অটোয়া, রবিবার ৪ জুন, ২০২৩
সুখের ছবি - সুনির্মল বসু

   র মা বলছিলেন, বড়দির বাড়ির ছাদের চেয়ে আমার টুকাইয়ের ফ্ল্যাটের ছাদ অনেক বড়। 
     শুনে শ্যামল বলল, নিউ আলিপুরে বড়দির নিজস্ব  বাড়ি, আর বারোয়ারী ফ্লাট এক হোল, আমি যদি হাওড়া ব্রিজের উপর দিয়ে হেঁটে যাই, তাহলে ব্রিজটা কি আমার হয়ে যাবে। 
     আসলে, ছেলেকে নিয়ে মায়ের এ এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অহংকার।
     এখন বিকেল বেলা। পাড়ার মোড়ে চক্রবর্তী দার চায়ের দোকান। গোলক বাবু কিছুক্ষণ আগে এখানে এসে বসেছেন। তিনি পেপার পড়ছিলেন। অবসরপ্রাপ্ত ট্রাম কোম্পানির কর্মচারী তিনি। একমাত্র মেয়ে মৌমিতার বিয়ে দিয়েছেন, চাকরি থাকতে থাকতেই। এখন পেনশনের টাকায় সংসার চলে। ঘরে অসুস্থ স্ত্রী বন্দনা দেবী। 
     গোলক বাবু সমবয়সীদের সঙ্গে মিশতে পারেন না, ইয়াং ছেলেরা তাঁর খুব কাছের মানুষ। আসলে, বড়দের সাংসারিক কচ কচানি তাঁর ভালো লাগেনা।

     খানিক বাদে মোটরসাইকেলে করে কালী ও দীপ্তেন এলো।
     কালী বলল, দাদা, কতক্ষন এসেছো,
     মিনিট দশেক, গোলক বাবু উত্তর দিল।
     দীপ্তেন বলল, দুনিয়াটা একেবারে পাল্টি খেয়ে গেল মাইরি,
     ক্যান, কি হইছে, গোলক বাবুর জিজ্ঞাসা।
     আরে দাদা, কাল পুকাইদার বিবাহ বার্ষিকী ছিল, পুকাইদা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে। লিখেছে, বউ আমার সম্পত্তি নয়, সম্পদ।
     কালী বলল, নিজে মহাসম্পদ নাহলে, এমন ভ্যালুয়েবল রিয়েলাইজেশন হয়না।
     দীপ্তেন সিগারেট ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিল। তারপর গোলক বাবুর দিকে প্যাকেটটা এগিয়ে দিলো।
     গোলক বাবু বললেন, আমি বিড়ি খাওয়া লোক, সিগারেট খামু না।
     কালী বলল, গোলকদা, আমাদের অনারে একদিন খেয়ে নিন।
     গোলকদা একটা সিগারেট ধরালেন। শূন্যে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, বিংশ শতাব্দীর একনিষ্ঠ প্রেমিক, ওরে একখান প্রাইজ দিতে কও,      দীপ্তেন বলল, এটা পুকাইদার তিন নম্বর প্রেম,
     গোলক বাবু বলল, একবার না পারিলে দেখো শতবার।
     কালী বলল, মায়ের আঁচল ধরা ছেলেগুলো হঠাৎ ছাড়া গরু হয়ে গেলে, এই পরিণতি হয়।
     গোলক বাবু হঠাৎ নাটকীয় কায়দায় বলল, ওরা রক্তবীজের বংশধর,
     দাদা, একথা কেন বলছেন,
     ইতিহাসের আগে ইতিহাস থাকে,
     দাদা, ঝেড়ে কাশুন।
     গোলক বাবু দীপ্তেনকে বলল, তুই চক্রবর্তী বাবুরে তিন খান চা আর তিন খান লেড়ো বিস্কুট অর্ডার কইরা দে,
     চক্রবর্তী দা, তিন নম্বর টেবিলে তিনটে চা আর তিনটে লেড়ো বিস্কুট পাঠান,
     গোলকবাবু বলছিলেন, -হের বাপে বিয়া করতে গিয়া বিয়ার মাঝ পথে গিয়া খাড়াইয়া গেল,
     কালী বলল, কেন দাদা,
     ক্যাশ ডাউন না করলে, বিয়া স্টপ।
     দীপ্তেন বলল, তারপর,
     গোলক বাবু বলল, ক্যাশ ডাউন হল, বিয়ে সাকসেসফুল। এখন সে শ্বশুরবাড়ির পেয়ারের জামাই।
     কালী বলল, সাফল্য আর কাকে বলে, ভদ্রলোক নিজের বাবা-মা-ভাই-বোন না চিনলেও, শ্বশুরমশাইয়ের শ্রাদ্ধে ফুল নিয়ে ছোটেন, শুনেছি, পুকাইদা বিয়ের তিন দিনের মাথায় বৌ নিয়ে ফুটে গেছে। কিন্তু বাড়িতে বৌমার খুব খাতির শুনেছি, কী মায়াময় ডাক, বৌমা, বৌমা,
     দীপ্তেন বলল, তুই ভুল শুনেছিস, কথাটা হবে, বোমা, বোমা।
     গোলকবাবু বলল, আমার বউ সম্পত্তি না সম্পদ, ভাববার সময় পাই নাই, বোনের বিয়া দিছি, ভাই মানুষ করছি। বউরে ভালবাসি, মুখে কই নাই, কিন্তু সেও সেইটা জানে। আসলে, আমাগো সময় ছিল অন্যরকম,
     কালী বলল, সুখের চেহারা বদলে যাচ্ছে দাদা,
     দীপ্তেন বলল, পোশাক আশাক, ঠাটবাট দেখে মানুষ চেনা যায় না,
     গোলক বাবু বলল, বাবা বলতেন, -মানব জনম নহে সুখ ভোগ তরে, কঠিন দায়িত্ব আছে মাথার উপরে, দুঃখ যদি পাই, কিবা খেদ তায়, কর্তব্য সাধিতে যেন এ জীবন যায়।
     কালী বলল, গুরুসদয় দত্তের কবিতা।
     গোলক বাবু বলল, মূল্যবোধ হারিয়ে গেলে জীবনে কি থাকে, এই ছেলে বছরে একদিন কর্তব্য করতে এলে, বাবা মা অভিভূত হয়ে যান,
     দীপ্তেন বলল, বাবা চালাকির দ্বারা কার্য সিদ্ধ করার যে পদ্ধতি ছেলেকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন, ছেলে আজ সেই গুরু মারা বিদ্যার প্রয়োগ দেখিয়েছে।
     গোলক বাবু বলল, দুঃখ হয় মাডার জন্য, এমন স্বামী, এমন ছেলে প্রশংসা করে জীবন কেটে গেল, অথচ, ভেতরের যন্ত্রণার কথা কয়জন জানবে।

     আমি ওই পথ ধরে যাচ্ছিলাম।
     কালী ডাকলো, সুনির্মলদা, আপনি এই প্রবলেমটার উপর কিছু লিখুন।
     দীপ্তেন বলল, স্বার্থপরতা সমাজটাকে একেবারে ফোঁপড়া করে দিচ্ছে।
     সব শুনলাম। বললাম, ভেবে দেখছি।
     পথে নেমে এলাম, মাইকেল মধুসূদনের জীবনীকার যোগীন্দ্রনাথ বসুর একটা মূল্যবান উক্তি মনে পড়ছিল, মধুসূদন যে বীজ বপন করিয়াছিলেন।

সুনির্মল বসু
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ