অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
ফেলে আসা দিনগুলি (১ম পর্ব) - মো হুমায়ুন কবির

বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার পর্দা বাতাসে সরে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বাতাসের সংগে বৃষ্টির পানি এসে চয়নের গায়ে লাগছে। চয়নের ঘুম ভেঙে গেল। বিদ্যুৎ চলে গেছে অনেক আগে। পুরো ঘরজুরে অন্ধকার। বালিশের নিচে রাখা লাইটার জ্বালিয়ে মোমবাতি জ্বালালো। সাইড টেবিলে রাখা ঘড়িতে সময় দেখলো। রাত দুটো। ইজি চেয়ার টেনে হেলান দিয়ে বসলো। চোখ বন্ধ করতেই মনে পড়ে গেল ছেলেবেলার এস্ট্রলোজারকে। সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে চয়ন ও শুভ্র এস্ট্রলোজারের কাছে এস দাঁড়িয়েছিল। মাঝ বয়সী লোকটির গায়ের রঙ তামাটে ধরনের। চওড়া কপাল। বড় বড় চোখ। সব মিলে এক ধরনের দার্শনিক দার্শনিক ভাব। লোকটি কিছু সময় চয়নের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর মিস্টি করে হেসে দিয়ে বললো, 
-এই খোকা? দেখিতো তোমার হাত দুটি। 
চয়ন থতমত খেয়ে গেলো। লোকটি পান খাওয়া কালো কালো দাঁত বের করে ফিক করে হেসে দিয়ে বললো,
-ভয় পাচ্ছ? কোন ভয় নেই। 
চয়ন হাঁটু গেরে বসে কচি হাত দুটি এগিয়ে দিল। লোকটি হাত দুটি খুব যত্ন করে ধরে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারপর চোখ তুলে তাকালো চয়নের দিকে, 
-তোমার নাম কি খোকা? 
-চয়ন। 
-কোন ক্লাসে পড়? 
-অষ্টম শ্রেনীতে পড়ি। 
-তোমার বাবা কি করেন? 
-বাবা ব্যবসা করেন। 
-তোমরা কোথায় থাক? 
-ঝিলটুলি থাকি। 
-তোমার কয় ভাইবোন? 
-দুই ভাইবোন। আমি আর আমার এক ছোট বোন। 
-তোমাকে কিছু কথা বললে তুমি কি খুব মন খারাপ করবে? 
-জ্বী-না। বলুন, কি বলবেন? 
এস্ট্রলোজার লোকটি চয়নের একেবারে চোখের দিকে তিখ্নোভাবে তাকালো। তারপর খুব বিষন্নভাবে বললো, 
-আমি জানি একমাত্র ছেলে হওয়ার কারণে তোমাকে সবাই খুব ভালোবাসে। তুমিও সবাইকে খুব ভালোবাসো। কিন্ত তোমার যখন প্রাপ্ত বয়স হবে, তখন সবাই তোমাকে ভুল বুঝবে এবং তোমাকে ঘৃণা করে দূরে সরিয়ে দিবে। আর তখন তুমি নির্মম এই আঘাত মেনে নিয়ে একাকী জীবন কাটাবে। তুমি এসব মেনে নিতে না চাইলেও তোমাকে মেনে নিতে হবে এবং মেনে নিতে বাধ্য হবে। 
চয়ন উঠে দাড়ালো। যদিও কেমন একটা পরিবর্তন এলো সমস্ত মনের মধ্যে। তারপর নিজেকে সামলে নিতে চেষ্টা করলো। প্যান্টের পকেটে টিফিনের পাঁচটা টাকা ছিলো। সেটা এস্ট্রলোজার লোকটির হাতে দিয়ে বললো, 
-এটা রাখুন। আপনাকে দিলাম। 
এস্ট্রলোজার লোকটি কিশোর বয়সী এই অসম্ভব সুন্দর ছেলেটির দিকে অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। বুকের ভিতরে গভীর মমতায় হুহু করে উঠলো। তারপর সেই টাকাটা চয়নের হাতে গুঁজে দিয়ে বললো, 
-টাকা লাগবেনা। আমি তোমার কাছ থেকে টাকা নিতে পারিনা। এটা তুমি তোমার কাছে রেখে দাও। চকলেট কিনে খেও। আমি তোমাকে দিলাম। 
চয়ন কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্ত মুখে কিছুই উচ্চারণ করতে পারলোনা। শুধু মাত্র স্বভাব সুলভ মিস্টি হাসিটা বিনিময় করে এস্ট্রলোজার লোকটির কাছ থেকে বিদায় নিতে হলো। এস্ট্রলোজারের প্রতি চয়নের কোনো বিশ্বাস ছিলো না। এবং তার বলা কথাগুলিরও কোন সত্যিকারের ভিত্তি ছিলনা। তারপরও কাকতালীয় ভাবে চয়নের জীবন থেকে সবকিছু এবং সবাই চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল। এরপর প্রায় প্রতিদিনই চয়ন এস্ট্রলোজার লোকটিকে খুঁজেছে। কিন্তু আর কোনদিন তার দেখা মিলেনি। জীবনের সমস্ত সুখ, স্বপ্ন, হাসি-আনন্দ হারিয়ে যাওয়ার কথা বলে এস্ট্রলোজার লোকটিও চিরদিনের মত হারিয়ে গেলো।   
*****
খুব সকালে চয়নের ঘুম ভাঙলো। চারপাশে কেবলই পাখির কলতান। কি সুন্দর সকাল। চয়নদের গ্রামের বাড়িটা অনেকটা ছবির মত। চয়নের কাছে কেমন অরন্য অরন্য লাগছে। কি এক অপার সৌন্দর্যের মোহ মায়ায় চয়নের কচি কোমল প্রান নেচে নেচে উঠছে। অদূরেই বাদ্যযন্ত্র বাজছে। ঢোল, বাশি, খঞ্জনী। সবকিছু মিলে মাতাল করা সুর ভেসে ভেসে যাচ্ছে। চয়ন দরজা খুলে বাইরে এসে দাড়ালো। তার বয়সী কিছু ছেলে মেয়েরা ছুটে যাচ্ছে। নয় দশ বছরের একটি মেয়ে চয়নের কাছে এসে দাড়ালো। পিছন থেকে অন্য আর একটি মেয়ে বললো, 
-এই পপের মা, যাবি না? 
পপের মা! এমন নাম শুনে চয়নের ভিষণ মজা লাগলো। পপের মা কারো নাম হয়? পপের মা চয়নের কাছে এসে দাড়ালো। চয়নকে বলল, 
-আমার নাম রানু। ওরা আমাকে পপের মা বলে ডাকে। যে মেয়েটি পপের মা বলেছে, তাকে উদ্দেশ্য করে রানু বললো- ওর নাম মিনি। আমরা ওকে বগার বৌ বলে ডাকি। তুমি আমাদের সংগে যাবে? 
চয়ন খানিকটা ভাবলো। তারপর বললো-যাবো। চয়নও ছুটলো তাদের সংগে। বাধাহীন, গন্ডিহীন, শাসন উপেক্ষা করে চয়নও মিশে গেলো তাদের সংগে। দৌড় আর দৌড়। প্রানের আনন্দে ছুটে চললো তারা। একটি বাড়ির সামনে এসে থামলো। এই বাড়ির ছেলে, বুড়ো সবাই রং-বেরঙের নতুন কাপড় পরেছে। ভারী সুন্দর লাগছে সবাইকে। দেশীয় বাদ্য বাজছে। অথচ মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত আনন্দধারা যেন একাকার হয়ে গেছে। যাকে ঘিরে এত আয়োজন সে একটি খুব ছোট ছেলে শিশু। শিশুটিকেও নতুন জড়ির জামা, জুতা পরানো হয়েছে। শিশুটিকে কোলে রেখেছে শিশুটির দাদী। একজন বৃদ্ধা মহিলা। তিনিও নতুন শাড়ি পরেছেন। চয়ন রানুর কাছে জানতে চাইলো, 
-শিশুটির নাম কি? - মরন চাঁদ। 
-এ কেমন নাম? 
-এর আগে ওর আরও দুটি ভাই জন্ম নিয়েছিলো। তারা জন্মের পরপরই মারা গেছে। তাই ওর দাদী মরন চাঁদ নাম রেখেছেন। এই নামের কারণে মরন চাঁদ বেঁচে থাকতে পারে। 
চয়ন রানুর কথা শুনে খুব অবাক হলো। কি সরল গায়ের মানুষগুলো! এস্ট্রলোজারের বলা কথাগুলির মত যদিও এর কোন ভিত্তি নেই। সত্য নেই। তবুও এরা এর সব কিছুকেই এখনো সত্য মনে করে। বিশ্বাস করে। 
এর পর বাদ্য বাদক দল নুরুতলী বট গাছের দিকে যাত্রা শুরু করলো। শিশুটির দাদী মরন চাঁদকে অনেক যত্নে বুকে জড়িয়ে আগে আগে যাচ্ছে। সংগে যাচ্ছে বাড়ির ছেলে বুড়ো সবাই। বাজনার তালে তালে এগিয়ে চলছে সবাই। চয়ন, রানু, মিনি আরও নাম নাজানা শিশুরাও এগিয়ে চলছে তাদের সংগে। বটগাছের কাছে এসে চয়ন আরও অবাক হলো। কতো পুরাতন গাছটি কে জানে! বিশাল জায়গা জুড়ে ডাল-পালা বিস্তার করে শিতল ছায়া করে রেখেছে। ছায়ায় এসে চয়নের মন-প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। মরন চাঁদের দাদী মরন চাঁদের কচি হাত দুটি এগিয়ে ধরে গাছটি স্পর্শ করালো। বট গাছের পাশেই বিশাল বড় পুকুর। সেখান থেকে চকচকে পিতলের কলসিতে করে পানি আনা হয়েছে। একজন অল্প বয়সী মহিলা গাছের গোড়ায় কলসির সমস্ত পানি ঢেলে দিলো। আরও সংগে করে আনা হয়েছিলো ফুল ও বিভিন্ন ধরনের ফল। তা-ও একজন রাখলো গাছের গোড়ায়। সমস্তটাই যদিও কেমন যেন লাগলো চয়নের কাছে। তারপরও অনেক আনন্দ হলো। ভালো লাগলো। 
ফিরে যাওয়ার সময় পথে যেতে যেতে মিনি বললো, 
- জান, একসময় এই পুকুরে সোনার নাও পবনের বৈঠা দিয়ে চলতো। আর চন্দ্র বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হলে সোনার বাসন পত্র ভেসে উঠতো। সেসব দিয়েই চন্দ্ররা অতিথিদের আপ্যায়ন করাতো। 
একদিন একজন লোভী কাজের মহিলা একটা সোনার থালা চুরি করে রেখে দেয়। সেই থেকে সোনার বাসন-পত্র আর আসেনি। আর কোন একদিন এখানে বাজার বসবে। বিশাল বাজার! 
এর পর চয়ন বড় হওয়ার পর যখন নুরুতলী বট গাছের কাছে গেছে, তখন সব কাকতালীয় হলেও সেই বটগাছের চারপাশে গড়ে উঠেছে বড়সড় বাজার না; ছোট খাটো নগর। আজকে সেই নুরুতলী বটগাছ, চন্দ্র বাড়ি আর রানু, মিনি আরও কত শৈশবের কতো ছোট ছোট বন্ধুরা চয়নকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। 
*****
সকাল থেকেই দল বেধে মেয়রা মাটির তৈরি কলস নিয়ে পদ্মা নদীর দিকে চলছে। পপের মা, বগার বউ, মানে রানু, মিনিও আছে তাদের দলে। চয়নদের বাড়ির উপর দিয়েই পদ্মা নদীতে যাওয়ার পথ। রানু বলল,
-আমাদের সংগে যাবা, পদ্মা নাদী দেখতে? 
চয়ন রাজি হয়ে গেলো। বলল,
-যাবো। কেন যাচ্ছ তোমরা? 
-আজকে শাকরাইন দিন। 
-মানে? 
-চৈত্র মাসের আজকে শেষ। শেষ দিনে নদীর পানি আনতে হয়। 
-কি করবা পানি দিয়ে? 
-খাবো। এতে পুরনো দিনের বালা মছিবত ভালো হয়ে যাবে। 
চয়ন ভীষণ ভীষণ অবাক হলো, গায়ের মানুষের বিশ্বাস দেখে। অনুভব করলো, গায়ের মানুষগুলো কত ভালো! কত সহজ-সরল! আহা! যদি শহরের মানুষগুলোও এমন ভালো ও সহজ-সরল হতো! তাহলে খুব ভাল হতো! 
নদীতে যাওয়ার পথে একটা ছোট চর পড়লো। বিশাল এলাকা জুড়ে শুধু বালি আর বালি। চৈত্রের দুপুরের রোদের তাপে বালু খুব তপ্ত হয়ে আছে। এখানে চাষ করা হয়েছে, বাংগী, তরমুজ, ফুটি, বাদাম। মাঝে মাঝে একচালা ঘর বাঁধা আছে। কৃষকেরা কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পরলে এই ঘরের ছায়ায় এসে জিরিয়ে নেয়। 
একজন অল্প বয়সী তরুণ রানুর সাথে কথা বলছে। চয়ন কাছে গেলো। রানু তরুণটিকে দেখিয়ে বলল, -এইটা আমার মিয়া ভাই। আর মিয়া ভাই, এই হলো চয়ন। শহরে থাকে। গ্রামে দাদা বাড়ি বেড়াতে এসেছে। 
-ও আচ্ছা। খুব ভালো। রানুর মিয়া ভাই বলল, 
-বাংগি খাও? 
-জি, খাই। 
তরুণটি বেছে বেছে বেশ বড় একটা বাংগি আনলো। কাস্তে দিয়ে সেটা কাটলো। 
দূর থেকে মিনি ডাকল,
-এই পপের মা, তাড়াতাড়ি আয়। যাবিনা? 
-যাবো। তুই এইদিকে আয়, মিয়া ভাই বাংগি কাটছে। 
-আচ্ছা আসছি। 
মিনি এলো। আর কাছাকাছি যারা ছিলো, তাদের সবাইকে বাংগি খেতে দেয়া হলো। চয়ন ভীষণ আনন্দিত হলো। পদ্মার পাড়ে এসে এতো ভালো লাগছে! এরই নাম পদ্মা। 
মিনি বলল, -পদ্মার আসলে বিয়ে হয়নি তো, তাই এতো রাগী ও সুন্দর! 
দৃষ্টির সীমানায় যতো দূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। উত্তাল ঢেউ। সারি সারি পাল তোলা নৌকা। মাঝে লঞ্চ যাচ্ছে। ইলিশ মাছ ধরার নৌকা গুলি মনে হচ্ছে ঢেউয়ের দোলায় ডুবে যাচ্ছে, আবার ভেসে উঠছে। ভয় লাগছে আবার আনন্দও হচ্ছে। কাছে না এলে চয়ন বুঝতে পারতো না যে, পদ্মা নদী এতো সুন্দর। সেই দিন ফেরার পর চয়ন প্রতিদিন পদ্মাকে নিয়ে ভেবেছে, আজো ভাবছে। পপের মা, বগার বউ, সেই বাংগি খাওয়ার স্মৃতি কোনদিন ভুলবার নয়। আজো চয়ন কান পেতে রয়, সেই-সেদিনের পদ্মার কন্ঠ শোনার জন্য। মনে হচ্ছে, রানু, মিনি হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে বলছে, তুমি যাবা, পদ্মা নদী দেখতে? চলবে… 

মো হুমায়ুন কবির
ঢাকা, বাংলাদেশ।