অটোয়া, শনিবার ১৭ আগস্ট, ২০১৯
বাদাইম্যা (৪) – কবির চৌধুরী

বাদাইম্যা   তিন(৩)  পড়তে ক্লিক করুন   

মাথার পাশে রাখা সেলফোনে রিং হচ্ছে। চোখ বন্ধ রেখেই হানিফ ফোনটি ধরে,
-হ্যালো
-কিথা_বে ! এখনও ঘুমও? 
-জ্বী ভাবী  
-কয়টা হইছে খেয়াল আছে! কাইল বিকালে ফোন করছিলে? আমরা বাইরে ছিলাম। পরে ফোন দিলাম_ পাইলাম না। 
-বাইরে আছলাম।  
-কেনে ফোন করছিলে?   
-পয়সার লাগি_ পয়সা লাগব। পকেট একেবারে খালি। 
-আমার কাছে কোন পয়সা নাই। আমি পয়সা পাইতাম কই। তর ভাইরে ক’। কাম ধরোছ্‌ না কেনে? 
-ভাবী প্লিজ। বেশি না_ ২/৩শ অইলে অইবো। কামকাজ ধরলে দিলাইমু নে। 
-গত ২৫/৩০বছর থাকি এই এক কথাই শুনছি।    
-ভাবী- ২/৪ ঘন্টার ভিতরে পাঠাউকা। বিকালে লাগবো। এখন রাখি। ভালা থাকঅইন।

ফোন রাখার সময় হানিফ ভাবীর অস্পষ্ট কথা শুনতে পায়_ “বাদাইম্যা___” ভাবী তাকে প্রায় সময়ই এই বলে সম্বোধন করেন। নিশ্চয়ই ভাইসাবের প্রশ্নের উত্তরে ভাবী বলছেন_ আর কে? তোমার “বাদাইম্যা” ভাই।  

ভাবীর ফোন রেখে হানিফ আরেকটু ঘুমাবার চেষ্টা করে। গতরাতে পাওলা যখন তাকে নামিয়ে দেয় তখন প্রায় ভোর। ডিনার শেষে ওরা যখন আল’স স্টেইকহাউস থেকে বের হয় তখন রাত প্রায় বারোটা। পাওলা হানিফের কাছে গাড়ির চাবি দিয়ে বলে_ বি কেয়ারফুল, আস্তে চালাবেন। রাতের অন্ধকারের ঝাঁকঝাঁক জোনাকির মায়াময় আলিঙ্গনবেষ্টিত অবস্থায় হানিফ গাড়ী চালাতে চালাতে মন্ট্রিয়লের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।       

ঘুম আসছে না। ফোনটা আবার হাতে নেয়। অভ্যাসমত ফেইসবুক ওপেন করেই একেবারে থ’ হয়ে যায়! একি দেখছে সে! ফেইসবুক ফ্রেন্ড একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন। পোস্টের সাথে ফটোর মানুষটি হানিফের খুবই পরিচিত। শুধু হানিফ না, অটোয়ার অধিকাংশ বাংলাদেশিদের পরিচিত_ তিনি হলেন হানিফের ‘মিন্টুভাই’। ফেইসবুক বন্ধুটি তার শেয়ারকৃত পোস্টের উপরে লিখেছেন_ “এই তো মাস দুয়েক আগে অরলিন্স মসজিদে উনার সাথে শুক্রবারের নামাজ পড়েছি, অথচ আজ উনি আমাদেরকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন _ ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাহির রাজিউন।” হানিফ বিশ্বাস করতে পারছে না। কি করবে! ভেবে পাচ্ছে না। মনে মনে বলছে- “আল্লাহ খবরটা যেন ফেইক হয়। মিথ্যা হয়। কাকে ফোন করবে? পোস্টদাতার টেলিফোন নাম্বার জানে না। তখন সকাল সাতটা বা আটটা হবে। ফ্যামিলি ডে। সবাই ঘুমে। মিন্টু ভাইয়ের ছোট ভাইকে ফোন করবে? ভয় হচ্ছে! কিভাবে এই অবিশ্বাস্য সংবাদের কথা জানতে চাইবে? অবশেষে সে ‘মিন্টুভাই’-য়ের দুলাভাইকে ফোন করে জানতে পারে সংবাদটি সত্য। ইতিমধ্যে অটোয়ার পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটি এই শকিং সংবাদটি জেনে গেছেন। শহর শোকে মুহ্যমান। সবারই এক কথা ‘অবিশ্বাস্য!’ বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। অটোয়ার অনেকের মত হানিফও ‘মিন্টুভাই’-য়ের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে দেখতে যায়। সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে_

গত শতকের নব্বই দশকের প্রথম দিকের কথা। স্পুরস, পাইন, ম্যাপল, চেডার তার রূপ ফিরে পাচ্ছে, ঊষ্ণ-ঠান্ডা বাতাসে অটোয়ার বর্ধিষ্ণু বাংলাদেশি কমিউনিটিতে মজাদার রোমাঞ্চকর আর আনন্দদায়ক একটা খবর ঘুরে বেড়াচ্ছে। কয়েকশ’ বাংলাদেশি অধ্যুষিত অটোয়া হঠাৎ করে আনন্দের ঘূর্ণিতে আন্দোলিত। অরলিন্স, নেপিয়ান থেকে শুরু করে অটোয়ার সর্বোচ্চ টাওয়ার ‘চ্যাপেল টাওয়ার’ একঝাঁক  তরুণের পদচারণায় মুখরিত!  হানিফ অটোয়াতে প্রায় ৬ বছর। এই ৬বছরে সে অটোয়ার এমন রূপ আগে কখন দেখেনি। হঠাৎ করে অটোয়ার বাংলাদেশিদের এভাবে এক্সাইটেড হয়ে উঠার কারণ_ বাংলাদেশ এসোসিয়শনের নির্বাচন। হানিফ জানতে পারে আগামী শনিবারে ওয়েগিং প্রাইভেটের একটি কমিউনিটি সেন্টারে বাংলাদেশ সমিতির মিটিং হবে এবং সেখানে আগামী বছরের জন্য সমিতির কার্যকরী পরিষদ নির্বাচন করা হবে।    

হানিফ বরাবরই এসব অনুষ্ঠানে যেতে পছন্দ করে। সেদিনও গিয়েছিল। সংগঠনের কমিটি এবং তার কার্যক্রম নিয়ে সমিতির সেদিনের মিটিং অন্যান্য যে কোন মিটিং এর মত ছিল। আলোচনায় এটি স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, কয়েকশ’ মানুষের কমিউনিটিটা দুভাগে বিভক্ত। নতুন আর পুরাতনের সংঘাত। এযেন বাংলার চিরাচরিত রূপ। একপক্ষের জোরালো আবেদন সমিতির কর্মকাণ্ডে তাদেরকে জড়িত করতে হবে, অন্যপক্ষের অনীহা প্রকাশ পরিস্কার। সেদিন প্রায় ৪ঘন্টা আলাপের পর একটি সিদ্ধান্তে আসা হয় যে, উভয় গ্রুপের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে সমিতির কমিটি গঠন করা হবে। যদিও শেষ পর্যন্ত তা হয় নি। হানিফ পুরোটা সময়ের তর্ক-বিতর্ক খুব মনযোগ দিয়ে শুনে। এতসব আলোচক-সমালোচকদের মধ্যে হালকা-পাতলা ধরনের উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের এক তরুণের যুক্তিনির্ভর আলোচনা এবং বিনম্রতা হানিফকে মুগ্ধ করে। আলোচনা সভার শেষে সে তাঁর সাথে পরিচিত হতে যায়, 

-স্লামালাইকুম ভাই, আমি হানিফ।      
-ওয়ালাইকুমুসসালাম ভাই, আমি মিন্টু।
-আপনার কথাগুলো খুব ভাল লাগলো। 
-ধন্যবাদ।
-আপনার দেশের বাড়ী কোথায়? কতদিন হয় অটোয়াতে?
-বগুড়া। এই তো বছর দুয়েক। আপনার? অটোয়াতে কতদিন?
-সিলেট। প্রায় পাঁচ বছর। 

এভাবেই হানিফের সাথে ‘মিন্টুভাই’য়ের পরিচয়। সে পরিচয় এক সময় আত্মার সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়। ‘মিন্টুভাই’ বিএনপির রাজনীতি করতেন। রাজনৈতিকভাবে হানিফ ভিন্ন এক মেরুর মানুষ। রাজনৈতিক মতানৈক্য তাদের সম্পর্কে কোন ফাটল ধরাতে পারেনি। সবসময়ই তারা একে অন্যের সাথে যোগাযোগ রাখতো। গতবছর ‘মিন্টুভাই’কে যখন এ্যাসোসিয়েশনের পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয় তখন তিনি বলেছিলেন, 

-হানিফ ভাই, আমাকে সাহায্য করতে হবে।  
-কি বলেন? আপনাকে সাহায্য করবো! এবং আমি! কি হয়েছে?
-এ্যাসোসিয়েশনকে পুনর্গঠন করতে হবে।   
-অবশ্যই ‘মিন্টুভাই’। কনগ্রেচ্যুলেশন। আমি আপনার সাথে আছি। আপনি শুরু করেন। আমি নিশ্চিত, আপনি তা করতে পারবেন।   

হানিফের ‘মিন্টুভাই’ তা করতে পেরেছিলেন। এ্যাসোসিয়েশন তার আগের রূপ ফেরত পাচ্ছে। এবছর ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে তার প্রিয় বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অস্থায়ী শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করবে। অটোয়াবাসীর সেই ফুল দেওয়া ‘মিন্টুভাই’ দূরের আকাশ থেকে দেখবেন ---চলবে। 

কবির চৌধুরী
অটোয়া, কানাডা।