অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
অন্তরালে - সাখাওয়াৎ হোসেন

     রিম গাজী একজন বর্গাচাষি। নিজের জমিজমা তেমন নেই তবে বিয়ের পর  শ্বশুরবাড়ী থেকে একটি দুধেল গাভী পেয়েছিল, তার কৃপায় এক জোড়া হালের বলদ এবং একটি যৌবনোন্মুখ বাছুরের মালিক হয়েছে। বলদ দুটি দিয়ে হাল বায় আর বাছুরটি দিয়ে বলদ দুটিকে পালাক্রমে জিরাণ দেয়। সংসারে তেমন ঝামেলা নেই, তাই দারিদ্র্য থাকলেও স্ত্রী মার্জিনা ও একমাত্র ছেলে মিরাজকে নিয়ে তারা সুখেই  আছে। ছেলেকে স্কুলে দিয়েছে, লেখা পড়ায় সে বেশ মনোযোগী। করিম ও মার্জিনার আশা ছেলে বড় হয়ে একদিন সরকারি চাকুরে হবে, সাদা জামা গায়ে জড়িয়ে  বাড়িতে আসবে, যেমন করে তালুকদারের ছেলেরা আসে। 
     বর্গাচাষি হিসেবে গাঁয়ে করিমের বেশ সুনাম। তার জমিতে সেরা ফসলটি ফলে। কারণ সে জমির ক্ষুধা ও ফসলের পরিচর্যা বুঝতে পারে। তাই তালুকদার করিমকে জমি বর্গা দিতে কার্পণ্য করে না।
     করিম বেশ সকাল সকাল, রোদ কড়া হবার পূর্বেই জমিতে কাজ করতে যায়। এতে কাজে বরকত হয়। সময় মত মার্জিনা করিমের জন্য থালায় করে আঁচল দিয়ে ঢেকে নাস্তা নিয়ে আসে। 
     -মার্জিনা ডাকে, হোননছেন, আল বন্ধ করেন, নাস্তা আনছি, খাইয়া নেন। 
     -তুমি থালে বারো, আমি আইতে আছি। 
     করিম হাল বন্ধ করে নাস্তা খেতে আসে। মর্জিনা জগ উঁচু করে পানি ঢেলে দেয়, করিম কোনরকম সাবান সোডা ছাড়াই হাত ধুয়ে নেয়। মর্জিনা শাড়ির আঁচল এগিয়ে দেয় হাত মোছার জন্য। করিম পান্তা ভাতে পেঁয়াজ, শুকনো মরিচ পোড়া ও মসুরের ডাল সহযোগে এমন তৃপ্তি করে খেলো যেন পোলাও বিরিয়ানিও স্বাদে এর ধারে কাছে নেই। করিম মর্জিনাকে বলে, 
     -তুমি খাইছাও? 
     -না বাড়ী যাইয়া খামু। আপনে খান। 
     করিম মর্জিনাকে খুব ভালবাসে। ভাল যে বাসে তা সকাল বিকাল বলে বোঝাতে হয়না। মর্জিনা নিজেই তা অনুভব করে। তাই দারিদ্র্যের সংসার হলেও এতে মর্জিনার কোন অভিযোগ নেই। করিমের অকৃত্রিম ভালবাসা মর্জিনাকে সকল অভাব-অভিযোগের ঊর্ধ্বে তুলে এনেছে।  
     করিম খেতে খেতে মর্জিনাকে জিজ্ঞেস করে ছেলের কথা।
     -মিরাজ কি স্কুলে গেছে? 
     -গেছে। ও কইছিল পরীক্ষার ফিস দিতে অইবে। মাস্টাররা কইছে, আর দেরি করা যাইবে না। কাইল দিতেই অইবে। 
     -ঠিক আছে, আইজ বিয়ালে পাট নইয়া অ্যাডে জামানে। কাইল ওরে ফিস দিয়া দিমু, তুমি চিন্তা কইররনা। 
     মিরাজ পিএসসি অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণির সমাপনি পরীক্ষা দেবে। করিম সমাপনি পরীক্ষার জন্য ৫০০টাকা দিয়ে বেশ মোটা একটি গাইড বই কিনে দিয়েছে। নাম একের ভিতরে সব। টেক্সট বুক বোর্ডের বই বাদ দিয়ে ক্লাসে এটি মুখস্ত করাণো হয়। মিরাজ মুখস্ত বিদ্যায় বেশ পারঙ্গম। শিক্ষকরা তাই তার ওপর আস্থা করে। তাদের ধারণা মিরাজ জিপিএ ফাইভ তো পাবেই ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিও পাবে। 
     নাস্তা শেষ হলে মর্জিনা থালাবাটি গুছিয়ে দুপুরে আবার খাবার নিয়ে আসবে জানিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। করিম আবার জমিতে চাষ দিতে শুরু করে। বাম হাতের মুঠোয় লাঙ্গলের কুটি আর ডান হাতে লাঠি ধরে দ্রুত হাল চালাতে থাকে। বলদ জোড়াকে তাড়া করে, হাট হাট, হুরর............ যেন দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলে দ্রুত সে সৌভাগ্যের চারণ ভূমিতে পৌঁছে যেতে চায়।   
     এদিকে মমিন তালুকদার জমি বর্গা দিয়েই বসে থাকে না। দুপুর রোদে মাথায় ছাতা নিয়ে জমিতে যায় ঘুরে ঘুরে দেখে জমির চাষবাসের অবস্থা। জমিতে আগাছা দেখলে বর্গাচাষীকে ডেকে পাঠায়, জমি ছাড়িয়ে নেবে বলে হুমকি দেয়। সময়মত চাষ না দিলেও একই কথা বলে। করিমের হালের কাছে হঠাৎ তালুকদার গিয়ে উপস্থিত। করিম অবশ্য অবাক হয়নি কারণ সে তালুকদারের বিষয় জানে। 
     তালুকদার বলে,
     -কি, করিম আছ কেমন? 
     -হ, ভাল আছি, আপনে কেমন আছেন? 
     -আছি ভাল। তোমারেতো কইছি, এই জমিতে এই বছর পেঁয়াজের চাষ কর। গেল বছর পেঁয়াজ খুব সস্তা গেছে। এই বছর পেঁয়াজের আবাদ বেশী অইবেনা। তুমি কর, লাভ পাইবা। 
     -হ, আমিও তাই ঠিক করছি, দেহেন না, ক্ষেতে কোনও, চাঙ্গা নাই। মাডি একদম মিহিন। 
     গ্রামের চাষীরা কি আর অর্থনীতি বুঝে আবাদ করে? এক বছর কোন ফসলের দাম ভাল  গেলে পরের বছর সকলেই কমবেশী ঐ ফসলের আবাদ করে, বাজারে যোগান বেশী থাকে, দাম পড়ে যায়, সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাহিদা আর যোগানের সাথে মূল্যের যে সম্পর্ক আছে তা কে বলবে! 
     করিম এবার হাল থামিয়ে তালুকদারের কাছে আসে। কিছু দিন থেকে তার মাথায় সবজি আবাদের একটি প্লান ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু জমিতো তালুকদার ছাড়া আর কারও কাছে পাওয়া যাবে না। তাই তালুকদারকে এক বিঘা না হোক অন্ততঃ দশ কাঠা উঁচু জমি বর্গা দেবার জন্য আনুরধ করবে বলে স্থির করে রেখেছে। এখন যেহেতু তাকে কাছে পাওয়া গেল, কথাটি এখনই সে বলতে চায়। 
     -চাচা, এটটা কতা কইতাম আপনে অনুমতি দিলে। 
     -অনুমতির কি আছে, জিগাও কি জানতে চাও। 
     -বৈরাগির ভিডার জমিডা যুতি আমারে দিতেন, তাইলে সবজির চাষ করতাম। 
     -তুমি কতাডা খারাপ কও নাই, কিন্তু আর জমি নিলে তুমিতো চাষ করতে পারবানা। একলা মানুষ যা আছে, এইডু ঠিক মত চাষ কর। 
     তালুকদার অভিজ্ঞ মানুষ। করিমকে অতিরিক্ত জমি দিলে সে যে আর ভাল ফসল ফলাতে পারবে না, তা সে খুব করে জানে। আর করিমও বুঝে নিল একবার সে যখন না বলেছে তখন এটি আর হ্যাঁ হবে না। তাই করিমও আর দ্বিতীয়বার আনুরোধ না করে তালুকদারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হালচাষে মনোযোগ দিল।
     সন্ধ্যা বেলা মর্জিনার অনেক কাজ থাকে। উঠোন ঝাড়ু দেয়া, গরুগুলোকে গোয়ালঘরে তোলা, খাবার দেয়া, মুরগীগুলোকে খোপে ঢুকিয়ে খোপের মুখ আটকানো, হেরিকেন জ্বালানো। ছেলে যেহেতু অনেক রাত অবধি পড়ে তাই হেরিকেন জ্বালাতেই হয়। গ্রামে কারেন্টের লাইন থাকলেও বিদ্যুতের ওপর ভরসা নেই। বিদ্যুৎ বেশী সময় থাকে না। তাই লোকে বলে, কারেন্ট যায় না কারেন্ট আসে। 
     করিম হাট থেকে ফিরে এসেছে। মাছ, তরিতরকারি, নিত্যদিন আর যেসব জিনিস দরকার হয় তা নিয়ে। হাটের দিন আসলে মর্জিনার বাড়তি কাজ পড়ে যায়। মাছ কোটাধোয়া, রান্না করা, সদায়-বেহাতি গোছানো ইত্যাদি। সমস্যা পোহাতে হয় মাছ নিয়ে। ছোট মাছ কম দামে পাওয়া যায় বলে করিম তাই কেনে। কিন্তু কোটাধোয়ার ঝামেলার কারণে মর্জিনা পছন্দ করেনা, বিরক্ত হয়, কিন্তু স্বামীর সামর্থ্যর কথা চিন্তা করে রাগ করে না। তাকে রাতের খাবারের জন্য কিছু রান্না করতে হয়, আবার খানিকটা জ্বালিয়ে রেখে দিতে হয়, যাতে পরবর্তী হাট পর্যন্ত খেতে পারে। কারণ তাদের রেফ্রিজারেটর কেনার সামর্থ্য নেই। 
     করিম চাপকল চেপে হাতপা ধুয়ে মর্জিনার রান্নার কাছে এসে বসে। স্ত্রীকে কাজে সাহায্য করে। চুলায় জ্বালানী ভরে দেয়। ওদিকে মিরাজ পড়ার টেবিলে পিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। খানিক পরে করিম মিরাজের কাছে যায়। ফিসের টাকা হাতে দিয়ে বলে,
     -আব্বা এই তোমার ফিসের টাহা, কাইল তুমি এই টাহা দিয়া ফিস দিবা। 
     -ঠিক আছে। 
     -লেহাপড়া কেমুন করতে আছাও আব্বা, পারবাতো পরীক্ষায়? আমাগো তুমিই ভরসা। আমিতো পড়তে পারলাম না। তোমারে দিয়া জানি আমার না পারার কষ্ট ভোলতে পারি। 
     মিরাজ মাথা নেড়ে, পারবে বলে জানায়।  
     মর্জিনা ধান সিদ্ধ করে উঠোনে নেড়ে দিয়েছে শুকানোর জন্য। কৃষক পরিবারকে এসব করতেই হয়। তাদের হাড়িতে ভাত আসে অনেক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। প্রথমে বীজ বোনা হয় মাঠে। তারপর ধান হয়, ধান মাড়াই করে সেদ্ধ করা হয়, রোদে শুকিয়ে ঢেঁকিতে ধান ভেনে চাল করা হলে, সেই চাল দিয়ে ভাত হয়। অনেক লম্বা পথ। শুকাতে দেয়া ধান মর্জিনা নেড়ে দিচ্ছে এমন সময় স্কুলের শিক্ষক তার কাছে সংবাদ দিলো মিরাজ খুব ভাল ফল করেছে। সে জিপিএ ফাইভতো পেয়েছেই বৃত্তিও পেয়েছে ট্যালেন্ট পুলে। মর্জিনা ট্যালেন্ট পুল না বুঝলেও বৃত্তি বুঝেছে। খুশিও হয়েছে বেজায়। উঠোনে ধান রেখে এক দৌড়ে স্বামীকে শুভ সংবাদটি দেবার জন্য মাঠে চলে গেল। 
     রাত্রিবেলা তিনজন একসাথে হয়েছে। তাদের আনন্দ আর ধরে না। দুপুরে মর্জিনা পালের একটি মোরগ ধরে রান্না করেছে ছেলেকে খাওয়াবে বলে। সবসময়তো আর ভালমন্দ খাওয়া হয়না। একসাথে খেতে খেতে সিদ্ধান্ত নেয়  সোবহান মুনশিকে ডেকে শুক্রবার সন্ধ্যায় মিলাদ পড়াবে আর প্রতিবেশীদেরকে খাওয়াবে। 
     শুক্রবার সন্ধ্যায় অতিথিরা সবাই এসেছে। তবে তালুকদার সাহেব আসাতে করিম ও মর্জিনা খুবই খুশি হয়েছে। করিমের অনেক দিনের সাধ ভূস্বামী তালুকদেরকে এক বেলা খাওয়াবে, অনেকবার চেষ্টাও করেছে কিন্তু সফল হয়নি। একবার বলাতেই এবার ইষ্ট দেবতা যেন স্বেচ্ছায় পূজারীর মন্দিরে প্রবেশ করেছে। 
     তালুকদারকে দেখে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই, 
     -আপনে আইছেন, আমরা যে কি খুশি অইছি! গরীবের দুয়ারে আতির পারা!  
     -না, তোমরা এতো বার কইছ আইতে পারি নাই। মনে করলাম এইবার নাগেলে ভাল দেহায় না। 
     -ভাল করছেন। আহেন, বহেন কষ্ট কৈররা। 
     অতিথি আপ্যায়নে বিশেষ করে তালুকদার সাহেবকে আপ্যায়নে দুজন খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বস্তুতঃ এমনই হয়। গরীবের বাড়ীতে ধনীর পদধূলি পড়লে গরীব তার সকল সাধ্য দিয়ে অতিথি সেবা করে। কিন্তু ধনির বাড়ীতে কখনও গরীব অতিথির আগমন ঘটলে তেমন উষ্ণতা লক্ষ্য করা যায়না। 
     যাইহোক মিলাদ শেষ হল। মুনশি সাহেব এবার দুএকটা হাদিস শোনালেন। সবাইকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য তাগিদ দিলেন। এ কথাও বললেন, বেনামাজির ঘরে আহার করা হারাম। খাবার চলে এসেছে সামনে। মুনশি গৃহকর্তাকে জিজ্ঞেস করল,
     -করিম, ঠিক মত নামাজ আদায় করেনতো? 
     হঠাৎ এই প্রশ্নে করিম একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, 
     -হুজুর, মাঠেময়দানে কাম করি, সব সময় পড়তে পারিনা। 
     -এখন থেকে পড়বেন। 
     -জি হুজুর। নিয়মিত, আর কামাই করমুনা। 
     করিম নামাজ রোজা তেমন একটা করেনা এটা সবার জানা। তাই আখেরাতের পথ মসৃণ রাখতে এবং উপাস্থিত সকলের না বলা প্রশ্নের উত্তর এড়াতে করিমের কাছ থেকে নামাজ পড়ার অঙ্গীকার আদায় করে নিয়ে, সোবহান মুনশি নিজেকে হারাম খাওয়া থেকে রক্ষা করল।
     খাওয়া শুরু হয়ে গেল। খাবারের ফাঁকে তালুকদার করিম গাজীকে বলল,
     -করিম, তুমি বৈরাগীর ভিডার জমি ছাইছিলানা?
     -হ, চাচা। 
     -সামনের বছর ছোরমান শেখ জমিডা ছাড়লে ওই জমিডা তুমি নিও। 
     -হাচা কইছেন চাচা? 
     -তোমার কি মনে অয় মিছা কইছি। 
     -না চাচা। 
     মহান সৃষ্টিকর্তা আজ তার দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছে। তালুকদার আজ ছেলের বৃত্তি পাওয়া উপলক্ষে দেয়া মিলাদে সামান্য অনুরোধেই চলে এসেছে। আবার যে জমি বহু অনুরোধ করেও তালুকদারের নিকট থেকে পাওয়া যায়নি তা নিজ থেকে যেচে করিমকে দেয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করছে। করিম খুশীতে একেবারে আটখানা, লাফাতে ইচ্ছে করছে তার। স্ত্রীকে গিয়ে চুপি চুপি সংবাদটি জানায়। স্বামীর খুশী দেখে স্ত্রীও খুশী।  
     মিরাজ হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। বছরের প্রথম থেকেই সে রুটিন করে পড়ছে। ভাল ফল করবে এটাই তার লক্ষ্য। আর হলও তাই। প্রথম পরীক্ষাতেই সে ভাল ফল করে শিক্ষকদের নজরে চলে এসেছে। শিক্ষকরা তার দিকে খেয়াল রাখে আর সহপাঠীরা তাকে সমীহ করে।  
     পিতা সকাল সন্ধ্যা মাঠে কাজ করে, মিরাজ স্কুলে যায়। দেখতে দেখতে ষষ্ঠ শ্রেণির দেয়াল টপকে পরীক্ষায় প্রথম হয়ে সপ্তম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। আবার হঠাৎ করে গায়ে গতরেও বেশ বড় হয়ে গেছে। ইদানিং গ্রামের লোকেরা বলতে শুরু করেছে, মিরাজ কেমন ছেলে! বাপ দিনরাত মাঠে খেটে মরে আর ছেলে বাবু সেজে স্কুলে যায়। বাবার কষ্ট বোঝে না। করিম অতিরিক্ত জমি বর্গা নেয়াতে এখন আর বিরাম নেই। শরীরের ঘাম আর শুকায় না। সত্যি এখন খুব কষ্ট হয় তার। তারপরও ছেলে মাঠে কাজ করবে এটা সে চায়না। 
     মিরাজ নিজে থেকেই বাবাকে বলে,
     -আব্বা আপনে এতো কষ্ট করেন, আমি স্কুলের তন বাড়ী আইয়া আপনের  হাতে কাম করমু। 
     -না আব্বা তোমার কাম করতে অইবে না, আমি পারমু, তোমার পড়ার খেতি অইবে। 
     -না অইবে না। আমি অন্য সমায় পোষাইয়া নিমু। 
     -দেইক্কো আব্বা, পড়ার যেন খেতি না অয়। 
     -ঠিক আছে। 
     মিরাজ লেখাপড়ার পাশাপাশি বাবাকে কাজে সাহায্য করে। তাতে করিমের কিছুটা সুবিধে হল। এদিকে তালুকদার করিমকে আরও এক বিঘা ধানের জমি বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতি মৌসুমেই এখন ভাল ফসল ঘরে আসে। সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। করিম নিজেও কিছু জমি বন্ধক রেখেছে। 
     বর্গা জমি, কামলা নিয়ে কাজ করলে লাভ তেমন থাকে না। তাই যতোটা পারে নিজেরাই কাজ করে। এখন ইচ্ছে না থাকলেও মিরাজকে মাঠের কাজে অনেক সময় দিতে হয়। মাঝে মাঝে স্কুল কামাই করতে হয় এবং তার প্রভাব লেখাপড়ায়ও পড়তে শুরু করে। পরীক্ষায় এখন আর সে প্রথম হয় না। কোন কোন বিষয় ফেলও করে বসে। জমির ফসল আর পরীক্ষার ফল বিপরীতানুপাতে বাড়তে থাকে। করিমের ভিটায় আধাপাকা বাড়ি উঠেছে। কিছু ফসলের জমিও খরিদ করেছে। কিন্তু মিরাজের স্কুল? 
     মিরাজ একসময় বুঝতে পারে,  নিজের অজান্তেই সে লেখাপড়া থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। করিম গাজী ভুলে গেছে ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা। মিরাজ আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে আর ছাত্র মনে হয় না। বরং আয়নায় ভেসে ওঠে একজন নবীন কৃষকের ছবি। 
     একদিন তালুকদার করিম গাজীকে ডেকে নিয়ে বলে, তাকে আর জমি বর্গা দেবে না। কেন দেবে না, তার কোন উত্তর দেয়নি তালুকদার। অগত্যা কি আর করে। বন্ধকীসহ যেটুকু জমি এতদিনে করেছে  বাপ ছেলে মিলে তাই চাষ করতে শুরু করে। পরে ময়জদ্দিন হওলাদারকে ধরে, তার কিছু জমি বর্গা নেয়। এ ভাবেই শুরু হয় মিরাজের পূর্ণকালীন কৃষক হবার গল্প। 

সাখাওয়াৎ হোসেন
অটোয়া, কানাডা।