অটোয়া, শনিবার ২১ মে, ২০২২
অন্তহীন উদ্বাস্তু - শেখ মোহাম্মদ হাসানূর কবীর

মাকে দিয়ে কিছু হবেনা-
এই ভেবে কলাবতী চলে গেল অন্য পুরুষের হাত ধরে; 
সেদিন নক্ষত্র খচিত রাতে কলাবতীর অখণ্ড সার্থপরতায় 
কষ্ট পেয়েছিলাম খুউব।
তারপর কেটে গেছে কয়েক যুগ,
ঘরহীন মানুষ আমি ঋতুচক্রে পাক খেতে খেতে 
চলে এলাম যৌবনের শেষ প্রান্তে। 

হঠাৎ খবর পেলাম দবির উদ্দিন দফাদারের কাছে- 
পাষণ্ড প্রেমিক ভালোবাসার ফাঁদে ফেলে
কলাবতীকে বেচে দিয়েছিল পাড়ার বিমলা মাসির কাছে।
লজ্জায় ঘৃণায় বীতশ্রদ্ধ জীবন থেকে মুক্তি পেতে
কলাবতী ঝাঁপ দিয়েছিল দুরন্ত ট্রেনের সামনে।
সুধাংশু নামে এক রেলকুলি ছুটে গিয়ে
পরম মমতায় বাঁচিয়ে দিয়েছিল তাকে।
দারুণ কৃতজ্ঞতায় কলাবতী জীবনের সর্বস্ব দায়ভার 
সঁপে দিয়েছিল সুধাংশুর হাতে।
মোক্ষম সুযোগ বুঝে একদিন সেও পালিয়ে গেল 
পৃথিবীর সমুদয় দেনাপাওনার হিসেব চুকিয়ে।

অচ্ছুত পল্লিতে কলাবতী এখন দস্তুর মতন দেহপসারিনী
কাউকে চিনতে আর তার বেগ পেতে হয়না,
ভালো-মন্দ সে বলে দিতে পারে খদ্দেরের বুকের ঘামের গন্ধ শুঁকে।

একদিন কলাবতীকে দেখতে ছুটে গেলাম বিমলা মাসির ঘরে
জিজ্ঞেস করলাম- কেমন আছে কলাবতী?
মাসি কোনো উত্তর দিলো না।
পুনরায় জিজ্ঞেস করলে বিরক্ত হয়ে বলল- কলাবতী আর নেই এখানে,
গলায় কলসি বেঁধে অভাগী জলে ডুবে মরেছে।
কত স্বাভাবিক গলায় কথাগুলো বলে গেলো মাসি,
যেন রাস্তার ধারের বেওয়ারিশ কুকুর সম্পর্কে জানতে চেয়েছি। 

বিষন্ন মনে আকাশের দিকে তাকালাম
অজস্র মেঘের পাহাড় সমস্ত আকাশ ব্যাপ্ত হয়ে আছে,
আর সে মেঘের পাহাড়ে লুকোচুরি খেলছে নবমীর চাঁদ।

ফেরার পথে ঝাপসা চোখে দূরে দেখলামÑ
নদীর বুকে দাপাদাপি করছে একজোড়া সোনালি ডানার গাঙ চিল,
বুকের ভিতরটা গভীর বেদনায় কেমন হু হু করে উঠলো।

হয়তো কলাবতীর মৃত্যুতে এ বিশ্বচরাচরে কারো কিছু এসে যাবে না
হয়ত তার কষ্টকথা হাসি হয়ে উড়ে বেড়াবে সুসভ্য নাগরিক বাতাসে,
কেবল আজন্ম সংসারলোভী অন্তহীন উদ্বাস্তু আমি-
আকণ্ঠ জন্মবেদনা নিয়ে হেঁটে বেড়াবো পরিবর্তনহীন সেই পুরনো পথে।

শেখ মোহাম্মদ হাসানূর কবীর। বাংলাদেশ