অটোয়া, বৃহস্পতিবার ১৮ এপ্রিল, ২০১৯
মনের চিলেকোঠায় জীবাশ্ম হয়ে…… (শেষ পর্ব) – বন্যা হোসেন

মনের চিলেকোঠায় জীবাশ্ম হয়ে- (১ম পর্ব) পড়তে ক্লিক করুন

৪)

মাদের পরিবারের উত্তরণের  চিত্রটি ধাপে ধাপে বদলে গেছে আমরা বড় হওয়ার সংগে সংগে। আমাদের ভাইবোনের মনে একটাই দুঃখ বাবা পিয়নের চাকরি করেন বলে। মায়া প্রায়ই তার শ্বশুরবাড়ি থেকে এসে মায়ের কাছে মিনতি করে এবার যেন বাবা চাকরি ছেড়ে দেয়। সারা জীবন অনেক কষ্ট সয়েছে  বাবা, উপযুক্ত ছেলেমেয়ে তৈরী করার পরও তাকে কেন চাকরি করতে হবে! আমি বুঝতাম বাবা কেন সাহসিকতার সাথে চাকরি ছাড়তে পারছে না। কারণ তার একমাত্র ছেলে তখনও সংসারের জোয়াল কাঁধে নেয়ার জন্য প্রস্তুত নয়।   

আমি ঢাকায় পড়তে এসে নানাধরনের বন্ধু জুটিয়ে নিজস্ব এক জগত তৈরী করে নিয়েছি। যেখানে আমাকে পিয়নের ছেলে বলে কেউ চিনে না। এখানে আমাকে মানুষ আমার পরিচয়েই চেনে, বাবার পরিচয়ে আমাকে পরিচিত হতে হয় না। লজ্জা সংকোচ কাটিয়ে স্বমহিমায় ঘুরে বেড়াই। আমাকে পিওনের ছেলে বলে তাচ্ছিল্য করার কেউ নেই।  

আমি সগর্বে ছাত্র পড়াই, বাড়ীতে খুব কম যাই, বাবা মাঝে মাঝে দেখা করতে এলে লুকিয়ে থাকি। বাবাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি সরকারের নিম্ন শ্রেণীর কর্মচারী। তার পোশাক, বেশভূষা ছিল যথেষ্ট মার্জিত। কিন্তু কথা বলতে গেলেই বোঝা যেতো তার শিক্ষার দৈন্যতা। তাই আমি কখনোই চাইনি আমার  উচ্চশিক্ষিত বন্ধুবান্ধবের পরিমণ্ডলে তার পরিচয় দিতে। যদিও বাবা অনেকদিন সরকারি অফিসের বড় বড় আমলাদের সাথে কাজ করার সুবাদে প্রচুর ইংরেজী শব্দ শিখেছিলেন, সেগুলো আবার ভুল জায়গায় প্রয়োগ করতেন…...বাবা...আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লজ্জা!

মনেপ্রাণে চাইতাম সরকারী আমলা হবো। বাবাকে দেখিয়ে দেবো আমার সত্যিকারের পরিচয়। মায়ের কাছ থেকে জোর করে একটা মোবাইল ফোন কিনে নিয়েছি। কিন্তু আমি ভুলেও বাড়ীতে ফোন করে মায়ের বা বাবার খোঁজ করি না। মা নিজেই ফোন করে বাস রাস্তার সামনের ফোনের দোকান থেকে, ছোট বোনটাও করে মাঝেসাঝে। আমি খুব নির্লিপ্ত মনে ওদের সাথে কথা বলি। মনে মনে ভাবি,সরকারী চাকরীর পরীক্ষায় পাশ করে তর তর করে উন্নতির শিখরে আমি উঠে যাবো। এসব আবেগী, পরগাছা নিম্ন শ্রেণীর আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রেখে  আমার নিজের পায়ে কুড়াল মারার কোন ইচ্ছে নেই। আমি শিক্ষিত , মার্জিত, রুচিবান মানুষ----শিল্প, সাহিত্য,সংস্কৃতির অনুরাগী। পথ চলতে গিয়ে ধু্লোবালি লাগে গায়ে, ঘরে ফিরেই  সুগন্ধী সাবানে ধুয়ে নিজেকে সাফসুতরো করে নিতে হয়। আমার জীবনের  ১৮টি বছরকে পথচলতি ধুলো বলেই মনে করেছি। 

এত পড়াশুনা, অধ্যবসায় আর পরিশ্রমের পরেও একেবারে শেষ পরীক্ষাটিতে আমি নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হলাম। মন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলো। মেসের বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে হু হু করে কেঁদেছি। আমার এতদিনের স্বপ্ন, আশা সব মিথ্যে হয়ে গেলো। দ্বিতীয়বার আবার প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দেবার ইচ্ছে  ছিল না। সেসময় কয়েকজন বন্ধু বিদেশে চলে গেল...কেউ কাজ নিয়ে...কেউ উচ্চশিক্ষার্থে। আমার মাথায় ঘুরপাক করছিল এ ধরনের চিন্তা। খোজখবর করে খুব অল্পদিনের মধ্যে মালয়েশিয়ার একটি কোম্পানীতে  কাজ করার সুযোগ পেয়ে গেলাম। তখন আমাকে পায় কে! 

৫)

প্রায় তিন বছর পর বাড়ী এলাম। মায়ের কাছে আবদার করলাম প্লেন ভাড়ার। মা তার অভিজ্ঞ সংসারী চোখে তার প্রথম সন্তানের ব্যাক্তিত্ব আর চরিত্র বোঝার চেষ্টা করছিলেন। কি বুঝলেন তিনিই জানেন!  তবে অর্থ দিতে তার অক্ষমতার কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন। মায়ের প্রত্যাখানে বেশ রুষ্ট হলাম। ছেলেবেলা থেকে মা আমাকে তার ক্ষুদ্র মুষ্টিতে  অকাতরে বিলিয়ে গেছেন। আমার ধারণায় ছিল না, মা এভাবে আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারেন। মায়ের হাতে বা ব্যাংকে সবসময় বেশ কিছু অর্থ সঞ্চয় থাকে এ আমি ছেলেবেলা থেকেই জানি। তার সঞ্চিত অর্থ থেকেই আমার আবদার মিটিয়েছেন চিরকাল।  

সেই মা  বঞ্চিত করলেন আমাকে তার স্নেহ থেকে, কিন্তু কেন ? এ প্রশ্ন আমার মনে এলেও বিদেশ যাত্রার চিন্তা আমার  মগজকে কুয়াশামন্ডিত করে রেখেছিল । বাবাকে ধরলাম… হ্যাঁ সেই বাবা ...যাকে আমি মনে প্রাণে ঘৃণা করি তার পেশার জন্য, তার নীচুবংশের জন্য, তার অশিক্ষার জন্য, পরিচয়বিহীন নাম গোত্রহীন পরিবারে জন্ম দিয়ে লজ্জিত করবার জন্য। 

বাবাকে একবার বলতেই  ব্যাংকে নিয়ে গিয়ে তার সঞ্চিত কিছু অর্থ তুলে দিলেন। বাকীটা খুব শিগগীর দেয়ার ব্যবস্থা করবেন কথা দিলেন। পরে জেনেছি, জমি বন্ধক দিয়ে বাকী অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন মাকে লুকিয়ে। 

সেদিন সন্ধ্যায় বাবা যখন পুরো টাকা আমার হাতে তুলে দেন, মায়ের চোখে ধরা পড়ে যাই আমরা। মা তুমুল অনর্থ করেন। মায়ের রুদ্রমূর্তি সেই প্রথম দেখেছি। শান্তশিষ্ট, ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ যেমন সর্বস্ব হারিয়ে বুক চাপড়াতে থাকেন, প্রবল শোকে মুহ্যমান হন  তেমনিভাবে মা আমাকে শাপ শাপান্ত করছিলেন। বাবাকে চরম সর্বনাশের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন। মায়ের চন্ডালীনি সর্বহারা রূপ দেখে আমি কিংকর্তব্যবিমুঢ়  হয়ে বসেছিলাম কিছুক্ষণ। 

কিন্তু  সে অল্প সময়ের জন্য। এত অপমান, অভিশাপ নিজের মা করছে … মেনে নেয়া অকল্পনীয় লাগছিল। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ছেড়ে দেবো না, আজ কাউকে ছেড়ে দেবো না। এদের জন্য সারা জীবন সংকুচিত হয়ে থেকেছি, কুন্ঠায় ভীরু মন  সমাজের উঁচু তলায় ঢোকার প্রবেশপত্র পাইনি। নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হয়েছে মুখোশের অবগুন্ঠনে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বন্ধুদের সাহিত্য, রাজনীতি নিয়ে কত জ্ঞান… জন্মের পর থেকে ওরা সুবিধা পেয়ে এসেছে শিক্ষিত পরিবেশে জন্ম লাভের সুবাদে। আর আমি ? অনেক আলোচনা, বিতর্কে, রাজনৈতিক তর্কে অংশ নিতে পারি না আশৈশব অশিক্ষার কারণে। বাবার অফিসের বড়সাহেবের দাসত্বগিরি করে করে মোসাহেবি মুখমন্ডল দেখলেই যে ক্ষোভ জমা হতো ...মায়ের পাই পাই করে সঞ্চয় ...অসহ্য! 

বহুদিন ধরে মায়ের উপর  একটা পুঞ্জীভুত আক্রোশ জমে জমে বৃহৎ আকার ধারণ করেছিল। মা যদি বড়সাহেবের দাস এই পিওন লোকটাকে বিয়ে না করে একজন শিক্ষিত অফিসারকে বিয়ে করতো তাহলে আজ আমার এত ক্ষোভ জমা হতো না। ফেটে পড়লাম আমার ভিতরে জমে থাকা হতাশা, হীনমন্যতা আর ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি নিয়ে। ইচ্ছেমত কথা শুনিয়ে দিলাম আমাকে এই পৃথিবীতে নিয়ে আসা আদিম দুই মানব মানবীকে। তাদের স্তম্ভিত, বিবর্ণ মুখাবয়ব আমাকে রুখতে পারেনি।   উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেটগুলো তখন আমার চোখের সামনে নেচে নেচে ভেংচি কাটছিল আর বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছিল। আমি থোড়াই পরোয়া করি নির্জীব কাগজের টুকরোদের!  
অগ্ন্যুৎপাতের গলিত লাভায় পুড়িয়ে দিয়েছি আজন্ম লালিত এ সম্পর্ক, ছিন্ন করেছি নাড়ীর বন্ধন, অস্বীকার করেছি পিতৃপরিচয়, মুছে ফেলেছি দারিদ্র্যের সোঁদা গন্ধ, শিকড়  উপড়ে চলে গিয়েছি  আত্মসুখের সন্ধানে। 

মালয়েশিয়ায় দুবছর যে কোম্পানীতে কাজ করেছি তারা খাটিয়ে মারতো। বহুতলা দালান নির্মাণের কোম্পানীতে আমার পদটি ছিল স্রেফ শ্রমিকের। দিনরাত উদয়াস্ত পরিশ্রম করে কুলকিনারা পাচ্ছিলাম না। একটু একটু করে বোধোদয় হচ্ছিল, কিন্তু বেঁচে থাকার বা টিকে থাকার সংগ্রামে আবেগের কোন স্থান নেই। ফেলে আসা শেকড় তাড়িত করে ঠিকই। হঠাৎ রাতদুপুরে ঘুম ভেংগে আলোকজ্জল ঝলমলে নগরীর দিকে তাকিয়ে নিজের মাতৃভূমির সোঁদা মাটির গন্ধ পেতে মন আনচান করে। 

বাবা তো আমার চেয়ে ভালো কাজ করতেন…...মনে হতো প্রায়ই। দাস না হলে দাসত্বের মর্ম কি বোঝা যায় ? 

৬)

আমার নিজের অহমিকা আমাকে চূর্ণ করে দিচ্ছিলো…...চূর্ণ বিচূর্ণ হতে হতে বিলুপ্ত হয়ে যাবার আগে আরো কিছু জ্ঞান আহরণ আমার বাকী ছিল। সুযোগ হলো ইউরোপ যাবার, চলে গেলাম জার্মানীতে। বাংগালী রেস্টুরেন্টে কাজ পেলাম চটপটে স্বভাব আর ভালো ইংরেজী জানার কারণে। পাশাপাশি জার্মান ভাষা শিখে নিচ্ছি। কিন্তু এখানে থাকার বৈধতা শেষ হয়ে গেছে তিনমাস পর। বৈধ হবার একটাই পথ ---- এদেশের নাগরিককে বিয়ে করা। 

বিয়ে,সংসার নিয়ে কখনোই খুব একটা ভাবিনি পরিবারের উপর আক্রোশ থাকার কারণে। নারীজগত থেকে সবসময় নিজেকে আড়ালে রেখেছি, সাহিত্যে রোমান্স পড়ে রোমাঞ্চিত হয়েছি কিন্তু নিজের জীবনে রোমান্সকে স্থান দিতে চাইনি।

কাজের সূত্রে পরিচিতরা বিভিন্ন স্বর্ণকেশীর খোঁজ দিচ্ছেন, পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। সোফিয়া নামের এক  চল্লিশোর্ধ ডিভোর্সী চুক্তিমূলক বিয়েতে সম্মতি দিলেন। বিনিময়ে তাকে মোটা অর্থ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলো। রেস্টুরেন্টের মালিক ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু, নিজ দেশ থেকে আসা আমার মতো সহায়সম্বলহীন মানুষকে তিনি নিজের আপনজনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তাদেরকে যথাসম্ভব নিরাপত্তা দিতে চেষ্টা করতেন। আর্থিক প্রতিশ্রুতি মালিক দিয়েছিলেন আমার কাজের বিনিময়ে। কাজ করে পুষিয়ে দিবো সংকল্প করেছি। 

পৃথিবীটা মাত্র তখন চিনতে শুরু করেছি । বিয়ে হলো, কিন্তু সোফিয়া টাকা নিয়ে পালিয়ে গেলো। ঋণে জর্জরিত আমি মুষড়ে পড়লাম, অবৈধ অবস্থায় যেন কারাগারে বন্দী হলাম। মালিকের বদান্যতায় দুঃখ ভুলে কাজ করে যাই মেশিনের মতো। আমার সৌভাগ্য, রেস্টুরেন্ট ব্যবসা সেসময় তুঙ্গে ছিল। তাই কাজ হারাতে হয়নি। আমি মন প্রাণ দিয়ে কাজ করতাম, মাটি কামড়ে পড়ে থাকতাম রেস্টুরেন্টে। 

বছরখানেক পরে আবার একটি সুযোগ এলো বৈধ হবার। এমিলিয়া নামের রূপসী, স্বর্ণকেশী অর্থের বিনিময়ে আমাকে তার স্বামী বানাতে রাজী হলো তিনবছরের জন্য। আগের ঋণ মাত্র শোধ করতে পেরেছি। আবার ঋণ করলাম মালিকের কাছে। বিয়ের পর বাসস্থান বদলাতে হলো। এমিলিয়ার এপার্ট্মেন্টে স্বামী স্ত্রী হিসেবে থাকতে হবে আমাকে। সরকারী অফিস থেকে খোঁজ করে যদি আমাদের একসংগে না পায় তাহলে সমস্যা হবে। আমি কাজ শেষ করে ফিরতাম প্রায় শেষ রাতের দিকে। এমিলিয়া ঘুমিয়ে থাকতো। ছুটির দিনে পার্টিতে যেতো বন্ধুদের সাথে। আমার সাথে প্রায় দেখাই হতো না, কথা তো দূরের কথা। তবে মেয়েটা খারাপ ছিল না। আংশিক ভাড়া আমাকে দিতে হতো ওখানে রাত্রিযাপনের কারণে।  

কোন ঝুটঝামেলা ছাড়াই প্রথম দেড়বছর কাটিয়ে দিলাম। মেয়েটির প্রতি ধীরে ধীরে আকর্ষণ বাড়ছে আমার। ২৪ বছরের শ্বেতাংগ যুবতীর সংগে রাতের পর রাত পাশাপাশি ঘরে ঘুমানো প্রচন্ড যন্তণাদায়ক হয়ে উঠছিল আমার জন্য। মেয়েটার কোন ছেলেবন্ধু ছিল বলে আমার জানা নেই। খুব পড়াশুনা করতো। পিএইচডি করছিল। বাবা মা মিউনিখ শহর থেকে কয়েকশো মাইল দূরে গ্রামের বাড়ীতে থাকেন। তারা আমার কথা জানতেন। মেয়ের কাছে কোন এক ছুটির দিনে বেড়াতে এলে পরিচয় হয়েছিল। হাসিখুশী প্রবীণ এক দম্পতি। প্রচুর খাবার বানিয়ে নিয়ে এসেছিলেন, আমাকেও তাদের সাথে বসে খেতে হয়েছিল। খুব অবাক হয়েছিলাম তাদের মেয়ের আমাকে বিয়ে করা নিয়ে বা মেয়ের চুক্তিভিত্তিক স্বামীকে নিয়ে তাদের কোন ভাবান্তর না দেখে। ভাবছিলাম এরা কি ধাতুতে গড়া কে জানে! 

আমার যন্ত্রণার অবসান ঘটলো অচিরেই। সিনেমার গল্পের মতোই স্বর্ণকেশী অসুস্থ হলো। সাতদিন ধরে প্রচন্ড জ্বরে ভুগলো। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম, স্যুপ বানিয়ে খাইয়ে, সেবা শুশ্রুষা করে তাকে সুস্থ করে তুললাম। এই প্রথম আমার চুক্তি করা বউয়ের জন্য দুদিন কাজ থেকে ছুটি নিতে হলো। 

এমিলিয়া সুস্থ হয়ে আবার তার নিজস্ব জগতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। ক’দিনের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসে আমি মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ছিলাম। নীলাভ নয়নার সোনালী চুলে হাত বুলিয়েছি যখন সে শয্যাশায়ী। ইচ্ছে করে কাছে পেতে বুকের গভীরে নিয়ে ভালোবাসার কোমল স্পর্শ বুলিয়ে দিতে। 

এক রাতে কাজ থেকে ছুটি হয়ে গেলো সময়ের অনেক আগেই খারাপ আবহাওয়ার কারণে। বাড়ীতে ফিরে দেখি এমিলিয়ার ঘরে তখনও আলো জ্বলছে। মেয়েটা অসুস্থ হওয়াতে একটা পরিবর্তন হয়েছিল আমাদের। একে অপরের কুশল সংবাদ নেয়া দেয়া হতো। এমিলিয়া কখনো রাঁধতো না। আমি রেস্টুরেন্টের উচ্ছিষ্ট খাবার এনে ফ্রীজে রাখতাম পরের দিনের জন্য। সে যে মাঝেমাঝে সেগুলো পরখ করে দেখতো  তা বেশ বুঝতাম। সেরাতে আমি খাবার সঙ্গে করে এনেছিলাম। এমিলিয়ার ঘরের দরজায় নক করে একসংগে খেতে অনুরোধ করলাম। মেয়েটি তার নীল চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। সেই চোখের দৃষ্টিতে আমার পৃথিবী থমকে গেলো। 

কোন কথা না বলে আমার সংগে চুপচাপ বসে খেলো। ঝাল খেয়ে উহ আহ করলেও পরিতৃপ্তির সাথে খাবার শেষ করে চা বানালো দু’জনের জন্য। চা খেতে খেতে গল্প করছিলাম আমরা। সে আমার দেশের কথা, পরিবারের কথা জানতে চাইলো, বহুদিন পর আস্তাকুড়ে ফেলে আসা সম্পর্কগুলি নিয়ে নিজের বউকে বলছিলাম। হ্যাঁ, বউই তো। ততদিনে আমার অপরাধী মন ফিরতে চাইছে শেকড়ের টানে। জীবনে এই প্রথম কারো কাছে নিজেকে মেলে ধরলাম। দু’চোখ অশ্রুতে ভেসে গিয়েছিল। 

এমিলি তার পেলব গালে আমার গালটি ধরে রেখে কোমল আঙ্গুলের ছোঁয়ায় প্রতিটি অশ্রুবিন্দু সরিয়ে দিচ্ছিলো। এমন কোমল মমতার স্নেহমাখা  স্পর্শ পাইনি বহুদিন। নিজের মুর্খামীর বিশদ বিবরণ দিতে গিয়ে ভেংগেচুরে যাচ্ছিলাম। এমিলি তার নরম দেহের বেষ্টনী  দিয়ে আমার সব কষ্ট মুক্ত করে দিতে চাইলো, ভুলিয়ে দিতে চাইলো আমার হীনমন্যতা, জরাজীর্ণ সংস্কার। ভেসে গেলাম টগবগে তারুণ্যের প্রবল জোয়ারে। কয়েকটি দিন, রাত্রি, মাস, বছর পেরুতে লাগলো আমাদের প্রেমের জয়গানে। আমার মধ্যে নবজন্ম হলো এক নতুন আমি-র।  

এমিলি অন্তঃস্বত্তা হলো বছরখানেক পর। এর মধ্যে তার থিসিসের কাজও চলছিল পুরোদমে। আমি যতদূর সম্ভব সাহায্য করতে চেষ্টা করি। আমাদের মধ্যে বেশ ভালো বোঝাপড়া হয়েছিল,একে অপরকে বুঝতাম। 

বাচ্চাটা হওয়ার পর কেমন করে যেন আমরা আবার সেই আগের মতো নির্লিপ্ত হয়ে গেলাম। মারিয়ামের মুখে আমি মায়ের ছায়া দেখি। মেয়েটা বেড়ে উঠছে ...ওর হাসিতে, চোখের তারায় আমি ফেলে আসা মানুষগুলিকে দেখতে পাই। ততদিনে  বৈধভাবে থাকার প্রাথমিক কাগজপত্র পেয়ে গিয়েছি। শুধু নাগরিকত্ব পেলেই আমি একবার দেশে যাবো ভেবেছি। 

আমার ছোটবোনের সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ হয়েছিল। ওর কাছেই বাবার মৃত্যুসংবাদ শুনেছি । নিজে বাবা হয়েছি বলেই হয়তোবা মনটা কেঁদে উঠেছিল। মায়ের পা ধরে পড়ে থাকলে নিশ্চয়ই মা ক্ষমা করবে...। 

৭)

এমিলি কিভাবে, কি করে, একটু  একটু করে দূরে সরে গেলো আজও রহস্য। শুধু একবার বলেছিলাম সবাইকে সংগে নিয়ে দেশে যাবো। আমার স্ত্রী,কন্যাকে নিয়ে গর্বের শেষ ছিল না আমার। এমিলি রাজী হয়নি আমার সংগে যেতে। এ নিয়ে আমাদের মন কষাকষি হতে লাগলো। হঠাৎ কোত্থেকে এক বন্ধু জুটিয়ে ফেললো। মারিয়ামকে আঁকড়ে  ধরে থাকলাম আমি। জানি এদেশের মেয়েরা বিয়ে, সংসার নিয়ে বেশী মাথা ঘামাতে চায় না। মেয়ের কথা ভেবে শেষ চেষ্টা করলাম। মাথা ঠান্ডা করে অনেক বোঝালাম। তখন কোন উত্তর দেয়নি। এক সপ্তাহ পরেই উত্তর পেয়ে গেলাম। এমিলি ডিভোর্স চায়। সে আমেরিকায় গবেষণার সুযোগ পেয়েছে। মারিয়ামকে নিয়ে ওখানে চলে যাবে। 

আমার পুরো পৃথিবী থরথর করে কেঁপে উঠলো। এক পরিবারকে আমি ত্যাগ করে এসেছিলাম বিনা কারণে…...আর আজ সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি…...নাটকের নায়ক নই, ভিলেন হয়েছি আজ। 

ওরা আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। ইতিহাস কাউকে ছেড়ে দেয় না, রক্তের ঋণ শোধ হয়ে যায়! 

কখন যে বাবার কবরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে গগনভেদী আর্তচিতকার দিয়ে চলেছি। শুধু সেই চিৎকার আমার বুকের ভিতরে প্রবল গর্জন করে চলেছে ...মুখ থেকে একটি আওয়াজও বের হচ্ছে  না।

 কিন্তু আমি কিছু বলতে চাই ...বাবা তুমি শুনছো…...আমাকে মাফ করে দিও বাবা…...একটি বাক্যও বের হলো না …...বাবা, তুমি বুঝেছো তো আমি কি বলতে চাই…...এই দেখো মারিয়ামের ছবি...তোমার  নাতনী...আমার মেয়েটা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে বাবা...ওর মা ওকে নিয়ে গেছে …..আমি পারিনি ওদেরকে ধরে রাখতে...আমি নিঃস্ব, রিক্ত, শূণ্য হয়ে ফিরে এসেছি। আমার অহংকার আমাকে নিমজ্জিত করেছিল এক অতল গহ্বরে। তমসাচ্ছন্ন সেই খাদ থেকে  এমিলি আমাকে টেনে তুলে রঙ্গীণ স্বপ্ন দেখিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেছে আবর্জনার ঝুড়িতে। যেমনটি আমি করেছিলাম…...তোমাদের স্বপ্নকে আমার মচমচে জুতোয় মাড়িয়ে খানখান করেছিলাম………...।

মনের চিলেকোঠায় জীবাশ্ম হয়ে বেঁচে আছি …...আত্মসুখে নিমজ্জিত আমি ভুলুন্ঠিত হয়েছি নিজেরই পাপে…! 
 কে যেন আমার ঘাড়ে হাত রাখলো। মায়ের ছোঁয়া পেলাম, চোখ বুজেই জানি মায়ের মাড়ভাংগা শাড়ীর খসখসে স্পর্শ, মায়ের গায়ের মশলা মাখানো রান্নার অদ্ভুত এক মায়ামাখা সুবাস। কোনরকমে মায়ের চরণ দুটি খুঁজে  পেতে দুহাতে জড়িয়ে ধরলাম। হু হু করে কেঁদে চলেছি…...মায়ের পা ধরে…  একটি শব্দই শুধু বের হয়ে এলো মুখ থেকে ………...বাবা………! 

বন্যা হোসেন
অটোয়া, কানাডা।