অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
ফেলে আসা দিনগুলি (দশ) -হুমায়ুন কবির

য়ন অনেকক্ষণ ধরে নবনিতা দিদির বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতর থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। যেদিন নবনিতা দিদির স্বামী মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বাড়িতে ফিরে, সেদিনই এই রকম চিৎকার চেচামেচি শুরু হয়। নবনিতা দিদি খুব ভালো মানুষ। শিক্ষক বাবার একমাত্র মেয়ে। উচ্চ শিক্ষিতা ও সুশ্রী। আদব কায়দা সবকিছুতেই অনন্যা। পুজা আর্চণা কোন কিছুতেই কমতি নেই। চয়ন প্রায়দিন এই বাড়িতে আসে। নবনিতা দিদির বাড়িতে অনেক সুন্দর একটা রাধা কৃষ্ণের মন্দির আছে। অসাধারণ শৈল্পিক কারুকাজ করা একতলা ইটের তৈরী দালান। নবনিতা দিদির পাশে বসে চয়ন অনেক দিনই কৃত্তণ শুনেছে। মঙ্গল বন্দনা শুনেছে। পবিত্র আরাধণা সঙ্গীতের মোহময় সুরের মূর্ছনায় চয়ন কতদিন হাড়িয়ে গেছে! তার হিসেব নেই।

নিতাই দাদা, মানে নবনিতা দিদির স্বামী চলে যাওয়ার পর চয়ন বাড়ির ভিতরে ঢুকলো। পাশেই দিদির একমাত্র মেয়ে সুপর্ণা বসে আছে। চয়ন নবনিতা দিদির কাছে এসে দাড়ালো। দিদির দিকে তাকিয়ে থাকলো। চোখদুটি রক্তজবার মতো লাল হয়ে গেছে। চয়নের ভিতরটা হুহু করে উঠলো। সুপর্ণাও মায়ের বেদনায় সমব্যাথীত। ছোট মানুষ। বাবার চিৎকার শুনে ভয় পেয়েছে। এখনও মাকে জড়িয়ে ধরে আছে। এরই মধ্যে নবনিতার শাশুরী এসে বলতে শুরু করলো,
-আমি তোমাকে কতবার বারণ করেছি যে, নিতাই যখন ওসব ছাই পাশ খেয়ে বাসায় আসে, তখন তুমি চুপ করে থেকো। কথা বলোনা। তুমি মেয়ে ছেলে মানুষ। তুমি কি বুঝো? বেটা ছেলেরা এক আধটু এই রকম নেশা টেশা করেই। এসব নিয়ে কথা বলে উচিতনা। এখন দেখলাতো, কি মারটাইনা ও মারলো। তোমার শশুরও এমন ছিলো। আমি প্রথম প্রথম মন খারাপ করলেও পরে আর কিছু বলতামনা। স্বামী দেবতা। স্বামীর পায়েই  মেয়েদের স্বর্গ।

নবনিতা দিদি কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকলো। কি বলবে! কি বলার আছে! মেয়ে ছেলে মানুষ। কিআর বুঝে! চয়ন অবাক হলো। এ কেমন ধর্মের কথা! একজন  স্বামী মাতাল হয়ে বাড়িতে এসে বউকে পেটাবে। মদ খেয়ে মাতলামী করবে। সে-ই স্বামীর পায়েতে স্বর্গ! আর যে মেয়েটি এতোটা নির্যাতিত হলো এবং সে এই নির্যাতনের প্রতিবাদ করলে নরকবাসী হবে! চয়ন এ অন্যায় ধর্মের কথা শুনে খুবই কষ্ট পেলো। নারী নির্যাতনের নির্দেশণা ধর্মেই দেয়া আছে? এটা সত্যি সত্যি ধর্মের কথা? নাকি মিথ্যা ফতোয়া? তাহলে আর প্রতিবাদ করে কি হবে! যুগ যুগ ধরে নারীদের স্বর্গবাসী হতে হলে অত্যাচারী স্বামীদেরই পুজা করতে হবে। বাহ! কি সুন্দর নারী নির্যাতনের দিক নির্দেশনা!

চয়ন খুব আহত হলো নারীর প্রতি এই অসম্যানের কথা শুনে। এ কেমন নির্দেশণা! সুপর্ণা নবনিতাকে জড়িয়ে ধরে আছে। নবনিতা দিদির শাশুরী চলে যাওয়ার পর চয়ন বললো,
-দিদি, তুমি মন ভালো করে ফেলো। জানোইতো দাদা এমনই। দেখ সুপর্ণা ব্যাথা পাচ্ছে।

নবনিতা চয়নের দিকে তাকালো। মনটা মুহূর্তেই ভালো হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে বয়স্ক কোন মানুষ এসে শান্তনা দিচ্ছে। ঠিক যেনো অন্যদা দিদির ইন্দ্র বা শ্রীকান্ত!
-লক্ষ্মী ভাই আমার! কোন মন খারাপ নেই আমার। এমন যার ভাই থাকে তার আবার মন খারাপ থাকবে কেন!
নবনিতা চয়নের বুকে ও মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলো। চয়ন পকেটে হাত দিয়ে 'কুজাক' চকলেট বের করলো। সুপর্ণাকে একটা চকলেট দিলো। নিজেও একটা খেতে থাকলো। 'কুজাক" চকলেট দেখতে অনেকটা এখনকার ললি পপের মতো। 'বিটিভিতে 'কুজাক বলে একটা ইংরেজি সিরিয়াল হতো। তারই নামানুসারে এমন নাম। 'কুজাক'!
-চয়ন তুই কিন্তু আজকে খেয়ে যাবি। আমি সবজির খিচুরি রান্না করে রেখেছি।
-জি, দিদি। অবশ্যই। তোমার হাতের রান্না করা খিচুরিতে যেনো অমৃতের স্বাদ মাখানো থাকে। অবশ্যই খেয়ে যাবো।

সুপর্ণা আর চয়নকে শিতল পাটি বিছিয়ে খেতে দেয়া হলো। নবনিতা দিদির শাশুরি আমরার চাটনি এনে দিলো। যাওয়ার সময় চয়ন নবনিতা দিদিকে প্রনাম করে ফিরে গেলো। যাওয়ার সময়  বলে গেলো,
দিদি, তুমি কিন্তু দাদা যখন মাতাল হয়ে ফিরবে তখন কোন কথা বলবেনা। তাহলে দাদা রেগে যাবে। তুমি কষ্ট পেলে সুপর্ণাও কষ্ট পায়। সুপর্ণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
-যাই সুপর্ণা। আমাদের বাড়িতে আসিস। রাবেয়া খালা আমাকে অনেক গুলি গল্পের বই আর সুন্দর সুন্দর রঙ পেন্সিল কিনে দিয়েছে। আমি সুন্দর সুন্দর ছবি এঁকেছি। তুই এলে তোকে দেখতে দিবো।
-জি যাবো। তুমি আবার এসো।
-জি আসবো।

সুপর্ণা বয়সে চয়নের চেয়ে অনেক ছোট।  তবুও চয়ন বলতে সুপর্ণা একেবারে পাগল। যেনো চয়ন ওর নিজেরই মামা। চয়নও সুপর্ণার জন্য অনেক কিছু কিনে আনে। পরের দিন নবনিতা দিদি পাগলের মতো ছুটে চলেছে। চয়ন দেখতে পেয়ে প্রায় দৌড়েই নবনিতার কাছাকাছি এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে চয়ন পিছন থেকে খুব মোলায়েম করে ডাকলো,
-দিদি! এভাবে ছুটে কোথায় যাচ্ছ?

নবনিতা ফিরে দাড়ালো। সমস্ত মুখ জুড়ে উৎকণ্ঠা আর হতাসার ছায়া। যেনো একটা টর্নেডো এসে নবনিতার পৃথিবী ওলট পালট করে দিয়ে গেছে। এলো মেলো চুল। চয়ন ভয় পেয়ে গেলো। নবনিতাকে কখনও এমন ভাবে বাইরে বের হতে দেখেনি। চয়ন বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চাইলো,
-কি হয়েছে দিদি? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? এভাবে কোথায় যাচ্ছ?
-তোর দাদা খুব অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি আছে। তাই ছুটে যাচ্ছি। 
-কোন হাসপাতালে?
-সদর হাসপাতালে। 
-আমাকে তোমার সঙ্গে নিবে?
-মাসিমা কিছু বলবেনা?
-কিছু বলবেনা। মা তোমাকে খুব খুব ভালো বাসে। তাছাড়া যদি জানতে পারে যে, দাদা অসুস্থ। তোমার সঙ্গে যাচ্ছি। তাহলে কিছুই বলবে না। বরং খুশি হবে। তুমি অযথাই ভাবছো। তাছাড়া আমরা ওখানে পৌঁছে টেলিফোনে জানিয়ে দিবো।
-তাহলে চল ভাই। তারাতারি যেতে হবে। 
-জি দিদি, চলো। আর দেরি না করি।

একটা রিক্সা ভাড়া করে সেটাতে চড়ে হাসপাতালে পৌঁছলো। দুতলায় উঠেই ২০৩ নং কেবিন। কারো অনুমতি না নিয়েই নবনিতা হন হন করে ভিতরে ঢুকে গেলো। একজন ডাক্তার নার্সকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিচ্ছে। সুবাস দাঁড়িয়ে আছে। সুবাস দোকানের ম্যানেজার। ভালো-মন্দ সবটাই সুবাস দেখে। নবনিতা দিদি নিতাই দাদার পায়ের কাছে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নার্স কাছে এসে দিদিকে শান্তনা দিতে দিতে বললো,
-কাদবেননা দিদি। তেমন কিছু হয়নি। ব্লাড প্রেশারটা একটু বেড়ে গিয়েছিলো। আমরা মেডিসিন দিয়ে দিয়েছি। এখন ঘুমাচ্ছে। ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে।

নবনিতা উঠে দাড়ালো। ডাক্তারের কাছে এসে জানতে চাইলো,
-নমস্কার! ডাক্তার বাবু।
-নমস্কার!
-ওর কি হয়েছে?
-তেমন কিছু না। ব্লাড প্রেশারটা একটু বেড়ে গিয়েছিলো। আমি মেডিসিন দিয়ে দিয়েছি। সারারাত ঘুমাবে। ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে। আমি নার্সকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিয়েছি। কোন অসুবিধা হবে না। 
সিস্টার, আপনি খুব করে খেয়াল রাখবেন। কোন অসুবিধা হলে আমাকে জানাবেন।
-জি স্যার। আপনি কোন চিন্তা করবেননা। আমি সাধ্যমত চেস্টা করবো। 
ডাক্তার সাহেব নবনিতা দিদিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-আমি আসি দিদি। আশা করি রাতের মধ্যেই ভালো হয়ে যাবে। 
-ঠাকুর যেনো তাই করেন।
-চলি তাহলে?
-জি, নমস্কার।
-নমস্কার।

ডাক্তার সাহেব চলে গেলো। নবনিতা দিদি ফিস ফিস করে সুবাসের কাছে জানতে চাইলো,
-কি হয়ছিলো সুবাশ? তোমার দাদার কখন থেকে এই অবস্থা? 
-আরে বাসা থেকে এসেই সবার সঙ্গে চিৎকার চেচামেচি করছিলো। তারপরই এই অবস্থা। আপনি কিছু বলেছিলেন বৌদি?
-আরে না। আমি আর কি বলবো! আমার সংগেও রাগারাগি করেছে। তোমার দাদাবাবুর রাগ উঠলে মাথা ঠিক থাকে? থাকেনা। আমি কত করে বুঝাই। কে শুনবে আমার কথা। এখন কিছু হয়ে গেলে কি হতো? ঠাকুর রক্ষা করেছেন। 
-আপনি চিন্তা করবেননা বৌদি। দাদা ভালো হয়ে যাবে। 
-জি, তাই যেনো হয়। 
-সুপর্ণাকে কে দেখবে?
-ওর ঠাকুমা দেখবে। উনি খুব ভালো মানুষ। আমাকে নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করেন এবং ভালোবাসেন। সুপর্ণাকে ভিশন স্নেহ করেন। সুপর্ণাও ওর ঠাকুমাকে খুব খুব পছন্দ করে।
-আর চয়ন তুমি?
-আমি দিদির কাছে থাকবো। তুমি শুধু মাকে ফোন করে জানিয়ে দিও যে, নিতাইদা অসুস্থ। আমি নবনিতা দিদির সঙ্গে আছি। 
-জি, বলবো।
-বৌদি, রাতে কিছু লাগলে আমাকে জানাবেন। আমি এসে দিয়ে যাবো। আর এখানে ক্যান্টিন আছে। সব কিছু পাওয়া যায়।
-জি। আমি জানি। এখানে আমাকে প্রায়ই আসতে হয়। মেয়ে ছেলে মানুষ আমি। কি যোগ্যতা আছে আমার। আমার কথারইবা কি মূল্য আছে? আমি কি বুঝি? মেয়ে মানুষতো ভগবানের অবহেলায় গড়া। আর তাইতো জগতে মেয়ে মানুষ মানে সম্পূর্ণ মানুষ না। তাদের কিছুই নেই। শুধু স্বামী, শশুর-শাশুরীর সেবা করতে হবে আর ভগবানের মতো স্বামীর পায়ে মাথা ঠুকতে হবে। নইলে স্বর্গবাসী হওয়া যাবেনা। নরকবাসী হতে হবে।
-বউদি মন খারাপ করবেননা। মেয়েদের জীবন এমনই। আমি তাহলে যাই। নমস্কার।
-নমস্কার।
সুবাশ চলে যাওয়ার পর। দিদি আঁচলে চোখের পানি মুছছে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। যে মানুষটি রোজ মদ খেয়ে মাতাল হয়ে স্ত্রীকে সীমাহীন নির্যাতন করে। সেই মানুষটির জন্য স্ত্রী লোকটির কি গভীর ভালোবাসা! অথচ মেয়ে মানুষ বলে সমাজের মানুষগুলি চিরকালই তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। ঘরের মধ্যে বন্দী করে রেখেছে। আর সেই বন্দী স্ত্রী লোকটিই এখন স্বামীর বিপদের দিনের একমাত্র দুঃখের সঙ্গী। নবনিতা দিদিকে দেখে আজকে জগতের সমস্ত নারীর প্রতিই চয়নের শ্রদ্ধা অনেক অনেক বেড়ে গেলো। নারী তোমায় প্রণমী জানাই। নিরন্তর শুভকামনা আর বিনম্র শ্রদ্ধা তোমাকে। জয় হোক জগতের সমস্ত নারী জাতির। 

চয়ন মনে মনে ভাবছে, " আহা! আমি যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতাম, তাহলে জগতের সমস্ত নারী জাতির জন্য এমন ব্যবস্থা করতাম যাতে কোন নারীরই কোন কষ্ট থাকতো না। সবার উপরে নারী। এই নারী ও মায়ের জাতির সম্যানের সব ব্যবস্থা করতাম। কিন্ত আমিতো সামান্য একজন মানুষ। আমার কি ক্ষমতা আছে! তবু সৃষ্টিকর্তা যেনো দুনিয়ার সমস্ত নারীদের শান্তিতে রাখেন। সম্যানিত করেন।"

নিতাই দাদা ঘুমাচ্ছে। আর নবনিতা দিদি আলতো করে কপালে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বির বির করে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করছে যেনো খুব তারাতারি তার স্বামী যেনো সুস্থ হয়ে উঠেন। চয়নের কাছে খুব ভালো লাগছে। মনে মনে নবনিতা দিদিকে প্রনাম করলো। শ্রদ্ধা আর মমতায় দুচোখের পানি চয়নের কচি কোমল গাল বেয়ে গড়িয়ে বুক ভিজিয়ে দিতে থাকলো।

চয়ন চোখ বন্ধ করলো। মনে হলো মন্দিরে নবনিতা দিদির পাশে সুপর্ণা আর চয়ন বসে আছে। বাতাসে ধূপের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। শুনতে পাচ্ছে নবনিতা দিদির গাওয়া গান।

" তুমি নির্মল করো। মঙ্গল করে। মলিন মর্ম মুছায়ে!" চলবে…

হুমায়ুন কবির
ঢাকা, বাংলাদেশ।