অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
প্লেইন পাউন্ড কেক - বন্যা হোসেন

কুসুমের কথা 
-------------

পর্দার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখছি বাবার তৈরী হওয়া। প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজে যাওয়ার জন্য সকাল থেকেই হাঁকডাক শুরু হয়ে যায়। 

মা যেন কিছুতেই গা করেন না বাবার তুমুল ব্যস্ততায়।

মা ভাবেন, “ সপ্তাহে একটা দিন ছুটি। মনের সাধ্মিটিয়ে উপভোগ করাতেই আনন্দ। কেন সারা সপ্তাহের মত এই দিনটিও হুটোপাটি করে কাটাতে হবে। জুম্মার নামাজ পড়তে মসজিদে যাবে, তার জন্য সারা বাড়ীর লোককে তার মনমতো  চলতে হবে । জানিস, লোকটা বুড়ো হচ্ছে আর দিনদিন তার হম্বিতম্বি বাড়ছে। বিয়ের পর অনেকদিন পর্যন্ত কি মুখচোরা ছিল । তুই হওয়ার পর থেকেই একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল। আর যেদিন থেকে তোর মুখে বুলি ফুটলো সেদিন থেকে এই লোকটাও যেন জীবন পেলো। “

মা কি যে বলে না -----বাবার সম্পর্কে এমন উদ্ভট কথা বলতে পারে। আগে বুঝিনি, এসব কিছুই ভালোবাসার কথা। মায়ের গলায় ঝাঁঝ থাকলেও নিজেই কিন্তু সবকিছু এগিয়ে দেবে বাবাকে।  

শুক্রবার সকালে একটা বিশেষ ধরনের নাশতা বানানো মায়ের চাইই-চাই । দাদীও তাই করতেন। এখন মা-ও করেন। দাদীর কত রেসিপি যে মা-কে দিয়ে গেছেন। বংশপরম্পরায় রেসিপিগুলো ঘুরতে থাকে পরিবারের মধ্যে। কি অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না !  

মায়ের নিজস্ব অনেক রেসিপিও আছে। টিভি চ্যানেলের রান্নার প্রগ্রামগুলোতে ইদানীং মায়ের একচ্ছত্র আধিপত্য। মায়ের এত নাম-ডাক চারদিকে। রান্নার বইও বেরিয়েছে অনেকগুলো। বেকিংয়েও সমান পারদর্শী মা। ছোট একটি কনফেকশনারী দোকান খুলেছেন সম্প্রতি। সেখানে কত রকমের কেক, পেস্ট্রী বিক্রী হয়। জন্মদিনের কেকের অর্ডার লেগেই থাকে। কর্মচারীরা হিমসিম খায় কাজের চাপে। 

আমি জানি, মায়ের ভীষণ গোপন একটা দুঃখের কথা। মায়ের কেকের এত সুনাম সত্ত্বেও আমার কিন্তু সেই পুরোন দিনের মতোই ইউসুফ বেকারীর প্লেইন পাউন্ড কেকই পছন্দ। ছোটবেলা থেকেই  দেখেই দেখেছি বাবা বায়তুল মোকাররমে জুম্মা পড়ে শুক্রবার পুরোন ঢাকার সেই দোকানটির কেক কিনে আনতেন। আর আমি পুরো সপ্তাহ ধরে একটু একটু করে খেতাম। আমার এত আগ্রহ দেখেই মা কেক বানানো শিখলেন, ওভেন কিনলেন----কিন্তু আমার মুখে ইউসুফের দোকানের স্বাদ লেগে রইলো।  এখনও তাই। মা অবশ্য মেনে নিয়েছেন। মনে মনে দুঃখ পেলেও আমার মা খুবই বাস্তববাদী। শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে যে জীবন চলে না, তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন।

বাবা নাশতা শেষ করেই  ঘন্টাখানেক ধরে  জমিয়ে তার প্রিয় দৈনিক পত্রিকা দুটি পড়বেন।  একটি বাংলা, একটি ইংরেজী দৈনিক আসে বহুকাল ধরে। আমার বাবা এখনও সেকেলে আছেন। আজকাল অনলাইনেই সব পত্রিকা  আছে।  আমাদের জেনারেশনের কেউ কি এসব পত্রিকা রাখতে যায় !!  পত্রিকায় পড়ার আছেটাই বা কী ! খুললেই হরহামেশা খুন, জখম, ধর্ষণ,ডাকাতি, বাস চাপা, অগ্নিকান্ড বা মসজিদ, গীর্জায় গোলাগুলি ছাড়া আর কি কোন খবর থাকে !  

সে যাকগে, দেখি তো আমার বাবাটা কি করছে !  হ্যাঁ, পত্রিকা পড়া শেষ করে এবার নেল কাটার নিয়ে বসেছে। নখ কেটেই শুরু হয়ে যাবে বাবার ব্যস্ততা। সারা সপ্তাহের অফিসের পোষাক, লুঙ্গী, গেঞ্জী, পাজামা সব নিজে হাতে ধুয়ে দিবেন। বাবা কাউকে কখনো নিজের কাপড় ধুতে দেন না। দু’একবার অসুস্থ হলে মা ধুয়ে দিয়েছেন। বাবার কাপড় ধোয়া দেখতে যে কি মজা লাগে আমার। 

আগে যখন আমরা এক ফালির উঠোনসহ একটি ছোট বাড়ীতে ভাড়া ছিলাম, বাবা তখনও এক চামচ জেট পাউডার এলুমিনিয়ামের গামলায় গরম পানিতে দিয়ে কাপড় ভিজিয়ে রাখতেন কিছুক্ষণ । তারপর ঘষে ঘষে শার্টের কলার, হাতা, প্যান্টের পায়ের ঝুলের ময়লা ঘষে পরিস্কার করে কাপড় ধুতেন বালতির জমিয়ে রাখা পানিতে। কাপড় ধোয়া পানি ঢেলে দিতেন পুই, লাউ, আর শিউলী গাছের গোড়ায় ।

তিল তিল করে হিসেব নিকেষ করা সংসার করা বোধহয় একেই বলে। জীবনকে ভালোবাসলেই বিন্দু বিন্দু করে বৃত্ত ভরাট করে জীবনটাকে উপভোগ করা যায়। যার জীবনে মাস ফুরোলে হাত খালি হয়ে যায় না, সে কি করে বুঝবে জীবনে ভালোবাসার মর্ম !!   

বাবা কাপড় ধুয়ে টানটান করে কাপড়গুলো মেলে দিতেন উঠোনের দড়িতে। এখন তো আর উঠোন নেই। সামনের বারান্দাতেই ঝুলিয়ে দেন। আমার স্কুলের কাপড়গুলোও ধুয়ে দিতেন। মায়ের শাড়ীতে মাড় দিয়ে আমি আর বাবা শাড়ীর দু’প্রান্ত ধরে চিপে দিতাম। বাবা দাঁত মুখ খিঁচিয়ে  অংগভংগী করতেন আর আমি খিলখিলিয়ে হাসতাম। মা আমাদের দেখে ঠোঁট টিপে ভ্রুভঙ্গি করে বলতেন,  “এহ, আহ্লাদ দেখে বাঁচি  না।”  

বাবা সারাবছর শীত গ্রীষ্ম সবসময় গরম পানি দিয়ে গোসল করেন। গোসল সেরেই হাঁক ডাক, নারকেল তেল কই গেল রে? নারকেল তেল দিয়ে নিজের চকচকে টাকটাকে আরও চকচকে করে, বুকের লোমে আর হাতে পায়ে তেল ঘষে কড়কড় ইস্ত্রী করা সাদা পাজামা পাঞ্জাবীতে নিজেকে ভদ্রস্থ করে চোখে খানিকটা সুর্মা লাগাতেন। 

আমি এতক্ষণ পর্দার আড়ালেই ছিলাম। আর ফিকফিক করে হেসে বাবার জুম্মায় যাবার প্রস্তুতি দেখছিলাম। এবার পর্দা সরিয়ে সটান  ঢুকে পড়লাম ঘরে। বাবা তখন আয়নার দিকে তাকিয়ে পিতলের সুর্মাদানি থেকে হালকা টানে চোখের কোনায় সুর্মা লাগাতে ব্যস্ত। এরপর আতর দেবার পালা। আতরের ব্যাপারে বাবা বেশ সৌখিন। গোলাপ পাপড়ির তৈরীর বিশেষ সুগন্ধী আতর বাবার সংগ্রহে থাকে সবসময়। বাবা ছোট একটু তুলায় আতর লাগিয়ে নিজের কানের দু’পাশে আর গলায় লাগান। আমার দিকে তাকিয়ে একটু লাজুক হাসি দেন। আতর লাগানো তুলোটা আমার গালে লাগিয়ে দেন বাবা আদর করে। 

আমি সেই আতরের গন্ধটা গায়ে মেখে বাবার কানে কানে বলি, “বাবা, তোমার মনে আছে তো?”

বাবা চোখ মটকে ফিসফিসিয়ে বলেন, “মনে আছে, মামণি।” 

বাবা বেরিয়ে যান আমার মাথায় হাত বুলিয়ে। অপেক্ষায় থাকি সতৃষ্ণ নয়নে। ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে থাকে। এক, দুই, তিন পার হয়ে চারটার দাগে যাওয়ার আগেই বেল বাজে। দৌড়ে গিয়ে দেখি বাবা দাঁড়িয়ে। ক্লান্ত, শ্রান্ত চেহারা কিন্তু মুখে বিশ্বজয়ের হাসি। আমাকে দেখেই বাড়িয়ে দেয় হাতে ধরা প্লেইন পাউন্ড কেক। ইউসুফ বেকারীর।

বাবার কথা 
------------

মেয়েটা ডাগর চোখে কি মায়া করে তাকায় আমার দিকে। ওর মা কেকটা কেটে ছোট টুকরা করে দিল মেয়েকে খেতে। কুসুম ওর ছোট্ট হাতে অল্প করে ভেংগে কেক মুখে দিচ্ছিল। পাউন্ড কেকের মোলায়েম টুকরো ওর জিভের জলে মিশে গভীর তৃপ্তির এক কাব্য রচনা করে।

প্রতিবার এই অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্যটি দেখি আর ভাবি, ভালোবাসা আর ভালোলাগা একসাথে মিলে মিশে যা তৈরী করে তা কি অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সম্ভব !  সন্তানের মুখের হাসি নিঃসন্দেহে মধুর ভালোবাসার দ্যুতি ছড়ায়। 


বায়তুল মোকাররমে  শুক্রবার জুম্মার নামাজ  পড়ার পর একবার ইউসুফ বেকারী থেকে কিছু বিস্কুট আর পাউন্ড কেক এনেছিলাম। সেই কেক মেয়ে পুরো সপ্তাহ জুড়ে একটু একটু করে খেলো। একবারে খেলে যদি শেষ হয়ে যায়।  আবার টানা সাতদিনের অপেক্ষা। তাই মায়ের কথামতো  ধীরে ধীরে শেষ করে। আমার যে খুব ভালো লাগতো পল্লবী থেকে বাসে করে গুলিস্তান যেতে তা কিন্তু নয়। আমি জুম্মার নামাজটা বিভিন্ন দিন বিভিন্ন মসজিদে পড়তে ভালোবাসি। জ্ঞানীগুণী ঈমামদের খুৎবা শুনতে ভালোবাসি। তাই, কোন সময় যাই বড় মগবাজার বা বাসাবোয় বা সোবহানবাগে অথবা বায়তুল মোকাররমে। নামাজের পর রিকশা নিয়ে সূত্রাপুরে ইউসুফের দোকান থেকে কেক নিয়ে আবার বাসে চড়ে বসা। আসতে  যেতেই অনেকটা সময় যায়। কুসুমের মুখের অনাবিল হাসির জন্য এইটুকু কষ্ট কিছুই না। 

মেয়েটা যখন আরও ছোট কাজ থেকে ফিরলেই দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়তো কোলে। দিকবিদিকশূণ্য হয়ে দৌড়াতে গিয়ে কতবার যে আছাড় খেয়ে পড়ে ব্যথা পেয়েছে। দু’বছর পর্যন্ত আমার বুকে উপুড় হয়ে ঘুমাতো। তাকিয়ে দেখতাম আর ভাবতাম, আমি আর কল্পনা তো দেখতে খুব সাধারণ। তবে এই রূপসী কন্যার জন্ম হল কি করে আমার ঘরে! 

টকটকে গোলাপী রঙ, ঢেউ খেলানো এক মাথা রেশমের মত নরম চুল, শিল্পীর তুলিতে আঁকা চোখের লম্বা পাপড়িতে অপরূপা ঘুমন্ত এক রাজকন্যা আমার গরীবের ঘরে। কারা যেন বলেছিল, আমার কুসুমকে দিয়ে মডেলিং করাতে। ওর মা এককথায় নাকচ করে দেয়। আমরা দুটো কম খাবো, তবু দুধের শিশুকে দিয়ে উপার্জন করাবো না। 

আমার কুসুমটা স্কুলে যায় আমার হাত ধরে । ওর  মা দুপুরে নিয়ে আসে। ওর মা রান্নার বই লিখে বেশ অনেকগুলো টাকা পেল।  নিজস্ব ব্যবসায় শুরু করেছে। টিভিতে তার একটি অনুষ্ঠান চলছে বেশ কয়েকবছর ধরে। কল্পনার ব্যস্ততা বাড়লেও আমরা দুজনে মিলেই কুসুমকে সময় দেই। কোচিংয়ে নিয়ে যাই, সপ্তাহে একদিন একসাথে বাইরে খাওয়া, কুসুমের মামা আর ফুপু বাড়ী যাওয়া সবই চলছে জীবনের ছন্দে।    

কুসুমের জন্য ইউসুফ বেকারীতে এতদূর গিয়ে প্রতি সপ্তাহে কেক কিনে আনলে  কল্পনা ইদানীং রাগ করে। আমার বয়স হয়েছে , তাই মেয়ের মা শংকিত হয়। বয়সের সাথে নানা আধিব্যধি বাসা বেঁধেছে শরীরে। কিন্তু মেয়েটা যে পথ চেয়ে থাকে। মেয়েটার মুখে আলো ফোটাতে কী অপার্থিব সুখ পাওয়া যায়, তা কি তুমি  জানো না কুসুমের মা ?? 

কল্পনার কথা 
------------

মেয়েটা এত বাবার ন্যাওটা হয়েছে। জন্মের পর থেকেই বাপ ঘরে ঢুকলেই সে গন্ধ পেত। যতক্ষণ বাবা তাকে কোলে না নিচ্ছে, ততক্ষণ চেঁচিয়ে বাড়ী মাথায় করতো। বাবাও মেয়েকে চোখে হারায়। আমার হিংসে হয় না। আমাকে একটু কম ভালোবাসুক, অসুবিধে নেই। বাবা মেয়ের প্রতি যত্নশীল---- এতো  আমার সৌভাগ্য।  আমার নিজের ত বাবাই জোটেনি কপালে। জন্মের চার বছর পরই বাবাকে হারিয়েছি। বাবার চেহারাটা পর্যন্ত মনে নেই। বিয়ের পর শ্বশুরকে পাইনি। বাবার আদর যে কি জিনিস তা দেখলাম কুসুম জন্মাবার পর । 

আসিফের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না আমাদের বিয়ের সময় । কিন্তু ওর মত যত্নবান আর সদয় বাংগালী পুরুষ আমি ইহজীবনে দেখিনি। আমাকে এত যত্ন করে, কাউকে বলতেও লজ্জা হয়।  যেদিন আমার বেশি কাজ করতে হয়, বিছানায় শুলেই সে আমার পা টিপে দেয়, মাথা  টিপে দেয় মুখে  কিছু না বলে। শুরুর দিকে তো আমি সংকোচে কুঁকড়ে যেতাম। সংসারের অপূর্ণতা ভরিয়ে দিয়েছে যত্নে আর ভালোবাসায়। একসময় স্বচ্ছলতা এলো, মানুষটা সেই একইরকম থাকলো। 

জুম্মাবারে পল্লবী থেকে বাসে করে গুলিস্তান গিয়ে নামাজ পরবে। যাতে ইউসুফে গিয়ে কেক আনতে পারে। এখন অবশ্য আরও অনেক দোকান হয়েছে ইউসুফের। অনেক বলে কয়ে বন্ধ করেছি অতদূর যাওয়া । 

সে এখন বনানীতে যায়। ফেরার পথে মেয়েটার কাছে যায়। মেয়েটাকে দেখে আসে... কেকটা সাথে নিয়ে। মেয়েটা এখনও তেমনি আছে, প্লেন কেকের জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকে। 

আমি ওকে ঠেলে পাঠাই। বলি, দুটো বেশী কিনো ! মেয়েটা বড় হয়েছে তো !  সারা সপ্তাহের খাওয়া। এ বাড়ী থেকে চলে যাওয়ার পর একদিন গিয়েছিলাম ওর বাবার পিছু পিছু। সেদিন কেন যে আসিফকে হিংসে হয়েছিল। নামাজ শেষের সময় আন্দাজ করে বেরিয়েছিলাম । গাছের ঘন ছায়ায় ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। মেয়েটা এত সুন্দর পরিবেশে আছে দেখে শত কষ্টেও মনে প্রশান্তি পাই। 

গাছের আড়াল থেকে দেখলাম মেয়ের বাবাকে, হাতে ইউসুফের ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে আসছে। ব্যাগ থেকে কেক বের করে রাখলো বাঁধানো কবরের বেদীতে। ওর চোখ ভেসে যাচ্ছে নোনা পানিতে, আমিও কি আর থাকতে পারি লুকিয়ে। ডুকরে কেঁদে উঠলাম। সে অবাক হয়ে এগিয়ে এসে আমার হাতটি ধরলো। সারাজীবন এমনটি করেই ধরে রেখেছে---- আমার আশ্রয়ের হাত, নির্ভরতার হাত, আশ্বাসের হাত। 

দু’জনের জোরালো মুষ্টিতেও ধরে রাখতে পারলাম না কুসুমকে। বাবা-মায়ের ভালোবাসা কি যথেষ্ট ছিল না রে কুসুম ?? 

২৩ বছরের  মেয়েটার একই বছরে পর পর দু’বার নিউমোনিয়া হল।  পরীক্ষায় ধরা পড়লো  রক্তে  তার কর্কট রোগ। চিকিৎসা শুরু হল সংগে সংগেই। দু’সপ্তাহ---শুধু দুটো সপ্তাহ সে ছিল। চিকিৎসার কষ্ট সে সহ্যই করতে পারলো না। আমাদেরকে তার কষ্ট বুঝতে না দিয়েই চলে গেল। রাতেও গলা জড়িয়ে বাবা মায়ের সাথে আহ্লাদি করেছে। সকালেই তাকে লাইফ সাপোর্টে নিতে হল। মাস্টার্স করতে একমাস পরেই শিকাগোতে যাওয়ার কথা তার। সে হারিয়ে গেল জীবনের কোলাহল থেকে গহীন অন্ধকারে । 

আমাদের কুসুম হারিয়ে গেলেও আরও অনেক কুসুম খুঁজে পেয়েছি যারা আমার কুসুমের পাশেই ঘোরাফেরা করে। সেদিন দেখেছিলাম, আমরা বাড়ী ফেরার পথ ধরতেই ৭/৮ বছরের দুটি বাচ্চা মেয়ে এলো কুসুমের কাছে। কেকের প্যাকেট খুলে দেখলো। প্যাকেট হাতে নিয়েই গাছের ছায়ায় বসে পড়লো। চোখে মুখে হাসির ঝিলিক। ওদের মুখের অনাবিল আনন্দ দেখে পাথর চাপা হৃদয়টা দুলে উঠলো। 

সেই থেকে আসিফও এদের সাথে সখ্যতা করে নিয়েছে। জুম্মা শেষ করেই কেক ছাড়াও আরও কিছু খাবার নিয়ে চলে যায় কুসুমের কাছে। কুসুমের পাশে বসেই বাচ্চাগুলো খায়। প্রতিবারই সংখ্যায় আরও কয়েকজন জুটে যায়। ওদের সাথে বসে গল্প করে আসিফ ভারী আনন্দ পায়। পরের দিনগুলোতে বেঁচে থাকবার জীবনীশক্তি নিয়ে ঘরে ফেরে। 

আর আমি ? আমিও যাই ওখানে মাঝেমাঝে। আমার নিজের কাজ নিয়েও ব্যস্ত থাকি। ব্যবসাটা বড় হচ্ছে। কুসুমকে হারিয়ে শোকাচ্ছন্ন অবস্থায় ভালোবাসার স্পর্শের খুব দরকার ছিল। আমরা দুজন একে অপরকে সেই স্পর্শ দিয়ে আঁকড়ে ছিলাম। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আমাদের কান্না আরও উত্তাল হয়েছিল। নিয়ন্ত্রণহীন সেই উথালপাথাল শোক সামলে মনকে শান্ত করেছি। শরীরের শ্রান্তিতে মন শীতল হয়েছে। 

কুসুমকে দিয়েছিলাম এক সমুদ্র ভালোবাসা। ওর নিয়তি ওকে টেনে নিয়ে গেছে। ধরে নিয়েছি, ওর আয়ু হয়তোবা সীমিতই ছিল। যে কদিন বেঁচেছে, হাসি-আনন্দে বেঁচেছি আমরা ওকে নিয়ে। যখন সে আমাদেরকে ছেড়ে গেছে, তখনও আমাদের বাঁচতে হবে। 

জীবন্মৃত হয়ে বাঁচতে চাইনি আমরা। মরণের আগেই মরতে চাইনা। জীবনটা লড়াই করেই বাচবো। 

কুসুমকে নিয়ে এক সমুদ্র সুখের উপাখ্যান লেখা যে এখনও শেষ হয়নি আমার। 

কুসুমের বাবা এক কুসুমকে হারিয়ে অনেক কুসুমের সন্ধান পেয়েছে। তাইতো, আজও আসিফ ইউসুফ বেকারীতে গিয়ে পাউন্ড কেক কিনে কুসুমের জন্য, কুসুমদের জন্য।

বন্যা হোসেন
অটোয়া, কানাডা।