অটোয়া, শনিবার ২১ মে, ২০২২
পাহাড়ি কন্যা - মোবারক মন্ডল

2012 সালের আগস্ট মাস। লালগোলা কলেজে থার্ড ইয়ার পড়ছি।। নতুন হোস্টেলে থাকি। ঠিক হল, আমরা হোস্টেলের ছেলেরা দার্জিলিং ট্রেকিং এ যাবো। গাইড হলেন ইতিহাস ডিপার্টমেন্টের তরুণ সুদর্শন অধ্যাপক তথা আমাদের প্রিয় রামজোত্যি বন্দ্যোপাধ্যায়, এবং শান্তুনু দা। শান্তুনুদার পরিচয় আরেকদিন দেবো। 

টুরিস্ট বাসে শিলিগুড়ি পৌঁছে, বাস বদল। খাওয়া দাওয়া সেরে আমরা উঠলাম লম্বা লম্বা কাঁচওয়ালা ছোট ছোট দুই বাসে। ট্যুরিস্ট বাসে, তেমন কিছু হয় নি। তখন দুপুর পেরিয়ে বিকেল। শান্তুনুদাকে সামনের উঁচু বিশাল কালো মেঘের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম, দাদা ওই দেখ, খুব মেঘ উঠেছে আকাশে! শান্তুনু দা এমন করে আমার দিকে তাকালো যেন মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেলেছি। গাধা! ওটাই দার্জিলিং! আমি তো হাঁ! ওই মেঘের মাথায় উঠবো আমরা! আমার তো ভয়ে গা হাত কেমন করতে লাগলো!

বমি করার সুবিধার জন্য বাসের বামদিকের জানালার ধারে আমাকে বসতে দেওয়া হলো। শিলিগুড়ি পেরিয়ে দুই ধারে সবুজ গালিচার মতো চা বাগানের মধ্য যাবার সময় সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। চা বাগানের সবুজ গালিচার উপর বিকেলের সোনারোদ পড়ে অপরূপ লাবণ্যময় দেখাচ্ছিল। সাথে কুমারশানুর রোমান্টিক গান। সবকিছু মিলিয়ে এক নরম স্নিগ্ধতায় ভালোলাগায় মনটা ভরে উঠেছিল। আস্তে আস্তে আবহাওয়া ঠান্ডা হতে শুরু করলো। এবার পাহাড়ে উঠছি। হঠাৎ চোখ পড়লো বামদিকে। সবুজে ভরা গভীর খাতের নিচে সরু ধারার ঝোরা। ভালো লাগতে লাগতে বাসের গা বরাবর নিচের দিকে তাকাতেই বুক শুকিয়ে গেল। গভীর খাত! তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম,মনে নেই। ‘ওঠ ওঠ পৌঁছে গেছি’, শব্দে জেগে উঠলাম। টিমটিম আলো অন্ধকারে নামলাম মনভঞ্জন নামক ছোট্ট জনপদে। মনভঞ্জন হল সান্দ্যাকফু ট্রেকিং এর বেসক্যাম্প। সবঘর বুক হয়ে যাওয়ায় বাড়ির মালিক আমাদেরকে ওদের শোবার ঘরে শুতে দিয়েছিল। কি নেই সেই ঘরে। আমরা অবাক। যদি চুরি করে কিছু নিই? আমাদের উপর এত বিশ্বাস! মামুন বলল, বোকা এরা নিজেরা খুব বিশ্বাসী তাই সকলকেই বিশ্বাস করে। বিজ্ঞের মতো বলল, আসলে পৃথিবীর সর্বত্র পাহাড়ী মানুষেরা সৎ, বিশ্বাসী, ও কম অপরাধ প্রবন হয়। গরম গরম ডিম আলু ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকাল সকাল উঠে পড়লাম। বেরিয়ে এলাম হোমস্টে থেকে। সূর্য উঠছে হোমস্টের সামনেই এক গভীর উপত্যকা থেকে। । রডেনড্রন আর ওক গাছের বন দুই দিকের উপত্যকা থেকে ঢালু হয়ে নীচে নেমে গেছে। মিষ্টি নরম রোদে চারিদিক ঝলমলিয়ে উঠলো। বামদিকের রোডের পাশে এক উঁচু টিলায় দাঁড়ালাম। দেখছিলাম, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছাই রঙের কুয়াশা আলো ঝলমল সবকিছুকে ঢেকে দিতে লাগলো। আমাকেও এসে ঢেকে দিল। আমার জীবনে প্রথম মেঘ দর্শন। ওটা কুয়াশা নয় মেঘ। মনে হচ্ছিল, আমি যেন অন্য গ্রহে এসেছি।

এদিকে শুরু হয়েছে প্রাতরাশ করে ট্রেক করার প্রস্তুতি। গাইড নেওয়া হয়ে গেছে। সকাল 9 টায় শুরু হল টাম্বলিং উদ্দেশ্যে যাত্রা। গাইডের দেখানো পাহাড়ী পথ বেয়ে। পায়ে হেঁটে। মোট বারো কিমি রাস্তা। কিন্তু পুরোটাই চড়াই। সঙ্গে নিয়েছিলাম কাটা ত্রিপল, প্রচুর লজেন্স। ট্রেকিং এর শুরুতেই মন খারাপ করে দিয়েছিল কিছু শিশু। উস্কোখুস্কো সোনালী চুলের গোলাপি গাল ওয়ালা বাচ্চাগুলো ছেঁড়া মলিন সোয়েটার পরে ভিক্ষা চাইছিল। বুঝতে পারছিলাম, সৌন্দর্যের আড়ালে যন্ত্রনা লুকিয়ে আছে।

আমাদের গ্রুপে ছিল, রাম জোত্যি স্যার, সাইদুর রহমান , সিরাজুল আর মামুন এবং আরও অনেকে স্থানীয়দের জন্য চলার পথ তৈরী করা হয়েছে পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ি তৈরি করে। দেখি সিঁড়ি উঠতেই আছে। এই ভাবছি, ওই মাথায় গিয়ে সিঁড়ি শেষ। কিন্তু তা নয়। ওই মাথায় গিয়ে আবার দেখছি সামনে বিশাল লম্বা সিঁড়ি। পিছন দিকে গড়িয়ে একবার পড়লে আর কোনদিন ওঠা যাবে না। আবহাওয়া ছিল মজার। নরম রোদে স্নান করতে করতে মাঝে মধ্যেই কুয়াশার মত ঘন মেঘা এসে আমাদের ভিজিয়ে দিচ্ছিল। এই মেঘ বৃষ্টি, ওই ঝলমলে রোদ। স্যার বললেন, তাড়াহুড়া করার দরকার নেই। সন্ধ্যার আগে পৌঁছলেই হলো।

কিছুটা যাওয়ার পর দেখলাম গোল গোল পাথরে তৈরী এবড়ো থেবড়ো ঢালু পথ। স্যার বললেন, এটা দিয়ে ট্রেকার চলে। বিশ্বাস করলাম না। কয়েক মিনিট পরে শুনতে পাই, গোঁ গোঁ আওয়াজ। পিছন থেকে উঠে আসছে এক ট্রেকার। তাতে তিন বিদেশী, বস্তা, টিন ইত্যাদি। কীভাবে ওরা বসে আছে ভেবে পেলাম না। স্যার বললেন, ওটা ট্রেকার নয়, ল্যান্ড রোভার।

চার কিমি মতো যাওয়ার পর রাস্তার বামদিকে এক দরিদ্র কুটির চোখে পড়লো। বাইরে এক গাই বাঁধা আছে। তার পাশে হরেক কিসিমের ফুল টবে ফুটে আছে। স্যার বললেন, চলো দেখি চা পাওয়া যায় কিনা। যতই গরীব হোক এখানে চা পাওয়া যায়। বাড়িতে ঢুকে অবাক কান্ড। কি সুন্দর বাড়ির অভ্যন্তর। বাঁশ এবং কাঠ দিয়ে তৈরি খুব রুচিকর ভাবে পরিপাটি করে গুছানো ঘর। মনে হল, গরীব হলেও এদের মনে শান্তি ও সৌন্দর্য্য আছে।

খুব আপ্যায়ন করে বসতে দিলেন এক মধ্যবয়সী মহিলা। বেশ গোলগাল। হাসিখুশি। উনুনের পাশে সতেরো আঠেরোর স্কার্ট পরা এক মেয়ে। বাদামি চুল। তাকিয়ে ছিলাম। ও আমাদের দিকে তাকাতেই চোখে চোখ পড়লো। আমি তাকিয়েই রইলাম। খুব মিষ্টি। গোলাপি গালের লম্বাটে মুখ। একজোড়া উজ্জ্বল চোখ। সুশ্রী। মেয়েটির সাথে আবার চোখাচোখি হল। ও বুঝলো আমি ইচ্ছে করেই ওর দিকে তাকিয়ে। মনে হচ্ছিল ওর দিকে তাকিয়েই থাকি। আসলে পাহাড়ি কন্যারা বরাবরই মিষ্টি ও বিনম্র স্বভাবের হয়। ও চা পরিবেশন করলো, মুখ নিচু করে। এত সুস্বাদু চা এ জীবনে আর কোনদিন কোথাও খাই নি।

বেরিয়ে এলাম। শুরু হল খাড়া পাহাড়ে ওঠা। লম্বা লম্বা মোটা গুড়িওয়ালা রডেনড্রন, ধূপি গাছে ঢাকা উপত্যকার পাশ দিয়ে যাবার সময় ফার্ন ঘাসে মোড়া মাটির দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল সভ্যতা এখানে এসে থমকে গেছে। প্রকৃতি এখানে নিস্তব্ধ। যেন নিজের নিশ্বাস প্রশ্বাস শুনতে পাচ্ছি। হঠাৎ এক অচেনা বুনো প্রাণীর আকাশ ভেদী কর্কশ চিৎকারে ভিতরের কলজেটাকেও শুকিয়ে দিল। কাষ্ঠহাসি হেসে স্যার বলল, চিৎকার করে জানোয়ারটা কারুর খাবার হয়ে গেল। বিকেল তিনটের সময় পৌঁছলাম টংলুতে। এখানকার সানরাইজ ভিউ পয়েন্ট বিখ্যাত। এখানে আছে এক হোমস্টে। ওখানে আমরা চা খাবার জন্য দাঁড়ালাম। ওই হোম স্টের বারান্দার মতো ফাঁকা জায়গাটায় চেয়ার টেবিলে বসে এক তরুণী বিদেশিনী ছবি আঁকছে। পায়ে, গায়ে জিন্স, খালি মাথা থেকে যত্নহীন এক গোছা চুল পিছনে ঝুলছে। মুখটা নিচের দিকে নামানো। এক মনে ছবি আঁকছে। সামনের উপত্যকা তাঁর ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে উঠছে। আমরা কথা বললাম, ওর চারপাশে ঘুরলাম। একটিবারও মুখ তুলে আমাদের দিকে চাইলো না।

আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম টাম্বলিং এর উদ্দেশ্যে। বামদিকের খাতে এক বাঁকে এক ল্যান্ড রোভার চিৎ হয়ে বিকেলের রোদ গায়ে মাখছে। স্যার বলল, দেখলে আমাদের মানুষই মনে করল করলো না মেয়েটা। একেই বলে নিজ কাজের প্রতি প্যাশন। একেই বলে একাগ্রতা। আমরা স্যারের কথায় মুচকি হাসলাম। হ্যান্ডসাম স্যারের অহং এ লেগেছে!

সূর্যাস্ত হবার ঠিক আগে পৌঁছলাম টাম্বলিং। সিঙ্গালীলা পর্বতমালার একচুড়ায় অবস্থিত কয়েকটি বাড়ি, আর হোম স্টে নিয়ে গঠিত টাম্বলিং গ্রাম। আমাদের বহু আগে আমাদের দলের বাকী সদস্যরা পৌঁছে গেছে। আমরা তিনজন বিশ্রাম নেওয়ার আগে এখানকার উঁচু টিলাটায় উঠলাম সূর্যাস্ত দেখবো বলে। ম্রিয়মান সূর্য যেন মন খারাপ করে নিচের উপত্যকার বনের ওই পারে কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ে ঢুকে গেল। খিদে, ঠান্ডা আর ক্লান্তিতে কাহিল হয়ে পড়েছিলাম। রাতে পেলাম গরম গরম খিচুড়ি। ঠেসে খেলাম আলুর ভর্তা দিয়ে। যেন অমৃত। রাতে গাঢ় ঘুম হলো না। পাতলা ঘুমের মাঝে শুনলাম কত রকমের নাম না জানা প্রাণীর হরেক রকমের আওয়াজ।

সূর্য ওঠার আগেই চললাম ওই ঘাসে ঢাকা টিলাটার পাশে। দেখি স্থানীয় এক দরিদ্র বৃদ্ধা ওখানে বসে। ফর্সা, কোঁচকানো মুখের চামড়া। তাকিয়ে আছে সামনে নিচের উপত্যকায় গভীর গহন অরণ্য পানে। অরণ্য, পাহাড়ের শ্রেণী পেরিয়ে সামনেই ঘুমিয়ে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বত শ্রেণী। তারপর নিচের কুয়াশায় ঢাকা উপত্যকা উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো অপরূপা কাঞ্চনজঙ্ঘার বিশাল পর্বত শ্রেণী। ঘাড় উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গ প্রথম কমলা রঙে রাঙা হয়ে উঠলো। তারপর শুরু হলো আলোর খেলা। কমলা আলোয় রাঙা কাঞ্চনজঙ্ঘার রঙ বদলাতে বদলাতে গোটা বিশ্ব চরাচরের ঘুম ভেঙে গেল। এটা ছিল আসলে কাঠের বেড়া দেওয়া এটা এক ভিউপয়েন্ট। কাইসুল আর আমি বসলাম। গাইডের কাছে শুনলাম, ওই বৃদ্ধা নাকি রোজ সকালে ওই পাথরের উপর বসে ওই সামনের বনে হারিয়ে যাওয়া ওর ছেলের ফেরার আশায়।

মনোভঞ্জন ফিরলাম খুব তাড়াতাড়ি। মাত্র তিনঘন্টায়। ভেবেছিলাম ফেরার পথে রাস্তার ধারের ওই কুটিরে সেই গোলগাল অষ্টাদশী মহিলার হাতে চা খাবো, এবং ওই অষ্টাদশী মেয়েকে আর একটিবার দেখবো। কিন্তু ফেরার সময় ওই কুটির আর চোখে পড়ে নি। কোন রাস্তায় এসেছিলাম কি জানি! খুব আফসোস হচ্ছিল।

দুই তিনখানা লাইনের বাসে ভাগা ভাগি করে উঠলাম। এবার দার্জিলিং শহর। তারপর শিলিগুড়ি। ড্রাইভারের পিছনের আসনে ডানদিকের জানালা ঘেঁষে বসলাম। পাহাড় নিয়ে ভয় কেটে গেছে। বাম দিকে চোখ ফেরাতেই চোখ আটকে গেল। আরে ওই চা খাওয়া কুটিরের মেয়েটি না? গায়ে জিন্সের জ্যাকেট, পরনে জিন্স। আমার দিকে মেয়েটা তাকায় না। অবশেষে মেয়ে তাকাল। চিনতে পারলো। মুচকি হাসলো। আমিও হাসলাম। কিন্তু লজ্জায়, কি ভয়ে আমি কথা বলতে পারলাম না। ওর কাছে উঠেও গেলাম না। পরস্পরের দিকে লুকিয়ে তাকাতে গিয়ে ধরা পড়ে যাচ্ছি। ধরা পড়ে মুচকি সলজ্জ হাসি। কিন্তু কথা হোল না। না হোক। আমার পৃথিবী তখন আলোয় ভরা। উষ্ণ। মিনিট 40 পর বাস ধীর হতেই মেয়েটি ব্যাগ গুছিয়ে উঠলো। আমার পৃথিবী মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল। আমি হা করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। মেয়েটি একবারও তাকালো না। নেমে গেল। সব মিথ্যে! নিজেকে বোকা মনে হচ্ছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল, নেমে যাই। পারলাম না। পাথরের মতো বসে থাকলাম। অদ্ভুতভাবে প্রায়ই অচেনা মেয়েটিকে খুব কাছের মনে হয়েছিল। ভালোলাগা কিছু হারানোর কষ্টে, এবং নিজের বোকামিতে নিজেকে আরও একবার ইডিয়ট মনে হচ্ছিল। বাস কিছুক্ষন দাঁড়ালো। মন খারাপ করে জানালায় মুখ বার করে তাকাচ্ছি। হঠাৎ দেখি, মেয়েটি পিছন ফিরে বাসের ডানদিকে এলো। ও হাত নাড়লো। আমিও হাত নাড়লাম। ও এগিয়ে এলো। এই সময় বাসটি চলতে শুরু করলো। আমি আমার মাথার বাঁশের হ্যাটটা ছুঁড়ে দিলাম ওর দিকে। বাস চলতে শুরু করলো। আড়াল হওয়ার আগে পর্যন্ত ওকে আমি দেখছিলাম। ও টুপি হাতে দাঁড়িয়ে হাত নাড়াতে থাকলো। আমার বাস কিংবা পৃথিবী ঘন কুয়াশার মেঘে ঢুকে গেল। 

মোবারক মন্ডল
করিমপুর
পশ্চিমবঙ্গ 
ভারত