অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
ফেলে আসা দিনগুলি (ষষ্ঠ পর্ব) – হুমায়ুন কবির

য়ন বিটিভিতে টারজান দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলো। বিকাল চারটায় টারজান হবে। পেটকা সেই আধঘন্টা আগে এসে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা চলে যাওয়ার পর চয়ন টিভি চালু করলো। চয়ন পেটকাকে বললো,
-ঘরে এসে দেখো।
পেটকা খুব খুশি হলো। কিন্ত জানালা দিয়েই দেখতে থাকলো। চয়ন আবারও বললো,
-ভিতরে এসো।
পেটকা ঘরের ভিতরে এসে বসে টিভি দেখতে থাকলো।

দিপালি বৌদি এসে মিস্টি করে হেসে দিয়ে বললো,
-চয়ন আমার সঙ্গে বেড়াতে যাবা?
-কোথায়?
-আমাদের বাড়িতে। 
দিপালি বৌদি চয়নকে খুব স্নেহ করেন। দিপালি বৌদির কোন সন্তান নেই। যে কারণে চয়নের জন্য মমতার গভীরতা অন্যদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। দিপালি বৌদি চয়নের মায়ের ঘরে ঢুকে গেলো। চয়নের মা কিছু একটা করছিলেন। দিপালি বৌদি বললেন,
-মাসিমা, ভালো আছেন?
-জি, ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
-ভালো আছি। মাসিমা, চয়নকে নিয়ে যাই?
-কোথায়?
-আমাদের বাসায়। কতোদিন হয়ে গেলো মাকে দেখিনা। 
দিপালি বৌদি যেনো চয়নের মায়ের আর একজন মেয়ে। বৌদি  যেমন চয়নের মাকে ভালোবাসে। তেমনি চয়নের মাও দিপালি বৌদিকেও ভালোবাসে। ঠিক যেনো মা ও মেয়ে। চয়নের মায়ের অনুমতি পাওয়ার পর চয়ন মহাখুশি। বৌদি যেনো চয়নেরও একজন মা। চয়নকে বাদ দিয়ে দিপালি বৌদির কিছুই হয় না। এমনকি ঠাকুরের প্রসাদও চয়নের জন্য বরাদ্দ থাকে। দিপালি বৌদির সঙ্গে যাওয়ার চেয়ে আনন্দের বোধহয় আর কিছুই হয়না। 

বৌদিদের বাড়ি একেবারেই শহরের মধ্যে। সামনে দোকান। পিছনে বাসা। টিন ও কাঠ দিয়ে তৈরি দু'তলা বাড়ি। কাঠের শিড়ি বেয়ে  চয়ন দুতলায় উঠলো। উপরের ঘরটি অনেকটা বসার ঘরের মতো সাজানো গোছানো। এই বাড়িটায় বেড়াতে এলে চয়নের কিযে ভালো লাগে! তা বলে বুঝাবার নয়। চয়ন যতবার এখানে এসেছে, ততবারই  বৌদির ছোট বোন পনোদি পাড়িবারিক এলবাম নিয়ে বসেছে। নতুন কোন ছবি থাকলে সেটা দেখাবে। পূরনোগুলিও দেখাবে। এটা বোধহয় পনোদির শখ। ভিশন সুন্দর শখ। পনোদিও দেখতে অনেক অনেক সুন্দর। কিন্ত এই এলবাম দেখতে চয়নের আর ভালো লাগেনা। কারন সবার সঙ্গে থাকা রুপুদির মুখ কালো রঙের কালি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কারন রুপুদি মুসলমান ছেলেকে বিয়ে করেছে। হিন্দু আর মুসলমান, এতে আবার আলাদা কি! রুপুদি-তো নিশ্চয় ভালো কাউকেই বিয়ে করেছে। তা করুক। রুপুদি যেটা ভালো বুঝেছে সেটাই করেছে। 

একটা মেয়ে জন্মের পর থেকে যে পড়িবারে বড় হয়েছে। মা-বাবা, ভাই-বোন সবার সঙ্গে কাটানো কতো সুখ-দুঃখ আর হাসি আনন্দে ভরা ছিলো মেয়েটির জীবন। আর আজ ,সেই সবই মিথ্যা, সব ফাকি! ধর্মের কারনে সব ভালোবাসা, মায়া-মমতা ফিনিস পাখির মতো আকাশের নিলীমার গভীরে চিরদিনের জন্য হাড়িয়ে গেছে। চয়ন পনোদির কাছে জানতে চাইলো,
-আচ্ছা পনোদি, রুপুদি দেখতে কেমন ছিলো?
পনোদি চয়নের কথার কোন উত্তর দিলোনা। চয়ন লক্ষ করলো, ফোটা ফোটা চোখের পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে এলবামের উপর পড়ে রুপুদির কালো রঙের কালি দিয়ে ঢেকে দেয়া মুখ ধুয়ে দিচ্ছে। চয়ন রুপুদিকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। একি রুপুদি! এতো রূপ রুপুদির! এতো মানুষ নয়, একজন অপ্সরী। পরি!  শিড়ি দিয়ে নামার সময় চয়ন লক্ষ করলো পনোদি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে। নিচের ঘরে বৌদি আর বৌদির মা কথা বলছে। দু'জনেই কাদছে। রুপুদির কথাই হচ্ছিলো। মেয়েদের এই নিরব কান্না যেনো চিরদিনের, চিরকালের। কারণ বৌদির বাবা রুপুদিকে চিরদিনের জন্য ত্যাগ করেছে। সবাইকে সাবধান করেছেন যেনো পড়িবারের কেউই  রুপুদির সঙ্গে যোগাযোগ না রাখে। কিন্ত রুপুদিকে কি রুপুদির বাবা সত্যিই ত্যাগ করতে পেরেছে? পারেনি। বাবার ভিতরে যে বাবা রয়েছে সে নিশ্চয়ই তার পরির মতো মেয়েটির কথা ভেবে ভেবে কস্ট পাচ্ছে। কস্টগুলি হয়তো কাউকে দেখানোর মতো নয়।

রুপুদির মা যেনো পাথর হয়ে গেছে। বিদায়ের বেলায় বৌদিকে ফিস ফিস করে বললো,
-দিপুরে! রুপুর জন্য আমার খুব খারাপ লাগে! আমার মেয়েটা কি ভালো আছে?
-কেদোনা-মা। দেখো আস্তে আস্তে সব সয়ে যাবে। চয়নের আজকে আনন্দের চেয়ে বেদনাই বেশি হচ্ছে।
-চয়ন দেখতে পাচ্ছে রুপুদি মাকে ডাকছে। বলছে,
-মাগো! তুমি কেদনা। আমি ভালো আছি। আমার জন্য দোয়া করবে। তোমার দোয়াতে আমি অনেক অনেক ভালো থাকব।

চয়ন দিপালি বৌদির দড়জায় এসে কলিং বেল বাজালো। ডোর ভিউ দিয়ে ছবিরন দেখে দরজা খুলে দিলো। একটি অপরূপা অসম্ভব সুন্দর পরির মতো মেয়ে বৌদির পাশে বসে আছে। বেদনা আর কষ্টের গ্লানি মেয়েটির সমস্ত মুখে কে যেনো লেপন করে দিয়েছে। বৌদি হাত ইশারা করে চয়নকে বসতে বললো। চয়ন বৌদির পাশের সোফায় বসলো। বৌদি চয়নকে দেখিয়ে রুপুদিকে বললো,
-রুপু, ওর নাম চয়ন। আর চয়ন,  এই আমার আর একটি বোন রুপু। চয়ন রুপুদির মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালো।  

কিছু কিছু মানুষ আছে, যাদের দেখলে মনে হয় তার সঙ্গে দীর্ঘ দিনের একটা গাড় সম্পর্ক রয়েছে। রুপুদিকে দেখে চয়নের তেমনই মনে হলো। চয়ন দুহাত তুলে বললো, 
-দিদি, নমস্কার।
রুপু অবাক হয়ে চয়নের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকালো। এতো ছোট একজন মানুস! কি অসাধারণ সৌজন্যবোধ! দেখতেও অসম্বব সুন্দর। দুহাত তুলে রুপুও বললো, 
- নমস্কার। তুমি ভালো আছো?
- জি, ভালো। তুমি ভালো আছো রুপুদি? 
-জি, ভালো আছি। 
-আমি তোমাকে এলবামের ছবিতে দেখেছিলাম। পনোদি দেখতে দিয়েছিলো। কিন্ত তোমার মুখ দেখতে পাইনি। কালো করা ছিলো। তবে আমি হৃদয়ের অন্তর দৃষ্টি দিয়ে তোমাকে দেখতে পেয়েছিলাম। খুব মায়া লাগছিলো। পনোদিকে তোমার কথা জানতে চাইলে পনোদি কিছু না বলে শুধু কান্না করেছে। পনোদির চোখের পানিতে ধুয়ে দেওয়া তোমার যে মুখ দেখতে পেয়েছিলাম, তুমি তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। চয়নের কথা শুনে রুপু বিমুরের মতো চয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর উঠে এসে চয়নের পাশের সোফায় বসে চয়নের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
-বেচে থাকো, বড় হও। অনেক বড়! বড় মানুষ হও।
-আপনি দোয়া করবেন রুপুদি।

বৌদি ছবিরনকে ডাকলো,
-ছবিরন
-জি-মা, আসছি।
-চয়নকে কিছু খেতে দে।
- দিচ্ছি মা। 
ছবিরন অল্প সময় পরে এক পেয়েলা ভরা নাস্তা নিয়ে হাজির। নারকেলের নারু, কদমা, ঠাকুরের প্রসাদ। চয়ন এতো কিছু দেখে খুশি হলো না। যদিও ঠাকুরের প্রসাদ  ছয়নের জন্যে নিত্যদিনের খাবার।  কিন্ত রুপুদির বেদনা ভরা মুখ  দেখে আর গভীর মমতা মাখানো কথা শুনার পর মনটা বেদনায় ভারী হয়ে আছে। বৌদি বললো ,
-খাও।
রুপুও বলল
-লজ্জা পাচ্ছ? লজ্জা কি ভাই খাও।
-লজ্জা পাচ্ছিনা। তোমার জন্য মনটা কেমন করছে।
বৌদি বললো, 
-চয়ন খুব ভালো একটা ছেলে। মাসিমাও খুব ভালো। এতো ভালো আর হয়না। আমাকে মায়ের মতো দেখে রাখে। আর চয়ন! ওতো আমার আর এক জনমের ছেলে ছিলো। চয়ন এবার খুব লজ্জা পেলো। মাথা নিচু করে থাকলো।

এরপর বড় হওয়ার পর দিপালি বৌদির কাছ থেকে চয়ন জেনেছে যে, রুপদির চয়নের মতো একটা ছেলে হয়েছে। তবে জামাইবাবুর সঙ্গে আর থাকেনা। ইউনিসেফে জব করে। থাকে আমেরিকার নিউইয়র্কে রুপুদি এখন অনেক সাবলম্বী। মা-বাবার সঙ্গেও এখন সুন্দর সম্পর্ক বজায় রেখেছে। প্রতি সারদীয় দুর্গা পুজায় ছুটি নিয়ে দেশে বেড়াতে আসে। চয়নের জন্য অনেক অনেক চকোলেট, গল্পের বই, ছবি আঁকার খাতা আর রঙ পেন্সিল নিয়ে আসে। চয়ন অবশ্য কোন কিছু উপহার পাওয়ার চেয়ে দিপালি বৌদি ও তার পড়িবারের মানুষের স্নেহ ,মমতা আর ভালো বাসায়ই মুগ্ধ। এর থেকে বেশি কিছু চাইবার নেই। মানুষের ভালোবাসা পাওয়াও কম কিছু নয়। 

একবার ঈদে দিপালি বৌদির হাসব্যান্ড  চয়নকে অনেকগুলি  তারা বাতি, আতস বাজি আর বাজি কিনে দিয়েছিলো। দিপালি বৌদি দিয়েছিলো দশটাকার একটা নতুন নোট। চয়ন প্রতি ঈদেই পাঞ্জবি পায়জামা পরে বাবার সঙ্গে ঈদগায়ে ঈদের নামাজ পড়তে যায়। নামাজ শেষে মায়ের হাতের রান্না করে সেমাই খেয়ে নতুন জামা জুতো পরে প্রথমেই যাবে বৌদি আর দাদার সঙ্গে দেখা করতে। তারপর বৌদির মায়ের বাড়িতে। ওখানে গেলে অন্যরকম এক শান্তির পরশ মিলে। যদিও রুপুদির সংগে দেখা হয়না। তবে পনোদির সঙ্গে দেখা হয়। পনোদিও অসাধারণ একজন মানুষ! একবার চয়নকে 'গলির ধারের ছেলেটি' পড়ে শুনিয়েছিলো। পরে চয়ন ঐ একই গল্পের উপর ভিত্তি করে বানানো 'ডুমুরের ফুল' ছবিটি বিটিভিতে দেখেছে। ছবিটি দেখার সময় মনে হয়েছিলো পনোদি পড়ছে আর চয়ন শুনছে। শুনে শুনে চয়নের গলির ধারের ছেলেটির জন্য ভালোবাসা আরো বেড়ে  যাচ্ছিলো। ছেলেটির মারা যাওয়ার পর চয়ন ফুপিয়ে কেদে ফেললো। শুধু সিস্টার আপার কাছে থাকতে চাওয়ার জন্য, তার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য গলির ধারের ছেলেটি চিরদিনের জন্য হাড়িয়ে গেলো।

এখনও চোখ বন্ধ করলে চয়ন দিপালি বৌদি, পনোদি, রুপুদি আর বৌদির মাকে দেখতে পায়। চয়ন যতবারই বৌদির বাসায় গেছে ততবারই বউদির মা চয়নকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছে, দিপু, চয়নের মাকে বলবি, চয়নকে যেনো আমার কাছে বিক্রি করে দেয়। চয়ন আজো শুনতে পায়, মাসিমা বলছে, 
-"দিপু, চয়নের মাকে বলবি, চয়নকে যেনো আমার কাছে বিক্রি করে দেয়”। 

নন্দিনীর কথা মনে হলে সমস্ত সমাজ ব্যবস্থাটার প্রতিই চয়নের প্রচন্ড ঘৃণা চলে আসে। একটা রাস্ট্রের প্রথম স্তর হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। সেখানে চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য ও স্থানীয় মুরুব্বীরাই ছোট খাটো বিরোধগুলি মিটিয়ে দেয়। নন্দিনী উচ্চ শিক্ষিতা। অভিজাত পড়িবারের মেয়ে। নন্দিনীর শাশুরও এক সময় স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান ছিলেন। মানুষের সেবা দেয়াই ছিলো তার একমাত্র দায়িত্ত। আর নন্দিনীর স্বামী, নন্দিনীর শশুরের পড়িবারের সমস্ত কিছুই তার ঘাম ঝরানো টাকা দিয়ে করেছে। ভাই-বোনদের জন্য সরবোচ্চটাই করার শুধুমাত্র চেস্টাই করেননি। করেছেন এবং সফল হয়েছেন। নন্দিনীর শশুর মারা যাওয়ার পর বাড়িতে  বিভিন্ন ধরনের লোকাজনের আনা-গোনা বেড়ে যায়। সাধারনত সবকিছুই নন্দিনীর শাশুরীই দেখাশোনা করেন। মতামত কিছু লাগলে সেটা নন্দিনীর একমাত্র ননদ ও দেবর দিয়ে থাকে। নন্দিনীর শাশুরী, দেবর ও ননদ তিনজনের চরিত্রই বেশি ভালো ছিলোনা। বিয়ের পর পরই নন্দিনী সেটা বুঝতে পারে। নন্দিনী মাঝে মধ্যে আপত্তিকর কিছু দেখে ফেললেও প্রতিবাদ করেনা।  অশেষ এলে অশেষকে বলে। নিজের মাকে আর কি বলা যায়? যতটুকু বলা সম্বব ততটুকুই অশেষ বলে।
 তবে এর ফল বেশি ভালো হয়না। স্বামী চলে যাওয়ার পর শুরু হয় নন্দিনীর উপর অমানবিক অত্যাচার। অপরাধীরা সব সময় অবাধে অপরাধ করার জন্য নিজেদের অনুকুল পরিবেশ বজায় রাখার চেস্টা করে। নিজেদের অপরাধ নিরাপদ করার জন্য একদিন রাতে নন্দিনীর দেবর ধারালো অস্র নিয়ে নন্দিনীর  সামীর উপর ঝাপিয়ে পড়ে। নন্দিনী পাশের ঘারে ছেলেকে ঘুম পারাচ্ছিলো। চিৎকার শুনে নন্দিনী দেখতে পেলো ওর সামীর সমস্ত শারীরই রক্তাক্ত ও নিথর দেহ। আকস্মিক এই ঘটনায় নন্দিনী প্রায় বাকরুদ্ধ। শাশুরী বিলাপ করে কাদছে আর বলছে।
-ডাকাত এসেছিলো! ডাকাত! সব নিয়া গেলো। আমার বাজানরেও মাইরা থুইয়া গেলো। আসে পাশের লোকজনও চলে এসেছে। সবাই ডাকাতকে গালমন্দ করছে। কেউ আহা! বলে শান্তনা বাক্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। খুনিরাই চিৎকার করে লোকজন জড়ো করে প্রমান করলো যে, রাতে ডাকাত এসেছিলো। সব কিছু নিয়ে গেছে। নন্দিনীর স্বামী অশেষ বাধা দেওয়াতে ডাকাতরা ছুরি চালিয়ে দিয়েছে। 

নন্দিনী কি আর করবে। কয়েকদিন যেতে না যেতেই এক বছরের ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে বাবার কাছে চলে আসে। সেই থেকে নন্দিনী, মা-বাবার কাছেই থাকে। বিচারের জন্য নন্দিনী স্থানীয় প্রশাসন,থানা ও 'ওমেন সাপোর্ট সেন্টারে' অভিযোগ করেছে। সেখানে কেউই নন্দিনীকে এতোটুকুও সহায়তা করেনি। জনপ্রতিনিধি বলেছে,
-সামানেই নির্বাচন। এখন এসব করতে গেলে আমার ভোট কমে যাবে। আমার ক্ষমতা হাত ছাড়া হয়ে যাবে। নির্বাচন শেষে  কিছু একটা করার চেস্টা করবো। 
নন্দিনী বলেছিলো,
-আমি খুব কস্ট পাচ্ছি। এতো কস্ট আর ভালো লাগেনা!
-আর একটু কষ্ট কর। সব ঠিক হয়ে যাবে।
-আমার সব কিছু ওরা দখল করে রেখেছে। অশেষের সমস্ত স্মৃতি নষ্ট করে ফেলেছে। আমি আমার স্বামীর স্মৃতিগুলি অক্ষত রাখতে চাই। 

তাতে কোন কাজ হয়নি। কেউ শুনেনি নন্দিনীর আর্তনাদ, আকুল আকুতি। নন্দিনীর ছেলে এখন স্কুলে যায়। নন্দিনীর মা সঙ্গে করে নিয়ে যায় আবার নিয়ে আসে।
আর নন্দিনী!  আঘাতে আঘাতে পিস্ট হয়ে মানসিক ভারসাম্য হাড়িয়ে এলো মেলো হয়ে গেছে। যে, কেউ এলেই নন্দিনী তাকে বলবে,
-তোমরা আমার অশেষকে দেখেছো? অশেষ কবে আসবে? অফিস ছুটি হয়নি? কবে ছুটি হবে? কখন ছুটি হবে?

চয়ন শুধু ভাবে,
-আহা! সমাজ ব্যাবস্থা যদি আরো উন্নত হতো? সমাজপতিরা যদি তাদের উপর ন্যস্তকরা দায়িত্ত যথাযথ পালন করতো? জনপ্রতিনিধিরা যদি নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত না থাকতো? মানুষের জন্য কাজ করতো? "সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই" এটা যদি সবার বোধগোম্য হতো? মানুষ যদি মানুষকে শুধুই মানুষ ভাবতো? মানুষের মন থেকে হিংসা, লোভ মিথ্যা, পাপাচার চিরদিনের জন্য ধুয়ে মুছে পরিস্কার হয়ে যেতো? একজন মানুষেরও যদি কোন অভাব না থাকতো? তাহলে কিযে ভালো হতো!

সমাজের এই নিষ্ঠুর অমানবিকতা নন্দিনীকে কেন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে দিলোনা? কেন? এমন কেন?
চয়ন চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পায় অসম্বব সুন্দর পরির মতো একটা মেয়ে বাড়িতে কেউ এলেই তাকে বলছে,
-"তোমরা আমার অশেষকে দেখেছো? অশেষ কবে আসবে? অফিস ছুটি হয়নি? কবে ছুটি হবে? কখন ছুটি হবে?”  চলবে...

হুমায়ুন কবির
ঢাকা, বাংলাদেশ।