অটোয়া, শুক্রবার ২০ মে, ২০২২
অমরত্বের যাত্রী - সুজিত চট্টোপাধ্যায়

উটা মরে গেল। স্বামীটা বেঁচে রইলো। একমাত্র ছেলে, দায় এড়িয়ে অনেক আগেই হড়কে গেছে। মরক লেগেছে সারা পৃথিবীতে। স্বামী এখন কী করে। একা একা। এতবড় পৃথিবী।

স্বামী ভদ্রলোকের বয়স বাহাত্তর বছর। পালাবার পথ নেই। উপায়ও নেই। সহায়সম্বল শূন্য। শারীরিক ক্ষমতা তলানিতে। আত্মীয়স্বজন আছে, আবার নেইও। আর বাঁচার ইচ্ছে নেই। বউয়ের মারা যাবার সাথে সাথে, সেটুকুও মারা গেছে।

সেদিন ভোরবেলা, কাকেদের কা কা ডাকের সঙ্গে বিছানা ছাড়লেন। এলেন গঙ্গার ঘাটে। চটজলদি কাজ সারলেন। ঝপাং। ডুব। একেবারে জলের তলায়। নিঃশ্বাস ত্যাগ। প্রাণবায়ু টা টা বাই বাই।

যমরাজ নিদান দিলেন,, এ ভারী অন্যায়। আত্মহত্যা মহাপাপ। সুতরাং, যাও নরক দর্শনে।

অমর শীল, মানে ওই আত্মহননকারি, যমরাজের রায় শুনে প্রথমে গুম মেরে গেলেন।

পাঁচ সেকেন্ড পরে মৃদু হাসলেন, শ্রীকৃষ্ণ স্টাইল। তারপর বললেন, প্রভু,, কিছু বলার ছিল। আপনার আদেশ পালনের আগেই সেটা বলা জরুরি। নইলে পরে আর চান্স পাওয়া যাবে কিনা জানিনা তো তাই।

যমরাজ ব্যাজার মুখে নিমরাজি হয়ে বললেন,,, বলো,,, 

অমর শীল, হাতজোড় করে বিনয়ের সাথে বললেন,, একটিই প্রশ্ন প্রভু আপনাকে,,

যমরাজ কপাল কুঁচকে অবাক হয়ে বললেন,, আমাকে? প্রশ্ন? ও আচ্ছা  বেশ, বলো,, তবে একটিই কিন্তু। আমার সময় বড়ো দামী। সেটা মনে রেখো,,।

হ্যাঁ, প্রভু জানি, তাইতো একটাই প্রশ্ন,,

হুজুর  মানে প্রভু,,, আমি জীবিত কালে যে নরক দর্শন করে এসেছি, তারচেয়েও জঘন্য নরক আপনি আর কী দেখাবেন জানিনা। যাইহোক, আপনি আপনার ডিউটি অবশ্যই পালন করবেন। করুন। কিন্তু আমি জানতে চাই, মানে কৌতুহল বলতে পারেন,, আমার পরিস্থিতিতে আপনি থাকলে কী করতেন? মানে, বাঁচা মরার সিদ্ধান্ত নেবার ব্যাপারে আরকি।  ঠিকঠাক জবাব চাই প্রভু। চাতুরী করে ঘোরপ্যাঁচ উত্তর দিলে, আমি মর্ত্যের ছাপোষা নাগরিক খেই হারিয়ে ফেলবো প্রভু।

প্রভু বললেন,,, তোমার সমস্যাটা কী। আচমকা মরতে গেলে কেন? চিত্রগুপ্ত হিসেব পত্তর যা দেখালো, তাতে তো দেখছি তোমার আরও দশবছর আয়ু ছিল।

অমর শীল একটু চমকে উঠে বললো,,, আরও দশবছর?  সর্বনাশের মাথায় পা। খুব বাঁচান বেঁচে গেছি। বাপরে, আরও অতদিন আমাকে গুমরে গুমরে, কিসমিস মুখো হয়ে, দয়ার পাত্র হয়ে থাকতে হতো! ওফ, এইজন্যেই বলে, ঈশ্বর যা করেন, ভালোর জন্যেই করেন।

যমরাজ রাগত স্বরে বললেন,,, কী সব যা তা ভুলভাল বকছো, ঈশ্বর তোমাকে ডুবে মরতে বলেছেন?

রাগ করবেন না প্রভু। শুনতে পাই, যা কিছু হয়, সবই তার ইচ্ছে,,

চুপ করো। যতসব পাগলের প্রলাপ। তোমার প্রশ্ন কী তাই বলো।

ওই যে বললুম,,, আপনি হলে কী করতেন?

যমরাজ একটু ঢোঁক গিলে নিয়ে বললেন,,, হ্যাঁ,, মানছি, তোমার সবদিক থেকেই খুবই অসুবিধে ছিল। একাকীত্ব, অনটন, মানসিক বিপর্যয়, তবুও তোমার জলে ডুবে মরে যাওয়া, মেনে নিতে পারছি না।

অমর শীল ঝটপট উত্তর দিলো,,, তাহলে গলায় দড়ি, গায়ে আগুন দিলে ঠিকঠাক হতো বলছেন?

মূর্খ। ধমকে উঠলেন যমরাজ। সে সব তো একই কান্ড। শুধু ধরন আলাদা। জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার জন্য তোমাকে মানব জনম দেওয়া হয়নি মূর্খ, বুঝেছ?

অমর শীল কাঁচুমাচু হয়ে বললো,,, সে তো জানি প্রভু। বিশ্বাস করুন মানব জীবনের প্রায় সবই পালন করেছি। সংসার ধর্ম, ন্যায় ধর্ম, কর্তব্য ধর্ম, প্রেম ধর্ম। উদয় অস্ত নাকে দড়ি দিয়ে,, যাক সেসব কথা। বলুন না স্যার মানে প্রভু,, আপনি হলে কী করতেন?

যমরাজ ঠোঁটের আগায় দুষ্টু মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বললেন,,,, সহ্য ধর্ম? কিহে, বলো?  মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ, সহ্যগুণ, সহ্যশক্তি। কী? পালন করেছ?

অমর শীল, প্রথমে নাক দিয়ে ফোঁসফোঁস আওয়াজ করলো, তারপর ভেউভেউ করে কেঁদে উঠলো,,,,,,,,, প্রচুর করেছি স্যার,, প্রভু। সারাটা জীবন শুধুই সহ্য পুষে রেখেছি এই বুকের মাঝে। কম বয়সে কতকিছুই ভেবে ছিলুম। এই করবো, সেই করবো। এই হবো, সেই হবো। কিছুই হলো না। হলুম কেরানি। বিয়ে করলুম। একটা ছেলে। লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করলুম। তার রোজগারের ব্যবস্থা করে বিয়ে দিলুম। কদিন যেতে না-যেতেই, সে হারামজাদা বউ নিয়ে আমাদের ফেলে, অন্য জায়গায় বাসা বাঁধলো। একটা মেয়ে। সাজিয়েগুছিয়ে ভালো পাত্র দেখে, গুচ্ছের খরচ করে বিয়ে দিলুম। খোঁজ নেবার সময় পায় না। নিজের সংসার নিয়েই ন্যাটা ঝামটা অবস্থা। একদিন আমার একমাত্র বউটাও,,,,,,,কথা শেষ হলো না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। তারপর, একটু সামলে নিয়ে উদাস কন্ঠে উচ্চারণ করলো,,,,,,,একা। এক্কেবারে একা।
তাই ভেবে দেখলুম, দুরছাই নিকুচি করেছে। অনেক সহ্য করেছি।  সহ্যশক্তি দিয়ে অনেক অপমান, লাঞ্চনা গঞ্জনা প্রতারণা হজম করেছি। মানুষের উপকার ভিন্ন অপকার করিনি কখনও। অনেক হয়েছে, আর না। এবার শেষ হোক ভবের খেলা। ক'রে ফেল্লুম মনস্থির। একেবারে এক ডুবে আপনার দরবারে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,, যাকগে, এবার বলুন তো,, আপনি হলে কী করতেন? 

যমরাজ, দুটি দানা বেদানা মুখে ফেলে দিয়ে, চোখ বুঁজে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,,, তাহলে স্বীকার করছ, শেষমেশ সহ্যশক্তি তোমাকে কুপোকাত করলো।

অমর শীল মাথা হেঁট করে বললো,,, হ্যাঁ, তা বলতেই পারেন।

তাহলে?  খুব যে সহ্যধর্ম পালনের সাতকাহন শোনাচ্ছিলে? এইবার কী বলবে?

বলতে পারি স্যার, যদি অনুমতি করেন, বলবো?

স্বরে বেশ আকুতি আর আগ্রহ মিশে ছিল। তাই, অনিচ্ছুক স্বরে যমরাজ অনুমতি দিলেন। বেশ,, বলো,,।

অমর শীল, বেশ গর্বিত গলায় বলতে শুরু করলো,, জানেন স্যার,, 
প্রভু বলা একেবারেই অভ্যেস নেই। তাই স্যার দিয়েই, মানে অভ্যস্ত উচ্চারণ দিয়েই কাজ চালাচ্ছে।
যমরাজও নিশ্চয়ই ব্যাপারটা বুঝেছেন। তাই তিনিও ধীরে ধীরে ব্যাপারটায় সড়গড় হয়ে উঠেছেন।
আমি যখন জলের একেবারে তলায় তলিয়ে যাচ্ছি, ঠিক তখনই আমার মনে হলো,,,,এই জলের ওপরে কত বাতাস। মাথাটা একটু ওপরে তুলতে পারলেই বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারবো।
কিন্তু বিশ্বাস করুন স্যার। সহ্যশক্তি। মাইরি বলছি।  সারাজীবনের সঞ্চিত সমস্ত সহ্যশক্তি একত্রিত করে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলুম,,,,না, কিছুতেই না। সংকল্প যখন করেছি, তখন কিছুতেই দুর্বল হবো না। আমি মরবো। মরবোই,,,,,,,,দেখতেই তো পাচ্ছেন স্যার, আমার সহ্যশক্তি জয়লাভ করেছে। আমি পেরেছি। আমি জয়ী।

গুষ্টিরমাথা। হতভাগা অকালকুষ্মাণ্ড পাপী। যমরাজ রাগে কাঁপতে কাঁপতে সিংহাসন থেকে নেমে এসে একেবারে অমর শীল এর নাক বরাবর দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে যাচ্ছেতাই করে কুকথা আওরাতে থাকলেন।
মূর্খ, অমানুষ, কান্ডজ্ঞানহীন। তারপরেই হঠাৎ একেবারে শান্ত হয়ে গেলেন। বললেন এসো আমার সঙ্গে।
তাকে নিয়ে এলেন এক মনোরম পরিবেশে। চারিদিক শান্ত। সামনেই টিয়ারঙ সবুজ পাহাড়। তার গায়ে দুধসাদা ফেনা তুলে পরম আনন্দে নেচে নেচে নেমে আসছে রুপোলী ঝর্ণাধারা।

ঠিক তার নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে এক পরমা সুন্দরী লাজবতী নদী। গতি আছে কিন্তু অকারণ ব্যাস্ততা নেই। তার এই অভিজাত চলনই যেন তাকে আরও রূপবতী করে তুলেছে। আর আছে পাখিদের কাকলী।
হায়রে, জীবন যদি এমন মধুময় হতো? তবে সহস্র কাল তপস্যা করেও, অনন্ত জীবনের বর চেয়ে নেওয়া যেতো। আহা, কত রঙের ফুল থরে থরে ফুটে আছে চরাচর ময়। তাদের মায়াময় সুবাসে আমোদিত সারাটি ভূবণ।

অমর শীল এখন এই মুহূর্তে এক অন্য মানুষ। সব দুঃখ হতাশা কোথায় যে অন্তর্ধান করেছে, তার হদিশ বোধকরি স্বয়ং ঈশ্বরেরও অজানা। সেই অনাবিল খুশিতে ডগমগ হয়ে, সে এখন নিতান্তই নিরীহ নিষ্পাপ শিশু মনের অধিকারী। তার সেই সরলতার মৃদু পরশ দিলো পবিত্র ফুলের গায়ে।
মুহূর্তে শত সহস্র রঙিন প্রজাপতি, আকাশে রঙধনু রঙ ছড়িয়ে প্রবল নির্বাক উচ্ছ্বাসে উঠলো নেচে। যেন এক আশ্চর্য মধুর সুর মূর্ছনায় ভেসে যায় অন্তরাত্মা। চোখে তার আনন্দাশ্রু। মুখমণ্ডল সুখানুভূতির আলোয় উজ্জ্বল। এইতো চেয়েছিল সে সারাজীবন ধরে মনে মনে।

যমরাজ, অমরের দিকে তাকিয়ে তার মানসিক পরিবর্তন দেখে, মুচকি হেসে বললেন,,,কেমন অনুভব করছো?

অমরের মুখে বাক্যি সরে না। বিস্ময় ভরা গোলগোল চোখ করে , কোনক্রমে উচ্চারণ করলো,,,  অদ্ভুত,, অনির্বচনীয় সুন্দর সুখানুভূতি।

যমরাজ আবারও মৃদু হেসে বললেন,,,,,তুমি কী তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছ?

অমর, আবেশ জড়ানো গলায় ছলছল চোখে বললো,,,,,পেয়েছি। পেয়েছি প্রভু আমার।

এই "প্রভু" উচ্চারণ কালে, আর কোনও জড়তা, দ্বিধা কিংবা তাচ্ছিল্য বোধ ছিল না। ছিল নিতান্তই অন্তরের অন্ধকার কেটে যাওয়া, নিরাসক্ত সরলতা।

পেয়েছি প্রভু। সারাটা জীবনকাল ব্যয় করেছি শুধু নিজের জন্যে। ক্ষুদ্র সংসারের দাবীদাওয়া, চাওয়া-পাওয়া, দেনাপাওনার হিসেবনিকেশ করে করে।

অথচ, চোখের সামনে থাকা এই বিশাল বিশ্ব সংসারের দিকে এক পলক তাকিয়ে দেখার ফুরসত মেলেনি।
বুঝতেই পারিনি প্রভু, মানুষের হাতে তৈরি করা ক্ষুদ্র সংসারের দায়দায়িত্ব একদিন শেষ হবারই ছিল। তবুও মোহ আর প্রত্যাশার মায়াজালে আবদ্ধ থাকলাম আজীবন।

ওফঃ,, ভুল ভুল।

অমর, প্রবল আক্ষেপে কপাল চাপড়ে কাঁদতে থাকলো।

যমরাজ, পরম স্নেহে তার মাথায় হাত রেখে বললেন,,,,,,জগতের এই নিয়ম। বৃহৎ বিশ্ব সংসারের থেকে কেবলই নেওয়া। বিনিময়ে কিছু ফিরিয়ে দেবার তাগিদ নেই। তাগিদ কেবলই নিজস্ব তৈরি করা সংসারের প্রতি। অথচ পরিনাম দেখো,,,,তুমি নিজেই।

সেই মনোরম পরিবেশে, বহে যাওয়া সুন্দরী নদীর বুকে নগ্ন অবগাহন করতে করতে, সব মনস্তাপ গেল ধুয়ে। নবদিগন্তের বিশুদ্ধ সোনালী ঝলমলে  আভায় অমর যেন অমরত্বের যাত্রী হয়ে উঠলো।

সুজিত চট্টোপাধ্যায়
৯৩ বি,, সীতারাম ঘোষ ষ্ট্রীট
কলকাতা,, ৭০০০০৯