অটোয়া, সোমবার ২৩ মে, ২০২২
মৃত্যুখিদে - রূপালী মান্না

পরিচ্ছেদ -এক
     মা আমার বড্ড খিদে পেয়েছে, মা আমার বড্ড জল তেষ্টা পেয়েছে। চোখের নোনতা জল গাল বেয়ে নামতে নামতে তেষ্টায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বছর আটেকের তিয়াশার। অসহায় মা অনিমা বলে আর একটু কষ্ট কর মা, আর কয়েক পা হাঁটলেই পৌঁছে যাবো। মা অনিমা তিয়াশার বাবার উদ্যেশ্যে বলে, কই গো, একটু দেখোনা, কোথায় একটু জল পাও কিনা! বোতলে তো আর এক ফোঁটাও জল নেই ..মেয়েটা তেষ্টায় ছটফট করছে। তিয়াশার বাবা সঞ্জয় বলে এতো রাতে ফাঁকা অন্ধকার মাঠের মধ্যে দিয়ে রাস্তায় কোথায় জল পাই বলো তো? বোতলের জলটা কি হলো? অনিমা বলে আমি জলটা খেতে যাচ্ছিলাম এই ছোট্ট বাবানটা পা ছুরলো আর জলটা পড়ে গেল। খাবার ও তো প্রায় শেষের দিকে, সকাল না হওয়া পর্যন্ত ছেলে-মেয়ে দুটোকে নিয়ে কি করবো গো? সঞ্জয় বলে সকাল হলেই কি খাবার পাবো? দোকান পাঠ তো সব বন্ধ।
     মা আমার বড্ড খিদে পেয়েছে মা। আমি আর হাঁটতে পারছি না। অনিমা বলে কই গো মেয়েটাকে একটু কোলে নাও। আর কাছাকাছি একটু বসার মতো জায়গা দেখতে পেলে একটু থামব। রাতটুকু একটু চোখ না বুজলে আর পারব না গো। সঞ্জয় বলে শিবানদের দলটা অনেকটা এগিয়ে গেছে। অনিমা বলে ওদের সাথে তো কচিকাচা নেই, ওরা একটুও দাঁড়াতে পারছে না, একটু আস্তে হাঁটতে পারছে না। ওরাই তো বললো চল সবাই মিলে হেঁটে পৌঁছে যাবো যা হোক করে। সঞ্জয় বলে -ওদের কি দোষ বলো এই সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা এতো বেশি বলেই মৃত্যুভয়টা এতো প্রবল।

পরিচ্ছেদ -দুই
     মা আমার বড্ড খিদে পেয়েছে, খুব জল তেষ্টা পেয়েছে। বদমাশ ভাইটার জন্যই তো জলটা পড়ে গেল। মা অনিমা বলে আচ্ছা মা চুপ করো, এমনি বলতে নেই।
     বছর দুয়েকের বাবান দিদির দিকে তাকিয়ে মিটমিট  করে হাসতে থাকে। আঙুল বাড়িয়ে দিদির চুল ধরে টানতে যায়। ছোট্ট শিশুটি জানেই না সে কি পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আগামীর সকালের সূর্য সে আদৌ দেখতে পাবে কিনা। দুধের বালক বাবান এর একমুখ সরল হাসি দেখে সঞ্জয় এর দুচোখ জলে ভরে ওঠে।
     তিয়াশা হঠাত্‍ করে বলে ওঠে বাবা ওই যে খালটাতে জল চিকচিক করছে। ওটাই একটু বোতলে ভরে এনে দাও না। তিয়াশাকে কোল থেকে নামিয়ে রাস্তার ধারের খাল থেকে জল ভরে আনে সঞ্জয়।  প্যাকেটের অবশিষ্ট চিরেভাজা, বিস্কুট, জলটুকু ছেলেমেয়ের মুখে তুলে দেয় মা অনিমা। ছোট্ট বাবান এর মুখে তখনও সেই অমলিন হাসি আর দিদির কাছ থেকে খাবার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা। কোনো রকমে সামান্য পেট ভরিয়ে রাস্তার একপাশে একটা গাছের নিচে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে মা অনিমা। সঞ্জয়ের মনে পড়তে থাকে-
     গত কয়েকদিন আগেও তারা অভাবের সংসারে হাসিখুশিতে কাটিয়েছে। মুর্শিদাবাদের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে স্ত্রী অনিমা ও বছর চারেকের  তিয়াশাকে নিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য বিহারের একটা ইঁটভাটায় শ্রমিকের কাজ করে সে। ভাটার মালিক ভাটাতেই আধপোড়া, ভাঙা ভাঙা ইঁট দিয়ে লাইন দিয়ে প্রায় খান পঞ্চাশ খুপরি বানিয়ে দেয়। স্বল্প পারিশ্রমিকেও সন্তুষ্ট স্ত্রী অনিমা ও মেয়ে তিয়াশাকে নিয়ে ছোট্ট খুপরিতেই তাদের সংসার।
     তারপর অনিমার কোল আলো করে পুত্রসন্তান ছোট্ট বাবান এর জন্ম। বাবান এর বয়স এখন দুই বছর প্রায়। হাসিখুশি বই এর ছবি দেখিয়ে দেখিয়ে দিদি তিয়াশা তাকে অ -আ চেনায়। ছোট্ট বাবান কখনও চুল ধরে টানে কখনও গালে মিষ্টি হামি  দেয় কখনও একসাথে দুজনে চেঁচিয়ে ওঠে। সন্ধ্যা হলে উনুনে রান্না করে, উনুনের পাশে বসে সঞ্জয় জ্বাল দিয়ে দেয় আর সুখ- দুঃখের গল্প করে। এইভাবেই কাটছিল তাদের সুখী সংসার।

পরিচ্ছেদ - তিন 
     শুক্রবার শিবান এসে খবর দেয়, সঞ্জয় জানিস, সবাই নাকি বলছে কি একটা রোগ এসেছে দেশে করোনা ভাইরাস নামে। অন্য অন্য দেশে নাকি অনেক লোক মারা গেছে। নিতাই ওর বড় মোবাইলে দেখেছে। রবিবার নাকি মোদী সরকার জনতা কারফিউ ডেকেছে। মানে রবিবার সব বন্ধ থাকবে। কেউ বাড়ি থেকে বেড়বে না। সঞ্জয় বলে হ্যাঁ আমিও শুনলাম।
     রবিবার সন্ধ্যায় ভাটার মালিক এসে বলে  সোমবার সাম পাঁচ বাজনেকে বাদ সে একিশ দিন লকডাউন রেহেগা। হাম কুছ রুপাইয়া অগ্রিম দে দেংগে, লেকিন জাদা নেহি পায়েন্গ্গে। আপাতত আপ লোগোকা কুছদিন চ্যালেগা। লেকিন ইয়ে জো টাইম চ্যালরাহা হে আপলোক কুছদিনও কে লিয়ে ঘ্যার মে চ্যালা যাইয়ে।
     ভাটার কিছু শ্রমিক ওখানেই থেকে যায়। আর কিছু শ্রমিক যাদের কাছাকাছি বাড়ি তারা বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়।
     শিবান বলে  -সঞ্জয় চল আমরাও বাড়ি ফিরে যাই। বাড়ি ফিরে গেলে তবুও অনন্ত শাক ভাত খেয়ে বাঁচবো। ওখানে দাদা ভাইরা তো আছে। না খেয়ে মরব না। এখন যদি এতো দিন বন্ধ থাকে চলবে কি করে, হাতে যা টাকা পয়সা আছে তাতে না হয় আট - দশ দিন চলবে কিন্তু তারপর?ফিরে চল সঞ্জয়, ফিরে চল। দুর্দিন কেটে গেলে  আসবো আবার।
     সঞ্জয় বলে - বলছিস? কিন্তু ফিরব কিভাবে? বাস ট্রেন তো চলবে না। শিবান বলে বিকেল পাঁচটার পর থেকে লকডাউন। ততক্ষনে আমরা কাছাকাছি পৌঁছে যাবো। তারপর কিছু একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে।  এখানে থাকলে না খেয়ে মরব ভাই, বলি শোন।
সঞ্জয় বলে আর কে কে যাবে দেখ। দীপ, শুভ, অমিত ওরা যাবে কি দেখ, ওদের তো পাশের গ্রামেই বাড়ি। ওদেরকে আমি বলছি, তোরা রান্না বান্না করে পেট পুরে দুটো খেয়ে নে, ছেলেমেয়ে দুটোকে খাইয়ে নে। জামাকাপড় দু- একটা নে কাজ চালাবার মতো। আচ্ছা আজ তাহলে আমি আসি। ওই কথায় রইলো। কাল খুব সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়বো।

পরিচ্ছেদ -চার
     পরদিন সকাল ছটার সময়  গ্রামে ফেরার উদ্যেশ্যে রওনা হয় দীপ, শুভ, অমিত, শিবান  সঞ্জয় ও তার পরিবার।
     ছটা চল্লিশ এর পাটনা থেকে অন্ডাল এর তুফান এক্সপ্রেশ ধরে তাড়া অন্ডাল এসে পৌঁছায় । ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ছয়টা। অন্ডাল থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ। কোনো টোটো, অটো, ট্যাক্সি কিছুই পাওয়া যায় না। অন্ডাল থেকে মুর্শিদাবাদ একশো আটচল্লিশ কিমির পথ, হেঁটে প্রায় তিরিশ ঘন্টা। দীপ মোবাইলে দেখে বলে।  এই পথ  তারা হেঁটে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়। হাঁটতে হাঁটতে ছেলেপিলে নিয়ে পিছিয়ে পড়ে সঞ্জয়। এই সমস্ত কথা ভাবতে ভাবতেই কিছুক্ষণ চোখ বুজলেও পাখির ডাকে সূর্যের আলোয় ঘুম ভাঙে।
    খালের জলে সবাই মিলে চোখ মুখ ধুয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে। কিছুটা পথ হেঁটে একটা গ্রাম পড়ে। দোকান পাঠ সব বন্ধ। সেখানেই দু- একটি বাড়ির দরজায় খাবার চায় সঞ্জয়। কিন্তু কোথা থেকে আসছে এরা, করোনা আক্রান্ত কিনা এই ভেবে বাড়ির লোকজন দরজা বন্ধ করে দেয়।
    সঞ্জয়সহ তার পরিবার তখন ক্লান্ত, রিক্ত হয়ে সর্বহারার মতো পথ হাঁটতে থাকে। কিমি চার-পাঁচ গিয়ে শিবান ও তাদের দল টার দেখা পায়। শিবান বলে তোরা যে কখন পিছিয়ে পড়েছিস বুঝতেই পারিনি। তারপর পিছন ফিরে দেখি তোরা নেই। তোর ফোনটাও লাগছে না। সঞ্জয় বলে হ্যাঁ রে কোথায় ফোনটা পড়ে গেছে মনে হয়। খুঁজে পাচ্ছি না।
    সঞ্জয়ের স্ত্রী অনিমা বলে -কইগো বাবান এর জন্য একটু দুধের ব্যবস্থা করো না। কোথাও কাছে পিঠে যদি বাজার পাওয়া যায়। 
     দুপুর প্রায় একটা। চৈত্রের কাঠফাটা রোদ। গ্রাম শহর নগর সব গৃহবন্দি। কোন এক ভাইরাস যেন সকল দেশবাসীকে গৃহবন্দী করে ফেলেছে। দলের মধ্যেই শুভ আর দীপ একটু পড়াশোনা জানা যুবক। শুভ ঘন্টায় ঘন্টায় মোবাইলে একবার মৃত্যুমিছিলের আপডেট দেয়। আর একবার করে আর কতটা পথ হাঁটতে হবে তা বলে দেয়। দীপ বলে বিদেশ থেকে প্রবাসীরা এলো  বিমানে করে, শরীরে ভাইরাস বয়ে নিয়ে এলো। কিছুদিন হোম কোয়ান্টাইনে থাকবে রাজকীয় ভাবে। তারপর পরিস্থিতি ঠিক হলে আবার বিদেশ চলে যাবে কোটি কোটি টাকা ইনকাম করতে। আর আমাদের মতো ভিনরাজ্যে দুটো পেটের ভাতের জন্য যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার জন্য সরকার ব্যবস্থা নিতে পারলো না? আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষরাই তো আজ কোটি কোটি টাকার প্রাসাদ তৈরি করেছি ওদের জন্য।


পরিচ্ছেদ -পাঁচ
     অনিমা বলে ওঠে ওগো তোমরা কিছু একটা ব্যবস্থা করো না গো। আমার বাবান কেমন যেন নেতিয়ে পড়ছে। ওর জন্য একটু দুধ বা কিছুর ব্যবস্থা করো না গো।
     শিবান বলে তাড়াতাড়ি পা চালাও। কিছুটা গিয়েই  একটা বাজার পড়বে। এক আধটা দোকান ঠিকই খোলা থাকবে।
     বাবার কাঁধে বসে থাকা তিয়াশা হঠাত্‍ করে চেঁচিয়ে ওঠে, মা ভাই কেমন করছে, কেমন বড় বড় করে তাকিয়ে ঢোক গিলছে।
     মা অনিমা বাবানের মাথাটা কাঁধ থেকে কোলে নামিয়ে নেয়, রাস্তার মাঝখানে ধপাস করে বসে পড়ে। সবাই মিলে বাবানের মুখে চোখে জল ছিটাতে থাকে। চোখ গুলোকে বড় বড় করে পাকিয়ে কয়েক ফোঁটা জল খেয়ে হেঁচকি তুলে  মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।   চৈত্র মাসের ভরা দুপুরে খাঁ খাঁ রোদে অনিমা মৃত বাবানকে কোলে নিয়ে পাগলিনীর মতো রাস্তার এ মাথা থেকে ও মাথা ছুটতে থাকে। অবশেষে সঞ্জয়ের পায়ে লুটিয়ে পড়ে বলে ওগো বাবানের জন্য একটু দুধ আনো না গো।
সবাই হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে।
     সঞ্জয় বুক ভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত স্বরে  বলে বাবানের খিদে পায়নি অনিমা। করোনা  মহামারির যে বড্ড খিদে পেয়েছে। তাই এ দেশ থেকে ও দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছে নরখাদক হয়ে। ওর যে মৃত্যুখিদে পেয়েছে, ওর যে মৃত্যুখিদে পেয়েছে।
হা হা হা ............

রূপালী মান্না
ইসবপুর, পূর্ব বর্ধমান
পশ্চিমবঙ্গ , ইন্ডিয়া