অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
কৃষ্ণকলি আমি তারে বলি – বন্যা হোসেন

সেই ২০০৪ সালের কথা। বাচ্চারা ছোট ছোট। ইউরোপের একটি দেশে থাকি কিন্তু আশেপাশে তেমন কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি। জীবনের শুরুতে কাজ, সংসার, বাচ্চা নিয়ে সংগ্রাম করতে গিয়ে নিজেদের অনেক কিছু থেকেই আমরা বঞ্চিত করি। সেবার দুজনে ঠিক করলাম জার্মানী, ফ্রান্স এই দেশগুলোতে বেড়াতে যাবো। যেই ভাবা সেই কাজ। যোগাড়যন্ত্র করে বাক্সপ্যাটরা আর বাচ্চাকাচ্চার পোটলা পুটলি নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। প্রথম যাত্রা বার্লিন… পরে ফ্রাংকফুর্ট, মিউনিখ, বন ঘুরে চলে যাবো প্যারিস। প্যারিসে দর্শনীয় বস্তুর কোন শেষ নেই। কাজেই, ওখানেই সবচেয়ে বেশী সময় চলে যাবে।  

বার্লিনে আমার ননদ থাকে এবং তার যথেচ্ছাচার অতিথি আপ্যায়নে দুদিন পরই আমাদের বিরক্তি ধরে গেলো। গ্রীষ্মের ঝকঝকে দিনগুলো ইউরোপে খুবই আকর্ষণীয়। নীল আকাশ দেখলেই লোকজন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে গ্রীষ্মের প্রতিটি সূর্যকিরণে নিজ স্পর্শের ছোঁয়া লাগাতে।। তেমনই একটি দিনে আমরা চললাম লটবহর নিয়ে বার্লিনের পার্লামেন্ট দেখতে। লটবহর বলছি কারণ ৪ আর ২ বছরের শিশুদের সফরসংগী করতে হলে ঘন্টখানেক পর পর তাদের জন্য খাবার রসদ ইত্যাদি হাতের মুঠোতে থাকা দরকার। আমাদের সংগে বাচ্চাকে ঠেলার স্ট্রলার আর বড়সড় দুটো ঝোলা ব্যাগ থাকতো। যখনই কেউ চেঁচামেচি শুরু করে তার মুখে ঠুসে দেয়া হয় ফলের টুকরো, জুস, পনির, সসেজ বা বাদাম জাতীয় কোন শুকনো খাবার। 

বার্লিনে মূল আকর্ষণ আমাদের কাছে ছিল বার্লিনের প্রাচীর আর পার্লামেন্ট ভবন। 

পুরনো সংসদ রাইশটাগ ভবন একটি বিখ্যাত স্থাপনা। এই ভবনটি ১৮৯৪-১৯৩৩ সাল পর্যন্ত সংসদ ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা পরে সংস্কার করা হয়। এই ভবনের ভিতরের কিছুটা অংশ সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রচুর ছবি তুলে পরের গন্তব্যস্থল ব্রান্ডেনবুর্গার টর দেখতে গেলাম। এটি মূলত একটি গেট… অনেকটা দিল্লী গেটের মতো। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন বার্লিন বিভক্ত হয়ে যায় তখন এই গেটের দুপাশেই বিখ্যাত বার্লিন প্রাচীর তৈরী হয়। প্রাচীর ভেংগে ফেলার পর এই গেটটি বৃহত্তর জার্মানীর একত্রীকরনের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এই গেটটি পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। অপূর্ব সুন্দর এই স্থাপত্যকলা এবং শান্তি ও বন্ধুত্বের নিদর্শন দেখতে এখানে প্রতিদিন প্রচুর লোকসমাগম হয়। 

স্বাভাবিকভাবেই এর পরের গন্তব্য ছিল বার্লিনের প্রাচীর। একটি শহরের মধ্যে প্রাচীর তুলে অভিনব কায়দায় একই দেশের লোককে দুভাগে বিভক্ত রাখার এ পদ্ধতিটি শেষ পর্যন্ত মানুষ ভেংগে দিতে পেরেছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষের জন্য রাজনীতি নয়, রাজনীতির জন্য মানুষ। শেষ পর্যন্ত শীতল যুদ্ধের অবসান হয়ে মানবিকতার বিজয়।

এসব স্থানগুলো পরিদর্শনের সময় প্রায়ই দেখা হচ্ছিল দুটি মেয়ের সাথে। ওদেরকে মেয়ে না বলে তরুণী না মহিলা বলবো তা নিয়ে বেশ সংশয়ে ছিলাম। আমার বাচ্চারা ওদের কৌতুহলের কারণ।  বারবার ওদের সাথে সাক্ষাৎ হচ্ছিল। মেয়ে দুটি দেখতে দুরকম। হয়তো ওরা বান্ধবী, তবে আমাদের ওদিককার অর্থাৎ এশিয়ান। ধরেই নিলাম ভারতীয়। একজনকে দেখে আমার ছোটবেলার স্কুলের কথা মনে পড়ে যায়। ভিখারুননিসা স্কুলে তখন আজকের বিখ্যাত ফখ্রুদ্দিন বাবুর্চি ও তার পরিবার লোকেরা বিভিন্ন কাজের  সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এই মেয়েদের একজন ঐ পরিবারের একটি মেয়ের মতো দেখতে। তাকে দেখলে মনে পড়ে যায় সেই বিখ্যাত গানের কলি,

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, 
কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে,
মুক্তবেণী পিঠের পরে লোটে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

সেই কৃষ্ণকলি মুক্তবেণীতে স্কার্ট আর টপ্স পরা আমেরিকান ইংলিশ বলা তন্বী কি বাংলাদেশী? কেন যে এমন মনে হল। কিন্তু আমার বহুদিনের প্রবাসবাসের চর্চিত শিষ্টাচার কিছুতেই জিভ থেকে প্রশ্নটি শূণ্যে ছুঁড়তে দিচ্ছিলো না তরুণীর উদ্দেশ্যে। যদিও এদেশে অনেকেই জিজ্ঞেস করে বা ধরেই নেয় আমি ভারতীয়।  
কৃষ্ণকলির সংগের মেয়েটি অবশ্যই আমাদের ওদিককার। তার চেহারায় উপমহাদেশীয় সাদৃশ্য। দুটো জায়গাতেই পরপর দেখা হওয়াতে হাসি দিয়ে সৌজন্য বিনিময় করলা্ম। আমার ছোট শিশু দুটি হাজার অচেনার মাঝে পরিচিত চেহারার আন্টিদের দেখতে পেয়ে হাততালি দেয়। পরের দিনও কাকতালীয়ভাবে আমাদের আবার দেখা হলো। ওরাও হাসে, আমরাও হাসি। বাচ্চারা আন্টিদের পেয়ে ছুটোছুটি করে।

কৃষ্ণকলির কাছে জেনেছি তার দুটি পুত্র সন্তান আছে যারা আমার বাচ্চাদেরই বয়সী। তারা বাবার সাথে আমেরিকার কোন একটি শহরে আছে। সে এসেছে তার ছোট বোনকে নিয়ে ইউরোপে বেড়াতে। অল্প কিছু আলাপ পরিচয় আর সখ্যতা হলো। বাচ্চারা আন্টিদ্বয়ের  সাথে আরও ঘনিষ্ঠ হলে আমি ভদ্রতার নিকুচি করে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম ওরা আমার দেশ থেকে এসেছে কিনা। কৃষ্ণকলি আমার প্রশ্নে থমকে গেলো। সে কিছু বলার আগেই তার শান্তশিষ্ট ছোট বোনটি  উত্তর দিয়ে  দিলো ঝটপট,

--উই আর ফ্রম স্টেটস!  

কেন যেন আমার সন্দেহ আরও বদ্ধমুল হলো ওরা নিশ্চয়ই বাংলাদেশী। আমার বাচ্চাদের নানা ভঙ্গীর ছবি তুলছিল মেয়ে দুটি। বাচ্চাদের ততক্ষণে ক্ষুধা পেয়েছে। রাস্তার পাশের টার্কিশ দোকান থেকে ওদের জন্য শোরমা কেনা হলো। ছোট ছোট বাচ্চাদের মায়েরা খুব ভালো করে জানেন বাচ্চারা পুরো খাবার খায় না। আমাদের বিশেষ করে মায়েদের বাকী খাবার শেষ করতে হয়, এই করেই তন্বী থেকে স্থুলকায় হওয়ার কাহিনী শুরু! 

কৃষ্ণকলিকে আমাদের সংগে শোরমা খাওয়ার প্রস্তাব দিলাম। আমার স্বামীটি আবার রমণীদের জন্য খাবার কিনে আনতে খুবই সিদ্ধহস্ত। কৃষ্ণকলি রাজী হলো খেতে এক শর্তে ...সে আমাদের খাওয়াবে। কিছুক্ষন বাক বিতন্ডার পর আমরা রণে ভংগ দিলাম। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ, আমিও ওদেরকে  স্যুভেনির কিনে দিলাম। ইমেইল বিনিময় হলো …...বাচ্চাদের  ছবিগুলো পাঠিয়ে দিবে আমাদের ঠিকানায়। 

আরও কিছুক্ষণ গল্প করে আমরা বিদায় নিলাম। কৃষ্ণকলির নাম জানতে পেরেছি …...রিংকু ...রিংকু স্টিভ। আর তার সহদোরা শীলা ওয়েন । রিংকুর স্বামী  একজন কানাডিয়ান কিন্তু আমেরিকায় চিকিৎসা শাস্ত্র পড়া শেষ করে ওখানেই কাজ শুরু করেছেন একটি হাসপাতালে। রিংকু নিজে নার্সের কাজ করেন একটি ক্লিনিকে। তার বোন শীলা আটলান্টায় থাকেন, ওখানে একটি প্রাইমারী স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন।  

সেই শুরু এই দুই বোনের সাথে আমার যোগাযোগের। তবে রিংকুর সাথেই আমার কথাবার্তা আলাপচারিতা হতো। শীলা প্রতি বছর নববর্ষের শুভেচ্ছা পাঠাতো। অবশ্য কে-ই বা পথে দেখা অচেনা লোকের কথা এতটা মনে রাখে! রিংকুর সাথে আমার আলাপচারিতা বন্ধুত্বে মোড় নেয়, সখ্যতা বাড়ে। প্রায় প্রতিদিন লম্বা লম্বা ইমেইল পাঠাই। দিনের সব কাজ শেষ করে বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেলে আমি ডেস্কটপের সামনে এসে বসতাম এক কাপ চা নিয়ে। সেদিনের সব ইমেইলগুলো পড়ে আমার কাঙ্খিত চিঠিটি রেখে দিতাম সব শেষে ধোঁয়া ওঠা চায়ের সাথে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার জন্য। মিন্টু অর্থাৎ আমার স্বামী তখন কিছু বলতে এলে আমি বিরক্ত হতাম। এ সময়টি ছিল একান্তই আমার নিজস্ব। মিন্টু আমার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে হ্যাংলার মতো ইমেইল পড়তো। ওর হিংসে হতো আমাকে। 

আমি লিখতাম আমার সারাদিনের কথা, বাচ্চাদের কথা, নতুন কোন রান্নার কথা,বিচ্ছিরী আবহাওয়ার কথা। রিংকু হাসপাতালের অনেক রুগীদের সম্পর্কে জানাতো, ওর ছেলেদের কথা লিখতো, লিখতো ওর আমেরিকান স্বামীর কথা যাকে তিন বেলা পিনাট বাটার আর জ্যাম স্যান্ডুইচ খেতে দিলেও সোনামুখ করে খেয়ে নিবে। রিংকুর একটা দুর্বলতা সে রাঁধতে জানতো না। চুলার কাছে যেতেই গায়ে জ্বর আসতো। আমার কাছে রেসিপি চাইতো, দেশী রান্না ছাড়াও আমি তখন নানা রকম বিদেশী রান্না শিখেছি। নতুন কিছু রান্না করলেই সে দাবী করতো রেসিপি। রেসিপি পাঠালে হতো আরেক জ্বালা। কারণ তার রান্না কখনোই আমার মতো হতো না ...আক্ষেপ করতো …... মনের দুঃখে আগামী এক মাসের জন্য আবার প্রসেসড খাবার …! 

ততদিনে জেনে গিয়েছি রিংকু বাংলাদেশের মেয়ে। ওর বাবা-মা বেঁচে নেই। রিংকু পড়াশোনা করেছে বাংলাদেশের সুবিখ্যাত ভারতেশ্বরী হোমসে। আমেরিকায় সে এসেছিল এইচ এস সি পাশ করে নার্সিং পড়তে। ওর পড়া শেষ হওয়ার আগেই দু’বছরের ব্যবধানে বাবা মা দুজনকেই হারায় রিংকু। তখন ওর বাবার আমেরিকান বন্ধু পরিবার ওকে নিজের পরিবারে দত্তক হিসেবে নেয়। চিন্তাও করতে পারি না মাত্র বিশ বছরের একটি তরুণী হঠাৎ করে অভিভাবকহীন হয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে কি করে টিকে থাকে। সৃষ্টিকর্তা হয়তো তাকে বিশেষ শক্তি দেন শোক সামলে ওঠার। বেঁচে থাকার সহজাত তাগিদ থেকেই মানুষ নিজের মনটাকে পাথর বানিয়ে যাপিত জীবন ভুলে থাকতে চায়। 

রিংকু খুব ভালো বাংলা জানতো, মাঝে মাঝে লং ডিস্ট্যান্স ফোন কলে কথা বলতাম। সে সময়টা আমরা কানাডায় যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। উত্তর আমেরিকার জীবনযাত্রা নিয়ে কিছু প্রয়োজনীয়  পরামর্শ পেতাম রিংকুর কাছে। রিংকুর স্বামী রন স্টিভ কানাডা থেকে আগত অভিবাসী, ওর বাবা মা এখনও কানাডায় থাকে …...রিংকুরা প্রতিবছর দুবার কানাডায় বেড়াতে যায় বাচ্চাদের নিয়ে শ্বশুর শাশুড়ীকে দেখতে। তারাও প্রতিবছর দু’বার ছেলের সংসারে বেড়াতে আসেন। ওর মুখে এগুলো শুনে আমার মনে হতো …...বাঃ কি সুন্দর করে ওরা সব সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রেখেছে! বিদেশীদের জীবনে একটি বাংগালী মেয়ে এত সুন্দর মানিয়ে নিয়েছে …...ওর গল্পগুলো আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম। বলার ভংগীটাই এমন যে কয়েক ঘন্টা কথা বললেও মনে হতো না অনেকক্ষণ বলেছি। জীবনকে এত ভালোবাসতো, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সে উপভোগ করতে জানতো। 

তার ডাক্তার স্বামীকে আমি তখনও দেখিনি কিন্তু শুনেই বুঝতাম কাজের বাইরে প্রতিটি বিশ্রামের ক্ষণ তারা নানাধরনের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কাটায় ছেলেদের সংগে নিয়ে। তাছাড়া, পরিবারের সবাই ক্রীড়াবিদ। খেলাধুলা তাদের জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। রিংকুর রান্না করতো না বলে  পরিবারের কারো কোন অসুবিধে ছিল বলে মনে হতো না। রন নিজে যে রান্না করতো তা নয়…...তবে এ নিয়ে ওদের বিশেষ কোন ভাবনা ছিল না। বাচ্চারা যা পায় তাই খায়, রন তিনবেলাই স্যান্ডুইচ খেতে পারে আর রিংকু নিজে সারাদিন কফি পান করে আর টুকটাক এটা সেটা খায়।  

আমাদের বন্ধুত্ব আরও জোরালো হল আমরা কানাডায় এসে বসতি স্থাপনের পর। টরন্টোতে এসে একটি ভাড়া বাসার বেসমেন্টে উঠেছি তখন…...মাত্র গুছিয়ে বসে এদিক সেদিক যাওয়া আর কাজ খোঁজা শুরু করেছি। এর মাঝেই রিংকুর ফোন …...ওর কথা শুনেই আমি আঁতকে উঠেছি। কেন বলুন তো? 
ওরা আমাদের সংগে দেখা করতে চায়। আমতা আমতা করে ওকে কাটিয়ে দিতে চাইলাম, এই বলে যে আমরা সদ্য এসেছি একটি নতুন দেশে। দুটো বাচ্চা নিয়ে কোনরকমে আছি। মিন্টু একটা ফাস্টফুডের দোকানে কাজ শুরু করেছে মাত্র। 

কে শোনে কার কথা! রিংকু ফোনে রনকে ধরিয়ে দিলো যেন ডাক্তার সাহেব আমার পাগলামী সারানোর জন্য প্রেসক্রিপশন দিবেন! রনের কথা শুনে আমার মূর্ছা যাবার জোগাড় হলো। ওরা শুধু আসবেই না আমার এ দুরুমের এপার্ট্মেন্টেই থাকবে আর দু’বেলা নাকি আমার রান্না খাবে!!! এ শক থেকে বের হতে আমার ঘন্টাখানেক সময় লেগেছিল!! 

মিন্টু কাজ থেকে ফিরে সব শুনে হাসতে হাসতে শেষ! আমি বুঝিনি ওর এত হাসির কি ছিল! সেইসংগে খুব খুশী। ঘরে কয়েকদিন ইংরেজী বলা লোকজন থাকবে, ফটাফট ইংরেজী বলাটা তার আয়ত্ত হয়ে যাবে। আমি যে হীনমন্যতায় ভুগছি সেগুলো নিয়ে তার বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই। মিন্টু মানুষটাই এমন! নিজেরা কোনরকম দুটো খেতে পারছি এর মধ্যে দু’সপ্তাহ অতিথিদের কি খাওয়াবো সে নিয়ে মাথার চুল ছেঁড়ার দশা আমার। এখানে আমাদের এখনো গাড়ী কেনা হয়নি। উত্তর আমেরিকায় যারা থাকেন তারা খুব ভালো করে জানেন গাড়ী ছাড়া এখানে চলাফেরা করা কি দুঃসাধ্য। অনেক প্রয়োজনীয় সামগ্রীই আমরা কিনতে পারিনি ভবিষ্যতের ভাবনায়। কানাডা সরকারের অভিবাসনের নিয়ম অনুযায়ী ছ’মাস ভরণপোষণের খরচ নিয়ে এসেছি। ভালো কোন কাজ না হলে দুটো বাচ্চা নিয়ে কি বিপদে পড়বো এই ভেবে শঙ্কিত ছিলাম। দুঘরে দুটো বিছানা আর একটি খাবার টেবিল চারটি চেয়ারসহ কিনেছি উন্নত বিশ্বের গরীবদের জন্য বানানো সুইডিশ  ফার্ণিচারের দোকান আইকিয়া থেকে।  

মিন্টু তার আকর্ণবিস্তৃত হাসি থামিয়ে বোঝালো, কেন আমি একবারও চিন্তা করছি না ওঁদের অসুবিধার কথা। এই ছোট্ট বাসায় ওদেরই তো অসুবিধা হওয়ার কথা। তারা যখন এটি নিয়ে চিন্তিত নয় তাহলে আমাদের অসুবিধে কি! এই কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হলাম যদিও পরমুহূর্তেই অন্য ভাবনায় ডুবে গিয়েছি। কোথায় ঘুমাতে দেব, কিভাবে কি খাওয়াবো, কি করে ওদের যত্ন নেবো এইসব ভেবে রাতের ঘুম হারাম আমার!  

পরের মাসে ওরা এলো। তখনও এখানে গ্রীষ্মকাল। আর গ্রীষ্মকাল মানেই লম্বা দিনের পরে সংক্ষিপ্ত  রাত্রি। চারদিকে ঝকঝকে সবুজ, রোদেলা দিন আর নীলাকাশের নীচে ঘোরাঘুরি। ওরা এসেই আমার সব সংকোচ, দ্বিধা ধুলোয় উড়িয়ে দিলো। এমন আন্তরিকতা আমার আজন্ম চেনা লোকদের মাঝেও দেখিনি। ছেলে দুটি নিমেষেই আমার ছেলে আর মেয়ের সংগে বন্ধুত্ব করে নিল। অবশ্য শিশুদের বন্ধুত্ব হতে সময় লাগে না, কারণ ওরা নির্মল আর পবিত্র।

রিংকু আর স্টিভের মত এমন মাটির মানুষ আমি আর দেখিনি, দেখবো বলেও  বিশ্বাস হয় না। পৃথিবীতে এইসব বিরল প্রজাতির মানুষ ভীষণভাবে কমে যাচ্ছে …...এত হানাহানি, হিংসা, বিদ্বেষ, কুটিলতার মাঝে এসব মানুষদের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তাই এরা অকালেই ঝরে পড়ে অভিমানে। তবে এরাই আবার পংকিলতা আর অন্ধকার কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে খোলা হাওয়ার শীতলতা ছড়িয়ে দেয় বন্ধুত্ব আর মৈত্রীর প্রতীক হিসেবে। 

ওরা এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ী ভাড়া করলো দু’সপ্তাহের জন্য। সেই গাড়ীতেই আমরা ঘুরে বেড়ালাম সবাই মিলে। রন প্রায় সাড়ে ছয় ফিট লম্বা শ্বেতাংগ, ছিপছিপে গড়নের অমায়িক একজন মানুষ। একজন সদাহাস্যময় ডাক্তার কি কেউ কখনো দেখেছেন? সে মৃদুভাষী, কিন্তু যে কোন ব্যাপারে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সমাধানটি বের হয় তার মাথা থেকে। বাংগালী খাবার তার খুব পছন্দের। এমনকি করলা ভাজি, শুটকি, সবধরনের জিভ জ্বলে যাওয়া ঝাল ভর্তা তার খুব প্রিয়। ডাল ভাত হাতে মেখে খায়….. ছেলেদের খাইয়ে দেয় নিজ হাতে যেমন করে আমার বাবা ছোটবেলায় খাইয়ে দিত বা আমার বাচ্চাদের বাবা যেমন খাওয়ায় তার সন্তানদের। অবাক হলাম শুনে এসব খাওয়া  সে বাংলাদেশে গিয়ে শিখে এসেছে। 

প্রথম সন্তানের ২ বছর বয়সে বাংলাদেশের টাংগাইলের একটি হাসপাতালে রন আর রিংকু এক বছর স্বেচ্ছাসবী হিসেবে চিকিৎসাসেবা দিয়েছিল। এসব শুনে মনে হয় আমাদের জানার বাইরে কত কিছু আছে…. নিজেদেরকে প্রায়ই মহাজ্ঞানী মনে করে কত উল্টোপালটা কথা বলি পাশ্চাত্য দেশের মানুষ সপর্কে। কয়জন ডাক্তার তার প্র‍্যাক্টিস ছেড়ে দিয়ে একবছরের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসা করেন তাও অনুন্নত দেশে……!    
নিজের চারপাশের বৃত্তের বলয়ে ঘুরে দুনিয়া চিনে ফেলেছি বলে হামবড়াই করি….. নিজের দেশের জন্য কতটুকু করেছি আমরা, কি করেছি….  ধিক্কার হয় এক একবার! 

রন আর রিংকু কয়েকদিনেই বুঝে গেল আমাদের একটা ওয়াশিং মেশিনের খুব প্রয়োজন। আমরা বেসমেন্ট এপার্ট্মেন্টে থাকতাম, কয়েকটা বাড়ীর জন্য একটা ওয়াশিং মেশিন ছিল সেখানে। খুচরো পয়সা দিয়ে কাপড় ধুতে হতো। একটা বড় সমস্যা ছিল আমার জন্য বাচ্চারা ছোট বলে আমার প্রয়োজন থাকলেও যখন তখন বের হতে পারতাম না কাপড় ধোয়ার জন্য। অনেক সময় লাইন দিয়ে রাখতে হতো কাপড়ের ঝুড়ির। এই স্টিভ দম্পতি আমাকে কিছু না জানিয়ে ওয়াশিং মেশিন কিনে নিয়ে এলো। 

সে এক বিব্রতকর পরিস্থিতি! আমি এধরনের সুবিধা বা উপঢৌকন নিতে অভ্যস্থ নই বলে মেনে নেয়া খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ভাবছিলাম ওদেরকে আর কতদিন ধরে চিনি! কেন ওরা এত স্বাভাবিক মনে করছে সবকিছু? রিংকু হতে পারে আমার বন্ধু কিন্তু পরিচয় মাত্র দুবছরের। রক্তের সম্পর্কের মানুষকে চেনা যায়না আর এরা তো প্রায় অচেনা। 

সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছিলাম এই সামান্য চেনা পরিবারটি আমার বাড়ীতে বেড়াতে এসে মেঝেতে ঘুমাচ্ছে। আমার অনেক অনুরোধেও রন গ্রাহ্য করেনি। সে সুটকেসে করে স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে এসেছে…...প্রতি রাতে সেটাই বিছিয়ে শুয়ে পড়ছে মেঝেতে আবার সকালে সব গুটিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখছে! স্কাউটে এবং ক্যাম্পিঙয়ে গিয়ে বনে বাদাঁড়ে থাকতে  অভ্যস্থ ছেলেবেলা থেকে…...কাজেই আমার মধ্যবিত্ত মনের টানাপোড়েন সে ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে। 

 রিংকু হয়তো আমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছিল। কিন্তু সে উলটা আমার উপর রাগ করে বসলো। সেদিন বিকেলে চার বাচ্চা নিয়ে সামনের পার্কে চলে গেল রিংকু আর রন। আমি রনের জন্য পাটিসাপটা পিঠে বানাচ্ছিলাম। রন ফিরে এলো একটু পরই। বুঝলাম, কিছু বলতে চায়। 

----সুস্মী, প্লিজ সামান্য ব্যাপার নিয়ে এতটা ভেবো না। রিংকু কিন্তু তোমাকে শুধু বন্ধু না নিজের বোন বলে ভাবছে! বুঝতে পারো নিশ্চয়ই। 

তা তো আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু এতটা অল্প সময়ে এত আপন করে নিতে পারে কেউ কাউকে এটা বিশ্বাস হতে চায়না যে! তাই আমি উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকি। রন কাছে এসে একটি পিঠে হাতে তুলে নিয়ে খাওয়া শুরু করে। তার প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। দেখি সে চোখ বন্ধ করে পরিতৃপ্ত মুখে চিবুচ্ছে। হঠাৎ চোখ খুলে বলে, 

---আহ! তোমার কুকিং নিয়ে কিছু করা উচিত! অসাধারণ প্রতিভা তোমার! 

আমি খুশীতে ফিক করে হেসে দিলাম। অন্যদিকে, ভাবছিলাম যে সারাবছর স্যান্ডুইচ খেয়ে থাকে তার কাছে যে কোন ঘরোয়া রান্নাই অসাধারণ লাগবে এ আর নতুন কি!

আমাকে হাসতে দেখে রন যেন কিছুটা সহজ হলো। রান্নাঘরের ছোট টেবিলের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে শুরু করলো কথোপকথন যা আমার বুক ভেঙ্গে দুমড়েমুচড়ে দিলো আর রিংকুর জন্য সহানুভুতি আর ভালোবাসায় প্রাণ কেঁদে উঠলো। 

--- সুষ্মী, রিংকু সম্পর্কে তুমি কতটুকু জানো? ও কি তোমাকে নিজের সম্পর্কে বলেছে? 

----মানে?? অবশ্যই আমি সব জানি। ওর বাবা মা নেই। শীলার পরিবার ওকে আপন করে নিয়েছে …...এই তো? 

---- আমি জানতাম, ও কিছুই বলেনি তোমাকে! নিজের সম্পর্কে বলতে ও পছন্দ করে না। আর একটা  কারণ হলো, ওর পারিবারিক ইতিহাস জানলে কে কিভাবে নেবে পুরো ব্যাপারটা…...  বলতে পারো গোটা ব্যাপারটা ও ভুলে থাকতে চায়!! 

আমার মুখটা সম্ভবত বিষ্ময়ে হা হয়ে গিয়ে থাকবে। কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম রিংকুর মতো এমন হাসিখুশী প্রাণোচ্ছল মেয়ের জীবনে আর কি থাকতে পারে যা ওকে গোপন করতে হয়। 

----কি বলছো? এমনি ফান করছো আমার সাথে, তাই না?

----নাহ। রিংকু তোমাকে অন্তরের অন্তস্থলে বিশেষ একজন প্রিয় মানুষ হিসেবে জায়গা দিয়েছে। তাই তোমাকে আজ এমন কিছু কথা বলবো যা শুধু খুব খুব কাছের লোকেরাই জানে! তুমি ওর বিশ্বাসের মর্যাদা দিবে আমি জানি! 

এবার আমি ভয় পেতে শুরু করেছি। না জানি কি রহস্য লুকিয়ে রেখেছে এই মেয়ে! আল কায়দা গ্রুপের সদস্য না তো? নাকি, ছদ্মবেশে কোন স্পাই? এফবিআই?? আমেরিকায় টুইন টাওয়ার ধ্বংস আর চারদিকে নৃশংসতার কথা ভেবে ঘামতে শুরু করেছি। ভালো মানুষের ছদ্মবেশে পুরো পরিবারই নকল মনে হয়। আমাকে যদি এখন আঘাত করে…...ভেবেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে ...রিংকু একা বাচ্চা দুটোকে নিয়ে পার্কে। ওদেরকে আটকে রেখে আমাকে কিছু অপকর্ম করতে বাধ্য করবে……? এভাবেই এরা ব্ল্যাকমেইল করে মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেয়... কত  পড়েছি! হায় আল্লাহ! এ কি বিপদ! 

আমার আবোলতাবোল ভাবনার মাঝেই রন বলা শুরু করেছে।

----- রিংকু যে বাবা মায়ের কথা বলে তারা ওকে মাদার তেরেসা সোসাইটি থেকে দত্তক নিয়েছিল। এই পরিবারটি ছিল নিঃসন্তান। রিংকুর জন্মের পরই তাকে মাদার তেরেসার সংস্থায় দিয়ে দেয়া হয়। নাহ, ওর জন্মদাত্রী মাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই! উনি বাধ্য হয়েছিলেন।  ওর পালক পিতামাতাও জানতেন না ওর আসল মায়ের পরিচয়। ১৮ বছর বয়সে ওর বাবা খুলে বলেছিলেন যে সে তাদের কন্যা নয়।  

রিংকুর মায়ের তখন সদ্য বিয়ে হয়েছে। তার স্বামী ছিলেন এক কলেজের অধ্যাপক। দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবোধে বিশ্বাসী এক দারুণ ব্যক্তিত্ব। ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ছিলেন জনপ্রিয়। ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হলো তার মাস দুয়েক আগেই এই তরুণ প্রফেসর বিয়ে করেছেন। ঘরে তার টুকটুকে নতুন বউ রেখেই যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিতে বেরিয়ে যান এপ্রিল মাসের শেষে। যাবার আগে বউ আর বাবা মায়ের কাছে বিদায় নিয়ে যান। তরুণী বধু  অশ্রুসিক্ত নয়নে স্বামীর কাছে স্বাধীন দেশের জন্য আবদার করেন। স্বামী তাকে প্রতিশ্রুতি দেন বিজয়ের পতাকার। স্বামীর জন্য দুশ্চিন্তা, ভয়, নিজেদের নিরাপত্তার ভাবনায় একের পর এক নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছিলেন তরুণী বধূ। আচমকাই সেই প্রতীক্ষার অবসান হয়। মাস দুয়েক পর তার স্বামী কয়েকজন সহযোদ্ধা বন্ধুকে সংগে নিয়ে ফিরে আসেন গভীর রাতে। মাত্র কয়েকটা ঘন্টা থেকে খাবার খেয়ে তারা বিদায় নেন। সেই ছিল তাদের শেষ দেখা। দুদিন পরেই তাদের বাড়ী ঘিরে ফেলে পাকিস্তানি আর্মি। ওরা খোঁজ পেয়েছিল এ বাড়ীর কৃতি সন্তান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। পরিবারের লোকেদের কাছ থেকে খবর সংগ্রহ করার জন্য প্রথমে বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। নির্যাতনের পর ছেড়েও দেয়। সেদিন রাতে ওরা আবার আসে। এবার অধ্যাপকের তরুণী বধূটির দিকে নজর পড়ে। শশুড় শ্বাশুড়ির সামনে তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়…...ছোট ভাই আর মা বাধা দিতে এলে তাদেরকে বেয়নেট দিয়ে আঘাত করে, বুট পরা পায়ে প্রচন্ড জোরে লাথি মেরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। 

সেই তরুণীকে নিয়ে কি করেছিল হায়েনার দল বুঝতেই পারছো। ওকে কোথায় আটকে রাখা হয় কেউ জানতে পারেনি। এই তরুণীর পরিবার বাস করতো ঢাকার অদূরে নারায়নগঞ্জে। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে হঠাৎ করেই তাকে এবং আরও কিছু নারীকে আটক করে রাখা সৈন্যের দল কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়। ততদিনে তিনি অন্তসত্ত্বা, নিজের মধ্যে ঘৃণীত এই পশুদের চিহ্ন নিয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় আছেন। ছাড়া পেয়ে মুক্তির আনন্দে উল্লসিত মানুষের সাহায্যে বাপের বাড়ীতে এসে পৌঁছাতে সমর্থ হন। বাবা মা তাকে গ্রহণ করেন ঠিকই কিন্তু সবাই যে তার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলছে তা বুঝতে দেরী হয় না। দাঁতে দাঁত চেপে গর্ভাবস্থার শেষ তিনটি মাস কাটান প্রায় গৃহবন্দী হয়ে। বাচ্চা প্রসবের পর তার বাবার এক বন্ধু বাচ্চাটিকে রেখে আসেন মাদার তেরেসার সংস্থাটিতে।

এই হচ্ছে রিংকুর জন্মের ইতিহাস। রিংকু যখন সব জানতে পারে তার বহু আগেই ওর জন্মদাত্রী অবহেলায়, বঞ্চনায় আর লাঞ্ছনার জ্বালা সইতে না পেরে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে চিরতরে সব নিন্দা আর দুর্নামের অবসান ঘটায়। 
--------
রনের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম। নিজের অজান্তেই কখন যেন হাতের কাজ শেষে চেয়ারে এসে বসেছি। নোনা জলের অশ্রুধারায় চোখ ভেসে যাচ্ছে।
যুদ্ধশিশু…  হ্যাঁ, তাই তো বলে এদেরকে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সৈন্যরা হাজার হাজার বাঙ্গালী নারীকে ধর্ষণ করে। বাংগালী জাতির বিদ্রোহী জাতিসত্ত্বা ধ্বংস করে এক শঙ্কর প্রজন্ম তৈরী করা ছিল তাদের উদ্দেশ্য। যার ফলে যুদ্ধ শেষে জন্ম নেয় শত শত যুদ্ধসিশু। সরকার এদের নাম দিয়েছিল বীরাংগনা শিশু। নিয়তির পরিহাস হলো এই যে, বাংগালী সমাজ এই অসহায় শিশুদেরকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকার আলবদরের গোষ্ঠী কর্তৃক ধর্ষিত বাংগালী মায়ের সন্তানদের বিদেশে দত্তক হিসেবে নিয়ে গেছে কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও ডেনমার্কের মানবতাবাদী মানুষেরা। 

টিস্যু পেপার এগিয়ে দেয় রন চোখ মোছার জন্য। আলতো করে আমার মাথায় হাত রেখে আমাকে শান্ত হতে বলে। আমি থামতে পারছিলাম না। রিংকুর মায়ের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা পেয়েছি আমরা …...রিংকু একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। যিনি অস্ত্র ধরেননি কিন্তু নিজের সম্ভ্রম আর রক্ত মাংসের বিনিময়ে এ অমুল্য আশীর্বাদ দিয়ে গেছেন। কোনরকমে ধরা গলায় বলি,

----- রন, ভাগ্যিস একটি নিঃসন্তান পরিবার ওকে আশ্রয় দিয়েছিল। আমার জানামতে অনেক শিশুকে সেসময় বিদেশে দত্তক পাঠানো হয়। 

----তুমি যেমন ভাবছো অত সহজ ছিল না রিংকুর জীবন। রিংকুর পালক বাবা চা বাগানে কাজ  করতেন, তার স্ত্রী ছিলেন গুজরাটি মহিলা। তাদের পরিচয় হয়েছিল ইংল্যান্ডে যখন রিংকুর  বাবা ওখানে পড়তে যান। তারা বিয়ে করেন, বাংলাদেশে ফিরে চা বাগানে চাকুরী পান। যুদ্ধের পরে এই ভদ্রলোক বিদেশী সংস্থায় চাকুরী শুরু করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্বাসনের কাজে সহায়তা করার পাশাপাশি যুদ্ধশিশুদের নিয়েও তারা কাজ করছিলেন। সেভাবেই তিনি রিংকুর সন্ধান পান এবং স্ত্রীকে রাজী করিয়ে বাচ্চাটিকে দত্তক নেন। তার স্ত্রী প্রথম দিকে মেনে নিলেও পরে আর এই বাচ্চাকে মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না। কাজের লোক আর বাবার সাহচর্যে রিংকু বড় হয়। ওর ১৩/১৪ বছর বয়সেই ওকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ছুটির সময় অল্প দিনের জন্য বাসায় যেতো। কিন্তু মায়ের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলতো। কাগজে কলমে মায়ের নাম থাকলেও সেই পালিতা মা ওকে মনে প্রাণে ঘৃণা করতো। আর তাই বাবা ওকে আমেরিকায় পড়তে পাঠায়। ওর বাবার আর্থিক সামর্থ্য ছিল বলে তিনি মেয়েকে যতটা সম্ভব আড়াল করে তার পরিচয় গোপন রেখে মানুষের ঘৃণ্য দৃষ্টি থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারপরও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। রিংকু দেশ থেকে বের হওয়ার আগে জানতে পারে নিজের জীবনের প্রকৃত সত্য। বাবার কাছেই নিজের গর্ভধারিনী সম্পর্কেও জানে…...উনি আর কিছু লুকাননি। 

“সেই থেকে ওর প্রায়ই প্যানিক এটাক হয়। অনেক চিকিৎসা হয়েছে আমেরিকায়...এখনো হচ্ছে। মাঝে মাঝেই ডিপ্রেশনে চলে যায়…...বিষাদেভরা অন্তসারশুন্য এক রমণীতে পরিণত হয়। ঐ রিংকুকে আমি ভয় পাই। যদিও আমি একজন চিকিৎসক কিন্তু ওর স্বামী আর বাচ্চাদের বাবা হিসেবে ওকে অমন দেখতে শীতের ঝরে পড়া পাতা মনে হয়। আবেগহীন, ভালোবাসাশূণ্য, রিক্ত, নিঃস্ব…... ...বিবর্ণ, রক্তশূণ্য, মলিন …...টোকা দিলেই যেন ভেংগে গুড়িয়ে পড়বে।” 

খুঁট করে শব্দ হলো দরজায়। রিংকু একা দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খোলা। কেমন যেন শীতল এক দৃষ্টি ওর চোখে। খোলা দরজা দিয়ে দেখছি বাচ্চারা খেলছে মিন্টুর সাথে…...আজ আগেই ফিরেছে কাজ থেকে…...। 

রিংকুর সেই আহত হরিণীর মতো অভিব্যক্তি অসহ্য লাগলো। দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরি রিংকুকে শক্ত হাতের বেষ্টনীতে আজ আমরা শুধু বন্ধু নই, আমরা সহোদরা। ভিন্ন মায়ের গর্ভে জন্মালে কি হবে আমাদের আত্মা যে একই সুরে কথা বলে, হৃদয়ের বীণাতে একই সুর বাজে।

একজন বীর নারীর বীর কন্যা রিংকু…...নিজের হীনমন্যতা, গ্লানি, হতাশা দূর করে এই বৈরী পৃথিবীতে  নিজেকে টিকিয়ে রাখা খুব একটা সহজ নয়। ওকে সুস্থ করার জন্য জান লড়িয়ে দিবো। যে শিশুর কোন অপরাধ ছিল না তাকে আমরা ফেলে দিয়েছি, বিতারিত করেছি দেশ থেকে, সমাজ থেকে, পরিচয় গোপন রেখে লোকচক্ষুর আড়ালে রেখেছি…...তার সংস্পর্শে নিজেকে কলুষিত মনে করে যে ভুল করেছে আমার পূর্বপুরুষ সেই ভুল আমাকে লজ্জিত করে, অমানুষ মনে হয় নিজেকে।

আমারই মায়ের রক্তমাখা, আমারই দেশের মাটিতে ওর শেকড় গাঁথা। অনেক অনেক ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। রিংকুকে বুকে নিয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই পুর্বপুরুষের ঘৃণার দাগ ধুয়ে মুছে দেবো ওর স্মৃতি থেকে। আমাকে পারতেই হবে। 

গ্রীষ্মের খরতাপ কমে গেছে। দিন শেষ হতে ১০টা বেজে যায়। এই পড়ন্ত বিকেলে নরম আলোয় পাখীরা নীড়ে ফিরছে। শোনা যায় রবিন আর ব্লু জে’র কন্ঠে সমবেত কলরবের গান। বাচ্চারা কোরাস গাইতে গাইতে ফিরে আসছে ঘরে। ওদের কন্ঠে আমি শুনতে পাচ্ছি জীবনের গান, ভালোবাসার গান। আমরাও ভালোবাসার বীজ বুনি, ভালোবাসায় বুনে তুলি স্বপ্নের নীড়।

বন্যা হোসেন
অটোয়া, কানাডা।