অটোয়া, মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯
অন্যরকম ভালোবাসা--- তাবাসসুম নাজ

     রান্নাঘর থেকে চায়ের কাপটা হাতে করে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো চন্দনা। এ সময়টুকু তার একান্ত নিজস্ব। আকাশের গায়ে একটু একটু করে আলো ফুটে ওঠে, শুকতারা একসময়ে দপ করে নিভে যায়। শুরু হয়ে যায় রঙের হোলি খেলা। চায়ে চুমুক দিতে দিতে চন্দনা প্রাণভরে সবকিছু উপভোগ করে। একসময়ে বিশাল টেনিস বলের মত সুর্যটা মুখ দেখায়। হলদে কমলা লাল তার রঙ। সুর্যের দেখা পাওয়ার সাথে সাথে চন্দনা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার প্রাত্যহিক কাজকর্মে। কাজ কি একটা দুইটা নাকি? নাহিয়ানকে ঘুম থেকে তুলে স্কুলের জন্য রেডি করে তাকে নাস্তার টেবিলে আনা--- ফাঁকে ফাঁকে নাহিয়ানের বাবা সৌম্যকে প্রথমে মৃদুস্বরে, তারপর ক্রমশ উচ্চস্বরে ও সবশেষে তর্জন গর্জনের মাধ্যমে ডেকে তোলাই তো এক বিরাট কাজ তার।
     চায়ের কাপ হাতে করে ডাইনিং স্পেসে পা বাড়িয়েছে--- সকালের নিস্তব্ধতা খানখান করে ভেঙ্গে দিয়ে কলিং বেলটা বেজে উঠল। পরমুহুর্তে দরজায় ধামধাম বাড়ি। দরজার ওপারে যে রয়েছে, তার যেন তর আর সইছে না। অধৈর্য হয়ে একবার কলিং বেল বাজিয়ে আর একবার দরজায় ধাক্কা দিয়ে নিজের উপস্থিতি জোরেসোরে জানান দিচ্ছে।
     এত সকালে কে হতে পারে? দ্রুতপদে এগিয়ে গিয়ে কি হোলে চোখ রাখল চন্দনা। ল্যান্ডিং এর আধো অন্ধকারে মুখটা চেনা চেনা লাগলেও ঠিক চেনা যাচ্ছেনা। দরজা খুলবে কি খুলবেনা ভাবছে। কিন্তু দরজার ওপারে যে রয়েছে, সে দরজাটা ভেঙ্গে ফেলবার উপক্রম করতেই বাধ্য হয়ে চন্দনা এবারে দরজাটা মেলে ধরে। আর ধরতেই তার মুখ আপনা থেকেই হাঁ ।
     চন্দনার হতবাক ভাবটা সাদী খুব উপভোগ করল।
     --- কেমন আশ্চর্য করে দিলাম বল দেখি!
     --- সাদী ভাই তুমি? কোথা থেকে? কেমন করে? কিভাবে?
     --- এই তো! চলে এলাম আজ সকালে।
     --- সত্যি তুমি তো? আমি যে বিশ্বাস করতে পারছি না। একটা খবর দিয়ে আসবে তো নাকি!
     --- খবর দিয়ে আসলে কি আর তোর এই মুখ দেখতে পেতাম? আহারে, আয়নায় যদি নিজের মুখটা একবার দেখতিস!
     এবারে অভিমান ফুটে ওঠে চন্দনার স্বরে। 
     --- আশ্চর্য হব না, বল। দশ বছর ধরে বলতে গেলে তুমি লাপাত্তা। সেই যে অস্ট্রেলিয়ায় গেলে, একেবারে গায়েব হয়ে গেলে। যাকগে, এখন বল কতদিনের জন্য এসেছে? কোথায় উঠেছ? সাথের লাগেজ কই? কথার রেলগাড়ি চালিয়ে দেয় চন্দনা। 
     --- ঘরে ঢুকতে দিবি তো নাকি বাইরে থেকেই বিদায় করে দিবি তুই, চান্দি? ছিঃ ছিঃ, এত বড় বংশের মেয়ে হয়ে তোর এই অধঃপতন? অতিথির সাথে এ কেমন ব্যবহার তোর বল দেখি!
     চান্দি! বহু আগের হারিয়ে যাওয়া নাম, যা শুনে সত্যি সত্যি একসময়ে চন্দনার চান্দি গরম হয়ে যেত কিন্তু সাহস করে কোনোদিন তেমন জোরালো প্রতিবাদ করতে পারেনি। কিন্তু আজ সে নাম শুনে গলার কাছে কি জানি একটা দলা পাকিয়ে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে চন্দনা দরজা ছেড়ে দাঁড়ায়।
     ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সাদী প্রশ্ন করে।
     --- সৌম্য কই?
     --- এখনো ওঠেনি, সাদী ভাই। কিন্তু আগে তুমি বল উঠেছ কোথায়? কতদিনের জন্য এসেছ?
     আরাম করে সোফায় গা এলিয়ে দেয় সাদী।
     --- বেশিদিন না, চারদিন।
     --- মাত্র? কাঁদোকাঁদো হয়ে উঠল চন্দনার মুখ।
     --- তুমি কি আমার সাথে ফাজলামি করছ নাকি? এতদিন পর তুমি স্রেফ চারদিন হাতে নিয়ে এসেছ?
     --- কি যন্ত্রণা! কাঁদবি নাকি? বিব্রত দেখায় সাদীকে।--- আরে বাবা, চারদিনই বহু কষ্টে ম্যানেজ করা গেছে। এখন সৌম্যকে ডাক দেখি। তোর প্রশ্নের জ্বালায় তো অস্থির হয়ে গেলাম।
     সেকথায় কান দেবার কোনো ইচ্ছাই চন্দনার নাই।
     --- তোমার সাথে লাগেজ কই?
     মুহূর্তে কাচুমুচু মুখ সাদীর।
     --- ইয়ে, হোটেলে!
     --- হোটেলে! নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারেনা চন্দনা।--- ইয়ার্কি মারছ নাকি? তুমি হোটেলে উঠেছ! আমি আর কিছু শুনতে চাই না। জলদি গিয়ে তোমার জিনিস নিয়ে এসো বলছি।
     --- আরে কি মুশকিল! এককাপ চা তো খাওয়াবি আগে! প্লেনের ট্যালটেলে চা খেয়ে মাথাটা যে ধরে আছে, বলার কথা না।  
     --- কিচ্ছু খাওয়াবো না! আগে তুমি হোটেলের পাট চুকিয়ে দিয়ে লাগেজ নিয়ে আসো, তারপরে অন্য কথা!
     --- আরে বাবা, বোঝার চেষ্টা কর। হঠাৎ করে আসবার প্রোগ্রামটা  হল। তোদের জানানোরও সুযোগ হয়নি। সেজন্য না বলে কয়ে হুট করে উঠে তোদের অসুবিধায় ফেলে দিতে মন সায় দেয়নি।
     সাদীর কথায় ততক্ষণে চন্দনার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে গেছে, তারমধ্যেই হুংকার দিল।
     --- অসুবিধা! আমাদের অসুবিধা! সৌম্য! সৌম্য! শুনে যাও সাদী ভাই কি বলছে!
     গোলমাল শুনে সৌম্য ঘুমচোখে হুড়মুড় করে ড্রয়িংরুমে ঢুকে চোখ ছানাবড়া করে ফেলে।
     --- সাদী তুই? কখন! হঠাৎ! কিভাবে!
     সাদী উঠে দাঁড়িয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে।
     --- কেমন আছিস, দোস্ত?
     নাস্তার টেবিলে চন্দনা আগের প্রসঙ্গে আবার ফিরে গেল।
     --- নাস্তা খেয়ে কিন্তু তুমি আর আমি তোমার লাগেজ আনতে যাচ্ছি, সাদী ভাই।
     সাদী কিছু একটা বলবার চেষ্টা করল। কিন্তু তাকে সে সুযোগ দিলনা চন্দনা।
     --- না না। কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। তুমি এখানে থাকবে, এটাই ফাইনাল।
     সাদী সৌম্যের দিকে তাকায়।
     --- তোর বউ দেখি হুকুম ছাড়া কোনো কথাই বলে না!
     সৌম্য ঠোঁট টিপে হাসে।
     --- তোদের বাড়ির মেয়ে, তুই ভালো জানিস, দোস্ত।
     --- কিন্তু কথা হচ্ছে, দোস্ত, সে আগে তো এমন ছিলনা। তারমানে তুইই ওকে বিগড়ে দিয়েছিস। আহা, আমার প্রতাপশালী দাদাজান যদি আজ দেখতে পেত। মনে বড় ব্যথা পেত! 
     টেবিলের অন্যপ্রান্ত থেকে চন্দনা চোখ পাকালো।
     --- তোমাদের কথা শেষ হয়েছে? সৌম্য, তুমি আজ অফিস যাবার পথে নাহিয়ানকে স্কুলে নামিয়ে দিও। সাদী ভাইকে আমি একফোঁটাও বিশ্বাস করছি না। সাথে গিয়ে জিনিসপত্র নিয়ে তবেই আমি ফিরছি।
     সাদী সৌম্যকে উদ্দেশ্য করে চোখ টিপল।--- বাপ রে! ডেঞ্জারাস মহিলা!
     সৌম্য প্রতিউত্তর করল।---  তোরই চাচাতো বোন, দোস্ত। কিছু বললে বুমেরাং এর মত তোর দিকেই ফিরে আসবে! 

********* 
     দুইদিন পরের কথা।
     গাড়িতে উঠতে উঠতে সাদী প্রশ্ন করে।
     --- আজ আমাদের প্ল্যান কী তাহলে?
     --- তুমি বলো, সাদী ভাই। আজ তোমার পালা। তুমি যা চাইবে আজ আমরা তাই করব।
     --- আইসক্রিম খাবি, চান্দি?
     নিমেষে মুখ গোমড়া চন্দনার।--- ফের চান্দি?
     তাড়াতাড়ি সংশোধন করে নেয় সাদী।
     --- আচ্ছা, আচ্ছা, চন্দনা ম্যাডাম। হলো তো? এখন আইস্ক্রিম খাবি কিনা বল!
     --- আমি আর আইসক্রিম খাই না, সাদী ভাই।
     চোখ কপালে তোলে সাদী।--- বলিস কি রে! ভুতের মুখে রামনাম! নাহিয়ানের কথা ভেবেই রাজি হয়ে যা না। বেচারা আইস্ক্রিমের নাম শুনে জ্বলজ্বলে মুখে তাকিয়ে আছে।
     চন্দনাকে আইস্ক্রিম নিয়ে নাড়াচাড়া করতে দেখে সাদী সত্যি অবাক হয়।
     --- তুই সত্যি সত্যি আর আইসক্রিম খাস না, না? 
     দুঃখিত দেখায় চন্দনাকে।--- না, সাদী ভাই। দেখো না কেমন মুটিয়ে যাচ্ছি। খাওয়া কন্ট্রোল না করলে একেবারে হাতি হয়ে যাব।
     --- বলিস কি রে। আমি তোর মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখছি না। একেবারে আগের সেই চান্দি রয়ে গেছিস। শুধু সর্দারি করাটা নতুন, এই যা।
     রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেলে চন্দনা।
     --- চোখে চশমা লাগাও, সাদী ভাই। দশ বছর পার হয়েছে বুঝলে? আমারো অনেক পরিবর্তন এসেছে। বয়স বেড়েছে, ওজন বেড়েছে, দায়িত্ব অভিজ্ঞতা সবই বেড়েছে। আমি কি আগের সেই চন্দনা আছি নাকি?
     কাঁধ ঝাকায় সাদী। তার চোখে চন্দনার কোনো পরিবর্তন সত্যি ধরা পড়ছে না। বরং মনে হচ্ছে এ কয় বছরে চন্দনা যেন আরো প্রস্ফুটিত হয়েছে। আত্মবিশ্বাসী, জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট এক রমণী। চন্দনার আলো ঝলমলে মুখটা দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু গোপনে, খুব গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ও পড়ে। বুকের কোথাও কি একটু চিনচিন করে উঠছে? পেয়েও হারানোর এক ব্যথা বাজছে? 
     ছোটবেলা থেকে সে জেনে এসেছিল চন্দনা আর তার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। তাদের দাদার ইচ্ছানুক্রমে। সে ইচ্ছার কোনো নড়চড় হবার উপায় নাই। রাশভারী দাদার কথা আদেশের সমান। কথাটা জানা সত্ত্বেও তেমন কোনো প্রভাব তার মনে পড়েনি। কেন তা কে বলতে পারে। পাঁচ বছরের ছোট চন্দনাকে বিশেষ কোনো নজরে কখনো দেখেনি সে। নিজের বোন ফায়জার খেলার সাথী, তারকাছে এটুকু ছিল চন্দনার পরিচয়। এই মেয়ে যে একদিন তার বউ হবে, সে কথাটা মনে তেমন দাগ কাটত না। ওরা দুজনে মাঝেমাঝে তারকাছে আইস্ক্রিম, আচার এসবের বায়না ধরত। সে বায়না অবশ্য সাদী খুশিমনে মিটাত। তবে সেখানে ফায়জাই মুখ্য ভুমিকা নিত। চন্দনা কিছুটা লাজুক, মুখচোরা ছিল, কথা বেশি বলত না। এরমাঝে সাদী ঢাকায় পড়তে চলে গেল। রুমমেট হিসাবে পেল সৌম্যকে। প্রাণের বন্ধু সৌম্যকে সাথে করে একবার ছুটি কাটাতে বাড়ি আসল সাদী। ফায়জা আর চন্দনা ততোদিনে কলেজে উঠে গেছে।  চারজনে একসাথে লুডু, ক্যারাম প্রভৃতি খেলতে গিয়ে কখন যে সৌম্য আর চন্দনার পরিচয় গাঢ় হয়ে গেল, তা সাদীর জানা নেই, চোখেও কিছু পড়েনি। ফিরে আসবার পর সৌম্যের কাছ থেকে ঘুরাক্ষণেও এর আঁচ পায়নি। তবে দুজনের মধ্যে যে যোগাযোগ বজায় ছিল, তা সাদী বহু পরে জানতে পেরেছিল।
     ইউনিভার্সিটির পাট চুকতে না চুকতেই দাদার তলব পেয়ে বাড়ি ফেরে সাদী। দাদা জানালো এবারে বিয়ের আর দেরী করার কোনো কারণ নেই। মনেমনে এর জন্য প্রস্তুত ছিল সাদী। জানা কথা এ প্রসঙ্গ উঠবে। চন্দনার সাথেই তার বিয়ে হবে। সাদী ঠিক আপত্তি করতে পারল না কিন্তু সেই মুহূর্তে বিয়ে করবারও তার ইচ্ছা ছিলনা। তবে সেই ইচ্ছা দাদাজানের ইচ্ছার কাছে যে নস্যাৎ হয়ে যাবে, সেখবর তার অগোচরে ছিলনা। কিন্তু একরাত্রে ঘটল এক ঘটনা। চন্দনা তার ঘরে এসে কেঁদে ফেলল। একে একে সমস্ত ঘটনা তখন বেরুতে লাগল। সবশুনে সাদী যেন একটা মুক্তির পথ দেখতে পেল, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল যে প্রিয় বন্ধুর সাথেই চন্দনার বিয়ে দেবার চেষ্টা করবে। তার নিজের এই মুহূর্তে বিয়ে করবার একেবারে ইচ্ছা নাই। আর চন্দনার প্রতিও বিশেষ কোনো আকর্ষণ নাই। অন্যদিকে সৌম্যের সাথে কথা বলে বুঝতে পারল সৌম্য চন্দনার ব্যপারে ভীষণ সিরিয়াস। শুধু লজ্জার খাতিরে সাদীকে মুখ ফুটে এতদিন কিছু বলতে পারছিল না।
     এঘটনার কয়দিন পর লুকিয়ে চন্দনাকে ঢাকাগামী বাসে তুলে দিল সাদী। এছাড়া আর কোনো উপায় ছিলনা। দাদাজান কখনো এ সিদ্ধান্ত মেনে নিত না। উপরন্ত সৌম্যের তখন চালচুলা বলতে কিছু নাই, একটা চাকরি পর্যন্ত জোগাড় করে উঠতে পারেনি সে। কথাটা চন্দনার কাছেও তুলেছিল সাদী।
     --- সৌম্য কিন্তু কিছুই করেনা। কখন চাকরি পাবে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নাই। এদিকে তুই আরাম আয়েশের মধ্যে মানুষ হয়েছিস। পারবি কষ্ট করতে?
     --- পারব। খুব সংক্ষেপে, খুব দৃঢ় উত্তর দিয়েছিল চন্দনা। তার চোখে কঠোর সংকল্পের ছাপ।
     একটু অবাকই হয়েছিল সাদী। চন্দনাকে জোর দিয়ে কখনো কিছু বলতে দেখেনি সে। জীবনে প্রথমবার যেন ভালোভাবে লক্ষ্য করল চন্দনাকে।
     --- সত্যি যদি পারিস তো ঢাকায় যাবার জন্য মনেমনে প্রস্তুত হ। এছাড়া আর কোনো উপায় দেখিনা। আমি সৌম্যের সাথে কথা বলে সব ব্যবস্থা করছি। তোকে আমি বাসে তুলে দিব, সৌম্য ঢাকায় তোর জন্য অপেক্ষা করে থাকবে।
     তারপর একদিন সত্যি সত্যি ঢাকাগামী বাসে চড়ে বসল চন্দনা। এসময়ে বন্ধুবান্ধবরা খুব সাহায্য করেছিল। বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত এক বান্ধবী চন্দনাকে তার বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে সাদী ঢাকায় সরাসরি কাজী অফিসে চলে আসে ওদের বিয়েতে সামিল হতে। আর তখনি বধূবেশে চন্দনাকে দেখে সে এক বিরাট ধাক্কা খায়। 
     বন্ধুবান্ধবরা তাদের সাধ্যমত যতটুকু পেরেছে করেছে। তাদের উৎসাহেই বিয়ের আয়োজন কিছুটা হলেও করা হয়েছে। চন্দনাকে লাল শাড়ি, সর্বাঙ্গে ফুলের গয়না দিয়ে সাজিয়ে এনেছে সেই বান্ধবী। চন্দনার ঠোঁটে সলজ্জ হাসি, মুখে নববধূর ব্রীড়া। একয়দিনে চন্দনার মধ্যে কি যেন একটা পরিবর্তন এসেছে, সাদী অনেক চেষ্টা করেও তা ধরতে পারল না। চন্দনা যেন এক লহমায় অনেকখানি বড় হয়ে গেছে, পরিণত হয়েছে, সুন্দরও হয়েছে। সেই সৌন্দর্য তার চোখে মুখে ফুটে বেরুচ্ছে। তথাকথিত নিখুঁত চোখ-নাক-মুখের সৌন্দর্য এ নয়, সম্পুর্ণ অন্য জিনিস। আরো কিছুদিনের মধ্যে সাদীর বুঝতে বাকি থাকল না এ কিসের সৌন্দর্য। এ সৌন্দর্য চন্দনার ভালোবাসার, তার মানসিক শক্তির, তার চারিত্রিক দৃঢ়তার। আজন্ম সুখ সাচ্ছন্দে লালিত হওয়া চন্দনা বিনাবাক্যব্যয়ে চালচুলাহীন সৌম্যের সাথে কষ্ট করছে। সৌম্য একদিন সফল হবেই--- চন্দনার অটল বিশ্বাস। 
     সাদীর মনে হল তার কিজানি এক অমূল্য ধন হারিয়ে গেছে তার নিজের অজান্তেই। যাকে সে জ্ঞান হওয়া অবধি নিজের প্রাপ্য বলে মনে করে তুচ্ছজ্ঞান করে আসছিল, ভালো করে কোনোদিন তাকিয়ে পর্যন্ত দেখেনি, আজ তাকে নতুন রূপে দেখতে পেয়ে সে মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে লাগল সে কি হারিয়েছে। মনের অবস্থা টের পেয়ে চমকে গেল সাদী। সাথেসাথে নিজেকে সরিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। চন্দনা এখন পরস্ত্রী, উপরন্ত বন্ধুর স্ত্রী। তাকে ঘিরে এসব অনুভূতি লালন করা রীতিমত আত্মহত্যার শামিল। এই ভালো, সে সরে যাবে ওদের জীবন থেকে। 
     কিন্তু চাইলেই কি সবকিছু হয়? চন্দনা তার চাচাতো বোন আর সৌম্য তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই ইচ্ছা থাকলেও সাদী দূরে থাকতে পারল না। কিম্বা বলা চলে ওরা দুজন তাকে দূরে থাকতে দিল না। ওদের পীড়াপীড়িতে সাদীকে আবার তাদের ঘরে নিয়মিত হতে হল। চোখের সামনে তাদের সংসার করা, তাদের খুনসুটি দেখতে হল। যতদিন যেতে লাগল, সাদীর মনের শুন্যতা যেন বেড়েই গেল। একসময়ে তার মনে ভয় ঢুকে গেল। সৌম্য বা চন্দনা হয়ত তার মনের অবস্থা বুঝে ফেলতে পারে! তা যদি ঘটে তো লজ্জার সীমা পরিসীমা থাকবে না। এই পরিস্থিতির হাত থেকে মুক্তি পেতে সাদী একরকম পালিয়ে চলে গেল অট্রেলিয়াতে, যোগাযোগ কমিয়ে দিল ওদের সাথে। পরের দশ বছর সে ইচ্ছা করেই সৌম্য চন্দনার কাছ থেকে দূরে থাকল। মন প্রাণ ঢেলে দিল কাজে। 
     আজ সে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, মেডিকাল ইন্সট্রুমেন্টের। ব্রিসবেনের বাঙ্গালী সমাজের খ্যাতিমানদের একজন, অনেকে তাকে একনামে চেনে। বাড়ি, গাড়ি, অর্থ বিত্ত কিছুরই অভাব নাই। এলিজিবল ব্যাচেলর হিসেবে তাকে নিয়ে বেশ গুঞ্জন শোনা যায়। বহু মেয়ে তাকে খুশিমনে স্বামী হিসেবে লুফে নেবে। কিন্তু সাদী আসলে এদিকটা কখনো ভেবে দেখেনি। এমন না যে চন্দনার প্রতি তার সেই আবেগের তীব্রতাটা এখনো রয়ে গেছে। সময়ের পলিমাটিতে তা অনেকটাই ফিকা হয়ে গেছে। সেভাবে তেমন মনেও পড়েনা। কিন্তু তারপরেও ইদানিং মেয়েদের আগ্রহ দেখে আর বিভিন্ন পার্টিতে “কবে বিয়ে করছ?” প্রশ্নের মুখোমুখি হলেই চন্দনার মুখটা মনে ভেসে উঠত। শেষে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল হুট করে দেশে আসার, চন্দনা সৌম্যকে আবার দেখার। বহুকষ্টে মাত্র কয়েকদিনের ছুটি ম্যানেজ করে সত্যি সত্যি এক সকালে চন্দনা সৌম্যের ঘরের দরজায় বেল বাজাতে থাকে সে।
     --- সাদী ভাই, ও সাদী ভাই, কী ভাবছ?
     চন্দনার ডাকে বাস্তবে ফিরে এল সাদি। জোর করে মন থেকে এসব ভাবনা ঝেড়ে ফেলল।
     চন্দনা তখনো আইস্ক্রিম নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। গলে যাওয়া আইসক্রিমের বাটিটা ঠেলা দিয়ে সরিয়ে রেখে বলে--- সাদী ভাই, আমি আর এইটা খাবো না। দেখো না এদের এখানে ফুচকা পাওয়া যায় কিনা?
      হেসে ফেলে সাদী।--- যাক, এই ব্যপারে অন্তত তোর কোনো পরিবর্তন হয়নি দেখি। এখনো ফুচকার নাম শুনলেই নেচে উঠিস!
     --- ইশ, ফুচকাও আমি আগের থেকে কম খাই।
     নাহিয়ান এতক্ষণ দূরে খেলছিল। এবারে দুজনের কথার মধ্যে ঢুকে পড়ে।
     --- মা ফুচকা অনেক খায়।
     সাদী হো হো করে হেসে ওঠে। নাহিয়ানকে কোলে তুলে নিতে নিতে বলে--- আর নাহিয়ান কী খায়?
     --- আইসক্রিম আর পিজ্জা!
     নাক সিটকায় চন্দনা।--- জাঙ্ক ফুড পেলে এই ছেলেটা আর কিছু চায়না!
     তারপর বলে--- সাদী ভাই, অস্ট্রেলিয়া খুব সুন্দর, তাই না?
     --- হ্যাঁ, খুব সুন্দর। একবার আয় না আমার ওখানে।
     --- আমার আর যাওয়া হয়েছে। সৌম্য যে ব্যস্ত থাকে। ছুটির দিনেও একগাদা কাজ নিয়ে বসে পড়ে।
     --- সত্যি, সৌম্যর উন্নতি দেখে এত ভালো লাগল। কেউ ভাবেনি সে নিজের অবস্থা এভাবে পালটে ফেলতে পারবে।
     --- এক আমি ছাড়া! চাপা গর্বের হাসি হাসে চন্দনা। --- আমার বিশ্বাস ছিল ওকে নিয়ে।
     --- হ্যাঁ, তুই বিশ্বাস করতি। এজন্য হয়ত হয়েছে। তোর কৃতিত্ব এতে কম না।
     একটু লজ্জা পায় চন্দনা।--- দূর, কী যে বলো। একটা কথা তোমাকে বলি, সাদী ভাই। তুমি হয়ত জানো না, ওকে নিয়ে আমি কিন্তু দাদাজানের কাছে গিয়েছিলাম। দাদাজানের পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চেয়েছিলাম। দাদাজান আমাকে ক্ষমা করেছিলেন।
     --- বলিস কি রে! এ তো অসাধ্য সাধন করে ফেলেছিস দেখি!
     একটু আনমনা হয় চন্দনা।--- শেষের দিকে দাদাজান অনেক নরম হয়ে গিয়েছিলেন। আর নাহিয়ানকে দেখে তো আরো বেশি হয়ে গেলেন। একমাত্র নাতি বলে কথা। তুমি তো আর বিয়ে টিয়ে করলে না। নাতিনাতনীর মুখও দেখালে না দাদাজানকে। 
     কেমন অপ্রস্তুত হয়ে গেল সাদী। এ প্রসঙ্গে না আগানোই ভালো। তাড়াতাড়ি আগের কথায় চলে যায় তাই।
     --- সৌম্য নাহয় ব্যস্ত। তুই আর নাহিয়ান চলে আয়। আমার বিরাট বাড়ি, তোর কিছু অসুবিধা হবেনা।
     খিলখিল করে হেসে ওঠে চন্দনা।
     --- সৌম্যকে ছেড়ে? ওটি হবার জো নাই।আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে কখনো থাকিনা। যতবার সৌম্য বিদেশে গেছে, আমাকেও তার সাথে সাথে যেতে হয়েছে।
     --- বাপ রে, এতটা?
     --- হুম, এতটাই!
     একটু ভাবে চন্দনা।--- গেলে আমরা একসাথে তোমার ওখানে যাব। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা কথা রাখতে হবে।
     --- কী কথা? আঁতকে ওঠে সাদী।--- নিশ্চয় বিয়ের কথা? তোদের মুখে এছাড়া কি আর কোনো কথা নাই?
     --- না, নাই। একটু যেন রেগেই গেল চন্দনা।--- এত বাড়ি গাড়ি করেছ কিসের জন্য বলো তো? যদি জীবনে সুস্থির হয়ে বসতেই না পারলে।
     --- আমি সুস্থির না কে বলল তোকে? জানিস, কত বড় ব্যবসা আমাকে সামলাতে হয়?
     ভ্রূ কুঁচকে গেল চন্দনার।--- ইচ্ছা করে না বোঝার ভান কোরো না, সাদী ভাই। তুমি খুব ভালো করেই বুঝেছ আমি কী বলতে চেয়েছি।
     --- বিয়ে সবাইকে করতে হবে এমন কথা কেউ কখনো বলেছে?
     --- অকারণে বিয়েটা ঝুলিয়ে রাখতেও কেউ কখনো বলেনি কিন্তু।
     --- বিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছি আমি? এই ইনফর্মেশনটা আবার তোকে কে দিল শুনি?
     --- কে আবার দিবে? আমার কি চোখ কান নাই? নাকি মাথায় বুদ্ধি নাই? আমি সব বুঝি!
     ধড়াস করে ওঠে সাদীর হৃৎপিণ্ড। কি সর্বনাশ! বলে কি চন্দনা। কোনোমতে বলল--- কী বুঝিস তুই?
     --- বুঝি যে তুমি ভুলতে পারোনি। তাই বিয়ে করতে গড়িমসি করছ।
     এ কি বিপজ্জনক প্রসঙ্গ টেনে আনল চন্দনা। ও যে বুঝতে পেরেছিল, সেটা তার একেবারেই জানা ছিলনা। তোতলাতে থাকে সাদী।
     --- তুই বুঝতে পেরেছিস যে আমি ভুলতে পারিনি?
     --- খুব বুঝতে পেরেছি, না বোঝার কী আছে? এজন্য তুমি অস্ট্রেলিয়ায় পালিয়ে গেলে সেটাও বুঝতে পেরেছিলাম।
     সরমে মরে গেল সাদী।--- তুই...তুই এসব নিয়ে আবার সৌম্যের সাথে আলোচনা করিস নি তো?
     --- সৌম্য আর আমার মধ্যে কোনো আড়াল নাই। ওকে আমি সবকথাই বলি।
     পাথর হয়ে বসে থাকল সাদী। কান মুখ সব ঝাঁঝাঁ করছে। কি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। চন্দনা সৌম্য কারোরই তাহলে জানতে আর বাকি নাই। এরপরে অস্ট্রেলিয়া কেন, পৃথিবীর শেষ প্রান্তে গিয়েও সে লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে পারবে না।
     --- দেখো সাদী ভাই, কিছু মনে কোরো না। তোমাকে একটা কথা বলি। এসব ভুলে যাও। এমন তো কতোই হয়। এসব ধরে কি কেউ বসে থাকে? আর কতটা সময় পার হয়ে গেছে দেখ। তোমার তো এতদিনে ভুলে যাবার কথা। দেখো গে সেই মেয়ে সবকিছু ভুলে গিয়ে চুটিয়ে সংসার করছে, দুই তিন বাচ্চার মাও হয়ে গেছে।
     গহিন জলে তলিয়ে যেতে যেতে শেষ মুহূর্তে খড়কুটা ধরে সাদী যেন বেঁচে উঠল। যাক, চন্দনা ধরতে পারেনি কে সেই মেয়ে। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল যেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সাদী।
     তাকে এক ঠ্যালা দিয়ে চন্দনা প্রশ্ন করে।--- বল না সাদী ভাই, ঠিক বলছি কিনা আমি?
     --- হু, কী বললি? ও হ্যাঁ, ঠিকই বলেছিস। খুব সম্ভব সে এখন বিয়ে টিয়ে করে বাচ্চার মা হয়ে গেছে।
     --- তাহলে বল তুমি, এর কথা ধরে বসে আছ কেন? ভুলে যাও তাকে। বিয়ে কর, জীবনটাকে গুছিয়ে নাও, আর দশটা মানুষ যেভাবে বাঁচে, সেভাবে বাঁচো। মিথ্যা এক মরীচিকার পিছনে ছুটে বেরিও না। 
     এতক্ষণে কৌতুকের হাসি ফোটে সাদীর ঠোঁটে। --- তুই তো দেখি একেবারে বুড়িদের মত উপদেশ দিতে শুরু করলি।
     কথাটা গায়ে মাখলো না চন্দনা। কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে তার ফুচকা চলে এসেছে।

*********** 
     আজ সাদীর ফিরে যাবার দিন। এয়ারপোর্টে তাকে বিদায় জানাতে এসেছে চন্দনা আর সৌম্য।
     সাদী সৌম্যকে বলে--- একবার আমার ওখানে বেড়াতে আয়, দোস্ত।
     ---আসব। তবে জানিস তো যাবার কি শর্ত দিয়েছে চন্দনা। শর্ত পূরণ হলে আমাদের আসতে দেরী হবেনা, দোস্ত।
     চন্দনা কিছু বলতে পারেনা। সে তখন চোখের পানি লুকাতে ব্যস্ত। বহুকষ্টে ধরা গলায় বলে--- আবার এসো, সাদী ভাই।
     সাদী মাথা ঝাঁকিয়ে হাঁ আর না এর মাঝামাঝি কিছু একটা বোঝায়। এরপরে সৌম্যকে জড়িয়ে ধরে, চন্দনার মাথায় আদরের টোকা মেরে বিদায় নেয়।
     ডিপার্টিং লাউঞ্জে বসে ভাবনায় ডুবে যায় সাদী। জীবনটা আসলেই খুব ছোট, খুব অনির্দিষ্ট। কবে এর সমাপ্তি ঘটবে তা কে বলতে পারে। ফায়জাই কি জানত এক সকালে যে স্বামীকে সে হাসিমুখে বিদায় জানাচ্ছে, তাকে আর কোনোদিন জীবন্ত ফিরে পাবেনা। সে ফিরবে লাশ হয়ে। সাদী কতোবার ফায়জাকে তারকাছে চলে আসতে বলেছে। কিন্তু ফায়জা রাজী হয়নি। সে লন্ডন ছেড়ে কোথাও নড়বে না। এ শহরে তার সংসারজীবনের পুরোটা সময় কেটেছে। সে এখানেই থাকবে।
     মনেমনে একটা সিদ্ধান্তে চলে আসে সাদী। চন্দনার প্রতি তার যে ভালোবাসা, সেটা একটা দুষ্প্রাপ্য সুগন্ধি কৌটায় পুরে সে তার মনের সিন্দুকে রেখে দেবে। হয়ত সময় সময় বের করে নাড়াচাড়া করবে। কিন্তু সেজন্য জীবনের আরসব রঙ রস রূপ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে না। জীবনের প্রতিটা আবেগ, প্রতিটা অনুভূতি সে প্রাণভরে উপভোগ করতে চায়। কাজের শেষে সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয়ার একজন সঙ্গী চায়। একটা শান্তির গৃহকোণ চায়। নাহিয়ানের মত একটা কচিমুখ চায়। 
     অনেক সময় নষ্ট করেছে সে। আর করবে না। (সমাপ্ত)

তাবাসসুম নাজ  
টরোন্টো, কানাডা।