অটোয়া, মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর, ২০২০
কোন এক দুপুরে এক বিরহীর স্মৃতিপাশে – চিরঞ্জীব সরকার

ক্সবাজার জেলার টেকনাফ থানায় রয়েছে মাথিনের কূপ যেটা কিনা স্মরণে নিয়ে আসে বিয়োগান্তক এক প্রেম কাহিনীকে। অমর কথা সাহিতিৎক শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায় শ্রীকান্ত উপন্যাসে লিখেছিলেন ’বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না,দূরেও ঠেলিয়া দেয়’। আবার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পোস্টমাস্টার নামক ছোটগল্পে রতন নামক এক গ্রাম্য বালিকার কথা আমরা জানি যাকে কিনা একবুক ব্যাথা নিয়ে বিদায় দিতে হয়েছিল শহর থেকে চাকুরী করতে আসা পোস্টমাস্টারকে। আলোচ্য মাথিন প্রত্যক্ষ করতে পারেনি কখন ভালবাসার মানুষটি চলে গেল চিরতরে। এ বেদনার শেল শরবিদ্ধ পাখিকে যেমন রক্তক্ষরনের যন্ত্রনায় নিমজ্জিত করে, মাথিনের হৃদয়কেও তেমনি ধীরাজের বিদায়ে ছিন্নভিন্ন করেছিল। মাথিন আর বাঁচতে পারেনি বিরহের দাবানলে। এ অনলে দাউ দাউ করে দগ্ধ হয়েছে তার অন্তরে থাকা নীরবে প্রিয় মানুষটির জন্য তৈরি হওয়া ভালবাসার সৌধটি।
কলকাতার সুদর্শন যুবক ধীরাজ ভট্টাচার্য পুলিশ কর্মকর্তা হিসাবে চাকুরী করতে আসেন টেকনাফ থানায় গত শতাব্দীর প্রথমদিকে। সে বৃটিশ আমলের টেকনাফ আর বর্তমানের টেকনাফ এক নহে। তখন এলাকাটি ছিল জঙ্গলাকীর্ন দূর্গম একটি এলাকা। থানা কম্পাউন্ডের ভিতরেই ছিল পাতকুয়াটি। এখানেই প্রতিসকালে পানি নিতে আসত সহচরী পরিবেস্টিত রাখাইন জমিদার ওয়ান থিনের সু্ন্দরী লাস্যময়ী কন্যা মাথিন। ধীরাজেরও এখানে অখন্ড অবসর। তার ঘুম ভাঙ্গে পাখির কলকাকলিতে, এরপর শুনতে পায় একদল তরুনীর হাস্যরসে ভরা জল তোলার বিচিত্রমধুর কোলাহল থানা কম্পাউন্ডে থাকা পাতকুয়াটিকে কেন্দ্র করে। চেয়ারটা টেনে বসে ব্যস্তহীন যুবক পুলিশ কর্মকর্তা উপভোগ করেন মাথিন ও তার সখীদের কুয়া থেকে পানি তোলার এ সহজ সরল জীবন প্রবাহমনতার  অনবদ্য ছন্দ ও খুনসুটি। এভাবেই চোখাচোখি হয় মাথিন ও ধীরাজের। ভালবেসে ফেলে দুজন দুজনকে। মনের দেয়া নেয়া ঘটে যায় মনেরি অজান্তে। দুজনেই প্রতীক্ষারত থাকে কখন হবে চোখাচোখি, কখন হবে ভালবাসার এতটুকু  বাক্য বিনিময়। মাথিন সকালের একটু আগেই পাতকুয়াটির কাছে আসত আর ধীরাজও খুব ভোরে উঠে চেয়ে থাকত কখন আসবে মাথিন। এভাবেই কাটছিল তাদের জীবন। এ যেন প্রকৃতিকন্যা মাথিনের সাথে যুবক ধীরাজের হৃদয় বিনিময়ের অনাবিল এক কাব্যমালা। ঠিক হয় তারা বিবাহবন্ধনে আবব্ধ হবে।
দুজনের জীবনে যেন আনন্দের স্রোতধারা বয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এ পৃথিবীতে সুখ ও আনন্দ বড়ই ক্ষনস্থায়ী। বিধি বাম হয়ে দাঁড়াল। ধীরাজের কাছে কলকাতা থেকে তার বাবার টেলিবার্তা  আসে জরুরীভাবে সে যেন এক মাসের ছুটি নিয়ে  কলকাতায় ফিরে আসে। ছুটি না পেলে  চাকুরীতে ইস্তফা দিয়েও তাকে কলকাতায় ফিরতে হবে এরকমি বার্তা ছিল ঐ টেলিগ্রামে। একটা সময় ছিল যখন জরুরী কোন বিষয় থাকলে মানুষ টেলিগ্রাম করত। কিন্তু সে দিন এখন গত। মোবাইল নামক যে জিনিসটি এখন পৃথিবীব্যাপী সবার হাতে হাতে তা একে একে বহু কিছুকে আমাদের জীবন থেকে সবার অগোচরে সরিয়ে দিয়েছে বিশেষ করে স্মার্ট ফোন। রেডিও, টেলিভিশন, টেলিগ্রা‌ম, টর্চলাইট, ক্যামেরা, টাইপরাইটার, চিঠি, সঙ্গীত, খেলাধুলা, শেয়ার বাজার, ইউটিউব, ফেসবু্‌ক, ইন্সটাগ্রাম সবকিছুই করা যায় সর্বগ্রাসী এ স্মার্ট ফোন দিয়ে। পদার্থবিজ্ঞানে ব্লাকহোল নামে একটা মহাজাগতিক বিষয়ের উল্লেখ আছে যার ভিতর কিছু প্রবেশ করলে আর বের হওয়া যায় না এমনকি আলোকতরঙ্গও। অর্থাৎ এটি সবকিছু তার ভিতরে শোষন করে নেয়। বর্তমানের মোবাইল ফোন হচ্ছে পৃথিবীর বুকে ব্লাকহোলের ভূমিকায় অবতীর্ন হওয়া সবকিছু গোগ্রাসে গিলে ফেলার আশ্চর্য এক যন্ত্র।
ধীরাজ মাথিনকে টেলিবার্তার ব্যাপারটা খুলে বলল। মাথিন কিছুতেই তাকে কলকাতায় যেতে দিবে না পাছে যদি ভালবাসার মানুষটিকে চিরতরে হারিয়ে ফেলে। ভালবাসার মানুষটি তাকে বোঝায় এ বিচ্ছেদ সাময়িক। মাসখানেক পরেই সে আবার টেকনাফে ফিরে আসবে। মাথিন নাছোড়বান্দা। যদি কলকাতাতে যেতেই হয় তবে যেন তাকেও  সে সঙ্গী করে। তৎকালীন সমাজের প্রেক্ষাপটে মাথিনকে নিয়ে হঠাৎ করে তার পরিবারের কাছে উপস্থিত হওয়াও ধীরাজের পক্ষে মনে হয় সম্ভবপর ছিল না। তাই সে আসলে পলায়নবৃ্ত্তি অবলম্বন করল। মাথিনকে না জানিয়েই কোন এক সন্ধ্যায় সে টেকনাফ হতে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওহনা হল। ধীরাজ আর টেকনাফে ফিরে আসেনি। পুলিশের চাকুরী ছেড়ে সিনেমার জগতে পা দেয় এবং বিভিন্ন ছবিতে অভিনয় করতে থাকেন। এদিকে ধীরাজের অনুস্থিতিতে মাথিন মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। সে নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দেয়। শত চেষ্টা করেও মাথিনকে কেউ অন্ন পানি গ্রহন করাতে সক্ষম হয়নি। একবুক বেদনা ও হাহাকার নিয়ে বিরহকাতর মাথিন মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। ধীরাজ ভট্টাচার্য পরবর্তীকালে ‘যখন পুলিশ ছিলাম’ ও ‘যখন নায়ক ছিলাম’ নামক দুটি বই লিখেন। ‘যখন পুলিশ ছিলাম’ বইটিতে মাথিনের সাথে তার যে সম্পর্কটা গড়ে উঠে তার কিছুটা উল্লেখ আছে। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক মাথিনের স্মৃতিবিজড়িত এ কুপটি দেখতে আসেন এক অমর প্রেমের আত্মত্যাগের নিদর্শন হিসাবে।
যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন একদিন নীলক্ষেতের পুরানো বইয়ের দোকান থেকে এ বইটি আমার হস্তগত হয়। বইটি পড়ার পর মনে হল এখনি চট্টগ্রামের বাসে উঠে কেন টেকনাফে চলে গিয়ে মাথিনের এ কুপটি ঘুরে আসছি না। দুহাজার সালে এক দুপুরে যাযাবরের মত ঠিকই চলে আসলাম এ কুপটির কাছে। আমি অনেকক্ষণ বসেছিলাম এখানে আর মনে মনে ভাবছিলাম হে সময়, তুমি বয়ে যাও নিরবধি, কিন্তু স্মৃতিপটে রেখে যাও কত বিচিত্র অনুভূতির একবুক জলরাশি।

চিরঞ্জীব সরকার। অটোয়া, কানাডা