ হয়তো শয়তানগুলো এখনো বেঁচে, হয়তো ওদের দেখলেই মেরে ফেলবে। যেমন ওর মরদকে মেরেছে গুলি করে। ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। ওরা সব করতে পারে। ঝড়ু মারা যেতেই ধুচনি আবারও আশ্রয় নেয় পাহাড়ের কোলে। মাঝে মধ্যে কিছু খাবার জোটে, না হলে খালি পেটে ঝর্ণার জল খেয়ে থাকে। কোলের মেয়েটাকে মানুষের বাচ্চা বলে মনে হয়না। না খেতে পেয়ে পেয়ে অপুষ্টিতে হাড়গোড় বেরিয়ে চামড়াটা শুধু ঝুলছে। মাথাটা শুধু বড় হয়ে চলেছে, শরীর একই জায়গায়।সেই মেয়েকে পিঠে বেঁধেই খাবার খুঁজে বেড়ায়।আজও খাবারের খোঁজে হন্যে হয়ে জঙ্গল তোলপাড় করছে। বিগত সাত আট দিন মা মেয়ের পেটে কিছু পড়েনি।

আমলকি গাছের নিচে বসে জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভাবতে ভাবতে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল ধুচনি। হঠাৎই শুকনো পাতার শব্দে ঘোর কেটে চমকে ওঠে। চকিতে মেয়েকে নিয়ে পাশের পাথরটার আড়ালে লুকোয়।ধীরে ধীরে যখন বোঝে কোনো বিপদ নেই, তখন বেরিয়ে আসে আড়াল থেকে। এগিয়ে দেখে একটা শুয়োর প্রাণপণে একটা মানকচু গাছের গোড়া খুঁড়ে চলেছে। মুহূর্তে ধুচনির চোখটা জ্বলে ওঠে। তড়িৎ গতিতে ঘুমন্ত মেয়েকে পিঠ থেকে নামিয়ে আমলকি গাছের নিচে শুইয়ে, হাতে একটা পাথর তুলে নেয়। রে রে করে তেড়ে যায়। হয়তো দুর্বল শরীরের থেকেও শব্দটা দুর্বল। শুয়োরটা মাথা তুলে শুধু দেখলো একবার, তারপর আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। শরীরের সমস্ত শক্তি একজোট করে হাতের পাথরটা ছুঁড়ে মারলো শুয়োরটার গায়ে। এবার সরাসরি ধুচনির চোখের দিকে চোখ,যেন রক্ত ঝরে পড়ছে শুয়োরটার চোখ থেকে। দু'পা ঘৎ ঘৎ শব্দ করে তেড়ে এলো। পালাতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো নুড়ি পাথরের ওপর। অসহ্য যন্ত্রণায় ডেকে উঠলো মাকে, 'এয়ো'। কোমর ঘেঁষটে ঘেঁষটে আবারও এগিয়ে গেল, শুয়োরটার দিকে। মনে অদম্য জেদ। আজ যে জিততেই হবে এই অসম লড়াইটা। মেয়েটাকে একটু কিছু খাওয়াতেই হবে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে লাগলো ধুচনির লড়াই থামেনি, থামেনি শুয়োরটার লড়াইও। পাথরের আঘাতে শুয়োরটার কানের পাশ থেকে রক্ত গড়াচ্ছে, তবুও খুঁড়ে চলেছে শুয়োরটা। পাথরে পড়ে ধুচনিও রক্তাক্ত। শুধু মরিয়া চেষ্টা মেয়েটাকে খাওয়াতেই হবে। শরীর মন শক্ত করে, শরীরের সমস্ত ক্ষীণ শক্তিকে জড়ো করে পাশে পড়ে থাকা বড় পাথরটা তোলার চেষ্টা করে ধুচনি। থমকে যায় শুয়োরটা। খানিক ভয় পায় বোধহয় ধুচনির চোখ দেখে। সে চোখে মায়ের স্নেহ আগুন হয়ে ঝরে পড়ছে। সমস্ত পেশিগুলো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, বাঁচার তাগিদে। মাথার ওপর পাথরটা তুলে উঠে দাঁড়ায় ধুচনি, গলায় 'মা চন্ডীর' চিৎকার। প্রবল আক্রোশে মাথায় আঘাত করতে যায় শুয়োরটার। হঠাৎই শুয়োরটা ছুট্টে পাশের ঝোপে ঢুকে পালিয়ে যায়। ঝোপের দিকে ছুঁড়ে ফেলে পাথরটা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে ধুচনি। এই চিৎকার, এই কান্না, আর কয়েকদিন বাঁচার লড়াইয়ে জেতার। ধপ পরে বসে পড়ে। প্রাণপণে মানকচু গাছটা ধরে উপরে ফেলার চেষ্টা করতে থাকে। পাখির ডাকে পাহাড়ের জঙ্গল মুখরিত হতে থাকে। সূর্য ধীরে ধীরে,পশ্চিমে পাহাড়ের পিছনে লুকিয়ে পড়ছে।

কয়েকবার টানতেই উপরে এলো মানকচু গাছটা। এমনিই পাথুরে আলগা মাটি, তারপরে আবার শুয়োরটা খুঁড়েছে। বেশি বেগ পেতে হয়না ধুচনিকে। তবুও অপুষ্ট শরীরটা সঙ্গ দেয়না হাঁফাতে থাকে ধুচনি। খানিক বিশ্রাম নিতেই মেয়ের কথা মনে পড়লো। তাড়াতাড়ি পাথরের আঘাতে খানিকটা কচু ভেঙে নিয়ে মেয়েকে খাওয়াবার জন্য যায়। মেয়ে ঘুমোচ্ছে। শরীরের চারপাশে লাল পিঁপড়ে ছেঁকে ধরেছে। কচু ফেলে চিৎকার করে ওঠে ধুচনি। প্রাণপণে মেয়ের গা থেকে ঝাড়তে থাকে পিঁপড়ে। হঠাৎ অনুভব করে বড্ড ঠাণ্ডা। কোলে নিয়ে প্রাণপণে ঝাকায় ছোট্ট শরীরটাকে। বুকফাটা চিৎকারে পাহাড়ের জঙ্গল কেঁপে ওঠে মুহূর্তে। গাছের পাখিরা আরো চিৎকার করে ডাকতে থাকে, দল ছেড়ে উড়তে থাকে। ঘৎ করে শব্দ হতে ঘুরে তাকিয়ে দেখে শুয়োরটা তিনটে ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে মহা আনন্দে মান কচুটা খাচ্ছে। ধুচনি চিৎকার করে সবেগে পাহাড় থেকে নিচে নামতে থাকে। পাথরে পাথরে আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে শরীর। কখনো ছিটকে পড়ছে। কখনো গড়িয়ে যাচ্ছে নুড়ি পাথরে। আজ আর কোনো ভয় নেই ধুচনির। পাগলের মতো আচরণ করতে করতে পাকা সড়কের পাশে এসে লুটিয়ে পড়ে ধুচনি।

*******

একথালা করে ডালভাত, আর ভরপেট চোলাই খেয়ে ড্রাইভারের সাথে ডাম্পারে উঠে বসে জিরকু। রাস্তার কাজ হচ্ছে সরকার থেকে। জিরকু জানে কোনো 'লবাব আইসবেক' , তাই রাস্তা মেরামত চলছে। দিনে দু ট্রিপ দিতে হয় ওদের । পাচামি থেকে স্টোন চিপস তুলে, এখানে ঠিকাদারের বলা জায়গায় ফেলতে হয়। ডাম্পারে ভেতরের এফ.এমটা বেশ জোরে চালিয়ে দিলো ড্রাইভার। দুজনে পুরো মস্তিতে গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চললো পাচামির উদ্দেশ্যে।
ডাম্পারে ডালায় করে ওদের অজান্তেই রক্তমাখা, ধুলোমাখা, নির্জীব একটা শরীরও চলতে থাকে ওদের সাথে।

দেউচা পাচামি এখন বিখ্যাত, কারণ শুধু কয়লা নয়, পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো দেউচা পাচামি কয়লাখনির উপরিভাগে থাকা পাথরের স্তরও বিক্রি করেও রাজ্যের কোষাগারে কয়েকশো কোটি টাকা আয়ের সুযোগ রয়েছে। এমনই অভিমত বিজ্ঞানীদের। তাঁদের দাবি, রাজমহল আগ্নেয়গিরি থেকে বের হওয়া লাভা জমে এই বিপুল এলাকা জুড়ে একটা পাথরের স্তর তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। তাই বিজ্ঞানীরা এই পাথরের নাম দিয়ে ‘রাজমহল ভলকেনিকস’। সেই পাথর থেকেই রাস্তা এবং বাড়ি তৈরির স্টোন চিপস প্রস্তুত করা যাবে।জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (জিএসআই) বিজ্ঞানীদের মতে, এই পাথরের স্তর মাটির তলায় দু-তিন মিটার থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই এখান থেকে বিপুল পরিমাণ পাথর পাওয়া যাবে বলেই তাঁরা মনে করছেন। যা থেকে সরকারের বিপুল আয় হবে।

প্রসঙ্গত, বীরভূম জেলার এই অংশে দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক পাথর খাদান রয়েছে। সেখান থেকে দীর্ঘদিন ধরেই পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এখন কয়লাখনি থেকেও যদি পাথর পাওয়া যায়, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট সরকারের কাছে উপরি আয়ের রাস্তা হতে পারে বলেই ভূ-বিজ্ঞানীদের মত। পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খণ্ড দুই রাজ্য মিলিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই পাথরের স্তর রয়েছে। প্রায় ২১০ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে। এমনই এক খাদানের আরও অনেকের মতো ঠিকা শ্রমিক জিরকু। তিনকুলে কেউ নেই। কোথা থেকে এসেছে জানে না। বড় হয়েছে কয়লার গুঁড়ো গায়ে মেখে। জ্ঞান হয় থেকেই খাদানের ডাম্পারে খালাসি করে, হোটেলে কাজ করে পেট ভরিয়েছে। অমানুষিক শক্তি শরীরে। শরীরের প্রকট হয়ে থাকা কালো কুচকুচে পেশিগুলো তার জানান দেয়। কিন্তু চোখ দুটো ভীষন মায়াময়। মনটাও ছেলেমানুষের মতো। হয়তো পিছুটান নেই, হয়তো দিন আনে দিন খায় বলে।

জিরকুর ঘুম ভেঙে যায়। গাড়ি পৌঁছে গেছে খাদানে। আড়মোড়া ভেঙে,গাড়ির ড্যাসবোর্ডে রাখা দাঁতনের ডালটা নিয়ে নেমে পড়ে গাড়ি থেকে। আবারও লোড করতে হবে ডালা। মাঝে কয়েক ঘন্টা সময়, তাও অন্য গাড়ির লাইন আছে বলে। চাকাগুলো চেক করতে হবে এইতালে। প্রতি ট্রিপেই করে। ঠুঁকে ঠুঁকে দেখে নেয় চাকার হওয়া, নাটবল্টু। তাই টায়ার খোঁচানিটা পারতে গাড়ির কেবিনের ছাদে উঠতে হবে। অনায়াসে উঠে পড়ে জিরকু কেবিনের ছাদে, কোনো জড়তা নেই শরীরে। খোঁচানিটা নিয়ে নামতে গিয়ে চোখ পড়ে পিছনের ডালায়। তড়িঘড়ি ছাদ থেকেই লাফ মারে ডালায়। নাকের কাছে হাত রেখে দেখে, শ্বাস পড়ছে। শিগগিরই পিছনের ডালা খুলে শরীরটাকে নামায় জিরকু। গাড়ির বালতি থেকে জল নিয়ে ছিটিয়ে দেয় অচৈতন্য অর্ধনগ্ন শরীরটার ওপর। খানিকপর সামান্য চোখ খোলে। জিরকু নাম জানতে চাইলে অতি কষ্টে বলে 'ধুচনি'।

হাসপাতাল থেকে ধুচনিকে নিজের মাটির ঘরটায় নিয়ে আসে জিরকু। এরপর টানা দশ বারো দিন আরও দেখাশুনা করে। ড্রাইভারকে বলে ছুটি করেছে। ড্রাইভার দাদাও সাহায্য করেছে সাধ্যমত টাকাপয়সা দিয়ে। এরপর যেদিন জিরকু কাজে বের হলো, সেদিন ধুচনি অনেকটাই সুস্থ। তবে মাঝে মাঝে কেঁদে উঠছে। জিরকু ওকে শান্তনা দিয়ে, ঘরেই থাকতে বলে বেরিয়ে যায় কাজে। এই কদিনে বড্ড মায়ায় পড়ে গেছে মেয়েটার। ড্রাইভার দাদাও সেদিন নেশার ঘোরে বললো -- মাগীটোকে জরু করি লে। একলা কুথি যাবে? জিরকুও ভাবতে থাকে তেমনই, তবে ধুচনি এইসবের কিছুই জানে না। বলবে কয়েকদিন পরে 'বিহা'র কথা।

বেশ আনন্দে কাজ করে কাটিয়ে দেয় জিরকু। বেশ দু পয়সা জড়ো করেছে মবিলের ড্রামে। মাস দেড়েকের মধ্যে ধুচনিও যেন আবার যৌবনবতী হয়ে উঠেছে। ওর ভারী বুক থেকে চোখ সরাতে পারেনা জিরকু। বুঝতে পেরে ধুচনিও কাজের ছুতোয় সরে যায়। দেখতে দেখতে ওদের 'বিহা'ও হয়ে যায়। খাদানের পরিচিত শ্রমিক মজুররা খুব হইচই করে ওদের বিয়ে দিয়ে দেয়। ধুচনি কোনো আপত্তি করেনি। অনেক ভেবেও আপত্তি করার কোনো কারণ খুঁজে পায়নি। খানিকটা কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে, আর সহায়হীন বোধ থেকেই হয়তো অমত করেনি ধুচনি।এরপর একটা বসন্ত কেটে গেছে। ধুচনি পুরোপুরি সংসার আর মরদ সামলেছে। হঠাৎই পাচামি, শালবাদরা, রাজগ্রাম, বশাদুরপুর, মাসরা, নলহাটি, মহম্মদবাজার এলাকার ২১৬টি পাথর খাদানের মধ্যে ২১০টি বন্ধ হয়ে যায়। যার মধ্যে জিরকুর খাদানও আছে। বহু শ্রমিক অন্নহীন হয়ে পড়ে। চোখের সামনে ধুচনিকে আবারও কঙ্কাল হতে দেখতে থাকে অসহায় জিরকু। মবিলের কৌটো শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। ড্রাইভার দাদা রোজই বলছে ওর সাথে ওর দেশে যেতে। ওখানে শহর পাশেই। ইঁটের ভাটি আছে কাজ জুটে যাবে। সেদিন ধুচনির, প্রায় শুকিয়ে যাওয়া, কাশতে থাকা শরীরটা দেখে ঠিক করেই ফেলে ড্রাইভার দাদার সাথে যাবে।

*******

শহরের একপাশে একঘরে হয়ে থাকা নোংরা বস্তির একটা ঘর ভাড়ায় ব্যবস্থা করে দিয়েছে ড্রাইভার দাদা। নিজে ড্রাইভারির কাজ পেয়েছে, জিরকুকেও ইঁট ভাটায় কাজে লাগিয়ে দিয়েছে।হাত আর কোমরটায় আজ যেন বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে জিরকুর। টিনের দরজাটা আলতো করে ঠেলে,উঁকি দিলো। বউটা অকাতরে ঘুমোচ্ছে । ঘুমের মধ্যে বউয়ের সুন্দর মুখটা পরম আদরের সাথে দেখে,চোখটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে এলো। বউটার শরীরটা কেমন দড়ি হয়ে গেছে। কয়েক মাস আগেও পুলক জাগতো জিরকুর, যখন বউ পুকুর থেকে স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে ওর সামনে দিয়ে গিয়ে তুলসী তলায় নমস্কার করতো। দাওয়ায় বসে ভেজা শাড়ির ওপর দিয়ে দেখতে পাওয়া ভরা স্তন আর নিতম্ব বেশ তারিয়ে উপভোগ করতো। 

পকেট থেকে কাগজে মোড়ানো সস্তার চেনাচুরটা বার করলো। দাওয়ার একপাশে পাতাউনুন। দুটো শুকনোপাতা দিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে মাটির পাতিলটা বসিয়ে দিলো। হাসপাতালের ডাক্তারবাবু ভালো খাবার দিতে বলেছে। বাজারের মুরগির দোকান থেকে রোজ পাঁচ টাকার ছাট কিনে আনে জিরকু। সামান্য নুন আর আলু দিয়ে সেদ্ধ করে,ভাত দিয়ে মেখে বউকে দেয়। প্যাকেটটা ছিড়ে মাটির ভাঁড়ে ঢেলে বেশ যুৎ করে বসলো। একটু চানাচুর ,কাঁচালঙ্কা দিয়ে চুল্লুটা বেশ লাগে,খিদেও কমে ক্লান্তিও যায়,ব্যাথাগুলো মরে। সবচেয়ে বড়কথা, সারারাত বউয়ের কাশি কানে ঢোকে না, ঘুম ভালো হয়। কয়েক মাস আগেও ঘুম হতো। তখন সারা সন্ধ্যা বউয়ের সাথে খুনসুটি করা,বউকে আদর করা বুকে মাথা গুঁজে। আজ আর সেই ভরা বুকগুলো নেই ,শুকিয়ে গেছে মরণরোগের কামড়ে। ডাক্তার বলেছে,আলো বাতাস দরকার বউয়ের। ভালো খাবার দিতে হবে,হাসপাতালে নিয়মিত 'ডট' নিতে হবে। সব ঠিক মত মেনে চললে রোগটা সেরে যাবে। জিরকুও আপ্রাণ চেষ্টা করছে ওর সাধ্য মত। সামনের দূর্গাপুজোয় একটা জানলা লাগাবে বদ্ধ ঘরটায়। ঘরের মালিক জানলা লাগিয়ে দিতে পারবে না বলে দিয়েছে। কিন্তু জিরকু ইচ্ছে করলে নিজের খরচে জানলা লাগাতে পারে, সেটাও বলেছে মালিক। ইঁট ভাটায় হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছে সেই জন্য। চুল্লুটা শেষ করে,উনুন থেকে খাবারটা নামিয়ে ঘরে নিয়ে গেলো। পরম স্নেহে গায়ে হাত বুলিয়ে ডাকলো বউকে। হাসার একটা চেষ্টা করলো বউ, কিন্তু দমকা কাশি মুখে হাসি আসতে দিলো না। প্রচন্ড কষ্টে সারা শরীর কুঁকড়ে গেলো। জিরকু বুকে জড়িয়ে ধরলো বউকে। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। হ্যাঁ,এবার হাসি এসেছে। খাবারটা পরম আদরে খাইয়ে দিতে লাগলো। বউয়ের মুখটা পরম তৃপ্তিতে ভরে উঠলো। সারাদিনের অমানুষিক পরিশ্রমের ক্লান্তি এক নিমেষে যেন উধাও হয়ে গেলো জিরকুর। বউয়ের খাওয়া শেষ হলে, নিজের ভাগে যেটুকু আছে সেটা নিয়ে খেতে বসলো। খাওয়া শেষ করে, সব গুছিয়ে রেখে, সকালের জন্য রাখা ভাতটায় জল ঢেলে, বউকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো জিরকু। বউও অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে ওর বুকে মাথা রেখে ঘুমোবার চেষ্টা করলো।                                                          

******

নতুন জানলা দিয়ে আসা ভোরের আলো, শিউলির গন্ধ,আর ঢাকের আওয়াজে,ঘুম ভাঙ্গে জিরকুর। চোখ খুলে দেখে বৌ চেষ্টা করছে উঠে বসার। জড়িয়ে ধরে বসতে সাহায্য করলো জিরকু। বৌ,দেবী প্রণাম সারলো।

তাপস দাস
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।