অটোয়া, বৃহস্পতিবার ২৩ মে, ২০১৯
‘নুনের দুঃখ’ ও দেওয়ান শাহীন আয়োজিত বৈশাখী মেলা – কবির চৌধুরী

দুই দিন হয় প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ থেকে অটোয়ায় ফেরত এসেছি। চোখে মুখে ঘুম নিয়েই গতকাল ১৪ই এপ্রিল ২০১৯ কানাডার রাজধানী অটোয়াতে বাংলা নববর্ষ-১৪২৬কে স্বাগত জানিয়ে আয়োজিত দুটি মেলার মধ্যে একটি, অটোয়ার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব দেওয়ান শাহীন কর্তৃক স্থানীয় টিউডোর কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত বৈশাখি মেলায় যাই। গত ২২ বছর থেকে দেওয়ান শাহীন এবং তাঁর সহযোগিরা নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে এই সময়ে বৈশাখি মেলার আয়োজন করে আসছেন। অটোয়ায় তাঁদের আয়োজিত মেলাই সর্বাধিক প্রশংসিত ও জনপ্রিয়। আয়োজনের দিক দিয়ে এবারও মেলায় কোন কমতি ছিল না। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও মেলায় মানুষের ঢল নেমেছিল। লাল-সাদা রঙের সমাহার আমাকে মনে করিয়ে দেয় বাঙালিরা অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিবান একটি জাতি। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও মেলার উদ্বোধন করেন অটোয়া সিটির মেয়র জিম ওয়াটসন। আমরা সবাই জানি যে, প্রবাসে আয়োজিত মেলাগুলোতে সাধারণতঃ রকমারী মুখরোচক খাবার-দাবার এবং রং-বেরঙের কাপড়চোপড়ের দোকান থাকে। সাথে বড়জোর দু’য়েকটি বইয়ের দোকান। কিন্তু এবছর মেলার আয়োজন ভিন্ন মাত্রা পায় ব্যতিক্রমধর্মী একটি উদ্যোগের কারণে। উদ্যোগটি নিয়েছিলেন কবি সুলতানা শিরিন সাজি। অন্ততঃ আমার কাছে তা মনে হয়েছে। ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ছিল একটি কবিতার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন। অনুষ্ঠানটির পরিচালক সঞ্চালক কবি সুলতানা শিরিন সাজি বেলা প্রায় ৪টার দিকে মেলায় আগত সকলকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ থেকে আগত কণ্ঠশিল্পী নোবেল চৌধুরী এবং মন্ট্রিয়ল থেকে আগত কণ্ঠশিল্পী দেবপ্রিয়া কর রুমা পরিবেশিত সঙ্গীতানুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের চমকে দেন। সাজি ঘোষণা করেন- “আজকে আমরা এই মেলায়, আমাদের প্রিয় কবি মৌ মধুবন্তীর লেখা একটি কবিতার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করব। বইটি এবার বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে- বলে তিনি লেখক কবি মৌ মধুবন্তী, আয়োজক দেওয়ান শাহীন চৌধুরী এবং আমিসহ অন্যান্য অতিথিদেরকে মঞ্চে ডেকে নেন। মোড়ক উন্মোচন করেন কবি সুলতানা শিরিন সাজি। উন্মোচিত বইটির নামঃ ‘নুনের দুঃখ’ প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, প্রকাশকঃ কবিতাচর্চা, ঢাকা, প্রচ্ছদঃ বদরুল হায়দার। দামঃ ২০০.০০টাকাআমি কবিতা লিখি না, কবিতা বুঝি না, আমার কাছে কবিতা সব সময় কবিতার মতই অধরা। তারপরেও মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে কবি কর্তৃক প্রদত্ত্ব বক্তব্য এবং গ্রন্থের ভূমিকা কবিতাগুলো পড়তে উৎসাহিত করে। ভূমিকায় যেমন- “নুনের দুঃখ ভাতে নয়। সমুদ্রের যে জলে নুনের জন্ম সে জলেই নুনের সর্বনাশ।“ অথবা কবি যখন মঞ্চে অভিযোগ করেন- “ যে মেয়েরা পুরুষকে জন্ম দেয়, সেই পুরুষরাই মেয়েদেরকে লাঞ্ছিত করে, শাসন করে, ধর্ষণ করে।“ এই অল্প সময়ের ভেতর ‘নুনের দুঃখ’ কবিতার বইটির সবগুলো কবিতা পড়া হয়নি- তবে কয়েকটি কবিতায় চোখ বুলিয়েছি। বইটিতে ৩৯টি কবিতা আছে। আমি যে কয়টি কবিতা পড়েছি তাতে মনে হয়েছে- মৌ মধুবন্তী অত্যন্ত উচুমানের একজন কবি, একজন লেখক। তাঁর কবিতার ভাষা এবং শব্দ খুবই সহজ সরল, সাবলীল। সময় এবং বিষয় সম্বন্ধে কবি খুবই সচেতন। বিশেষ করে রূপক শব্দের ব্যবহার এবং কবিতার বিষয় নির্বাচন ও তার সাথে পারিপার্শ্বিক অবস্থার বাহারি রূপায়ন। তিনি যখন লিখেন-   

“নতুন অভিজ্ঞতা, 
বেজমেন্ট ঘুম,
বইয়ের দেয়াল,
মধ্যরাত
অনিয়মের সাঁওতাল
সব নিয়ম ভাঙ্গানি খাওয়া-দাওয়া
চিকেন বিরিয়ানি,
বিফ রাগিনী,
অতুলনীয় হাসি
তেতুলনীয় কাশি
কি করে প্রকাশি?”

অথবা-
“এসেছে গাঁদা ফুলের বর্ণবাহারি
হেমন্তে-শিশিরে ভেজা
সকালের সাঝ ভারী-
এখনো মনের ভেতরে আঁকে স্মৃতি রকমারি।“ 

অথবা-
“অবাক দু’চোখে সূর্যে প্রেম
আলোর প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছে দিগন্তে-
আকাশ-জল-মাটির প্রণয়ে বিছানো আছে
বিশাল এক চত্বর, যেন ছোট একটি
সুখের সংসার; সৈকতে মেলে দিয়েছে তার ভালোবাসা।“

বৈশাখ শুধু একটি মাসের নাম নয়। বৈশাখ আমাদের সম্প্রীতির আর অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক। বৈশাখ আমাদের প্রতিকূল অবস্থার সাথে, সাম্প্রদায়িক অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে শেখায় - জিততে শেখায়। কবি মৌ মধুবন্তীর লেখা কবিতার উদ্ধৃতি দিয়েই শেষ করতে চাই-

“সেদিন কেমন যেন ঘোর লাগা চাহনিতে
সম্রাট দেখেছিলেন বাংলার রূপ, 
তাই ঘোষণা দিয়েছিলেন,
বাজাও বাজনা, তোলো খাজনা।
ধান কাটার মওসুম হোক
বছরের প্রথম মাস,
কৃষকের হোক সর্বনাশ।“  

কবির চৌধুরী
অটোয়া, কানাডা।