অটোয়া, শনিবার ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯
ইউরোপের পথে পথ (দশ) -দীপিকা ঘোষ

     বার আমাদের কয়েকদিনের ভ্রমণযাত্রার গন্তব্যস্থল পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসসমৃদ্ধ বৃহত্তম দেশ শিল্পসংস্কৃতির লীলভূমি ফ্রান্স। কিন্তু সেই ভ্রমণযাত্রা আকাশপথে পথে হবে নাকি আটলান্টিক মহাসাগরের ইংলিশ চ্যানেলের টানেল দিয়ে হবে, সেটা নিয়ে শেষ মুহূর্তে একটি অনাবশ্যক প্রসঙ্গ উঠে এলো লাঞ্চের টেবিলে। কণিষ্ক বিশেষ উৎসাহ নিয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে বললো-
     দিদিভাই, মেসোদের নিয়ে ইউরোস্টার প্যাসেঞ্জার ট্রেনে করে যাচ্ছো না কেন?একটা অন্য রকম এক্সপেরিয়েন্স হবে ওঁদের! তুমি তো এর আগে সেভাবেই একবার প্যারিসে গিয়েছিলে!
     সেটা এখন সম্ভব নয় পাপান! আমার প্লেনের টিকেট কাটা হয়ে গেছে। তাছাড়া ওখানে ট্রেনের ভাড়াও খুব বেশি!
     কিন্তু বাহাত্তর ঘন্টা আগে প্লেনের টিকেট ক্যান্সেল করলে ওরা তোমাকে কিছুটা রিফাণ্ড করবে! অত হিসেব করলে এনজয় করবে কী করে? ভাবো মেসো, আটলান্টিক ওসেনের নিচ দিয়ে তোমাদের ইউরোস্টার ১৮৬ মাইল স্পিডে ছুটছে! কী দারুণ অ্যাডভেঞ্চার হবে বলো তো?
     কিন্তু সবাই যে তোমার মতো সবকিছুতে অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করবে, সেটা কেন ভাবছো পাপান?                                                                                                                                                                                                                   ভাইবোনের বিতর্ক থামাতে ঘোষ কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলো-
     আটলান্টিকের কত নিচে সেই ইউরোটানেল?
     সবচেয়ে বেশি গভীরতায় পঁচাত্তর মিটার। টানেলের মোট লেন্থ, ফিটটি পয়েন্ট ফাইভ কিলোমিটার। অবশ্য জলের নিচে আটত্রিশ কিলোমিটারের মতো, মানে সাঁইত্রিশ পয়েন্ট নাইন। তবে চব্বিশ বছরের মধ্যে এখানো কোনো ব্যাড রেপুটেশন হয়নি। আমি বলছি যে অ্যাক্সিডেন্টের কোনো রেকর্ড নেই!
     মেসো হেসে জবাব দিলো-
     আচ্ছা ঠিক আছে। পরের বার না হয় তোমার সঙ্গে ইংলিশ চ্যানেলের টানেল দিয়েই যাওয়া যাবে।

     ইংলিশ চ্যানেলের টানেল প্রথম উন্মুক্ত করা হয় ১৯৯৪ সালের ৬ই মে। লণ্ডনের সেইন্ট প্যানক্রাস থেকে ফ্রান্সের গ্যারে ডু নর্ড পর্যন্ত দীর্ঘ এই টানেল যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সকে সংযুক্ত করেছে। তবে কেবল প্যাসেঞ্জার ট্রেনই নয়, ইউরোটানেল শাটলও এই স্টেশনে চলাচল করে। মোটর সাইকেল, ক্যারাভান, লরি, গাড়ি প্রভৃতি সরবরাহের জন্যই এই ব্যবস্থা। ভবিষ্যৎ পৃথিবী আরও কত বদলে দেবে প্রযুক্তির নিত্য নতুন আবিষ্কার, কে জানে! ওদের কথোপকথন শুনে প্রযুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানসভ্যতার অনাগত চেহারাটা কল্পনা করার চেষ্টা করতেই এলামেলো হয়ে গেলো সবকিছু। মন বললো-
     সত্যিই কি সেই সময় এসে গেছে পৃথিবীতে যখন মানুষ স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালে একইভাবে বিচরণ করে ফিরবে? যেমন শৈশবের রূপকথার গল্পকাহিনীতে শুনেছিলাম? যেমন পড়েছিলাম প্রাচীন সাহিত্যের পাতায় পাতায়?
     বিশ্বের যে ১১৬টি দেশে আমেরিকান নাগরিকদের ভিসার কোনো প্রয়োজন হয় না তাদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ইটালি এবং ফ্রান্স অন্যতম। কিন্তু ‘Schengen Agreement’-এর তালিকাভুক্ত ইউরোপের যে ২৬টি রাষ্ট্র, তাদের নাগরিকদের পরস্পরের দেশে যাতায়াতের জন্য পাসপোর্ট দেখানোরও প্রয়োজন পড়ে না। ‘শেঙ্গেন চুক্তি’ হলো লিথুয়ানিয়া, আইসল্যাণ্ড, জার্মানি, নেদারল্যাণ্ডস, স্লোভাকিয়া, অষ্ট্রিয়া, ফিনল্যাণ্ড, বেলজিয়াম, লাটভিয়া, গ্রীস, মাল্টা, ফ্রান্স, ইটালি, সুইডেন, ডেনমার্ক, হাঙ্গেরি, স্পেন প্রভৃতি ইউরোপীয় দেশের মধ্যে ভৌগলিক সীমানা বাতিলের চুক্তি। গ্রেট ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য। কিন্তু চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। শুচিকেও তাই চেক-ইন সিকিউরিটির সময় আমাদের মতো পাসপোর্ট দেখাতে হলো। 
     লাউঞ্জে নানা দেশের বিচিত্র চেহারার অপেক্ষমান যাত্রীদের ভিড় বাড়ছে। স্বংয়ক্রিয় প্রবেশদ্বারের মাথার ওপর বড় বড় করে লেখা -‘ওয়ার্ল্ড ডিউটি ফ্রি লাউঞ্জ’। বামে এক্সচেঞ্জ অফিস। ডানদিকে জুতোর দোকান -‘Dune London'(ডিউন লণ্ডন)। একপাশে ট্যাক্স ফ্রি ‘Sunglass Hut'। আর সামনেই ফ্যাশন এক্সেসরির এক বড় দোকান। কিশোরী থেকে রমনী সবারই ঘোরাঘুরি সেখানে। সামনের চেয়ারে বসে অনেক সময় ধরে একজন অশীতিপর বৃদ্ধা বেশ তৃপ্তি করে সুইস রোল খাচ্ছেন। খাবার বহর মনে হলো, সকালবেলায় তাড়াহুড়োতে ব্রেকফাস্ট সারা হয়নি। হঠাৎ চোখ তুলতেই চোখাচোখি হয়ে গেলো। নকল দাঁতে এক ঝলক হাসলেন মিস্টি করে। তারপর ভদ্রতা রক্ষায় জিজ্ঞেস করলেন-
     কেমন আছো?
     ভালো। তুমি?
     কথা না বলে মাথা নাড়লেন। তারপর পার্স থেকে লিপস্টিক বার করে ঠোঁট রাঙাতে রাঙাতে সম্ভবত ওয়াশ রুমের উদ্দেশ্যেই উঠে গেলেন।   

     ফ্রান্সের অনন্যসাধারণ বিমানবন্দর ‘চার্লস ডি গল’ এর দৃশ্যছবি প্লেনের জানালা দিয়ে চোখের সামনে ভাসছে। সেই সঙ্গে চোখে পড়ছে চারপাশে শাখা প্রশাখার রাস্তায় হন্যে হয়ে ছুটে চলা যানবাহনের গতিবিধি। আধুনিক যুগ নিরন্তর ছোটাছুটিতে কতটা অস্থির সে চিত্র মুহূর্তেই তীব্রভাবে ধরা দিলো চোখের ক্যামেরায়। এ যুগের বহুমুখী কর্মময় জীবনে অবসরের বড় অভাব। অনিঃশেষ আকাঙ্ক্ষা পূরণের ইচ্ছা কিছুতেই মানুষকে স্থির থাকতে দেয় না। অতৃপ্তির অসন্তোষ একুশ শতাব্দীর মূল অসুখ, বলছেন সমাজ মনোবিজ্ঞানীরা।
     দেখতে দেখতে নিমেষের মধ্যে নেমে এলো বিমান। ভেতরে বসেও অনুভূত হলো একই রকম আবহাওয়া সত্ত্বেও ইংল্যাণ্ডের চেয়ে তাপমাত্রা অনেকটা এখানে বেশি। চারপাশের চেহারা আরও বেশি শুষ্ক। বোধকরি উপসাগরীয় প্রবাহে গ্রীষ্মকালে এখানে অঞ্চলবিশেষে তাপমাত্রা বেশি অনুভূত হয়। মাল সংগ্রহ করে ট্যাক্সির অনুসন্ধান করতেই ইউরোপীয় চেহারার এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন প্রসন্ন চেহারা নিয়ে-
     কোথায় যাবে?
     অনলাইনে শুচি যাবতীয় বিষয় সমাধা করে রেখেছিল। অতএব প্রশ্নোত্তর পর্বও তার সঙ্গেই চলতে লাগলো কিছুক্ষণ ধরে। একটু পরেই স্পষ্ট হলো ভদ্রলোক মোটেই ইউরোপীয় নন, ফিলিস্তিনী। নাম- আলমোতালেব। আলমোতালেব বাইরে গিয়ে এক মাসলম্যানকে ডেকে আনলেন। বললেন-
     ওর নাম বাসেম। ট্যাক্সি করে ও তোমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেবে।
     কিন্তু বাসেম মুখ খুলেই প্রথম যে কথা বললো তাতে ভদ্রতার সব খোলসই ঝরে গেলো তার আচরণ থেকে-
     আশি ইউরো দিতে হবে, যাবে তো চলো!
     শুচির চোখে বিস্ময় ঝরে পড়লো-
     কিন্তু শ্যাটিউতে যাওয়ার ভাড়া তো পঁয়ত্রিশ ইউরো!
     তাহলে অন্যলোক দেখো! আমার দ্বারা হবে না! বলেই চলে যেতে উদ্যত হলো সে।
     আব আলমোতালেব সঙ্গে সঙ্গেই ফেরালেন তাকে। আরবীয় ভাষায় কথা বললেন সম্ভবত। তারপর মুখ ফেরালেন-
     পঞ্চাশ ইউরো দিয়ো ওকে। তোমরা তিনজন যাত্রী, তার ওপর মালপত্র রয়েছে সঙ্গে!
     অচেনা জায়গায় কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। গন্তব্যে পৌঁছনোটাই প্রধান কথা। অতএব মালপত্র ট্রাঙ্কে তুলে দিয়ে যথানিয়মে গাড়িতে ওঠা হলো। বাসেমের তাগড়া দেহের মতো তার মনও মনে হলো টগবগিয়ে ফুটছে। ঘাম ঝরছে কপালের দু’পাশ বেয়ে। নিঃশব্দে উড়াল পুলের ওপর দিয়ে দুরন্তবেগে গাড়ি চালাচ্ছে সে। অনেক সময় পরে জিজ্ঞেস করলো-
     তোমরা কি পাকিস্তানী নাকি?
     জবাব শুনে আবারও কিছু সময়ের জন্য নীরবতা। তার সম্পর্কে জানতে চাওয়ায় বললো-
     তিউনিশিয়ান। রিফিউজি হয়ে দশ বছর আগে সপরিবারে চলে এসেছি। এখন বয়স ত্রিশ। পরিবারে বাবা-মা, সাত ভাইবোন, স্ত্রী আর তিন সন্তান রয়েছে। ট্যাক্সি চালিয়ে সংসার চালাই।
     শুচি হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলো-
     কিন্তু তিউনিশিয়া তো যুদ্ধবিধ্বস্ত নয়, তাহলে নিজের দেশ ছেড়ে সবাইকে নিয়ে চলে এলে কেন?
     বাসেম একটুও না ভেবে সরাসরি জবাব দিলো-
     আমাদের ওখান থেকে অনেকেই চলে এসেছে এদেশে ভালো থাকার আশায়। আমরাও তাই চলে এলাম! আর চলছেও বেশ! তিউনিশিয়া থেকে এখানকার ব্যবস্থা অনেক বেশি ভালো!

     ১৯৫৬ খ্রীষ্টাব্দে তিউনিশিয়ায় ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা শেষ হওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রী হাবিব বার্গুইবা তিন দশক ধরে ফ্রান্সের অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনার ধারা বজায় রেখেছিলেন। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখন ভোগ করেছে নারীসমাজও। এরপরই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে চরম রক্ষণশীল ইসলামি শাসনব্যবস্থা। ফলে দেশটা সবক্ষেত্রেই পিছু হটতে হটতে মধ্যযুগের অবস্থায় ফিরে যায়।
     দুপুরের রৌদ্রক্লান্ত ঝিমঝিমে পরিবেশের দিকে তাকিয়ে খুব চেনাচেনা লাগছে এখানকার আবহকে। যেন কোনো গ্রীষ্মমণ্ডলের পরিবেশের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছি আমরা। হঠাৎ দেখি বাঁদিকে রাস্তার ধারে বোরকা পরিহিত এক শ্যামলা রঙের নারী দুই কিশোর পুত্রকে নিয়ে ভিক্ষে করছে। যতবার গাড়ি রাস্তা দিয়ে ছুটছে ততোবার হাত বাড়িয়ে ছুটতে ছুটতে চলন্ত গাড়ির কাছে এসে দাঁড়াচ্ছে তারা। শিউরে উঠে বললাম-
     দেখেছিস শুচি ওদের মায়ের কাণ্ড? যে কোনো সময়েই তো একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেতে পারে!
     শুচি ঠেসান দিয়ে বসে চোখ বুঁজে তখন বিশ্রামের উপায় খুঁজছিল। সংক্ষেপে বললো-
     হুঁ!

     গন্তব্যস্থলে পৌঁছুতে প্রায় তিনটের ওপর বেজে গেলো। গাড়িতে বসে ঈজিপশিয়ান হোস্টেস ডারউইশিকে ফোন করে আগমন সংবাদ জানালো শুচি। গেটের তালা খুলে ডারউইশি ঘরের চাবি দেবে আমাদের হাতে। তিনটে ক্যারি অন লাগেজ ছাড়াও সঙ্গে রয়েছে ঢাউজ সাইজের এক স্যুটকেস। যার মধ্যে শুচির কয়েক জোড়া জুতোস্যাণ্ডেল, ফুল সাইজের বিউটি বক্স আর ফ্যাশনেবল পোশাক ছাড়াও রয়েছে আমার দু’চারটি জিনিষপত্র। স্যুটকেসটি ঠেসেঠুসে তাই পরিপূর্ণ। অতএব টেনেহিঁচড়ে নামাতে গিয়ে বললাম-
     বাসেম, একটু সাহায্য করবে প্লিজ! স্যুটকেসটা ওই গেটের কাছ অবধি পৌঁছে দাও!
     বাসেম দুর্দান্তভাবে মাথা নাড়িয়ে খুব মেজাজ নিয়ে বললো-
     ম্যাম, আমি একজন ড্রাইভার! মাল বহনকারি মুটেমজুর নই!
     উত্তর শুনে অবাক হয়ে তাকাতেই শুচি কাছে এলো-
     কেন তুমি ওর কাছে হেলপ চাইছো? নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয়! দেখোনি, এয়ারপোর্টে মাল তোলায় ও কোনো সাহায্যই করেনি?
     সিনসিনাটির ফ্রেডরিক ওরফে তরুণ ফ্রেডের কথা মনে পড়লো। বাসেমের সঙ্গে আচরণের কী দুস্তর ফারাক তার! বললাম-
     কিন্তু আমেরিকায় তো সব ড্রাইভাররাই লাগেজ তুলে নেয়! নামিয়েও দিয়ে যায় শুচি!
     কিন্তু তুমি তো সবার কাছেই সবকিছু আশা করতে পারো না! আমাদের ওখানেও এসব জায়গার মানুষগুলো এই রকমেরই হয়! বলে সে নিজেই সেটাকে টেনে নামাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                          

     প্রায় মিনিট দশেক পরে ডারউইশি ছুটতে ছুটতে এলো হন্তদন্ত হয়ে। মুখের ওপর মখমলি সিল্কের মোলায়েম হাসি ছড়ানো। মেয়েদের তুলনায় অনেক বেশি লম্বা তার শরীর। পরিধানে লম্বা স্কার্ট আর লং স্লিভ টপ। মাথায় হিজাব। ব্যস্তভাবে গেটের তালা খুলতে খুলতে বললো-
     আমি তো বলেছিলাম বিকেল চারটের পরে চেক ইন আর সকাল এগারোটার মধ্যে চেক আউটের ব্যবস্থা এখানে! সেই জন্যই...!
     তোমাকে বিরক্ত করার জন্য সরি ডারউইশি! আসলে আমরা একটু আগেই এসে পড়েছি! আর বুঝতেই তো পারছো, ভীষণ ক্লান্ত! শুচির গলায় বিনয়ের সুর নরমভাবে তরঙ্গ তুললো।
     মিশরীয় মেয়ে ভেতরে ঢুকে ইন্টারকম সিস্টেম বোঝালো প্রথমে। তারপর দরজা খোলা আর বন্ধ করার সব নম্বরগুলো বারকয়েক উচ্চারণ করে শক্ত কাঠের বাঁকানো সিঁড়ি বেয়ে আমাদের নিয়ে উঠতে লাগলো ওপরের দিকে। চারতলার ৩০২ নম্বর এপার্টমেন্টের দু’খানা ঘরে সে আমাদের জন্য থাকার ব্যবস্থা করেছে। ওপরের দিকে উঠতে উঠতেই একটি লিখিত কাগজ হাতে ধরিয়ে দিয়ে ডারউইশি ফের আলতো উচ্চারণে বললো-
     নো পার্টি! নো স্মোক! নো ড্রিঙ্ক! এণ্ড ..!
     শুচি ক্লান্ত হেসে জবাব দিলো-
     সব মনে আছে! তুমি নিশ্চিন্ত থাকো! ওগুলোর কিচ্ছুই হবে না!
     পলকের দৃষ্টিপাতেই বিল্ডিংটির বৈশিষ্ট্য নজরে এলো। সম্ভবত বিগত শতাব্দীতে তৈরী করা হয়েছিল। খুব উঁচু সিলিং। দেয়ালগুলো ভারি। খুব শক্ত। পথে আসতে যতটুকু দৃষ্টিগোচর হয়েছে তাতেও দেখেছি যুক্তরাজ্যের মতো এখানকার বাড়িঘরের সঙ্গেও আমেরিকার পার্থক্য রয়েছে বিশেষভাবে। এখানে স্থাপত্যশিল্পের চমৎকার কারুকার্য বিশেষভাবেই বাইরের ছাদে দৃশ্যমান। সেখানে এমনভাবে সৌন্দর্যের উপস্থাপনা হয়েছে, যাতে গথিক স্থাপত্যের নিশানাটি বড় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জানালার শাটারগুলোও বাইরে নয়, ভেতরের দিকে। কিন্তু এতবড় বিল্ডিং-য়ে লিফটের কোনো ব্যবস্থাই নেই। ভেতরে প্রবেশ করে অবশ্য চোখ জুড়িয়ে গেলো। বিশাল জানালা দিয়ে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে অফুরন্ত আলোর স্রোত। বাথরুম থেকে কিচেনের দেয়াল ওয়ালপেপার দিয়ে নিখুঁতভাবে আবৃত। কাঠের মেঝেয় তারুণ্যের উদ্দীপ্ত তেজ। আইরন থেকে রেফ্রিজারেটর, সবকিছুই পরিপাটি একেবারে।
     ডারউইশি জানিয়েছিল, এ্যাপার্টমেন্টের কাছাকাছি হাঁটাপথের মধ্যেই চার পাঁচটি রেস্টুর‌্যান্ট রয়েছে শ্যাটিউতে। সুতরাং ঘরে লাগেজ রেখেই খাদ্যের অনুসন্ধানে ছুটতে হলো সবার আগে। দশ পনেরো মিনিটের মধ্যেই দেখা মিললো, লা রোমা রেস্টুর‌্যান্ট, বাফেলো গ্রিল, ক্রেসসেণ্ডো রেস্টুর‌্যান্টের। কিন্তু ততোক্ষণে অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে। শুচি মুখ গম্ভীর করে বললো-
     জানতাম এখন রেস্টুর‌্যান্ট খোলা থাকবে না! চলো আমরা বরং সুপার মার্কেট থেকে এখনকার মতো কিছু কিনে আনি। সন্ধেবেলায় এসে রেস্টুর‌্যান্টে ডিনার করবো!
     খানিকটা অগ্রসর হয়ে রাস্তা ক্রস করে সুপার মার্কেটের দিকে আসতে চোখ আটকে গেলো এক সাইনবোর্ডের দিকে -‘ওয়াক এণ্ড গ্রিল’, চাইনিজ, এশিয়ান। উত্তজিত হয়ে বললাম-
     ওই তো, ওই চাইনিজ রেস্টুর‌্যান্টটা খোলা রয়েছে!
     শুচি হাসলো-
     মেসো, মামণিকে একটা ধন্যবাদ দাও! আমাদের কারুরই কিন্তু ওটা নজরে আসেনি! মামণি অনেক কিছুই মিস করে যায় জানি, কিন্তু এটা ঠিকই দেখতে পেয়েছে!
     ঠিক! না পেলে তোমার মামণিরই কষ্ট হতো!
     রেস্টুর‌্যান্টের ভেতরে কোনো কাস্টোমার নেই। কেবল চার বয়সের চারজন চাইনিজ ললনা ছাড়া। নিজেদের মধ্যে গল্পগুজবে মশগুল থাকলেও খরিদ্দার দেখেই সবাই টানটান হয়ে উঠে দাঁড়ালো। শুচি ফিসফিস করলো মেসোর কাছে-
     কোনো আইটেমই তো দেখছি না! কেবল কয়েক টুকরো শ্রিম্প আর চিকেন উয়িং ছাড়া!
     কী আর করা যাবে মামণি! যা আছে একটু খেয়ে নাও! ডিনারে না হয় ...।
     হ্যাঁ, সেই ভালো!
     বললাম–
     বানিজ্যসংস্কৃতি চাইনিজদের রপ্ত বলেই তো সামান্য মাল দিয়েও ব্যবসা চালাতে জানে!
     সেজন্য নিশ্চয়ই ওদের ধন্যবাদ জানাচ্ছো তুমি? শুচি প্লেট এগিয়ে দিয়ে হাসলো আমার দিকে তাকিয়ে।
     আমিও হাসলাম-
     সে তো নিশ্চয়ই! চলবে...

দীপিকা ঘোষ 
ওহাইয়ো, আমেরিকা।