অটোয়া, বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর, ২০২৪
অভিনয় শুধু অভিনয় -বন্যা হোসেন

বিয়ের পঁচিশ বছর পর জহির  আজ নীনাকে এত কড়া কথা বললেন। নীনা বুঝতেই পারছেন না তার কোথায় ভুল হল। সংসারের হিসেব বড়  জটিল। আমরা যখন ভাবি, জীবনটা প্রায় গুছিয়ে নিয়েছি উটকো ঝামেলা যন্ত্রণার পালা শেষ... ...ঠিক তখনই ঝামেলার ঝুড়িটা এসে চোখের সামনে নড়াচড়া করে মনে করিয়ে দেয় দুশ্চিন্তাহীন মুক্ত জীবন বলে কিছু নেই ! 

জীবনের পুরো সময়টা জহির কাটিয়েছেন  সৌদি আরবের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে। সংসার জীবনের শুরুতে তারা একসংগেই ছিলেন বছর দশেক জেদ্দাতে। তাদের দুই ছেলে আর এক মেয়ের জন্ম ওখানেই। বাচ্চাদের পড়াশোনার সুবিধার্থেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নীনা ছেলেমেয়েদের নিয়ে দেশে ফিরে যাবেন। গত পনের বছর ধরে  জহির চৌধুরি বছরে দু’বার দেশে আসেন। ছুটির সময়টা কাটিয়ে যান পরিবারের সান্নিধ্যে। তার চাকুরী জীবন প্রায় শেষ হতে চলেছে। আর এক বছর পরেই  অবসর নিতে যাচ্ছেন। এবার  গরমের ছুটিতে এসেছেন দুমাসের জন্য। 

জহির সাহেব লক্ষ্য করেছেন ছেলেমেয়েদের মধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ২৩, ২১ আর ১৮ বছরের তিন সন্তান এখন নিজেদের জীবন নিয়ে মশগুল। তিনটি ছেলেমেয়েই অত্যন্ত মেধাবী। তবে জীবনের এতগুলো বছর  দূরে থেকে ওদের সাহচর্য থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে এখন খুব আফসোস হয়। নীনার প্রভাবেই ওরা বড়  হয়েছে। বাবাকে দূর থেকে সমীহ করে কিন্তু বাবার জন্য ওদের মনে কোন সত্যিকারের টান আছে বলে মনে হয় না। এজন্য নিজেকেই  অপরাধী মনে হয়।   
নীনা অনেকবার বলেছেন, দেশে ফিরে আসতে। প্রথম দিকে বাংলাদেশে ফিরে তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে অনেক ঝড় ঝঞ্ঝা পার করতে হয়েছে নীনাকে একা হাতে। ওদের পড়াশোনা স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, খেলাধুলা, শরীর স্বাস্থ্য এবং  সংসার সামলেছেন তিনি। এর মাঝে নীনা তার কিছু সঞ্চয় ভেঙ্গে একটি দেশী কাপড়ের বুটিক  দিয়ে  ব্যবসায় শুরু করেছেন। সেই সাথে নীনার সামাজিক মেলামেশার জগতটাও বেশ বেড়েছে।  

জহির সাহেব নিজের আত্মীয়স্বজন ছাড়া অন্যান্য  মানুষের সাথে পরিচিত হন নীনার স্বামী হিসেবে। প্রথম দিকে খানিকটা আমোদিত হয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাপারটা ক্রমান্বয়ে অস্বস্তিকর হয়ে যাচ্ছে।  দু’একবার তিনি নীনাকে বিদ্রূপের আকারে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু নীনার শত ব্যস্ততায়  এসব তুচ্ছ জিনিস কানে তোলেননি। 
নীনার স্বভাবে একটা পরিবর্তন এসেছে। যদিও সে আগের মতই মায়াবতী, হাসিতে-গল্পে সবাইকে মাতিয়ে রাখে। শরীরটাও ধরে রেখেছে শক্ত বাঁধুনিতে। দেখে কেউ বলবে না তার বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে …... বড় বড় সন্তানের মা। নীনা নিজের সংসার সামলে শ্বশুর শাশুড়ি আর তার নিজের বাবা মায়ের দেখাশোনাও করেছেন যথাসাধ্য। স্বাভাবিকভাবেই, তিনি আর আগের মত স্বামীকে সময় দিতে পারেন না। 

মুশকিল হয় তখনই যখন  ঘনিষ্ঠজনদের নিজের ব্যবহার্য সামগ্রী ভাবা হয়। পেশাদারি জীবনের হাজার ব্যস্ততার মাঝেও মানুষ জানে  রাতে ফেরার একটি আশ্রয় আছে, বাসস্থান আছে। নিজের আপন গৃহকোণের পাশাপাশি পরিবারের সবাইকেও টেকেন ফর গ্র্যান্টেড হিসেবে নিলেই  ভুলটা হয়ে যায়। 

পৃথিবীতে কোন সম্পর্কই কি সম্পূর্ণ স্বার্থহীন!
গাছের গোড়ায় প্রতিদিন জল না দিলে বিবর্ণ পাতাগুলো ঝড়ে পড়ে। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ককে  কেউ বলে চিরদিনের সাথী….বাস্তব জীবনে এমন  কিছু নেই। কোন সম্পর্কই কি চিরস্থায়ী!!   
ঘরে সাজিয়ে রাখা টবগুলো সুন্দরভাবে সুসজ্জিত থাকে কারণ নীনা প্রতিদিন  তাতে জল দেয়, মাঝে মাঝে বিশেষ কিছু খাদ্যও দিতে হয়। সম্পর্কের গোড়ায়ও যে জল দিতে হবে তা তিনি  ভুলে গিয়েছিলেন।    

স্বামী তার ব্যস্ত জীবন সহ্য করতে পারছিলেন না অথবা নিজের অবসর জীবনের কথা ভেবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছিলেন। মানুষের খুব স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হল নিজের দোষ  বা অক্ষমতা না খুঁজে সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে আঘাত করা। 

তাদের এতদিনের দাম্পত্য জীবনে ছোট খাট বাদ- বিবাদ যে হয়নি তা নয়। নীনা খুব মানিয়ে চলার মানুষ। পরিবারের প্রত্যেকের সুবিধানুযায়ী নিজের মনোভাব বদলে নেন তিনি পারিবারিক শান্তি রক্ষার জন্য। কিন্তু এবারের আঘাতটা এভাবে আসবে তা ছিল অকল্পনীয়। 

নীনা জানেন, জহির সাহেব অত্যন্ত বিশ্বাসী, সৎ মনের ভালো মানুষ। বিয়ের আগে তারা সামান্য পরিচিত ছিলেন। পারিবারিক সম্মতিতেই  বিয়ে হয়েছিল। ভালোবাসার আবেগ ছিল না।  সংসার করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত অনুভব করেছেন মানুষটির মমতার স্পর্শ। কেউ কাউকে কোনদিন বলেননি ভালোবাসার কথা।  তবে তিনি জানেন,  মানুষটি কাছে না থাকলেও আছেন তার শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে মিলে মিশে।  

 নীনাও বোঝেন তিনি আর আগের মত সেই শান্ত বোকাসোকা বঁধুটি নেই। সংসারের অনেক গুলো বছর কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে নিজের উপর আস্থা বেড়েছে। স্বামী প্রবাসে থাকলে যা হয়, অনেক দুঃসংবাদ তাকে জানানো হয় না সময় মত। ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট বা স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি ভর্তির মত গুরুতর ব্যাপার গুলোতেও তিনি একাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্বভাবতই তার মধ্যে কর্তৃত্ব করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। 
বাবা ছাড়া সন্তানদের মানুষ করতে হলে কর্তৃত্ব কিছুটা করতেই হবে। তাদের স্বচ্ছলতা আছে,  কিন্তু বাহুল্য নেই। আজকালকার এই অস্থির সমাজে কঠোর হাতে সন্তানদের ইচ্ছেমতো গ্যাজেট কেনা বা অনলাইনে বসে থাকার ইচ্ছেকে তিনি দমন করেছেন। 

এইসব করেই ধীরে ধীরে অনেক কিছু  শিখেছেন। সংসার থেকে একটা বড় শিক্ষা নীনার জীবনে---- সবার মতামতের সাথে আপোষ করতে হলে কিছুটা  অভিনয় করা আবশ্যক। ছেলেমেয়েদের সামনে অনেক সময় সেই অতি অভিনয়ের মিষ্টি হাসি ধরা পড়ে যায়। তার বুটিকের দোকানের কর্মচারিদের সাথেও প্রায়ই দাঁতে দাঁত চেপে অভিনয় করতে হয়। সবার আবদার মেটানো যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সবাইকে বাদ দিয়ে কাজ করাও সম্ভব নয়।  
 তার এ গুণটির পরিচয়  জহিরকে দিতে হয়নি। স্বামীর সাথে লুকোচুরি তার নেই।  বাইরের জগতের প্রতিটি  ঘটনা তিনি স্বামীকে বলেন। তবে ইদানীং জহির সাহেব খুব মনমরা থাকেন, লক্ষ্য করেছেন নীনা। তিনি বোঝেন এত বছর বিদেশে থেকে এখন অবসরের সময়টা দেশে এসে থাকতে তার কষ্টই হবে। একদিকে সবার সাথে একসংগে থাকার আনন্দ অন্যদিকে তার অখন্ড অবসর নিশ্চয়ই তাকে ক্লান্ত করে তুলবে ----এসব ভেবেই সম্ভবত তিনি বিমর্ষ থাকেন। সবাই ব্যস্ত। কারো সময় নেই তার সাথে দুদন্ড বসে গল্প করার। 

সকালেও মুড ভালো ছিল জহির সাহেবের । দুজনে মিলে বারান্দার টবের পরিচর্যা করলেন। কয়েকটি ক্যকটাসের  মাটি বদল করলেন। গোলাপ আর জবার মাটি বদলে কিছু সার দিয়ে দিলেন। বাগানের শখ তাদের দুজনেরই। তবে নীনা আজকাল আর অত সময় পান না নিয়মিত যত্ন নেয়ার।
 জহির সাহেবের সারাদিনের অনেকটা সময় কাটে গাছপালা নিয়ে। ছেলেমেয়েরা একেক জন একেক সময় আসে, আবার বেরিয়ে যায় বিভিন্ন দরকারে। উঁকি দিয়ে দেখে যায় একবার বাবাকে। 

নীনা বেরোয় একটু দেরী করে। সংসারের কাজ গুছিয়ে রেখে একবারে দুপুরের খাবার খেয়ে সে বেরিয়ে যায় বারোটার পর। ফেরে সাতটার পর। এই  দীর্ঘ সময়টা বার তিনেক ফোন করে স্বামীর খবর নেন। 

কিন্তু তিনি  খেয়াল করেছেন স্বামীর শীতল ব্যবহার, ক্ষণে ক্ষণে মুখের রঙ বদল। জানতেও চেয়েছেন।
----আচ্ছা, তুমি এত চুপচাপ হয়ে যাচ্ছ কেন বলতো? আমার উপর কি রাগ করেছো? 
এভাবেই শুরু হয়েছিল তাদের সংলাপ। জহির সাহেব খুব নির্লিপ্ত স্বরে জানালেন তার কিছুই হয়নি। 

বউ কি আর থেমে থাকার পাত্রী! তিনি তো পণ করেছেন এই দুনিয়া থেকে সমস্ত মনখারাপ, বিষন্নতা ঝেঁটিয়ে বিদায় করবেন। তাই তার আবারও প্রশ্ন, 

----- নাহ, তোমাকে কি আমি চিনি না?  খুব ভালো করেই চিনি! কিছু একটা তো হয়েছে!! 
বলতে বলতেই দেখলেন জহির সাহেব হাতে প্লাস্টিকের দস্তানা না পরেই মাটি ধরছেন । 
----আহ, ওটা পরে নাও। নখের ভেতর মাটি ঢূকে যাবে। 

জহির সাহেব হাত নাড়িয়ে স্ত্রীর কথা উপেক্ষা করলেন। মুখে বললেন,
----আমার কথা এত ভাববার সময় আছে নাকি তোমার?  তুমি আছো নিজেকে নিয়ে! 

স্বামীর অভিযোগে হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন নীনা। লক্ষ্য করেছেন, জহির কেন যেন আজকাল তাকে ঠেস মেরে কথা বলে। কিন্তু তিনিও তো ছেড়ে দিবেন না  আজ! 
---- মানে, এই কথার মানে কি? নিজেকে নিয়ে আছি মানে কি? আমি কি তোমাদের জন্য কিছু করি না বা সংসার দেখি না? 
---করো। কিন্তু সে নিজের মত করে কর। আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য নেই এ সংসারে ! সব তুমি নিজের মত সাজিয়েছো। ছেলেমেয়েরাও চলে  তোমার ইচ্ছে অনুযায়ী। আমি তো শুধু টাকা রোজগারের মেশিন। 
----কে বলেছিল তোমাকে মেশিন হতে?   বহুবার বলেছি ফিরে আসতে। তুমি সাহস করনি। এখন আমাকে দোষ দেয়ার আগে নিজের কথাটা একটু ভেবে দেখো।  

 ব্যস, এখানেই প্রথম রাউন্ডের সমাপ্তি হল। তারা কখনোই খুব উচ্চস্বরে চিৎকার করে লোক জানান দিয়ে ঝগড়া করেননি।  দুজনেই চুপচাপ বাকী কাজ গুছিয়ে  শেষ করলেন। 
আজ মংগলবার। নীনার বুটিক বন্ধ। গোসল খাওয়া সেরে আজ দুপুরে একটু ভাত-ঘুম দিলেন। জহির সাহেব পুরো দুপুর তার প্রিয় দল ম্যাঞ্চেষ্টারের খেলা দেখে কাটালেন।
 সন্ধ্যায়  আজ জহিরের চাচাতো ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার কথা। তাদের মেয়ের বিয়ের কথা চলছে। তাই পারিবারিক মিটিং। নীনার এই ভাসুর এবং জা তাকে খুবই স্নেহ করেন। জহিরের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে তারা বিপদে আপদে ছুটে এসেছেন। তাই  নীনা যথাসাধ্য চেষ্টা করেন এদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজার রাখার। 
সন্ধ্যার মুখে তিনি  তৈরী হয়ে জহির সাহেবকে ডাকতে গেলেন চা নিয়ে। তার স্বামী ফুটবল ছেড়ে এবার ক্রিকেটের পুরনো  কোন খেলা দেখছেন। 
---কি হল, তৈরী হচ্ছ না যে!! 
----আমি যাচ্ছি না। তুমি যাও!  
আকাশ থেকে পড়লেন নীনা।
 দুপুরে কি হয়েছিল একটুখানি  খুনসুটি, তা তিনি কখন ভুলে গেছেন। কিন্তু  জহির ভোলার লোক নন।  প্রতিটি পাই পয়সা  যেমন হিসেব করেন, তেমনি স্ত্রীর প্রতিটি কথার চুল চেরা বিচার বিশ্লেষণ করেন। তার অপরাধবোধকে  জাগিয়ে তুলেছেন নীনা  দেশে সময়মত ফিরে না  আসার খোঁটা দিয়ে। আজ নিজের ভাবনার বলয়ে থাকাই শ্রেয়। 

---আশ্চর্য ! ভাইয়া, ভাবী বারবার করে বললেন যেতে।
না গেলে কি মনে করবেন! আর ফেরার পথে ঐশীকেও তুলে নিতে হবে ওর বান্ধবীর বাড়ী থেকে। 
----আমি যাচ্ছি না। তুমি যাও! 

নীনা একেবারে  বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। জহির তার চাচাতো ভাইয়ের বাসায় নীনাকে পাঠাচ্ছেন, নিজে যাচ্ছেন না। সে আবারও বললো,
--- আমি তো সারা বছরই যাচ্ছি একা একা। আজ নাহয় আমার সাথে গেলে। 
---বলছি তো যাবো না! অনর্থক এক কথা বলছো কেন? 

জহিরের কড়া গলার উত্তর শুনে নীনা ঘাবড়ে গেলেও মুখে প্রকাশ করেননি। তিনি স্মিত হেসে শুধু বললেন,
---ঠিক আছে। তাহলে আমি বেরুচ্ছি। ময়নার মা এসে তোমাদের খাবার বেড়ে দিবে। খেয়ে নিও।

চোখের কোণায় জমে থাকা অশ্রু মুছে নিলেন আলতো করে। জহিরকে তার আবেগ  দেখাতে চান না। কান্নাকাটি জহিরের একেবারেই পছন্দ নয়।  
রাতে ফিরতে দেরী হয়ে গেল। ফিরে এসে দেখেন  ছেলেরা খেয়ে শুয়ে পড়েছে। জহির তখনো টিভির সামনে।  কয়েক মিনিট বসে গড়্গড় করে ভাসুরের বাসার ঘটনা সবিস্তারে জানালেন মনমরা  স্বামীকে। 

রাতে শুয়ে শুয়ে  ভাবছিলেন  আজকের কথা।  জহির যায়নি দেখে সবাই বিস্মিত হয়েছিল ওবাড়িতে। নীনা শরীর খারাপের অজুহাত দিয়েছে। কেউ অবশ্য আর উচ্চবাচ্য করেনি। শুধু ওর এক ননদ কি করে যেন অনুমান করলো  তাদের মান অভিমানের কথা।  সে হেসে গড়িয়ে পড়লো, যদিও নীনা  বিশদ ব্যাখ্যা কিছু দেননি। 

পরদিন সকালে  ড্রাইভারকে নিয়ে বাজার করে  এলেন জহির। ময়নার মা আজ সকালে কাজে আসেনি।  তাই নীনাকেই সব  গোছগাছ করতে হল। জহির অবশ্য প্রচুর সাহায্য করলেন। 

জহির সাহায্য করেন ঠিকই,  কিন্তু তার পিটপিটে স্বভাবের জন্য নীনার অসহ্য  লাগে। সত্যিকার অর্থে, রান্নাঘরের কাজে তারা দুজনেই সমান পারদর্শী। তবে নীনা  রকেটের গতিতে কাজ করেন। আর জহির ধীরে সুস্থে নিখুঁত কাজের নমুনা দেখাতে দক্ষ। দ্রুত রান্না শেষ করে সব গুছিয়ে নীনাকে কাজে যেতে হবে বলে তার ধীর মন্থর গতিতে চলার অভ্যেস নেই। সময়ে সময়ে  অস্থির হয়ে ওঠেন।  জহিরকে বলেন তিনি,
---আচ্ছা শোন, তোমার এখানে কাজ করা লাগবে না! আমি একাই করে নিচ্ছি। তুমি ঘরে যাও।  
---কেন, আমি তো তোমার কাজে বাধা দিচ্ছি না। উলটা তোমাকে সাহায্য করছি। 
---তোমার সাহায্য আমার চাই না! তুমি যাও তো এখান থেকে!  
নীনা তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠে।  তার কাজে দেরী হয়ে যাচ্ছে বলেই উদ্বিগ্ন। আজ   বুটিকে কিছু নতুন অর্ডার নিয়ে আসবে টাঙ্গাইল থেকে।  মালিক নিজে সময়মত উপস্থিত না থাকলে কি হয়!  

কিন্তু তার কথায় জহিরের প্রতিক্রিয়া হল দেখার মত।    হাতের ধাক্কায় সাজিয়ে রাখা তরকারীর বাটিগুলি ফেলে দিয়ে  রান্নাঘর থেকে হনহন করে বের হয়ে গেলেন জহির।  নীনা কিংকর্তব্যবিমুঢ়  হয়ে  নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। এতক্ষন কষ্ট করে রাঁধা তরকারীগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো ফ্যালফ্যাল করে। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা! ইস, ঝোলমাখা  চারদিকে। সব তো আবার তাকেই পরিস্কার করতে হবে। 

জহির কেন এমন করলেন  সেটাও জানা দরকার। 

পায়ে পায়ে বেরিয়ে এসে দেখে জহির শোবার ঘরের লাগোয়া বারান্দায় বসে আছেন বেতের চেয়ারটিতে। গভীর চিন্তায় বিষাদগ্রস্ত মুখ। কাছে এসে নরম গলায় বললেন নীনা, 
---- আই এম সরি! তাড়াহুড়োয় কি বলতে কি বলেছি আমার মনে নেই! প্লিজ মাফ করে দাও! 
----মাফ করার কিছু নেই। আমি এখন তোমার কাছে অসহ্য হয়ে গিয়েছি। এত অবহেলা আর উপেক্ষা! হয়তোবা আমারই দোষ। এতদিন ধরে আলাদা থেকে তোমার ভিন্ন জগত তৈরী হয়েছে, যেখানে আমার স্থান নেই। 
----কি বলছো এসব! বলছি তো আমি, সরি! 
----নাহ, এভাবে চলে না আর! আমি প্রতিমুহূর্তে অপমানিত হচ্ছি। আমি না থাকলেই তোমরা সবাই খুশী হও বুঝতে পারছি। আমি চলেই যাবো! থাকো তুমি তোমার জগতে! 
---- এমন কি হয়েছে যে তুমি এভাবে বলছো?  আমি তো বললাম, ভুল হয়েছে। হুটহাট করে এমন অনেক কথাই আমি  বলি। তুমি কি এতদিনেও আমাকে বুঝতে পারনি। আর এমন করে রাগ দেখাচ্ছ, ছেলেমেয়েদের কাছে কি তোমার কোন সম্মান থাকছে, বলো? কাল যাওনি, আমাকে মিথ্যে বলতে হয়েছে। 
---চলেই যাই, তোমাদের জীবন থেকে …...তোমাকে আর মিথ্যে বলতে হবে না!  

আর সম্ভব হল না  চোখের পানি ধরে রাখা। পুরুষ মানুষ বিধাতার এক আশ্চর্য সৃষ্টি। তাদের পায়ের কাছে বসে থাকলে যদি মন পাওয়া যেতো।
 এই যে এতগুলো বছর ধরে তিনটা বাচ্চা নিয়ে একা কাটালেন---- কত কত দিন গেছে রাতের পর রাত ঘুমাতে পারেননি বাচ্চারা অসুস্থ বলে। কাজের মানুষ নেই, বাজারের লোক নেই, বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছাতে হবে, সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজে বাথরুমে না ঢুকে আগে ওদের প্রস্তুত করা।  তাকে চাকুরী করতে হয়নি। কিন্তু আলাদ্দীনের আশ্চর্য প্রদীপে ঘষা লাগিয়ে তো দিনগুলো পার হয়ে যায়নি।  

জহিরকে তার কষ্টের কথা বলতে গেলে কথার মাঝে সে বলেছে, তার ঘুমাতে হবে। কাল সকালে ক্লাস আছে। তার উপেক্ষা আর গ্লানির কথা নীনা কাউকে বলতে পারেননি। আর আজ জহির সামান্য অবহেলা সইতে না পেরে এত বড় নাটক করছেন!!  

নাটকই যদি করতে হয় তবে নীনার চেয়ে বড় নাট্যকার কিছুতেই হতে দেয়া যাবে না  জহিরকে। 

যে-ই ভাবা সেই কাজ। 

নীনা আচমকা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। মেয়ে আর ছোট ছেলে বাসায়। তাই কান্না চেপে রাখতে হল। জহির মাথা নীচু করেই আছে। তার দিকে তাকাচ্ছে না। নীনা  কাঁদতে কাঁদতে  হাঁপাতে লাগলেন।  রীতিমত শ্বাসকষ্ট হচ্ছে ওর। তাও জহির ভ্রুক্ষেপ করছেন না। এবার নীনা তড়িৎ পায়ে শোয়ার ঘরে ঢুকে কাঁদতে কাঁদতেই আলামারী থেকে কাপড় বের করে ঘর সংলগ্ন বাথরুমের দিকে ছুটে যান। 

জহির বারান্দায় বসে শুনতে পায় ধপ করে পড়ে যাওয়ার শব্দ। দৌড়ে এসে দেখে নীনা বাথরুমের মেঝেতে  চিতপটাং পড়ে আছেন। দাঁত কপাটি লেগে গেছে।  জহিরের ডাকে ছেলেমেয়ে দৌড়ে আসে। নীনাকে ধীরে ধীরে তুলে নিয়ে আসে বিছানায়। মেয়ে ডাক্তারের  খোঁজে  বেরিয়ে যায়। জহির দেখে শরীরের অন্য কোথাও ব্যথা পেয়েছে কি না ।   

নীনা যন্ত্রণার নানা অভিব্যক্তি করে কেঁদেই চলেছেন আর বিড়বিড় করে বলছেন, 
---আমি মরি না কেন!! মরলেই সবার শান্তি হত!  

ডাক্তার এসে দেখে প্রেসার হাই। ঘুমের ঔষধ  খাওয়ানো হয় নীনাকে। বেশ কয়েকঘন্টা পর ঘুম ভাংগলে দেখেন জহির বসে আছেন অপরাধী মুখ করে  তার  বিছানার এক প্রান্তে।  স্বামীর হাতটি ধরে নীনা আবার ঘুমিয়ে পড়েন। 

ডাক্তার বলে গেছেন দুটো  দিন বিশ্রাম নিতে।  তাই  পরদিনও কাজে না গিয়ে শুয়েই থাকলেন।  ছেলেমেয়ে আর তাদের বাবা  তার আশেপাশেই রইলো । 

জহিরের সাথে আর বিশেষ কথা হল না আগের প্রসংগ নিয়ে। তবে পরদিন রাতে  বিছানায় জহির তাকে জড়িয়ে ধরে থাকলো কিছুক্ষণ খুব আন্তরিকভাবে। তার তপ্ত নিঃশ্বাস এসে পড়ছে নীনার চোখেমুখে। উত্তপ্ত ঠোঁট দুটো যেন শুষে নিল। ভালোবাসায় মাখামাখি পড়ন্ত যৌবনের শরীর দুটি  ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকলো…..!!

নীনা ভাবছে, মেয়েদের জীবনটা কী পুরোটাই অভিনয়!  যে যত  সুনিপুণ অভিনয় জানে সে সংসারে  তত গ্রহণযোগ্য। জহিরের মত একজন ভালো মানুষের সাথেও  এত সামলে চলতে হয়!!  

 সম্পর্কের গোড়ায় জল ঢেলে সার দিয়ে তাকে সতেজ আর উর্বর রাখতে হয়। একটু ভুলচুক  করলেই  বাঁধন  খুলে যেতে দেরী হয় না। অথচ নারীর জীবনের অপ্রাপ্তি, হতাশার কথা শোনার জন্য কেউ বসে নেই। শুধু দায়িত্বপালনের জন্য নয় একটু ভালোবাসবার জন্য, সুখে দুঃখে  তার পাশে ছিলেন না জহির সর্বক্ষণ।  ভাবতেন, জহিরও একাকী আছে। তাই নিজের কষ্টের কথা চেপে যেতেন। আজ যখন তিনটি ভদ্র, বিনয়ী, মেধাবী, সুস্বাস্থ্যের  অধিকারী সন্তান বড় হয়ে গেছে  তখন জহির তার মনোযোগ প্রার্থী। হায়রে জীবন! 
  বেঁচে থাকতে হবে এই প্রশান্তিতেই ... তার পুরুষটি তাকে কামনা করে !  
কিন্তু  বাইরের দুনিয়া যে তাকে  হাতছানি দিয়ে ডাকে! নিজের বুটিক, নিজের ব্যবসায়, নিজস্ব স্বাধীনতা………! 
 পঁচিশ বছর দাম্পত্য সম্পর্কের পরে  যদি মনে হয় সাংসারিক দায়িত্ব পালনের চেয়ে নীনা তার কাজকে বেশি ভালোবাসেন  তাহলে কেনইবা এ সমাজ  নীনাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায় ?  
অভিনয় করে আর কতদিন চলবে !  

সত্যিকারের মুখোশটা যে বের হয়েই আসে!!  

জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে রুপোলী চাঁদ আর তারার ঝিকিমিকিতে অন্ধকার ঘর আলোয় ভেসে যায়। পাশে শুয়ে থাকা ঘুমন্ত স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখেন একমনে। 
কাল আবার আসছে নতুন দিন, নতুন দিনের সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হয়ে আবারও পৃথিবীর মানুষ সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখার অভিনয়ে নামবে। 

মুখোশধারী মানুষই শুধু টিকে থাকে এই  খেলায়। বাকীরা পরাজিত হয়ে হারিয়ে যায়। 

নীনা নিজেকে পরাজিত দেখতে অভ্যস্ত নন। ভোর হওয়ার আগেই মুখোশটা পরে নেন  পাকা অভিনেত্রীর মত!!  
সংসার নামক এক মঞ্চে প্রতিদিনই মঞ্চস্থ হয় তার অভিনীত নাটক!! 

বন্যা হোসেন
অটোয়া, কানাডা।