অটোয়া, সোমবার ২৩ মে, ২০২২
বিনতার সংসার - লাবণ্য কান্তা

বিনতা সিলেটের চা-বাগানের আটবছর বয়সী এক শিশুর নাম। তাকে কিশোরী বলা যায় না, তাকে মেয়েটি বলা যায় না, তাকে নারী বলা যায় না; সে একজন শিশু। অথচ এই গল্পের সে মহা নায়িকা। তার একটি মাটির ঘর রয়েছে, লালমাটির ঘর। চারদিকে মাটি দিয়ে গড়া আপন হাতের পরশ। সেই মাটির ঘরে বিনতা ঘুমায়। বিনতা ও বিমল মিলে গড়েছে তাদের সংসার। মা-বাবাহারা বিনতা ও বিমল ভাই-বোন, তাদের বেঁচে থাকার নাম সংসার। ভাই-বোনের সংসারের দুজন অসহায় অবুঝ মানুষ তারা। তাদের এই একটি সুস্থ চিন্তা আছে, তাদের বাঁচতে হবে। বাঁচতে হলে খাবার দরকার, বিমল মৌলভিবাজার জেলার কমলগঞ্জ ইউনিয়নের ‘দলই’ নামক চা-বাগানের একজন চা-শ্রমিক। চা বাগানে কাজ করে তাদের জীবন চলে। মা-বাবা কখন কিভাবে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে তারা হয়তো জানে, হয়তো জানে না। চা-বাগানের মৃত্যুগুলোর কোনো প্রকারভেদ নেই, কে কি প্রকারে মারা গেলো। কখনো সাপের কামড়ে কেউ মারা যায়, কখনো বিনা চিকিৎসায় ধুকে ধুকে কেউ মারা যায়, কখনো অপুষ্টিজনিত রোগের কারণে কেউ মারা যায়, কখনো বজ্রপাতে কেউ মারা যায়, কখনো আত্নহত্যায় কেউ মারা যায় ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে চা-শ্রমিকদের মৃত্যু ঘটে। বিমল আর বিনতার মা- বাবা কিভাবে কখন মারা গেছে তা অজানাই থাক; বিমল বিনতা কিভাবে বেঁচে আছে তার গল্পই বলা যাক। 

বিমল সারাদিন চা-বাগানে কাজ করে আর বিনতা সারাদিন ঘরের কাজ করে। সবুজের সমারোহে প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি একেকটি চা বাগান। সেইসব অপরূপ সৌন্দর্যের মধ্যে জরাজীর্ন জীবনের দুটি জীবন এই বিমল ও বিনতা। সারাদিন কি কাজ করে বিনতা? ভাই সকাল নয়টায় চা-বাগানের কাজে যাবে, তাই সকালে ভাইয়ের জন্য খাবার রান্না করতে হয় বিনতাকে। ভাইয়ের জন্য সামান্য খাবার গুছিয়ে দিতে হয় কাজের ফাঁকে ভাই খাবে বলে। বিনতা বিমলের ছোট বোন মাত্র  আট বছর বয়সী এই শিশুটি সংসার চালায়। ভাইয়ের সেবায় সে নিয়োজিত রয়েছে। যে কাজটি তাদের মা করতো আজ সেই কাজটি বিনতা করে। অথচ এই শিশুটির এখন স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া করার সময়, খেলার সাথীদের নিয়ে টিলাঘেরা চা-বাগানে শিরীষছায়ায় খেলা করার কথা। কিন্তু তাকে এখন চিন্তা করতে হয় ঘরের কাজ নিয়ে, ভাইয়ের সেবাযত্ন নিয়ে। ঘরে চাল আছে কিনা, জ্বালানি কাঠ আছে কিনা, চুলা ধরানোর ম্যাচ আছে কিনা, বাতি জ্বালানোর কেরোসিন আছে কিনা। সজনে পাতার শাক ভাজবার তেল আছে কিনা, শাকে দেবার নুন আছে কিনা। এসব হিসেব রাখা এই আট বছরের শিশুটির পক্ষে অসম্ভব হলেও, এই অসম্ভব কাজটির পুরো দায়ভার সে নিয়েছে। এসব দায়ভার নিয়ে সে এখন সংসারী।

আর কিছু না হোক, ভাইবোন মিলে একমুঠো খেয়ে বেঁচেছিলো সেই তো তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা। কিন্তু গত তেরোদিন যাবত তাদের দলই চা-বাগানটি বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন চা-বাগানের কাজ। এক সপ্তাহ কাজ করলে যে মজুরি পায় তাই দিয়ে পুরো সপ্তাহের চাল-লবন-তেল কিনে আনে তারা। কিন্তু এখন সেই কাজের পথটিও বন্ধ হয়ে গেছে। চা-বাগানের মালিক কিংবা ইজারাদার হঠাৎ চা-বাগান বন্ধ করে দিয়েছে। এই করোনাকালীন সময়ে জীবন বাঁচানো দায় যেখানে, সেখানে পুরো চা-বাগান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। চা-শ্রমিকেরা পুরো সপ্তাহ কাজ করে চা-বাগানে আর সপ্তাহান্তে মজুরি পায় তার ওপর নির্ভর তাদের জীবন প্রবাহ। কিন্তু তাদের ওপর যখন কোনো প্রতিশোধ নেয়া হয় তখন বিনা কারণে কিংবা কারণে-অকারণে বাগান কতৃপক্ষ বাগান বন্ধ ঘোষণা করে দেয়। যে শ্রমিকেরা একমাত্র চা-বাগানের কাজের সাথে জড়িত মজুরির ওপর জীবন নির্বাহ করে, তাদের সেই শেষ সম্বল কাজটুকুও যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন তারা অনাহারে মরে, কর্তৃপক্ষের সে দায় থাকে না, শ্রমিক কি খেয়ে বাঁচবে। এ এক অমোঘ নিয়তি চা-শ্রমিকদের জীবনে। এই নিয়তির ছোবল থেকে যেন তাদের নিষ্কৃতি নেই। এমনি এক নিয়তির ছোবলে দারিদ্রক্লিষ্ট জীবনের মমতাময়ী বিনতা ও তার ভাই বিমল অনাহারে থেকে যাওয়ার এই গল্প।

বিনতা মাত্র আট বছর বয়সে ভাইবোনের সংসার সাজিয়ে নিয়ে জীবন চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের ঘরের বাহ্যিক বর্ণনা এমন __ ঘরের সামনে রয়েছে ধানক্ষেত, পেছনে সবুজের সমারোহ আর চারদিকে নির্জন নিস্তব্ধতা তারই মাঝে তাদের প্রাত্যহিক জীবন। ভাই কাজে চলে যায়, বিনতা ঘর দোরের কাজ করে, রান্না করে। ভাই-বোনের মাত্র দুজনের সংসার, তবুও তো সংসার। সংসারের সমস্ত দায়ভার বিনতার ওপর। যখন বাগান বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ, তখন বিমলের হাতে টাকা নেই,  তাই বিমল চাল আনতে পারেনি, বিমলা চুলা জ্বালিয়ে রেখেছে, ভাত রান্না করবে বলে, ভাই বিমল নিশ্চুপ; বিনতার চুলা জ্বলছে তার অন্ধকার কুঠুরিতে, চুলোতে হাঁড়ি নেই। ঘরে চাল নেই, হাতে টাকা নেই ফাঁকা চুলোতে বিনতা আগুন ধরিয়ে বাইরে বসে আছে। সে জানে না তাদের পেটে কখন কিভাবে খাবার পড়বে। বিনতার অন্ধকার ঘরে ফাঁকা চুলা জ্বলছে আর বিনতা ও তার ভাই বিমলের পেটে জ্বলছে ক্ষুধার আগুন। দুই আগুনের মাঝখানে অসহায় বিনতার টলটল চোখের করুণ  চাউনি, আর বিমলের পাহাড় সমান মৌনতা অতিক্রম করছে বাংলাদেশের মধ্যম আয়কে, অতিক্রম করছে নগর সভ্যতাকে, অতিক্রম করছে ডিজিটাল যুগকে। এসবকিছুকে অতিক্রম করে বিমল ও বিনতার সমস্ত দেহে মনে লেগে রয়েছে আধুনিক যুগের পৈ্শাচিকতার গ্লানি। এই গ্লানি তারা বইবে কি করে তারা জানে না, এই গ্লানি তারা ধুয়ে উঠে একমুঠো অন্ন মুখে তুলবে কখন, কোন সকাল- দুপুর- সন্ধ্যারাতে তারা জানে না। একই আলো-বাতাসে বেঁচে থাকা মানুষ, একই মানচিত্রের বৃত্তে তাদের বসবাস অথচ তারা রয়েছে বৃত্তেরও বৃত্তের ভেতরে। যে আঁধার বৃত্তে প্রবেশ করে না অরুণোদয়ের প্রথম কিরণ, যে বৃত্তের ভেতরে ছোঁয়া লাগে না সভ্যতার বিকাশের আলো, যেখানে দৃষ্টি হরণ করেছে মুনাফার গণিত তত্ত্ব। 

বিনতা আর বিমলের মা-বাবার কি মৃত্যু হয়েছিল এইভাবেই, তারাও কি এইভাবেই ক্ষুধার জ্বালা সইতে সইতে একদিন মরে গেছে? বিনতা তা জানে না, হয়তো বিমল জানে, হয়তো বিমলের চোখের সামনেই কোনো একদিন তাদের মা বাবা এক এক করে নীরবে মরে গেছে। কে জানে এসব কথা! চা-বাগানের নিভৃতে-নির্জনে এইভাবে কতজন চলে যায়, দুধের শিশুটিকে রেখে; প্রকৃতির কোলে তারা প্রকৃ্তির নিয়মে লালিত পালিত হয়ে পুনরায় আট নয় বছরে চা-শ্রমিক হয়ে ওঠে, দারিদ্রের কষাঘাতে চলে তাদের জীবন। কখনো সাপ-বিচ্ছুর উপদ্রবে মরে যায়, কখনো বজ্রপাতে মরে যায় অথবা কখনো কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেয়া অনিয়মকে মেনে নিতে না পেরে মরে যায়। এখন দলই চা-বাগানের শ্রমিকেরা দৈনিক একশত টাকা মজুরির কাজটুকুও করতে পারছে না, বিনতার সংসারে ফাঁকা চুলোতে আগুন জ্বলে, আগুন জ্বলে তার শিশুমনের গহীনে, সেই আগুন আর দেখে কি কেউ কি দহন সেই মন্তরে! আগুন জ্বলে, আগুন জ্বলে, আগুন জ্বলে অন্তরে, চা-শ্রমিকের মনের ঘরে এমন কত আগুন জ্বলে! স্বপ্ন আসে স্বপ্ন মরে, এমন কত স্বপ্ন যে, চা-শ্রমিকের জীবন জ্বলে হাজার  শত ঘরে ঘরে। হাজার স্বপ্ন জন্মেই মরে, হাজার শিশু জন্মেই মরে, হাজার কত বিনতাদের স্বপ্ন নয় তো জীবন মরে। জীবন জ্বলে জীবন জ্বলে, এমন কত জীবন জ্বলে অত্যাচারের আগুনে যে এমন হাজার বিমল পুড়ে, পৈশাচিকতার আগুনেতে এমন হাজার শ্রমিক মরে দিনে রাতে।   

লাবণ্য কান্তা। ঢাকা