অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
ইউরোপের পথে পথে (তেরো) -দীপিকা ঘোষ

০১৫-এর নোবেল পিস লরিয়েট, রুমানিয়ান-আমেরিকান লেখক এবং প্রফেসর এলাইজার উয়িসেল, বিশেষ এক সাক্ষাৎকারের প্রশ্নোত্তর পর্বে বলেছিলেন-
বিশ্বের সব ধরনের অশান্তি সৃষ্টির কারণ হিসেবে কেন ইহুদীদের দায়ী করা হয় সেটা আজও রহস্যময় ধাঁধা আমার কাছে! কারণ সম্পর্কে ঐতিহাসিক কিংবা অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে যে যুক্তি দাঁড় করানো হয়, তাতে মনে হয়েছে এটা হলো স্পিরিচুয়্যাল এবং সাইকোলজিক্যাল ডিজিজ! যার কোনো সমাধানের পথ নেই!
কিছুক্ষণ নীরব থেকে পরে ভারাক্রান্তভাবে বলেছিলেন-
এমন পরিস্থিতিতে ইহুদিদের বলির ছাগল ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে! অথচ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এরা মাত্র এক শতাংশ!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ইউরোপে কুখ্যাত হলোকস্টের শিকার হয়ে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ১৫ বছর বয়সে বন্দী হয়েছিলেন ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দে জন্ম নেওয়া এই রুমানিয়ান কিশোরটি। পরে ভাগ্যক্রমে পালিয়ে এসেছিলেন আমেরিকায়। বন্দী জীবনের হৃদয়বিদারক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখেছেন ইংরেজি আর ফরাসি ভাষায়। প্রফেসর এলাইজার উয়িসেলের মতো আরও সংখ্যাতীত দুর্ভাগা মানুষদের নারকীয় পরিণতির তথ্য জানতেই আমাদের আজ সেন্ট্রাল প্যারিসে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘Memorial de La Shoah’ মিউজিয়াম দেখতে আসা। দর্শকদের জন্য যাদুঘর উন্মুক্ত রাখা হয় রবি থেকে শুক্রবার। মিউজিয়াম ভিজিটের সময় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫:৩০টা।



উঁচু প্রাচীর ঘেরা গেট পেরিয়ে সিকিউরিটি রুমে নিয়ম অনুযায়ী প্রবেশ করতে হলো সবাইকে। অফিসিয়্যাল ফর্মালিটি সেরে কয়েক পা অগ্রসর হতে চোখে পড়লো বাইরের লম্বা দেয়াল জুড়ে খোদিত রয়েছে নামধামসহ হাজারো নাম! কণিষ্ক ভাবগম্ভীর হয়ে বললো-
এখানে মোট ৭৬০০০ নাম ইনগ্রেভ করা হয়েছে! ফিউচারে আরও করা হবে!

কী অসম্ভব নিঃস্তব্ধতা চারপাশে ছড়ানো! যেন তখনো অন্দরের পরিবেশটি সুগভীর শোকের অপরশ চাদরে ঢাকা! অদূরেই একটি প্রশস্ত পাথরের সাদাটে বেদী। দুজন তরুণী বুকের ওপর আলগোছে হাত রেখে চোখ বুঁজে তার সামনে দাঁড়িয়ে। উপলব্ধি করতে দেরি হলো না-
এরা নিয়মিত এখানে আসা-যাওয়া করে তথ্য প্রদানের জন্য। এবং যে পূর্বপুরুষদের কোনোদিন দেখেনি, তাদের বেদনা অনুভব করে এভাবে তাদের জন্য ভালো থাকার প্রার্থনা জানায়!



ভেতরে প্রবেশ করে কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভাঙতেই মনোযোগ আকর্ষণ করলো ঘর জুড়ে থাকা বিশাল পর্দার টেলিভিশন। সেখানে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার, ডকুমেন্ট, চিঠিপত্র, ডায়েরি, ফটোগ্রাফসহ বিভিন্ন তথ্য প্রদর্শিত হচ্ছে সুশৃঙ্খলভাবে। কণিষ্ক এবারও অস্ফুটে সুগম্ভীর উচ্চারণে জানালো-
প্রাকটিক্যাল ইনফরমেশন জানানোর জন্য এসব দেখানো হচ্ছে। নিচে ইংরেজি সাবটাইটেল রয়েছে, সব বুঝতে পারবে! চুপচাপ বসে বসে দেখো!

দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পষ্ট হলো, যারা ধারাবিবরণীর মতো একের পরে এক দুর্ধর্ষ সব ঘটনার কথা বলে চলেছেন তারা আসলে তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাসঞ্জাত জীবনালাখ্যের বর্ণনা দিচ্ছেন স্মৃতির দুয়ার উন্মোচন করে। অর্থাৎ কোনো না কোনোভাবে সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েও সৌভাগ্যক্রমে সেদিন যারা আত্মরক্ষায় সমর্থ হয়েছিলেন, তাদের অনুসন্ধান করে এনেই এই ডকুমেন্টগুলো সাজিয়ে নেওয়া হয়েছে।
একজন বললেন-
এই যন্ত্রনাদায়ক স্মৃতির বেদনা থেকে তখনই শুধু মুক্ত হওয়া সম্ভব, যারা আমাদের হত্যা করেছে, নির্যাতন করেছে, তাদের যখন সর্বান্তকরণে আমরা ক্ষমা করতে পারবো! সেটাই হবে অনিষ্টকারীদের জন্য আমাদের যথার্থ প্রতিশোধ! কারণ আমাদের ক্ষমাই তাদের শক্তিহীন করে তুলবে!



ঐতিহাসিক কাল ধরেই মানবসভ্যতায় সীমাহীনভাবে বয়ে চলেছে অজস্র অবাঞ্ছিত ঘটনার স্রোত। কুড়ি শতকে সংঘটিত ‘ইউরোপ হলোকস্ট’(ইহুদি গণহত্যা) তাদের অন্যতম। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশকে হত্যা করা হয়। কারুর মতে নিহতদের সংখ্যা সর্বনিম্ন ষাট লাখ। আবার কারুর গবেষণা অনুযায়ী এই সংখ্যা এক থেকে দুই কোটির মতো। এই বর্বরোচিত ঘটনার খলনায়ক এক মিলিটারি ম্যান। জার্মান চ্যান্সেলর এডলফ হিটলার। তার রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারীরা। ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তের অন্ধ ইহুদী বিদ্বেষীরা। প্রাচীনকাল থেকে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ খ্রীষ্টান ধর্মের অনুসারী দেশ ইহুদীদের বিরুদ্ধে হিংস্র নীতি গ্রহণের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রেখেছে। যে ধর্মমত থেকে ইসলাম, খ্রীস্টিয়্যানিটির জন্ম তারা উভয়েই বিশ্বব্যাপি ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করে এসেছে শত, সহস্র বছর ধরে। অথচ আদি থেকে মধ্য যুগ পর্যন্ত মিশর, ইয়েমেন, মরক্কো, জর্ডান, সিরিয়াসহ আরবীয় দেশে গণিতশাস্ত্র, জ্যোর্তিবিদ্যা, দর্শন, রসায়ণ, এমনকি রাজনীতিতেও এই সম্প্রদায়ের মানুষগুলো অসাধারণ অবদান রেখেছেন। কিন্তু তারপরও বাস্তবতা হলো এদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন কখনো বন্ধ থাকেনি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরেও রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতাসহ বিশ্বব্যাপি আরও যে সব জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল তার থেকে পরিত্রাণের জন্যও এই সম্প্রদায়ের সম্পূর্ণ নিধনই ছিল নাকি একমাত্র সমাধান। অন্তত নাৎসী জার্মানীর চ্যান্সেলর হিটলারের গবেষণার ফরমূলা অনুযায়ী- ‘This is the final Solution'. অতএব ১৯৩৩ খ্রীষ্টাব্দের ৩০শে জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই জুইশদের দোকানপাটসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বয়কট করার মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছিল তার নিধনযজ্ঞের পরিক্রমা। বিগত শতাব্দীর সেই বেদনাবিধুর ইতিহাসকে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং ইসরায়েলসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নানাভাবে স্মরণীয় করার উদ্যোগ নিয়েছে দীর্ঘকাল ধরে। ‘Memorial de La Shoah’, ফ্রান্সের এমনই একটি হলোকস্ট স্মরণতীর্থ। 

৫০০০ স্কয়ার মিটারের বিশাল যাদুঘরের ভেতরটা যেন চাপা কান্নার যন্ত্রনায় গুমরে গুমরে কাঁদছে, এমনই মনে হলো দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে আরও খানিকটা অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর। উজ্জ্বল নীলাভ আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে। জুইশ সম্প্রদায়ের আগাগোড়া জীবন ইতিহাস সেখানে পরম মমতায় এমন শৃঙ্খলায় উপস্থাপন করা হয়েছে যে, মুহূর্তে শত শত বছরের জীবন্ত অতীতের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারেন যে কোনো দর্শক। সব ড্যাটাভিত্তিক রের্কডগুলো গবেষণার জন্য সময়ের ক্রমানুসারে সাজিয়ে রাখা হয়েছে যত্ন সহকারে। সেই সঙ্গে রয়েছে পোলিশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, ইংরেজি ভাষায় লেখা তখনকার বই, ম্যাগাজিন, নানা সংবাদপত্র। তারিখটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের, ‘১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫’ সাল।

সীমাহীন মৌনতায় বেদনাতুর হতে হতে দর্শকরা সবকিছুই এমনভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছেন, দেখছেন যে মনে হচ্ছে তারা প্রত্যেকেই যেন সেই বিয়োগান্তক ঘটনার সাক্ষী। স্মৃতির দুয়ার খুলে সমবেদনার অতলে তাই একাগ্রতায় একাত্ম হয়ে যাচ্ছেন। প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হলো অমূল্য জীবনের দৃশ্যছবি। পূর্ব ইউরোপ থেকে ইহুদী সম্প্রদায়ের ফ্রান্সে ইমিগ্র্যান্ট হয়ে আসার চিত্র, জার্মান সৈন্যদের ফ্রান্স দখলের দুর্ধর্ষতা, নির্বিচারে গ্রেফতার করার দৃশ্য, অসহায় মানুষগুলোর যন্ত্রনার নারকীয়তা, কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে তাদের পুড়িয়ে মারার আলোকচিত্র এখনো দারুণভাবে জীবন্ত।

একজন বৃদ্ধ মানুষের দিকে নজর আটকে গেলো। নিচু হয়ে ঝুঁকে পড়ে একটি বিশেষ ফটোগ্রাফের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন নিষ্পলক। ছবিটি এক তরুণী মায়ের। বছর দুয়েকের শিশু কোলে উদভ্রান্ত হয়ে ছুটছেন। মন জানতে চাইলো-
শিশুটি কি আজকের এই প্রবীণ মানুষটি? বেঁচে গিয়েছিলেন কোনোভাবে? আর তরুণী? সে কি তার জননী? চোখ তুলছেন না কেন? অশ্রুজলে ভিজে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে দৃষ্টি?
ঘোষ পেছন থেকে তাড়া দিলো-
এত সময় দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে? আরও অনেক কিছু দেখার রয়েছে তো?

বেরিয়ে আসার আগে আর একবার টেলিভিশনের সামনে এসে দাঁড়ালাম। অন্য কারুর উপস্থিতি নেই এখন। জীবন আলেখ্য বলে চলেছেন ইভা মোজেজ কোর। এক আশি পেরুনো প্রবীণা। মাথার সাদাটে সোনালি চুলে পিক্সি স্টাইলের কাট। মুখের ওপর ভয়ংকর স্মৃতিচারণের আবেগ।                                বলছেন-
আমার আর মিরিয়মের তখন দশ বছর বয়স! মিরিয়ম আমার যমজ বোন! সপ্তাহে তিন দিন, সোম, বুধ আর শুক্রবার আমাদের ল্যাবরেটরিতে নিয়ে যেত ওরা! আট ঘন্টা ন্যাংটো রেখে আপাদমস্তক মেপে মেপে   একটি চার্টে মাপগুলো লিখে নিতো! তারপর মিরিয়ামের চার্টের সঙ্গে তুলনা করে দেখতো! মাপ নেবার আগে আমার বাম হাত থেকে প্রচুর রক্ত নেওয়া হতো। পরে ডান হাতে দারুণ যন্ত্রনাময় ইনজেকশন দিতো! এটুকু বলেই থেমে গেলেন ইভা। তার মুখের ওপর অবসন্নতা ছায়া ফেললো।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে ইভা আবার বললেন-
আমরা ছিলাম গিনিপিগের মতো! ইনজেকশন দেবার পরে খুব কষ্ট হতো! প্রবল জ্বর হতো আমার! বমি হতো!
প্রশ্ন হলো-
কখনো পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করোনি?
পালানোর উপায় ছিল না!
পেছন থেকে কানে এলো-
জেনিটিক এক্সপেরিমেন্টের জন্য!
শুচি কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে জানি না। তাকিয়ে দেখি তার মুখের ওপরে বিষণ্নতার ছায়া ঘনিয়েছে।

হিটলারের অসুস্থ মানসিকতার কারণে ইহুদী সম্প্রদায়ের লক্ষ লক্ষ মানুষগুলোকে নির্বিচারে বলি হতে হয়েছে একদিন। কিন্তু ইতিহাস জানাচ্ছে, জাতিগত, চেহারাগত, আচরণগত এবং রাজনৈতিক আদর্শের কারণে হত্যার তালিকায় আরও কয়েকটি সম্প্রদায়কেও যোগ করেছিলেন জার্মান কর্তৃপক্ষ। এরা হলেন জিপসি সম্প্রদায়, স্লাভিকদের কিছু অংশ, সমকামি মানুষ এবং কমিউনিস্ট আর সোশ্যালিস্টরা। সেদিনকার সেই বিচারশক্তিহীন অসুস্থ ইউরোপের মানসিক অবস্থাকে আড়াল করার কোনো উদ্যোগই আজকের মানবতাবাদী পাশ্চাত্যের নেই দেখে অসংখ্য ধন্যবাদ জানালাম মনে মনে!
কিন্তু তারপরেই প্রশ্ন জেগে উঠলো-
প্রফেসর উয়িসেল যে বিদ্বেষকে আধ্যাত্মিক এবং মানসিক রোগ বলে চিহ্নিত করেছেন, তার অবসান সম্ভব কি হবে কোনোদিন?
কেননা কদিন আগেই জেরুসালেমের হজ আমিন আল হুসেইন কঠিন হুংকার ছেড়েছে-
হিটলারের মতো ইহুদীদের আবারও পুড়িয়ে মারার সময় এসেছে! পুড়িয়ে মারো তাদের! চলবে…

দীপিকা ঘোষ
ওহাইয়ো, আমেরিকা।