অটোয়া, শনিবার ২১ মে, ২০২২
পড়ন্ত বিকেলে ওয়াটার লুর প্রান্তরে – চিরঞ্জীব সরকার

উরোপের একটি ছোট দেশ বেলজিয়াম। লোকসংখ্যা ১কোটি ১৫ লক্ষের কাছাকাছি। এর চারপাশে রয়েছে জার্মানী ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবার্গ। ফ্রেঞ্চ ও জার্মান দুটো ভাষাই প্রচলিত আছে এখানে। দেশটির উত্তরে ডাচ ভাষারও প্রচলন রয়েছে। রাজধানী  ব্রাসেলসে রয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের হেড কোয়ার্টার্স। ন্যাটোর হেডকোয়ার্টার্সটিও অবস্থিত  এ দেশটিতে। ১৮৩০ সনে স্বাধীনতা প্রাপ্ত ৩০,৫২৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটি ইউরোপের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ন দেশের একটি যার প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে ৯৬৭ জন মানুষ।

ওয়াটার লুর অবস্থান ব্রাসেলসের পনের কিলোমিটার দক্ষিনে। ১৮ জুন ১৮১৫ সনে ওয়াটার লুর যুদ্ধটি সংঘটিত হয় যেটি সেসময় ছিল ইউনাইটেড কিংডম অফ নেদারল্যান্ডসের একটি গ্রাম্য এলাকা। এ যুদ্ধে ফরাসী বীর নেপোলিয়ন বোনাপার্টের নেতৃত্বে ফরাসী সৈন্যদলকে পরাজিত করে ডিউক অফ ওয়েলিংটনের নেতৃত্বে  অ্যাংলো অ্যালাইড আর্মি যার সাথে যোগ দিয়েছিল ফিল্ড মার্শাল ভন ব্লুচেয়ারের নেতৃত্বাধীন প্রুসিয়ান সৈন্যরা। নেপোলিয়ান এ যু্দ্ধে পরাজিত হয়ে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হন এবং এ যু্দ্ধেই একি সাথে একজন অকুতোভয় বীর সেনানী হিসাবে তার সমর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। সেন্ট হেলেনাতেই নির্বাসিত অবস্থায় নেপোলিয়ন প্রান ত্যাগ করেন। নেপোলিয়নের নেতৃত্বাধীন ফরাসীপক্ষে সেদিন ছিল ৭৩,০০০ সৈন্য এবং অ্যাংলো অ্যালাইড আর্মির পক্ষে ১,১৮,০০০সৈন্য।যুদ্ধ শেষে নেপোলিয়নের দল হারায় ৪১,০০০ ও বিপরীত পক্ষ ২৪,০০০ সৈন্য। প্রকৃতি বা ভাগ্যদেবী কোনটাই সেদিন নেপোলিয়নের পক্ষে ছিল না। প্রচন্ড বৃষ্টিতে ওয়াটার লুর কর্দমাক্ত মাটি সেদিন নেপোলিয়নের বাহিনীর আক্রমনের গতি মন্থর করে দেয় এবং প্রুসিয়ান ও ইংরেজ নেতৃত্বাধীন সন্মিলিত বাহিনীর আক্রমনের শিকার হয়ে নেপোলিয়নকে পরাজয়কে বরন করতে হয়েছিল।

বুদ্ধিজীবিদের আশ্রয়স্থল বেলজিয়ামঃ 
রাজনৈতিক মতবাদ প্রচারের কারনে ফ্রান্স ও জার্মানী থেকে নির্বাসিত হয়ে ১৮৪৫ সালে বেলজিয়ামে আশ্রয় নেয় কার্ল মার্কস। এখানে বসেই ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলসের সাথে লেখেন কমিউনিস্ট মেনিফেস্তো। ১৮৫১ সালে ফ্রান্স থেকে পালিয়ে বেলজিয়ামের গ্রান্ড প্যালেসে সাত মাস কাটান লা মিজারেবলের লেখক ভিক্টর হুগো। যদিও হুগো ফ্রাঞ্চ কর্তৃক বহিস্কৃত হননি তবুও গনতন্ত্র,সামাজিক সমতা,মৃত্যুদন্ড রহিত ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে তার যে চিন্তাধারা সেটার সাথে তৎকালীন ফরাসী শাসকগোষ্ঠীর চিন্তা চেতনার সাথে মিলছিল না। তাই তিনি অনেকটা একবুক হতাশা নিয়ে এখানে চলে এসেছিলেন। হুগোর বন্ধু কাউন্ট অফ মন্টেক্রিস্টোর লেখক আলেকজ্যান্ডার দুমাস সেও একি সময় চলে আসেন বেলজিয়ামে। যদিও সে ঋনের কারনে কারাবাস এড়াতে এখানে এসে আশ্রয় নেন তবুও তিনি বলে বেড়ান যে রাজনৈতিক কারনে তাকে ফ্রাঞ্চ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। যাদের কাছ থেকে তিনি ঋন করেছিলেন তাদের সাথে তিনি সমঝোতা চুক্তি করে দুবছর পরবাস শেষে ১৮৫৩ সনে আবার প্যারিসে ফিরে আসেন। আসলে ঋন খুব খারাপ একটা জিনিস। মাইকেল মধুসূদনের মত কবি যে কিনা একটা সময় বলত রাজনারায়ন দত্তের ছেলে কাউকে টাকা গুনে দেয়না তাকেও একটাসময় ঋনগ্রস্ত হয়ে পাওনাদারদের কাছ রক্ষা পেতে বাড়িতে লুকিয়ে থাকতে হত এবং স্ত্রী হেনরিয়েটাকে বলতে হত তার স্বামী বাসায় নেই। ঋনকর্তা পিতা শত্রু,মাতা চ ব্যাভিচারিনী / ভার্যা রূপবতী শত্রু,পুত্র শত্রু অপন্ডিতম। অর্থাৎ ঋনগ্রস্ত পিতা,ব্যাভিচারিনী মাতা, অতি রূপবতী স্ত্রী ও মূ্র্খ সন্তান কখনো কখনো পুরো পরিবারের কাছে শত্রুতে পরিনত হন। এছাড়াও ১৯০২ থেকে ১৯৩৩ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় মাঝে মাঝে বেলজিয়ামে বিভিন্ন মেয়াদে আলবার্ট আইনস্টাইনকে থাকতে হয়েছিল ।

হিরের রাজধানীঃ
বেলজিয়ামের এন্ট্রেপকে বলা হয় ‘ওয়াল্ড ক্যাপিট্যাল অফ ডায়মন্ড ট্রেড’ কেননা পৃথিবীর বেশীরভাগ অমসৃন হিরে এখানে পলিসড্ হয়ে বা মসৃনতা লাভ করার পরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দামী দামী অলঙ্কারের দোকানে কাচের সেলফে বিক্রির জন্য শোভা পায়।

নিউ ইয়র্ক শহরের গোড়াপত্তনঃ
ডাচ ওয়েষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে বেজিয়ামের অভিযাত্রী পিটার মিনিউইট ১৬২৬ সালে ৬০ গিল্ডার দিয়ে ম্যনহাটনের জমি কিনে যে অগ্রযাত্রার সূচনা করেন সেটাই আজ কালের বিবর্তনে পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়ানো নিউ ইয়র্ক সিটি।আজকের বাজারদরে সেসময়ের ৬০ গিল্ডারের মূল্যমান হবে মোটামুটি পনেরশ’র মত মার্কিন ডলার।

কান্ট্রি উইদআউট গভরমেন্টঃ
বেলজজিয়ামবাসীদের কাছে একটা সময় এসেছিল যখন দেশটিতে ৫৮৯ দিনের জন্য কার্যকর কোন সরকার ছিল না। রসিক বেলজিামবাসীরা নাকি তাতে বেশ সুখেই ছিলেন কারন তখন আর তাদের সরকার কর্তৃক ট্যাক্স বাড়ানোর কথা চিন্তা করতে হয়নি।

চকোলেট,বিয়ার আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের দেশঃ
বেলজিয়ামবাসীদের দাবি তারাই নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল মানের চকোলেট উৎপাদন করে। যদিও সুইসরা বেলজিয়ামের এ দাবি মেনে নিয়েছে কিনা জানিনা। বছরে প্রায় ২২০,০০০ টন চকোলেট উৎপাদন করে দেশটি যেখানে বাৎসরিক মাথাপিছু প্রতি বেলজিয়ামবাসীর ভাগে পড়ে প্রায় ২২ কেজি চকোলেট। খুবই সামান্য! হাজারো রকমের বিয়ার তৈরী করে দেশটি এবং একি সাথে এ রকমারি বিয়ার পরিবেশনের জন্য হাজারো রকমের গ্লাস। বেলজিয়মে প্রতিদিন যদি কেউ একটা নতুন বিয়ার পান করে তবে টানা চার বছর পর্যন্ত তাকে আগের একই বিয়ার পান করতে হবে না। মাথাপিছু একজন বেলজিয়ান গড়ে বছরে ১৫০ লিটার বিয়ার গিলেন। ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের জনকও নাকি তারা।

আমি ২০১৮ সনের অক্টোবরের এক পড়ন্ত বিকেলে ওয়াটারলুতে আসি। ওয়াটার লুর স্মৃতিকে ধারন করে রাখার জন্য এ যুদ্ধক্ষেত্রের মাটি দিয়ে একটি পাহাড়ের মত স্তুপ তৈরী করা হয়েছে যার শীর্ষে রয়েছে একটি সিংহের মূ্র্তি। আমি ওই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সেদিন নেপোলিয়নকে নিয়ে অনেক কিছু ভাবছিলাম। নেপোলিয়ানই বলেছিলেন তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি উপহার দেব। মেয়েরা শিক্ষা দীক্ষায় এগিয়ে গেলে সে জাতির অগ্রযাত্রার গতি কেউ রুখতে পারে না। একটা শিক্ষিত পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হবে। আর যেখানেই শিক্ষার আলো জ্বলে উঠে অন্ধকার সেখান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

বীরেরা হেরে যেতে পারে নানা কারনে। তবে সেটা তাদের পরাজয় নয়।বীর বিক্রমে যুদ্ধ করল কিনা সেটাই বীরত্বের মাপকাঠী। বীরদের পরাজয় অন্যখানে। সবাইকে নিজেদের অধীনে আনার যে মাত্রাতিরিক্ত লোভ সেটা তাদের ক্রমাগত পররাজ্য গ্রাস করতে গিয়ে পাপে পরিনত হয় যা তাদের অন্তিমে পরাজয় এবং কখনো কখনো করুন মৃত্যুর মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটে।

চিরঞ্জীব সরকার। অটোয়া, কানাডা