অটোয়া, শুক্রবার ২০ মে, ২০২২
ডায়েরির গল্প – মোঃ ইমন শেখ

     বাবার মৃত্যুর পর সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। মা, দাদী, ভাই, বোন তথা গোটা পরিবারের দায়িত্ব তখন আমার কাঁধে। অনেক কষ্টে এইসএসসির গণ্ডি পার করলাম। এরপর লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হলো না। একটি চাকরির খুব দরকার। চেনা-অচেনা অনেকের কাছেই ধরনা দিতে শুরু করলাম। যেকোনো কাজ কেরানি, পিওন, দপ্তরী এমনকি ঝাড়ুদার হতেও রাজি। এরকমই এক দুঃসময়ে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই এক জর্দা কোম্পানির ব্রাঞ্চ অফিসে চাকরি পেয়ে গেলাম। বেতন যা তাতে টেনেটুনে চলে যাবে। কাজ ভালো দেখাতে পারলে বেতন বাড়ানো হবে বলে কোম্পানির তরফ থেকে বলা হয়েছে। অবশ্য কাজ তেমন কঠিন না। কেবল ব্রাঞ্চ থেকে বাজারে জর্দা সাপ্লাইয়ের হিসাব রাখা, সাপ্লায়ারদের কাজের তদারকি এবং কর্মচারীদের বেতনের বিলি ব্যাবস্থা করা। তবে আমার পোস্টিং হলো অনেক দূরে। যাহোক জীবনের তাগিদে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হলো। পরিবার ছেড়ে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কাজে নেমে পড়লাম। নতুন জায়গায় থাকার ব্যাবস্থা কোম্পানিই করে দিল। জীর্ণশীর্ণ পলেস্তারা খসে যাওয়া দুই রুমের একতলা বাড়ি। কোনো রকম সাফ সুতরো করা। আসবাব বলতে কেবল একটি খাট, একটি ভাঙা আলমারি আর জানালার কাছে একটি পুরনো টেবিল ও হাতলবিহীন চেয়ার। জানালার পাল্লা আবার ভাঙা। সেখানে চোখ রাখলেই এক বিরাট আম গাছ চোখে পড়ে। জর্দা কোম্পানির সামান্য এক কর্মচারীতো আর বিলাসবহুল এসিরুম পেতে পারেনা। অতটা আশা করাও বোকামি। বরঞ্চ এই ঢেরবেশি। সুতরাং সেই পলেস্তারা খসে যাওয়া বাড়িতে থেকেই খোশমেজাজে কাজ চালিয়ে গেলাম। একদিন ঘর সাফসুতরো করার সময় আলমারির নিচে একটি পুরনো ডায়েরি আবিষ্কার করলাম। ইদুর আর তেলাপোকা মিলে সেটির প্রায় এগারোটা বাজিয়ে ফেলেছে। বেশ কিছু পৃষ্ঠা অক্ষত ছিল বলে ডায়েরির বারোটা তখনো বাজেনি। ফেলে দিতে গিয়েও ডায়েরিটি ফেলা হলো না। টেবিলের ওপর উঠিয়ে রাখলাম। কাজের বেশ চাপ থাকায় ওটা আর খুলে দেখার সময় পায়নি। অবশেষে একদিন সময় পেলাম। অফিসের এক বৃদ্ধ কর্মচারীর বাসায় সেদিন রাতে নিমন্ত্রণ ছিল। পাঁচ মেয়ের পর বৃদ্ধ বয়সে এক পুত্রের পিতা হওয়ার খুশিতে ভদ্রলোকের সেকি আয়োজন! যাকে বলে একেবারে এলাহী কাণ্ড। ভদ্রলোকের চাপাচাপিতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে হলো। তাই সেদিন রাতের রান্নার ঝামেলা ছিলনা। রুমে ফিরে খাটে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। খাওয়াটা জম্পেশ হয়েছে। সুতরাং ঘুম ভালো হওয়ার কথা। কিন্তু বাধ সাধল লোডশেডিং। গরমের তীব্রতায় ঘুম গেল পালিয়ে। অগত্যা মোমবাতি জ্বেলে টেবিলে গিয়ে বসলাম। হিসাবের খাতাটা কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে রেখে দিলাম। গরমে কাজ করতে ইচ্ছে হচ্ছিলনা। তখনই চোখ গেল টেবিলে পড়ে থাকা ডায়েরির উপর। সেটি খুলতেই গুটি গুটি অক্ষরের পরিচ্ছন্ন লেখা চোখে পড়ল। হাতের লেখাই বলে দিচ্ছে এ ডায়েরি কোন নারীর লেখা। আমার আগ্রহ বেড়ে গেল। প্রথম দিককার পৃষ্ঠাগুলি ইদুর তেলাপোকা যেভাবে নষ্ট করেছে তাতে সেখান থেকে বিশেষ কোনো পাঠোদ্ধার সম্ভবপর হলো না। আমি পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকলাম। অবশেষে এক জায়গায় স্পষ্ট লেখার সন্ধান পেয়ে পড়তে শুরু করলাম।
     'আপনা মাংসে হরিণী বৈরী' কথাটি যে আমার জীবনের ক্ষেত্রে এমন ধ্রুব সত্য হয়ে দাড়াবে কখনো ভাবিনি। এটা যদি একটা দুঃস্বপ্ন হতো! ঘুম ভাঙলেই স্বস্তি। কিন্তু হলো না। তবে সত্যি বলতে আমি তো ঘুমিয়েই ছিলাম। শুধু কী আমি? এই সমাজ কী জেগেছিল? গভীর ঘুমে মগ্ন ছিল এই সমাজ। নইলে লম্পটগুলো কী লাম্পট্যের রাজত্ব কায়েম করতে পারত? ওরা কী পারত কলেজ যাওয়ার পথে  আমাকে প্রতিনিয়ত উত্তক্ত করতে? শিস দেওয়া, চোখ ইশারা কিংবা বাজে মন্তব্যের গণ্ডি পেরিয়ে গা ঘেঁষতে পারত? ওরা কী পথ রোধ করে ওড়না টানতে পারত? সবই কেবল প্রশ্ন। এই ঘুমন্ত সমাজ ওদের এই অন্যায় আচরণ বোধহয় দেখতেই পায়নি। প্রতিবাদের তাই কোন প্রশ্ন ওঠেনি। আমার ঘুমও ভাঙলো না। প্রতিবাদ করার সাহস পর্যন্ত হলো না। হবে কি করে? উড়তে গেলে ডানা লাগে। কিন্তু ডানা কেটে দিলে কী উড়াল দেওয়া যায়? বনশাই উদ্ভিদের কথা জানি। ওগুলোকে নাকি কেটে ছেটে টানা দিয়ে বড় হওয়ার পথ রুদ্ধ করা হয়। এই সমাজে নারীর অবস্থা কী ঐ টানা দেওয়া বনশাইয়ের মত না? ফল ফুল সবই দেবে কিন্তু পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হতে পারবে না।
     কাজের কাজ কিছু হবে না জেনেও আমার বিধবা মাকে সব খুলে বললাম। মা খুবই বিচলিত হলো। আমাদের অর্থবল, লোকবল না থাকা সত্ত্বেও মা বেশ দৌড়-ঝাপ করলো। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। শুভাকাঙ্খীদের অনেকেই সদুপদেশ দিল মাকে। মেয়ে-ছেলে বড় হলে একটু সামলে চলতে হয়। তাছাড়া মেয়ে বেশ সুন্দরী। আর সুন্দরী মেয়ে দেখলে উঠতি বয়সের পোলাপান একটু আধটু উৎপাত তো করবেই। অগত্যা আমার কলেজ যাওয়া বন্ধ হলো। তবু কী শেষ রক্ষা হলো? সৌন্দর্যেরও যে অভিশাপ আছে সেকথা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। 
     পরের পাতাগুলির অবস্থা এতটাই জরাজীর্ণ ছিল যে কিছুতেই পড়তে পারলাম না। মনটা খারাপ হয়ে গেল। এরকম কিছু পড়ব বলে আশা করিনি। যাহোক কিছুদূর গিয়ে আবারও স্পষ্ট লেখার সন্ধান পেলাম। দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে পড়তে লাগলাম। 
     সেদিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি আজ বার বার হানা দিচ্ছে। সেই কাল সন্ধ্যা, এক দল উন্মত্ত পশু ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার উপর। তারপর-উহ অসহ্য। কিছুতেই ভুলতে পারছি না। ভুলব কী করে? ঐ পশুদের দাঁতের ক্ষত আর নখের আচড় কী শুকিয়েছে? আকাশে মেঘ করেছে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিও পড়ছে। মা রান্নাঘরে খিচুড়ি চড়িয়েছে। আমার প্রিয় খাবার কিনা তাই। ঘরে বসেই গন্ধ নাকে আসছে। আর কানে আসছে একটা চাপা স্বরের কান্নার আওয়াজ। মা-ই কাঁদছে। এই সমাজ, এই শাসন ব্যাবস্থা, এই বিচার ব্যাবস্থা অসহায় মায়েদের শুধু কাঁদাতেই জানে।
     বৃষ্টির বিরাম নেই। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সেই আলোয় সেদিনের সেই অন্ধকারের দুঃসহ স্মৃতি যেন আরও স্বচ্ছ, আরও স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠছে চোখের সামনে। উহ! আমি আর পারছি না। যে সমাজ নিপীড়ীতের পাশে না দাঁড়িয়ে নিপীড়কের পক্ষ নেয় সেই সমাজ সভ্য সমাজ হতে পারেনা। এই সমাজে - ধর্ষক দেবতা আর ধর্ষিতা পাপী বলে গণ্য। এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
     ইতিহাস সাক্ষী অগ্নিপরীক্ষা শুধু সীতাদেরই দিতে হয়। পরীক্ষা উতরে গেলেও এই সমাজ তাদের গ্রহণ করে না। কালের অতল গহ্বরে কত শত সীতা যে তলিয়ে যায় সে হিসাব কে রাখে?
     বেঁচে থাকার বড় সাধ ছিলো। জানি পারবো না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তপ্ত বুলেটে নাহয় বিদ্ধ হবে আরেক সীতা। তাতে আর কী এমন ক্ষতি? কী-ইবা আসবে যাবে কার? ঐ নরপশুগুলি আমার ওপর হামলে পড়েছিল একবারই। কিন্তু এই সমাজ প্রতিটি সেকেন্ড, প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি ঘন্টা আমার ওপর হামলে পড়েছে। ক্রমাগত ধর্ষণ করে চলেছে আমাকে। এই সমাজ পণ করেছে আমায় বাঁচতে দেবে না। আমিও বোধহয় বেঁচে থাকতে পারব না। বুক ভরে শ্বাস নিতে না পারলে কী বেঁচে থাকা যায়? বেঁচে থাকার অভিনয় আর কত?
     উঠানের আম গাছের ঐ ডালটি কী আমায় হাতছানি দিচ্ছে? ঐ গাছের ডালে ঝুলানো দোলনায় দোল খেতে খেতে বড় হয়েছি। ঐ ডালে ঝুলেই কী চুকিয়ে দেব বয়সের হিসাব নিকাশ? দড়িটা বেশ মজবুত। ফাঁসের গেরোতেও ত্রুটি নেই। অপেক্ষায় আছে এই রাত। যেন আমায় মিলিয়ে নিবে আঁধারের দেশে। বৃষ্টি এখনও থামেনি। অন্ধকার-গাঢ় অন্ধকার। ভেতরে বাইরে সবখানে অন্ধকার। চারদিকে একটা থমথমে ভাব। এই বুঝি ঝড় উঠবে।
     তারপরের পাতাগুলি ফাঁকা। পড়ার পর কতক্ষণ যে ঘোরের মধ্যে ছিলাম তা আজ আর মনে নেই। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় মোমবাতিটা নিভে যেতেই ঘোর ভাঙলো। বুকের ভেতর একটা চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করলাম। সজল চোখে জানালাটা ধরে অন্ধকার ভেদ করেই বাইরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলাম। অন্ধকারেও আমগাছটি যেন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আর তাতে ঝুলছে একটি নিথর  নিষ্পাপ  দেহ। তার স্পন্দনহীন দেহে   ফোটায় পড়ছে বৃষ্টির পানি পড়ছে। যেন সব ক্লান্তি, সব যন্ত্রণা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিবে।

মোঃ ইমন শেখ। নড়াইল, বাংলাদেশ