অটোয়া, শুক্রবার ২০ মে, ২০২২
একুশ শতকের সংকট এবং সম্ভাবনার পথ (দুই) - দীপিকা ঘোষ

জনসংখ্যা বিস্ফোরণঃ 
     প্রশ্নটা কুড়ি শতকের শেষ ধাপ থেকেই উচ্চারিত হয়ে আসছে, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ কি একুশ শতকেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে? এর উত্তরে নানা মুনির নানা মত থাকলেও বর্তমান শতাব্দীর সব রকম সংকটের মূলে যে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, বাস্তব পরিস্থিতিতে এ সম্পর্কে বিতর্কের আর অবকাশ নেই।  যে বিতর্ক ইংরেজ দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ টমাস রবার্ট ম্যালথাসের বিখ্যাত গ্রন্থ (১৭৯৮ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত), ‘An Essay on the Principle of Population’ নিয়ে আবর্তিত ছিল দীর্ঘকাল।  ম্যালথাস জানিয়েছিলেন, ১‘Human’s unquenchable urge to reproduce would ultimately lead us to overpopulate the Planet, eat up all its resources and die in a mass famine,’ (An Essay on the Principle of Population by Thomas Robert Malthus). স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এবং মার্কিন জীববিজ্ঞানী ডক্টর পল রালফ এরলিকও, ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘The Population Bomb’ গ্রন্থে  এ সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন।  পল বলেছিলেন, ২ জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি সংহত করতে না পারলে  সত্তর এবং আশির দশকে বিশ্বব্যাপি শুরু হবে দুর্ভিক্ষ।  কিন্তু এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটবে না।  প্রতি বছর পৃথিবীতে দশ মিলিয়ন করে বুভুক্ষু মানুষের সংখ্যা বাড়বে।  একই সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের সামাজিক সংঘাতে পরিবর্তিত হবে বিশ্বের জনসমাজ, (The Population Bomb by Dr. Paul Ralph Ehrlich)।
     সত্তর ও আশির দশকে বিশ্বের সর্বত্র অবশ্য দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়নি।  সবুজ বিপ্লবের উদ্যোগ ও সফলতা কোটি কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের প্রাণ রক্ষা করেছিল।  সেই যুক্তির কারণে ইংরেজ অর্থনীতিবিদ ম্যালথাসের মতো মার্কিন জীববিজ্ঞানী ডক্টর এরলিকের গ্রন্থও সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি।  কিন্তু বর্তমান শতকের সব রকম দৃশ্যমান সংকটের দিকে তাকিয়ে যুক্তিসঙ্গতভাবেই এই প্রশ্নগুলো সামনে এসে দাঁড়ায়, কতটা জনসংখ্যা পৃথিবীর ধারণ ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে? ম্যাক্সিমাম পপুলেশন কি এরই মধ্যে হয়ে গেছে?  নাকি ২১০০ সাল অবধি চলতেই থাকবে? জন্মের হার যদি এখনই কমতে থাকে তাহলে জনসংখ্যা কি নিকট ভবিষ্যতে দ্রুত হ্রাস পাবে? নাকি জন্মহার কমার পরেও হিউম্যান পপুলেশন আরও একশো বছর ধরে বিরামহীন বাড়তেই থাকবে বিশ্বের নানান প্রান্ত জুড়ে? জন্মহার কমার পরেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া কি সম্ভব হয় বাস্তবে?  
     জাতিসংঘের ২০২০- এপ্রিলের সেন্সাস ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা আপাতত সাতশো আশি কোটির ওপরে।  ২১০০ সাল নাগাদ এর সঙ্গে যোগ হবে আরও কয়েকশো কোটি মানুষ।  জাতিসংঘের গবেষকদের  প্রোজেকশন অনুযায়ী সংখ্যাটা দাঁড়াবে,  ১১৫০ কোটি থেকে ১২০০ কোটির মধ্যে।  কোনো কোনো গবেষকের ভবিষ্যদ্বাণী, সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি।  যেহেতু এখনই জনসংখ্যা ৮০০ কোটি অতিক্রম করতে যাচ্ছে,  অতএব সংখ্যা বৃদ্ধির গাণিতিক হারে ২১০০ সালে সংখ্যাটা  ১৬০০ কোটির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াবে।  এগারো শো পঞ্চাশ, বারো শো,  ষোলো শো কোটি কিংবা আরও বেশি যেটাই হোক না কেন, পৃথিবীর আয়তন অনুসারে (দুই তৃতীয়াংশই সাগর-মহাসাগর) আদর্শ জীবন ব্যবস্থার জন্য এই সংখ্যা থাকা কি সমীচীন?  আদর্শ সমাজজীবনের জন্য জনসংখ্যার আকার কতটা বড় থাকা বাঞ্ছনীয়?
     এমন প্রশ্নের উত্তরে শতাব্দীকাল ধরেই বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন অভিমত প্রয়োগ করে এসেছেন।   কেউ বলেছেন, ৬৪ কোটি হচ্ছে পৃথিবীর ধারণ ক্ষমতার মধ্যে।  কারুর মতে,  ১২৮ কোটি।  কেউ বলেছেন, ২৫৬ কোটি।  কারুর গবেষণার ফলাফল জানাচ্ছে, ৪০০ কোটির চাইতে বেশি নয়।   কেউ কেউ আবার জানিয়েছেন,  ১৬০০ কোটি এমনকি ৪৬০০ কোটির মতো বিশাল সংখ্যাকেও বসুন্ধরা জননী ধারণ করার ক্ষমতা রাখে।  তবে বেশিরভাগ বৈজ্ঞানিক গবেষণাতথ্যের ড্যাটা অনুযায়ী, সংখ্যাটা অবশ্যই ৮০০ কোটির নিচে থাকতে হবে।  বর্তমানে কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা শুভঙ্করের জটিল হিসেব কষে ভবিষ্যত পৃথিবীতে মানবজাতির আকারকে সুনির্দিষ্ট করতে চাইছেন।  কিন্তু সত্যিই কি এ সম্পর্কে যথার্থ ভবিষ্যত নির্ণয় করা সম্ভব?  কারণ শিশু জন্মের হার নিম্নগামী হওয়ার অনুপাত দেখিয়ে জনসংখ্যার যে ধারণা দেওয়া হচ্ছে সেটা সর্বদা স্থিতিশীল থাকছে না।  সুদূর ভবিষ্যতে থাকবেই সে সম্ভাবনা কি সুনিশ্চিত? একটি উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে।  যেমন, ১৯৮৯ তে জন্ম নিয়েছিল  ৮ কোটি ৮০ লাখ শিশু।   ২০০৩ সালে  কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৭ কোটি ৪০ লাখ।  ২০০৬-এ  জন্ম নিয়েছে ৭ কোটি ৫২ লক্ষ শিশু।   কিন্তু ২০১৭-য় ফের  সংখ্যাটা ঊর্ধ্বগামী।  ৮ কোটি ৩০ লাখ। 
     জনপরিসংখ্যানের ইতিহাস জানাচ্ছে, ১৯৫০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি সবচাইতে দ্রুতগতিতে এগিয়েছে।  এ সময়কার প্রবৃদ্ধিতে গ্লোবাল পপুলেশন তিন গুণ হয়েছে ষাট বছরে।  একদিন মানুষের অস্তিত্ব এবং সভ্যতা রক্ষার জন্য জন্যসংখ্যা বৃদ্ধির প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল।  বর্তমানে হিউম্যান পপুলেশনের উদ্বেগজনক বিস্ফোরণ তার অস্তিত্ব সুরক্ষার পথেই প্রধান অন্তরায়।  ১৮০৪ খ্রীষ্টাব্দে  জনসংখ্যার ১০০ কোটিতে পৌঁছুতে সময় লেগেছিল দুই লক্ষ বছরেরও বেশি সময়।  এরপর  ২০০ কোটি  স্পর্শ করেছিল ১২৩ বছর পরে ১৯২৭ সালে।  পরবর্তীকালে  গ্লোবাল পপুলেশন ঝড়ের গতিতে বেড়েছে।  মাত্র তেত্রিশ বছর পরে অর্থাৎ ১৯৬০ সালেই  নম্বরটি পৌঁছে গিয়েছিল ৩০০ কোটিতে।  তারপর ৬০ বছর পরে  ২০২০-এর এপ্রিল মাসের জনগণনায় সংখ্যাটি প্রায় আটশো কোটির কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে।  অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে আট কোটির বেশি মানুষ যোগ হয়েছে মোট জনসংখ্যার সঙ্গে।  কোনো কোনো জনবিশেষজ্ঞের গবেষণার ফলাফলে সংখ্যাটা আরও বেশি।  
     যাইহোক, বিশ্বের আদমশুমারি এবং জন্মমৃত্যুর অনুপাত নিয়ে তর্কবিতর্কের স্রোত অতীতের মতো এখনো আধুনিক বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছে।  সেই সঙ্গে রয়েছে পৃথিবী কত সংখ্যক মানুষের ধারক হতে সক্ষম সে সম্পর্কে নানা মতান্তর।  তবে বাস্তবতা হলো,  পৃথিবীর জনসংখ্যা ধারণের সক্ষমতা শুধু লোকসংখ্যার পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না।   মানুষের জীবনমানের  উৎকর্ষতা বাড়ানোর ওপরেও নির্ভর করে।   বিজ্ঞানীরা তাই বার বার বলছেন, আর অধিক জনসংখ্যার বোঝা বসুন্ধরা জননীর পক্ষে সামলানো সম্ভব নয়।  কারণ জনসংখ্যার উদ্বেগজনক বিস্ফোরণ কেবল যে স্থানের প্রয়োজনীয়তাই বাড়িয়ে দিচ্ছে তাই নয়।  একই সঙ্গে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকায় প্রচণ্ড চাপ বাড়ছে পৃথিবীর পরিবেশের ওপরে।  অথচ  অন্যান্য জীব ও উদ্ভিদ জগতের মতো মানুষও প্রকৃতির অংশ।   প্রকৃতি বিধ্বস্ত হলে  মানুষের নিশ্চিহ্নিকরণকেও ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।  
     জার্মান রসায়নবিদ প্রফেসর ফ্রেডরিক তাঁর ‘The Fossil Makers’ বইয়ে  ‘Humans are a part of the Biosphere’ পর্বে লিখেছেন,৩‘Humans cannot afford to be indifferent to the ways in which the environment reacts to anthropogenic material flows. The human species is a part of biological evolution of life on  this planet. If we dislodge the ecological system from the state in Which they made human life both possible and tolerable, whether consciously or unconsciously, we must expect that over the long term the conditions will become less favorable for our continued survival. The biological survival of the human species could become endangered,’ (The Fossil Makers by Friedrich Bio Schmidt-Bleek).   
     অতিরিক্ত জনসংখ্যা আপাতত যে এক ভয়াবহ সমস্যা, তার জন্য বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলাফল জানার প্রয়োজন পড়ে না।  খুব সোজা কথা হলো,  মানুষের কারণেই ধ্বংস হতে চলেছে পৃথিবী।  জনসংখ্যার আকার যত বড় হতে থাকবে তত বেশি অরণ্য, জীবজগৎ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ উজাড় হবে।  খাদ্য আর পানীয়ের চাহিদা বাড়বে।  জলবায়ু দূষণের পরিমাণ বাড়ায় বিপর্যস্ত হবে পরিবেশ।  সামাজিক অস্থিরতায় জটিল থেকে জটিলতর হবে রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রক্রিয়া।  মানবসভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখতে, পৃথিবীর ধ্বংস রুখে দিতে জনসংকোচন ছাড়া তাই দ্বিতীয় পথ খোলা নেই।  দ্রুতগতিতে ক্রমবর্ধমান মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার চাপ নিতে  গিয়ে এরই মধ্যে মুমূর্ষু পৃথিবীর ফুসফুস, অক্সিজেন ধারণের ক্ষমতা হারিয়েছে।  তার স্থিতাবস্থার সব পিলারগুলো ধসে পড়ছে একে একে।   বিশ্বের সব ধরনের সামাজিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়,  সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, উদ্বাস্তু সমস্যা, মহামারি, ব্যাধি, দুর্ভিক্ষ, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের পেছনে রয়েছে মারাত্মক জনসংখ্যার প্রবল অভিঘাত।  জাতিসংঘে কর্মরত ২০০০ পরিবেশবিজ্ঞানীর  তাই ২০১৪-এর ১৪ই অক্টোবর জলবায়ু সংক্রান্ত অধিবেশনে সমস্বরে মন্তব্য ছিল, ৪‘World’s real problem is overpopulation, not climate. Overpopulation is destroying the Planet. Today humans are the new dinosaurs, the next species slated for extinction,’ (www.marketwatch .com>story>climate-report-proves).    
     কিন্তু সমস্যা হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের মূলে, বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য এবং আরও বহু ধরনের বিপর্যয়ের পেছনে যে বিশাল জনসংখ্যা এবং তাদের উচ্ছৃঙ্খল ভোগবাদিতা দায়ী, এই বাস্তবতাকে শতভাগ বুঝেও স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সোচ্চার হতে দ্বিধা রয়েছে বহু বিজ্ঞানীদের মনেই।  তাঁরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় নিয়ে হাজার  হাজার পৃষ্ঠা লিখে টেকনিক্যাল রিপোর্ট দেন।  বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে আনতে অনেক বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ের পথ বাতলে দিতে কথা বলেন।  কিন্তু বিপুল জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি রোধের জন্য বিশ্বের সব দেশেই যে জন্মহারের লাগামটাকে কষে টানতে হবে, সে বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ।  একই কথা প্রযোজ্য রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ, শিল্পপতি, সমাজপতিসহ অন্যান্য বুদ্ধিজীবিদের ক্ষেত্রেও।  পৃথিবীর পারিপার্শ্বিকতা বদলে যাওয়ার পেছনে যে বাস্তবতা, সেটা প্রকাশ করতে এঁদের অস্বীকৃতি।  কিন্তু তাতে সমস্যার কোনো সুরাহা হয় না। বাস্তব পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে না তাতে।  ভোগবাদী মানুষের সীমাহীন চাহিদার ওপরে পরিমিতির গণ্ডীরেখাও পড়ে না।  
     এ কথা ঠিক বিশ্বে জনসংখ্যার কারণে উদ্ভূত সমস্যা সম্বন্ধে তর্কবিতর্কের অবসান এখনো ঘটেনি।  এক পক্ষের মতে, জনসংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধির গাণিতিক হিসেবে যেমন দেখা যাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্যভাবে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।  কারণ গত শতকের তুলনায় ফার্টিলিটি রেট অনেক কমে এসেছে বর্তমান শতাব্দীতে।  জাপান, রাশিয়া, জার্মানি, নিউজিল্যাণ্ড, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, উত্তর আমেরিকাসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে নারীদের ফার্টিলিটি রেট এখন নিচের দিকে।  চীন সরকার সত্তরের দশক থেকে কঠোরভাবে জনসংকোচন আইন অনুসরণ করায় সেখানকার বেগবান জনপ্রবাহ থেমে গিয়েছে।  শিক্ষাবিষয়ক পরিকল্পনা, জন্মপ্রতিরোধের প্রযুক্তিব্যবস্থা বিভিন্ন দেশে সহজলভ্য হওয়ায় ভারতসহ এশিয়ার উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতনতা এসেছে।  কাজেই একুশ শতকের শেষে জনসংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হয়ে আসবে।  বরং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে  এ কথাই ভাববার সময় এসেছে,  জনসংখ্যা ছোট হতে হতে পৃথিবীই না জনহীন হয়ে পড়ে।   
     অন্যদলের অভিমত, জন্মহার কমে যাওয়ায় পৃথিবীর জনহীন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা এখনো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।   উল্টে এই শতাব্দীর শেষে জনসংখ্যার আকার আরও বিশাল হওয়ার লক্ষণ দৃশ্যমান।  মানবসন্তানের অনাকাঙ্ক্ষিত বিস্ফোরণ ভবিষ্যতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের চাইতেও বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে কিনা সেটা্ই এখন প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিচ্ছে।  এ প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এবং রয়্যাল ইনস্টিটিউশনের প্রাক্তন ডিরেক্টর, ডক্টর সারাহ হারপারের উত্তর ছিল, ৫ ‘Falling total fertility rate around the world should be welcomed. Countries should not worry if their population is not growing. Having fewer children is undoubtedly positive from an environmental point of View. In fact, the most important contribution of a reduced birth is its long-term contribution towards mitigating global warming by reducing CO2 emissions,’ (www.theguardian.com> world>falling-total-fertility, Dec 26, 2018).   
     ২০১৪ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী,  জিরো থেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর সংখ্যা ছিল ১৯০ কোটি।  এই সংখ্যাটি তখনকার  (২০১৪ সালের) মোট জনসংখ্যার ২৭  ভাগ।   অর্থাৎ এক যুগ অতিক্রম করতেই  (১৪ বছর) প্রায় দুশো কোটি মানুষের চাপ বেড়েছে সৌরজগতের ছোট্ট গ্রহটির ওপরে।  ওই বছরই ইউনিসেফ আর বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছিল,  ১৯৯০ থেকে ২০১৩-এর মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে ৫০ শতাংশ।  ২০৩৫ সাল নাগাদ মৃত্যুর হার কমে  আসবে  শতকরা শতভাগ।  শিশু জন্মের তথ্যউপাত্তগুলোও জানিয়ে দিচ্ছে, প্রতি বছর মানবসংখ্যার হ্রাস নয়, বেড়ে যাওয়ার গাণিতিক হিসেবই তারা উপস্থিত করছে।  যেমন,  ২০১৮-এর ১লা জানুয়ারি বিশ্বে মোট শিশু জন্মেছিল ৩৮৬,০০০।  ২০১৯-এর এই দিনে ৩৯৫,০০০।  ২০২০-এর প্রথম দিনের সংখ্যাটি ছিল ৪০০,০০০।  সত্যি বটে উত্তর আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান, ইউরোপসহ সারা বিশ্বেই প্রতি নারীর ক্ষেত্রে গড়ে ফার্টিলিটির রেট কমেছে।  কিন্তু তার মানে এই নয়, পৃথিবী জুড়ে মোট শিশুজন্মের সংখ্যা আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।  কারণ জনসংখ্যার আকার যত বড় হবে,  প্রতি নারীর  ক্ষেত্রে জন্মহার কম থাকা সত্ত্বেও মোট জন্মসংখ্যা তারপরও বেড়েই চলবে।  
     ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যাণ্ড কিংবা উত্তর আমেরিকায় জনসংখ্যা হ্রাসের যে ধারণা দেওয়া হচ্ছে সেটাও কেবল শ্বেতাঙ্গদের ক্ষেত্রে।  যে কারণে পাশ্চাত্যের সভ্যতা, সমাজ, সংস্কৃতি অটুট রাখতে এসব দেশের সমাজসংস্কারকদের অনেকেই সন্তান সংখ্যা বাড়িয়ে ট্রাডিশন্যাল ফ্যামিলি সিস্টেম অনুসরণ করার তাগিদ অনুভব করছেন।  শিশুজন্মের হার ক্রমাগত নেমে যাওয়ার কারণে পাশ্চাত্যে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক আর অর্থনীতির ক্ষেত্রে কী ধরনের বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে, সে সম্বন্ধে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অজস্র আর্টিকেল এরই মধ্যে লেখা হয়েছে।  শ্বেতাঙ্গদের ভেতর তরুণ জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং বয়স্কদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে যে বহু ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, সে বিষয় নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে ক্রমাগত। 
     আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী প্যাট্রিক জে বুকানন ২০০১ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘The death of the West’ গ্রন্থে লিখেছেন, ৬‘The West is dying. Collapsing birth rates in Europe and U.S, coupled with population explosions in Africa, Asia and Latin America are set to cause cataclysmic shifts in world power, as unchecked immigration and polarizes every western society and nation,’ (The death of the West by Patrick J. Buchanan). প্যাট এই গ্রন্থে উপসংহার টেনেছেন এই বলে,  আজ যারা ওয়েস্টার্ন কান্ট্রিতে জনমানুষের বৈচিত্র্য দেখে উল্লাসভরে ‘গোল্ডেন ইয়ার’ উদযাপন করছেন, তারাই একদিন ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড আমেরিকার’ ভয়ংকর পরিণতিটা ভালোভাবেই সমঝাবেন।  ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদেরা হয়তো এর নামকরণ করবেন, ‘The Suicide Tablet of the West’!  
     প্যাট বুকানন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ইমিগ্রেশন পলিসি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে আক্ষেপ করেছেন সেখানকার শেতাঙ্গ পপুলেশন কমে যাওয়ার জন্য। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির পপুলেশন স্টাডিজের কয়েকটি গবেষণার ফলাফলও দেখিয়েছে,  জনসংকোচন নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও প্রকৃতপক্ষে জনসংখ্যার হ্রাস আদৌ হচ্ছে না।  এ সম্পর্কে সাধারণভাবে যে ধারণা তৈরী করা হচ্ছে তা যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি ভ্রান্ত।  হিউম্যান পপুলেশনের বৃদ্ধির ঝোঁক বরং ইউরোপ আমেরিকায় ইমিগ্রেশনের কারণে নতুন করে দেখা যাচ্ছে।  অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সোশ্যাল পলিসি এণ্ড ইন্টারভেনশন ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর ডেভিড কোলম্যান জানিয়েছেন, ৭‘We have shown that this so-called decline has been exaggerated and trends in European fertility have been misunderstood. With immigration, fertility rates have gone up in many European and English-speaking countries,’(www. Ox. Ac.uk>news: Claims about the decline of the West are exaggerated ). 
     ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, উত্তর আমেরিকায় জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে কেবল মাত্রাতিরিক্ত ইমিগ্রেশনের কারণে নয়।   অভিবাসী নারীদের শিশু জন্মদানের অনুপাত বৃদ্ধির জন্যও।  সাদাদের তুলনায় তো বটেই, এমনকি নিজেদের জন্মভূমির নারীদের চেয়েও অভিবাসীদের জন্মহার ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রে ঢের বেশি।  যেমন চাইনিজ নারীদের যুক্তরাষ্ট্রে ফার্টিলিটি রেট ২.৩,  স্বদেশে ১.৭।  ল্যাটিনোদের নিজের দেশে ২.৬, আমেরিকায় ৩.৫।  যুক্তরাজ্যে শ্বেতাঙ্গদের ১.৭, পাকিস্তানীদের ৩.৯।  অস্ট্রিয়ায় ক্যাথলিকদের ফার্টিলিটির হার ১.৩, বিভিন্ন আরব ইমিগ্র্যান্টদের ৩.৭।  ২০১০ -এর পপুলেশন রেফারেন্স ব্যুরোর সেন্সাস রিপোর্ট অনুযায়ী, মাইনোরিটি গ্রুপ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৪৯.৫ শতাংশই ছিল ইমিগ্র্যান্ট পিতামাতাদের সন্তান।  অর্থাৎ ইংরেজ জনতত্ত্ববিদ এবং অর্থনীতিবিদ টমাস ম্যালথাস দুশো বাইশ বছর আগে যা মন্তব্য করেছিলেন, ৮ ‘Population, when unchecked, increases in a geometrical ratio,’ (todayinsci.com>Malthus Thomas-Quotations) সেটা বহু বছর পরে হলেও বহুজনকে সচেতন করে তুলেছে। 
     সুতরাং যারা দ্রুত পপুলেশন কমে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন, অন্তত ২১০০ সাল নাগাদ তাদের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। বিশ্বে জনসংখ্যা বাড়ার প্রবণতা অতীতে কী অবস্থায় ছিল এবং ভবিষ্যতে কেমন থাকবে, তার একটি চার্ট এখানে উপস্থাপন করা হলো।


     এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ কেবল জন্মহার বেড়ে যাওয়ার ওপরে নির্ভর করে না।  দীর্ঘকাল জন্মমৃত্যুর অনুপাতের মধ্যে দূরত্ব যখন বেড়ে  যায় তখনও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।  শিশুমৃত্যু কমে যাওয়ার পাশাপাশি মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেলে জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে একটা সময় থেকে সংখ্যা অতি দ্রুত বড় হয়।  সভ্যতায় নবজাগরণের ফলে, শিল্পবিপ্লবের জোয়ারে এবং কৃষি, প্রযুক্তি, মেডিসিন ও যাতায়াত ব্যবস্থায় উন্নয়নের স্পর্শ লাগায় কুড়ি শতক থেকে ধীরে ধীরে সারা বিশ্বেই কমে গিয়েছে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা।  সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে মানুষের গড় আয়ু।  মানুষের বর্তমান  গড় আয়ু ৭২ বছর।  বলা হচ্ছে, ২০৪০ সাল নাগাদ বেড়ে সেটা ৮৭ বছরে পৌঁছুবে।  অবশ্য বিশ্বে প্রতি নারীর ফার্টিলিটি রেট কমে গেলে শতাব্দীর শেষে জন্মমৃত্যুর অনুপাতের ফারাক কমতে শুরু করবে বলে বিশেষজ্ঞদের অনুমান রয়েছে।  কারণ  তখন শিশু ও তরুণের তুলনায় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা হবে কয়েক গুণ বেশি।  যে কারণে একটা সময় পরে জন্ম সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে।  তারপর দুয়ের অনুপাতিক সংখ্যাটি যখন কাছাকাছি হবে, তখন জন্ম এবং মৃত্যুসংখ্যা স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে যাবে।  যেমন ঐতিহাসিক কাল থেকে জন্মমৃত্যুর গড়পরতায় সমতা থাকার ফলে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যার আকার স্থিতিশীল থেকেছে । 
     তবে জনবিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি নারীর সন্তান সংখ্যা যদি ২.১-এর বেশি হয়, তাহলে জনসংকোচনের সম্ভাবনা প্রত্যাশিত পর্যায়ে ২১০০ সালের পরেও নেই।  কারণ পাশ্চাত্যে জন্মহার সংকুচিত হলেও এখনও পর্যন্ত এশিয়া এবং আফ্রিকার অনেক দেশেই উঁচুতে।  এছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকায় জন্মমৃত্যুর অনুপাতের মধ্যে দূরত্ব কম হলেও এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশে এই অনুপাতে পার্থক্য প্রচুর। সেখানে রাষ্ট্রভেদে মৃত্যুহারের চাইতে জন্মহার কোথাও তিন গুণ, কোথাও বা চার গুণেরও বেশি।  অবশ্য ইউরোপ, আমেরিকায় অভিবাসী মায়েদের সন্তানসংখ্যা বাড়ার কারণে জনসংখ্যা সেখানেও নিয়মিত বাড়ছে। ফলে গড়ে জন্মমৃত্যুর আনুপাতিক তফাৎ প্রত্যাশিত পর্যায়ে সংকুচিত হচ্ছে না।  ১৯৫০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত  বিশ্বব্যাপি জন্ম-মৃত্যুর অনুপাত বোঝাতে একটি  তথ্য নিচে সংযোজন করা হলো। 

 


     ওপরের এই তথ্যসূত্রই জানিয়ে দিচ্ছে প্রতি বছর উদ্বৃত্ত মানুষের সংখ্যা কতটা থেকে যাচ্ছে।   এবং মোট জনসংখ্যার সঙ্গে  এই নম্বর যোগ হতে থাকলে আকার কতটা বিশাল হতে পারে।  ২০২০ এর ১২ থেকে ২৫ শে এপ্রিল পর্যন্ত জাতিসংঘের তৈরী সর্বশেষ ড্যাটা অনুসারে মহাদেশভিত্তিক জনসংখ্যার তালিকা এখানে যোগ করা হলো – 
     এশিয়াঃ (১১)  ৪৬৩ কোটি ৩৪ লক্ষ ১৫ হাজার ৩৪৫ ।  বিশ্বের মোট জনসংখ্যার  ৫৯.৭৬ পার্সেন্ট। (www.worldommeters.info > world- population> Asia po… 22nd April, 2020). 
     আফ্রিকাঃ (১২)  ১৩৩ কোটি ৪২ লক্ষ ১৪ হাজার ৫২।  বিশ্বের মোট জনসংখ্যার  ১৬.৭২ পার্সেন্ট ।( www.worldometers.info > world-population>Africa po... 23rd April, 2020 ).  
     ইউরোপঃ (১৩)  ৭৪ কোটি ৭৫ লক্ষ ৫৩ হাজার ৯৫২।   মোট বিশ্ব জনসংখ্যার ৯.৭৮ পার্সেন্ট। (www.worldometers.info > world population> Europe po… 25th April, 2020).  
     ল্যাটিন আমেরিকাঃ (১৪)  ৬৫ কোটি ২৮ লক্ষ ৫২ হাজার ৮৪২।  বিশ্বজনসংখ্যার ৮.৪২ পার্সেন্ট।  (www.worldometers. info> world population > Latin America po… 23rd April, 2020). 
     উত্তর আমেরিকাঃ (১৫)  ৩৬ কোটি ৮৪ লক্ষ ২৮ হাজার ৯২২।  বিশ্বজনসংখ্যার ৪.৭৩ পার্সেন্ট।  ( www.worldometers.info > world population> Northern America po… 21ST April, 2020).  
     অস্ট্রেলিয়াঃ (১৬) ২ কোটি ৫৪ লক্ষ ৯৯ হাজার ৮৪৪।  মোট বিশ্ব জনসংখ্যার ০.৩৩ পার্সেন্ট। ( www.worldometers.info > world population> Australia po… 12TH April, 2020).
     যাই হোক, ভবিষ্যৎ পৃথিবী এবং মানবজাতির পরিণতি নিয়ে বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের গবেষণা আর অনুমান এ যাবৎ নানা  অভিমতে ডালপালা ছড়িয়েছে।  সভ্যতা রক্ষায় কুড়ি শতক থেকেই বার বার উচ্চারিত হয়েছে হুঁশিয়ারি।  তবে  বাস্তবতা হলো, মানুষ নিজেকে পরিবর্তিত না করে বিজ্ঞান প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে চিরকাল প্রকৃতিকেই নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে।  যে কারণে তার বিশাল জনভারের বিরাট কর্মযজ্ঞের আয়োজন সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে প্রকৃতির বিরুদ্ধেই।  প্রাকৃতিক সম্পদের অতি ব্যবহার, জীববৈচিত্র্যের বিনষ্টিকরণ, সবুজ অরণ্যের নিঃশেষণ প্রকৃতির মৌলিক ভিত্তিকেই ধ্বংস করেছে।  এর নেতিবাচক প্রভাব এতটাই অপ্রতিরোধ্য, এতটাই ব্যাপক ও ভয়ংকর যে, কোনো নতুন প্রযুক্তির অলৌকিক ক্ষমতা দিয়েই ভবিষ্যতে একে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না বুদ্ধিমান মানুষের পক্ষে।    
     অতএব বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে, জনসংখ্যা বিস্ফোরণের নেতিবাচক দিকগুলোকে গ্রাহ্য করে মানুষকেই তার প্রচলিত  ভোগবাদিতার লাগাম টেনে ধরতে হবে।  লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে চাপ কমাতে হবে প্রকৃতির ওপরে।  মানুষ ইচ্ছেমতো সন্তান উৎপাদন বাড়িয়ে যেতে পারলেও পৃথিবীর পক্ষে নতুন নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।  অন্তহীন কাল ধরে কোটি কোটি মানুষের  অতিরিক্ত লোভের তালিকা মেটানোও সম্ভব নয় তার পক্ষে।  পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে মানুষকে তাই প্রকৃতির নিয়ম মেনেই জীবন চালাতে হবে। কেননা জগত কেবল মানবজাতির একার আবাসভূমি নয়, বসুন্ধরার মাতৃকোলে বসবাসের অধিকার উদ্ভিদজগত, কীটপতঙ্গ, পশুপাখিসহ প্রত্যেকের।  মানুষ তাদেরই মতো প্রকৃতির অংশ, সেটা উপলব্ধি করার মুহূর্ত একুশ শতকে তীব্র মাত্রায় উপস্থিত।  
     মানুষের সহমর্মিতার পরশ পেলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ফের ফিরে আসবে তার মৌলিক অবস্থানে।  প্রকৃতি সবাইকে চিরকাল সাধ্যমতো দিয়েছে।  কিন্তু মানুষের রাক্ষুসে ক্ষিধে নিবারণ করা তার পক্ষে অসম্ভব, সেটাও সে জানিয়ে দিচ্ছে নানাভাবে। ‘Earth provides enough to satisfy Every man’s needs, but not Every man’s greed.’ সহমর্মিতার এই মর্মবাণী এমন একজন মানুষের,  যিনি জীবনের সার্থকতা ভোগবাদিতায় নয়, খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন সহাবস্থানের ভেতর দিয়ে।  তিনি সারা ভারতের বাপুজি।  মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। 

দীপিকা ঘোষ। ওহাইয়ো, যুক্তরাষ্ট্র