অটোয়া, সোমবার ২৩ মে, ২০২২
বহুমাত্রিক প্রতিভার প্যারীচাঁদ মিত্র - আবু আফজাল সালেহ

    বাঙলাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক প্যারীচাঁদ মিত্র(১৮১৪-৮৩) ভাষাবিদ্রোহী, সমাজনিষ্ঠ, কথাশিল্পী, উন্নয়নসংগঠক, চিন্তক গুণে গুণান্বিত। তিনি সাংবাদিকও ছিলেন। প্রথমবাঙালি ঔপন্যাসিক। আলালের ঘরের দুলাল প্রথম উপন্যাস হিসাবে বিবেচনা করা হয়। উপনিবেশিক চিন্তার বাইরে সাধু-চলিতের মিশ্রণ একটি কথ্যভাষায় লেখেন উপন্যাসটি। এজন্য তাকে বলা হয় ভাষাবিদ্রোহী। ইংরেজিভাষায় তিনি বেশ কিছু গ্রন্থ লিখেছেন তিনি। এসব বিবেচনায় বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী প্যারীচাঁদ মিত্রকে বাঙালি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। লেখক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবী ও ব্যবসায়ী প্যারীচাঁদ মিত্রের জন্ম কলকাতায় ১৮১৪  সালের ২২ জুলাই। তার বাবার নাম রামনারায়ণ মিত্র। ১৮২৭ সালে তিনি হিন্দু কলেজে ভর্তি হন এবং খ্যাতিমান শিক্ষক হেনরি ডিরোজিওর তত্ত্বাবধানে থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

     (১)সাহিত্যকর্ম:
     বাংলাসাহিত্যের বাঙালি কর্তৃক প্রথম উপন্যাস হচ্ছে আলালের ঘরের দুলাল(১৮৫৭ খ্রি.)। এটি প্যারীচাঁদের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম। এটির জন্যই তিনি বাঙালির কাছে স্মরণীয় ব্যক্তি। এ উপন্যাসে প্যারীচাঁদ প্রথমবারের মতো বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত গদ্যরীতির নিয়ম ভেঙ্গে চলিত ভাষারীতি প্রয়োগ করেন। সাধারণ মানুষের মুখে ব্যবহৃত কথ্য ভাষা আলালের ঘরের দুলাল উপন্যাসের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। The Spoiled Child  নামে ইংরেজিতেও অনূদিত হয়েছে এটি। এ উপন্যাসে তিনি নতুন এক আলো-আঁধারী ভাষা সৃষ্টি করেন। কলকাতার আশেপাশের মানুষের ভাষা। সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণে এক অদ্ভুত ভাষা। কথ্যরূপের এ ভাষাকে উপন্যাসের নামানুসারে 'আলালী ভাষা' হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। বহুলপরিমাণে কথ্যভাষা ব্যবহার করেন। এ ভাষা ছাড়াও তদ্ভব, ইংরেজি, ফারসী, হিন্দি ভাষার শব্দাবলিও প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হয়েছে উপন্যাসটিতে। দ্বিতীয় উপন্যাস 'মদ খাওয়া বড় দায়, জাত থাকার কি উপায়'(১৮৫৯)। দুই খণ্ডের এ উপন্যাসে ১০টি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। কয়েকটি অধ্যায়ের শিরোনাম আজও প্রাসঙ্গিক। মদ খাওয়া বাড়িতেছে, মাতাল নানারূপী, মদে মত্ত হইলে ঘোর বিপদ ঘটে, নেশাতেই সর্বনাশ, জাতি মারিবার মন্ত্রণা ইত্যাদি শিরোনামের ছোট ছোট কাহিনী। এখানেও নতুন কথ্যভাষার ব্যবহার করেন। তবে পরবর্তীকালের লেখায়  প্যারীচাঁদ এ ভাষার ব্যবহার কমিয়ে দেন। খুব অল্পপরিমাণে ব্যবহার করেন। তার উপন্যাসগুলোকে আমরা দুটিভাগে ভাগ করতে পারি। আলালের ঘরের দুলাল ও মদ খাওয়া বড় দায় জাত থাকার কি উপায় ভাষারীতি ও চিন্তা একরকম। পরবর্তীর উপন্যাস ও লেখায় সাধুভাষার প্রয়োগ ও চিন্তায় আধ্যাত্বিকতার ছাপ পাওয়া যায়। মানস-রূপান্তরের প্রতিফলন ঘটে রামারঞ্জিকা(১৮৬০), গীতাঙ্কুর (১৮৬১), কৃষিপাঠ(১৮৬১), যৎকিঞ্চিৎ (১৮৬৫), অভেদী (১৮৭১), ডেভিড হেয়ারের জীবনচরিত(১৮৭৮), আধ্যাত্মিকা(১৮৮১) এবং বামাতোষিণী(১৮৮১) রচনায়। প্যারীচাঁদ মিত্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের রচনাবলী হচ্ছে তার আধ্যাত্মিক উপন্যাসগুলো। এগুলো তার ব্যক্তি জীবন ও আধ্যাত্মিক চেতনার গভীরে উত্তরোত্তর উৎক্রমণের কাহিনী।  পারিবারিক স্বাস্থ্য রক্ষা, শিশু ও স্ত্রী শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়েও তিনি উপন্যাস লিখেছেন। সাংবাদিকতা ও বাঙলাসাহিত্যে অবদানের জন্যই প্যারীচাঁদ বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। 

     (২) ভাষাশিল্পী বা ভাষাবিদ্রোহী প্যারীচাঁদ: 
     বাঙলাসাহিত্যের আধুনিক আদর্শের সার্থক উপন্যাস হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী-কে(১৮৬৫ খ্রি:) বিবেচনা করি। অবশ্য প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল(১৮৫৭ খ্রি.)এবং কালী প্রসন্ন সিংহের হুতোম-প্যাঁচার নকশা(১৮৬২ খ্রি:) কেন্দ্র করেই বাংলা উপন্যাসের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল। আলালের ঘরের দুলাল উপন্যাসে বিশেষত অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে কলকাতা ও তার নগর কেন্দ্রিক সামাজিক চিত্র আশ্চর্য নিপুণতার সাথে অঙ্কিত হয়েছে। কাহিনী ও চরিত্রের যথাযথ পরিস্ফুটনের উদ্দেশ্যে লেখক এতে প্রচুর  তদ্ভব, চলিত এবং বিদেশি শব্দও ব্যবহার করেছেন। বাঙলাভাষায় প্রথম উপন্যাস আলালের ঘরের দুলাল(১৮৫৭ খ্রি.)। শুধু প্রথম উপন্যাস বলেই নয়, এখানে কথ্যরীতির প্রথম প্রয়োগ করা হয়েছে। উপনিবেশিত সমাজ-কাঠামোয় বেড়ে-ওঠা প্যারীচাঁদ নিজস্ব রূপকল্প(ভড়ৎস) সৃষ্টি করেছেন। বহুদিনের উপনিবেশিক প্যাটার্ন ভেঙেছেন তিনি। সংস্কৃতিয়ান প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে নতুন ভাষারীতির প্রয়োগ সাহসিকতার পরিচায়ক। অন্তত সেসময়ে এটা কঠিন ছিল কাজটি। মনে রাখতে হবে, রাজা রামমোহন রায় ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের সময়ে সাহসীর এমন বিদ্রোহীকাজ আলোচনার দাবি রাখবেই। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্তসহ অনেকেই সংস্কৃতি ভাষাকে সহজতর করতে পেরেছিলেন। কিন্তু কথ্যভাষাকে সাহিত্যিকরূপ দেননি বা দিতে পারেননি। কিন্তু প্যারীচাঁদ মিত্র  সংস্কৃতিয়ান প্রক্রিয়াকে শুধু ধাক্কাই দেননি, থামিয়েছেনও। নিজস্ব প্রক্রিয়া ব্যবহার করে সার্থকও হয়েছেন। নিজস্ব ও দেশিয় চরিত্র নির্মাণ করেছেন। নায়ক মতিলাল, অন্যতম চরিত্র ঠকচাচা, বেণীবাবু, ঠকচাচী, বরদা ইত্যাদি চরিত্র নির্মাণে ভিন্নতা আছে। দেশজ আবহ আছে। সমাজের নিঁখুত ছবি চিত্রায়িত হয়েছে উপন্যাসে। বাঙালিপাঠক হাসিমুখে গ্রহণ করেছেন এমন রীতি। পরবর্তীতে বঙ্কিম থেকে শুরু করে প্রায় সব সমালোচকগণ উপন্যাসটির ভাষাবিদ্রোহ গুণকে প্রশংসা করেছেন। সাহিত্যের বিষয় ও উপাদানগুলো যে ‘সমকালীন জনজীবন’ থেকে গ্রহণ করা যায় তা দেখিয়েছেন প্যারীচাঁদ মিত্র। বলা যায় শিখিয়েছেন আমাদের। সাহিত্যের বিষয় ছিল ‘সংস্কৃতের এবং কদাচিৎ ইংরেজির ছায়ামাত্র’। এই দুই সঙ্কট থেকেই বাংলা সাহিত্যকে উদ্ধার করলেন প্যারীচাঁদ। আলালের ঘরের দুলাল লিখলেন সেই ভাষায়, ‘যে ভাষা সকল বাঙালির বোধগম্য এবং সকল বাঙালি কর্ত্তৃক ব্যবহৃত’। এ রীতি পরবর্তীতে বাঙলাভাষায় প্রয়োগ শুরু হয়েছে অন্যভাবে। উপন্যাসে অবশ্য অন্যভাষার শব্দও প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করেছেন লেখক। তারপরেও নিজস্ব শব্দ-ভাষা প্রয়োগ স্বমহিমায় ফুটে উঠেছে। এবং প্রবল জনপ্রিয়তা পেয়েছে বাঙালি পাঠকসমাজে। উপন্যাসে কথ্যরীতিতে প্রয়োগ এ ভাষাকে 'আলালী ভাষা' হিসাবে পরিচিতিলাভ করা সেটাই প্রমাণ করে। তাই তো উনিশ শতকের লেখক হয়েও এখনও প্রাসঙ্গিক তিনি। লেখকের সাহিত্যকর্ম বিশ্লেষণ করলে আমরা নতুন প্যারীচাঁদ মিত্রকে আবিষ্কার করতে পারব। জনপ্রিয় হওয়ার কারণেই এটাকে 'আলালী ভাষা' নামে মর্যাদা পেয়েছে। সাহিত্যিক হিসাবে এটি প্যারীচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুরের(লেখকের ছদ্মনাম) ঐতিহাসিক সার্থকতা। সামাজিক সমস্যাকে প্রাধান্য দিয়ে মূলত লেখক উপন্যাসটি রচনা করেছিলেন। তৎকালীন কলকাতার আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবনযাত্রার একটি চিত্র পাওয়া যায় এখানে। দেশে ফারসির চল ও ইংরেজির প্রতি  আগ্রহ  ছিল। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতদের কদর ও চাকরিতে অগ্রাধিকারের ছিল। লেখকের ছিল ক্ষোভ। এসবই তুলে ধরা হয়ে আলালের ঘরের দুলাল উপন্যাসের পরতে পরতে। দুর্নীতির বিষয়াদি উপন্যাসের একটি বড় আকর্ষণ। টাকার বিনিময়ে মিথ্যা সাক্ষ্য, মিথ্যা মামলা সত্যে পরিণতকরণের মতো সামাজিকসমস্যাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন লেখক প্যারীচাঁদ মিত্র। ‘স্ত্রীর অন্য পুরুষের প্রতি মন কখন হইবে না এবং পুরুষেরও অন্য স্ত্রীর প্রতি মন কদাপি যাইবে না-’ এই একগামী আদর্শের কথা প্যারীচাঁদ তাঁর আলালের ঘরের দুলাল-র শেষে লিখেছেন। দাম্পত্যের মধুর ও চিরন্তন বন্ধনকে ছড়িয়ে দিতে লেখকের এমন চিন্তার প্রকাশ হয়েছে। বইয়ের ভ‚মিকাতেও দেশজ শব্দাবলির কথা বলা হয়েছে। ‘প্রশংসিত টেকচাঁদ ঠাকুর মহাশয় বাঙ্গালায় অতি সরল ও সর্ব্বসাধারণের অনায়াসে বোধগম্য রচনা-পদ্ধতি প্রচার করিয়াছেন। বর্ত্তমান গ্রন্থে যদিও কাদম্বরীর উৎকট-পদ প্রয়োগ-পটুতা, শকুন্তলার ললিত-পদবিন্যাস মাধুর্য্য, বাসবদত্তার অনুপ্রাস ছটা ও তিলোত্তমার ভাব ঘটা নাই;...’- (ভ‚মিকা থেকে গৃহীত)। ক্যালকাটা রিভিউ পত্রিকা আলালের ঘরের দুলাল-এ খুঁজে পেয়েছেল অলিভার গোল্ডস্মিথের হিউমার, হেনরি ফিল্ডিংয়ের উইট। জেমস লং প্যারীচাঁদকে বলেছিলেন ‘বাংলার চার্লস ডিকেন্স’। তিনি লেখেন, তার ছোটবেলায় অধ্যাপকেরা যে ভাষায় কথা বলতেন, তা সংস্কৃত ব্যবসায়ী ছাড়া কেউ বুঝত না। খয়ের-কে খদির, ‘চিনি’- কে  শর্করা, ‘ঘি’-কে আজ্য, ‘কলা’-কে  রম্ভা। ‘ফলাহারে বসিয়া ‘দই’ চাহিবার সময় দধি বলিয়া চীৎকার করিতে হইবে।’ মুখের ভাষাই এই, তা হলে লেখার ভাষা না জানি কী! রাধানাথ সিকদার ও প্যারীচাঁদ মিত্রের যৌথ প্রচেষ্টায় বের হয় মাসিক পত্রিকা।  এই পত্রিকায় তিনি ‘টেকচাঁদ ঠাকুর’ ছদ্মনামে লেখা শুরু করেন-আলালের ঘরের দুলাল। বইটিতে মোট ত্রিশটি পরিচ্ছদের মধ্যে সাতাশটি পরিচ্ছদ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো। 
     আলালের ঘরের দুলাল উপন্যাসে ব্যতিক্রমী ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল। সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণে সাধারণের বোধগম্য কথ্যভাষা। উপন্যাসের নামানুসারে এটির নামাকরণ করা হয় আলালী ভাষা। কালীপ্রসন্ন সিংহের 'হুতোম প্যাঁচার নকশা'-য় কলকাতা ও কলকাতার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা ব্যবহার করেছেন। প্যারীচাঁদের মতো কথ্য ও সাধু ক্রিয়াপদের মিশ্রণ করে লেখেননি। ফলে, এ ভাষা হয় আরও মার্জিত ও আধুনিক। এটাও উপন্যাসের নামানুসারে 'হুতোমী ভাষা' বলা হয়। বিদ্যাসাগরের সংস্কৃত-ঘেঁষা ভাষা, টেকচাঁদ ঠাকুরের আলালী ভাষা ও  কালীপ্রসন্ন সিংহের 'হুতোমী ভাষা'-কে সমন্বিত করে বঙ্কিম চন্দ্র বাংলা গদ্য রচনায় নিয়ে আসেন নতুনত্ব। সার্থকও হয়েছেন তিনি। বঙ্কিমীয় ভাষা বাঙলাভাষাকে শক্তিশালী করতে থাকে। প্যারীচাঁদ মিত্র লিখেছেন আরও সতেরোটি গ্রন্থ। কিন্তু এই একটি বই-ই বাঙালির কাছে তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে। নানামাত্রিক বিতর্ক থাকলেও আলালের ঘরের দুলাল-ই বাঙলাসাহিত্যের প্রথম উপন্যাস। 

     (৩)সমাজ সংস্কারক ও সামাজিক আন্দোলন:
     প্রশাসক হিসাবেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কোথাও কর্মচারী হিসাবেও কাজ করেছেন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে নেতৃত্ব বা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন থিওসফিক্যাল সোসাইটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৮৬০ সালে স্ত্রী বামাকালীর মৃত্যুর পর প্যারীচাঁদ  থিওসফি বা প্রেততত্তে¡-র প্রতি আকৃষ্ট হন। এরপরের সাহিত্যকর্মে তার প্রভাব পড়ে। সাংবাদিক ও স¤পাদনার কাজও করেছেন তিনি। সর্বক্ষেত্রেই তিনি মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের অন্যতম কাণ্ডারি প্যারীচাঁদ মিত্র যেমন নানা সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনি সংস্কৃতবহুল বাংলা ভাষার পরিবর্তে সাহিত্যে চলিত রীতির ব্যবহার এবং বাংলা উপন্যাস রচনার পথিকৃতের দায়িত্ব পালন করেন। পাদ্রি লঙ তাকে ‘ডিফেন্স অব বেঙ্গল’ বলতেন। দেশকল্যাণকামী বহু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছিল তার ঘনিষ্ঠ যোগ। বহু দেশি-বিদেশি বাণিজ্য-ব্যবসায় কৃতী ছিলেন তিনি। ছিলেন বহুধারার পথদ্রষ্টা। সে কৃতিত্বে একাধিক বিলিতি কোম্পানির পরিচালন-প্রধান নির্বাচিত হয়েছেন ব্রিটিশ-ভারতে। একাধিক ভাষার দক্ষতার পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িত ছিলেন তিনি। সাংবাদিক ছিলেন। পত্রিকার সম্পাদনাও করতেন। নারীশিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। প্যারীচাঁদ মিত্র বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সম্মানসূচক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। যেমন: জাস্টিস অব পিস (১৮৬৩), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো(১৮৬৪), জেল ও কিশোর অপরাধীদের সংশোধন কেন্দ্রের পরিদর্শক (১৮৬৪), কলকাতা হাইকোর্টের র্গ্যান্ড জুরি(১৮৬৮-১৮৭০), বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য (১৮৬৮-১৮৭০), কলকাতা মিউনিসিপ্যাল বোর্ডের অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট প্রভৃতি। দ্য বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটির(১৮৪৩) অবৈতনিক সম্পাদক ছিলেন প্যারীচাঁদ। দ্য ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন(১৮৫১), বিটন সোসাইটি(১৮৫১), দ্য ক্যালকাটা সোসাইটি ফর দ্য প্রিভেনশন অফ ক্রুয়েল্টি টু অ্যানিম্যালস(১৮৫১) ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের সদস্য ছিলেন।  জ্ঞানান্বেষণ সভার সদস্য হন তিনি ১৮৩৮ সালে। তিনি ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান ছিলেন। তিনি ফার্সি, বাংলা ও ইংরেজি ভালো জানতেন। তিনি মহিলাদের জন্য একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি পুলিশি অত্যাচারিতার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন এবং সফলকামও হয়েছিলেন। তিনি স্ত্রীশিক্ষা প্রচারে যথেষ্ট সক্রিয়তার পরিচয় দেন। তিনি বিধবাবিবাহ সমর্থন করতেন। তিনি বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহের বিরোধিতা করেন।

     (৪)ইংরেজি চর্চা এবং প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে সেতুবন্ধন:
     প্যারীচাঁদ ইংরেজি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। ইংরেজি ভাষায় আটটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। বহু লেখা অগ্রন্থিত থেকে যায়। পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।'The Zemindar and Ryots'  গ্রন্থ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথার বিরুদ্ধে কলম ধরেন। পাঠক ও শাসক সমাজে এ গ্রন্থটিও প্রচুর আলোড়ন সৃষ্ট হয়। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছেঃ A Biographical Sketch of David Hare(1877), Stray Thoughts on Spiritualism(1880), Life of Dewan Ramcomul Sen(1880), On the Soul : Its Nature and Development(1881), Agriculture in Bengal(1881), Life of Coles Worthy Grant(1881) ইত্যাদি। তার ইংরেজি ভাষায় রচিত লেখাসমূহ ছাপা হত ইংলিশম্যান, ইন্ডিয়ান ফিল্ড, ক্যালকাটা রিভিউ, হিন্দু প্যাট্রিয়ট, ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া প্রভৃতি পত্রিকায়। প্যারীচাঁদের ইংরেজিগ্রন্থে এবং অগ্রথিত ইংরেজি রচনায় ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, ধর্ম, বাঙালি নারীর জাগরণ, বাংলার অর্থনীতি এবং কৃষি-বিষয়ক নানামাত্রিক বিবেচনা উপস্থাপন করেছেন। ইংরেজি রচনায় প্যারীচাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি নিরপেক্ষ, শিল্পীসুলভ এবং গভীর অনুসন্ধিৎসু। হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর সাক্ষাৎ-শিষ্য প্যারীচাঁদ মিত্র ছিলেন প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে সেতুবন্ধন বা মিসিং লিঙ্ক। ২০৩ বছর পরে নবজাগরণের এই সন্তান আজও ‘ইয়ং বেঙ্গল’ বলে মনে করেন অনেকে। তার প্রয়াণে বাঙ্গালী মনীষী  তিনি ছিলেন ইয়ং বেঙ্গল দলের সদস্য ভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল্যায়ন স্মরণযোগ্যঃ He was a link of union between European and Native society which will be regretted now as a ‘missing link’ by both those communities. No one was more fitted for the highest position open to native ambition than he was, and yet despising worldly ambition and indifferent to self-interest he adhered to the interests of his country and laboured indefatigably for those interests. 
     সাহিত্যের বিষয়ে লোকজ বা সমকালীন জীবন-জীবিকা থেকে নেওয়া হয়। কিন্তু এ কাজটির প্রথম সফলপ্রয়োগ করেন প্যারীচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুর। সমকালীর ভাষা বা শব্দ যে সাহিত্যে প্রয়োগ করা যায় তা দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। এর ফলে তিনি যথেষ্ট জনপ্রিয়তাও পান। তার পূর্বে কেউ এমন সাহস দেখাননি। এর পরে মার্জিত হতে হতে আমরা একটি স্ট্যান্ডার্ড ভাষা পেয়েছি। এটাও ধাপে ধাপে আরও আধুনিক  হবে। কিন্তু বাঙলা ভাষাবিদ্রোহী হিসাবে প্যারীচাঁদ মিত্রকেই মনে রাখব আমরা। বহুমখী গুণের অধিকারী প্যারীচাঁদ মিত্র ১৮৮৩ সালের ২৩ নভেম্বর কলকাতায় প্রয়াত হন।

আবু আফজাল সালেহ
কুষ্টিয়া

তথ্যসূত্র: 
(১) বঙ্কিম-রচনাবলী(বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় : ১৩৯০দ্বিতীয় খন্ড, সাহিত্য সংসদ, কলিকাতা)
(২) প্যারীচাঁদ মিত্রের জীবন ও সমাজভাবনা(বীণাপাণি বাগচী : ১৯৯৩, বাংলা একাডেমি, ঢাকা)
(৩) উপন্যাসের কালান্তর(সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় : ২০০৩বাংলা, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা)
(৪) হাসনাত আবদুল হাই, বিশ্বজিৎ ঘোষ, মহাম্মদ দানীউল হক, মুহাম্মদ ফরিদ হাসান প্রমুখ লেখকর বিভিন্ন লেখা